ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 
Nahid-

 

২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৪ দৈনিক জনকন্ঠে প্রকাশিত একটি ছোট্ট অথচ গুরুত্বপূর্ণ খবর পড়ে হতাশায় মনটা ভরে গেল। শিক্ষামন্ত্রী মহোদয় এই ছোট্টি সংবাদ প্রতিবেদনটির প্রতি আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। জানি এতে কোন লাভ হবে না; তবু বিবেকের তাড়নায় লিখতে হচ্ছে। আমাদের মতো নগণ্য থেকে শুরু করে দেশের পন্ডিত ও শিক্ষাবিদরা বর্তমানে পিএসসি, জেএসসি, জেডিসি ও এসএসসি পরীক্ষায় পাশের হারের বিস্ফোরণ নিয়ে পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি করলেও পাশের হারের বিস্ফোরণ ঘটেই যাচ্ছে। সরকার শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যাপক সফলতার দাবী করে আসলেও বর্তমান শিক্ষাব্যাবস্থায় নিয়ে নানা অসঙ্গতি ও এর মান নিয়ে ছাত্র-ছাত্রী, অভিবাবক শিক্ষক ও বিশেষজ্ঞদের পক্ষ থেকে হাজারো প্রশ্ন উত্থাপিত হচ্ছে। সবারই এক কথা পরীক্ষার ফলাফলে পাশের হার এ যাবতকালের মধ্যে সর্বোচ্চ হলেও শিক্ষার মান তেমন বাড়েনি। এ কথা প্রাথমিক স্তর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত সর্বক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। এ নিয়ে শিক্ষক প্রতিনিধি ও বিশেষজ্ঞরা বারবার অভিযোগ করেও কোন কাজ হচ্ছে না।

যাক আবার ফিরে আসছি সেই সংবাদ প্রতিবেদনটিতে। সেই প্রতিবেদনের শিরোনাম ‘ঢাবিতে ইংরেজী বিভাগে ভর্তির যোগ্য মাত্র ২ জন’। দৈনিক জনকন্ঠের বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদদাতার ওই প্রতিবেদনে বলা হয় ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষে ‘খ’ ইউনিটের অধীনে কলা, সামাজিক বিজ্ঞান ও আইন অনুষদের ভর্তি পরীক্ষায় ভয়াবহ ফল বিপর্যয় হয়েছে। এই পরীক্ষায় ফেল করেছে ৯০ শতাংশ শিক্ষার্থী। এই ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্রে পাঁচটি অংশ ছিল। এর মধ্যে অন্যতম একটি অংশ ছিল সাধারণ ইংরেজি। যাতে উচ্চ মাধ্যমিকের সাধারণ ইংরেজীর আলোকে প্রশ্ন করা হয়। এতে ন্যুনতম পাশ মার্ক পায়নি সিংহভাগ ভর্তিচ্ছুক ছাত্র-ছাত্রী।…কলা অনুষদের অধীন ‘খ’ ইউনিটে এবারের ভর্তি পরীক্ষার প্রকাশিত ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এ বছর ইংরেজী বিভাগে ভর্তি হতে মোট ভর্তিচ্ছুদের মধ্যে ইলেকটিভ ইংরেজী অংশের উত্তর করেছিল মাত্র ১ হাজার ৩৬৪ জন। উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিষয়টির উত্তর করেছেন মাত্র ১৭ জন। এর মধ্যে ইংরেজী বিভাগে ভর্তির যোগ্যতা অর্জন করেছেন মাত্র ২ জন। অথচ বিভাগটিতে আসন সংখ্যা রয়েছে ১৩২টি। গত ১৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হয় এই ভর্তি পরীক্ষা। ফলাফল প্রকাশ করা হয় ২৩ সেপ্টম্বর রাতে।’ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ভর্তি পরীক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, ‘খ’ ইউনিটের অধীনে এবারের ভর্তি পরীক্ষায় ২ হাজার ২২১ আসনের বিপরীতে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন ৪০ হাজার ৫৬৫ জন। এতে ইংরেজীতে উত্তীর্ণ হয় মাত্র ৩ হাজার ৮৭৪ জন।

মাস কয়েক আগে কয়েকটি প্রথমসারির অনলাইন পত্রিকা ও ব্লগে ‘বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ও শিক্ষার মান নিয়ে হাজারো প্রশ্ন’ শিরোনামে আমার এ সংক্রান্ত একটি লেখা প্রকাশিত হয়েছিল। এতে পাঠকরা এ নিবন্ধটি পড়ে যে নেতিবাচক মন্তব্য করাছিল এ এখানে উল্লেখ করলে লেখার পরিধি অনেকটাই বেড়ে যাবে, তাই তা এখানে উল্লেখ করলাম না। এখানে আমার সেই নিবন্ধের একটি অনুচ্ছেদের উদ্ধৃতি দিতে চাই, যেখানে আমাদের পাবলিক পরীক্ষায় কিভাবে ফলাফলের বিস্ফোরণ ঘটানো হচ্ছে তা উল্লেখ করেছিলাম। সেখানে আমি বলেছিলাম-শিক্ষার মান বাড়বেই বা কি করে। প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় পরীক্ষার থেকে খাতা মূল্যায়ন এবং সর্বশেষ টেব্যুলেশন ও ফলপ্রকাশে যে তুঘলকী কান্ডকারখানা চলে তা শিক্ষাক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সবাই জানেন। দেশের প্রাইমারী স্কুলগুলোর সিংহভাগ স্কুলগুলোতেই কোন লেখাপড়া নেই। এর মূল কারণ ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যাধিক্য, শিক্ষক-শিক্ষিকার অভাব। অধিকাংশ স্কুলেই এক একটি শ্রেণীতে ১ থেকে দেড়শ’ শিক্ষার্থী। সেখানে একজন শিক্ষকের পক্ষে কিছুতেই পাঠদান সম্ভব নয়। রোল কল করে ও অন্যান্য কাজ করতে করতেই নিদ্দিষ্ট সময় চলে যায়। এটা উর্ধ্বতন কতৃপক্ষ থেকে নিন্মতম পর্যায় পর্যন্ত সবাই জানে। তবু পরীক্ষার সময় টার্গেট নির্ধারণ করে দেয়া হয়, যাতে কেউ পরীক্ষায় ফেল না করে। আর সমাপনী পরীক্ষায় নাকি এমন ও নির্দেশ দেওয়া থাকে শিক্ষার্থরা পরীক্ষার খাতায় লিখতে পারুক বা না পারুক বা কম পারুক যেভাবেই হোক লিখিয়ে শতভাগ পাশ নিশ্চিত করতে হবে। বাজারে এমন কথাও চালু আছে, পরীক্ষার খাতায় পাশ মার্ক না ওঠলে সেখানে খাতা মূল্যায়নকারীরাই লিখে পাশ মার্ক দিতে হবে। তারপরও যদি পাশের হার না বাড়ে তা হলে ফলাফল প্রকাশের সময় এভারেজ গ্রেস মার্ক দিয়ে পাশের হার বাড়ানোর অলিখিত নির্দেশ আছে। তাই পাশের হার বাড়লেও এসব ছাত্র-ছাত্রীরা যখন হাইস্কুলে ভর্তি হয় তখন দৈন্যদশা প্রকটভাবে ধরা পড়ে। এ কথাটা পিএসসি, জেএসসি, এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার সর্বক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার সংবাদ প্রতিবেদন থেকে জানা যায় ঢাবির ইরেজি বিভাগে ভর্তির যোগ্য অর্জন করেছে মাত্র ২ জন। ইংরেজি বিভাগে আসন সংখ্যা রয়েছে ১৩২ টি। ১৩২ আসনের বিপরীতে মাত্র ২ জন ছাত্র ভর্তি যোগ্যতা অর্জন করায় বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষ বিভাগটির ক্লাশ চালু নিয়ে আছে চিন্তায়। খ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় ইংরেজি বিভাগের পাশাপাশি আইন, অর্থনীতি, লোক প্রশাসন, উইমেন এ্যান্ড স্টাডিজ, শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা, উন্নয়ন অধ্যয়ন, পপুলেশন সায়েন্স, ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট এ্যান্ড ভালনারাবিলিটি স্টাডিজ, ক্রিমিনোলজি এবং টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র অধ্যয়ন বিভাগসমূহেও চাহিদা মতো ছাত্র খুঁজে পাওয়া যায়নি। সেই কারণে বিগত বছরের মতো এবারও উপরোক্ত বিভাগগুলোতে শিক্ষার্থী সংকট দেখা দেবে বলে মনে করছেন ঢাবি কতৃপক্ষ।

পরিশেষে নির্দ্বিধায় এ কথা বলা যায়, আমাদের দেশের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় পাবলিক পরীক্ষায় পাশের হারের বিস্ফোরণ ঘটলেও শিক্ষার মান যে বাড়েনি তা আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিল ঢাবির ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল। এই ফলাফল দেখে শিক্ষাক্ষেত্রে যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে বলে শিক্ষামন্ত্রী দাবি করলেও দেশের সচেতন শিক্ষানুরাগী, সাধারণ মানুষ, ছাত্র-ছাত্রীদের অভিভাবকরা কিছুতেই এ দাবি কিছুতেই মেনে নিতে পারছেনা। এ যদি হয় উচ্চশিক্ষাঙ্গনে ভর্তি পরীক্ষায় ফলাফলের হতাশাজনক চিত্র, তাহলে আমরা কি করে মেনে নেব যে শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নতি হয়েছে? মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর কাছে এটাই অভাজনের ব্যাকুল জিজ্ঞাসা।