ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

গতকাল ও আজ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত দুইটি খবর নিয়ে বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে চরম হতাশা বিরাজ করেছে। দুইটি খবরই শেখ হাসিনার পররাষ্ট্রনীতি ও কুটনৈতিক বিষয়াবলী নিয়ে। এর মধ্যে প্রধান খবরটি হলো জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে যোগদানকারী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মধ্যে অনুষ্ঠিত শীর্ষ পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকটি নিয়ে। আর দ্বিতীয় খবরটি হলো বিশ্বের পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মাজেনার ‘ডিক্যাব’ টকের বক্তব্য নিয়ে। আমাদের আত্মীয়-স্বজন ও পরিচিত যেসব বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মী কিছুদিন আগেই বলেছিল‘ হাসিনা সরকার অবৈধ, বিশ্ববাসীর কাছে এ নির্বাচনের কোন গ্রহণযোগ্যতা পাবেনা। কঠোর আন্দোলনের মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে দেখ জনগণই ক্ষমতা থেকে কিভাবে টেনেহিচড়ে নামায়। তাই এই সরকারের আমলে বিএনপির ডাকা ২১ সেপ্টেম্বরের হরতালের আগে বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে চাঙ্গাভাব লক্ষ্য করা গেলেও স্মরনাতীতকালের সবচেয়ে ফ্লপ হরতাদের পর সেসব নেতাকর্মীদের মনোবল অনেকটাই ভেঙে যায়। প্রায় একই সময়ে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট থেকে ১০টি দল বের হয়ে আলাদাভাবে ‘বাংলাদেশ ন্যশনালিষ্ট ফ্রন্ট’ গঠন করে বের হয়ে গেলে বিএনপি নেতাকর্মীরা আরও হতাশায় নিজজ্জিত হয়। আর গতকাল ও আজ গণমাধ্যমে উল্লেখিত দুইটি খবর প্রকাশিত হওয়ার পর তাদের চেহারা মলিন ও কপালে চিন্তার ভাঁজ ফুটে ওঠেছে। বিএনপি নেতাকর্মীরা এখন নিজেরাই বলাবলি করছে। আন্দোলন করে কিছুতেই শেখ হাসিনাকে হঠানো যাবে না। শেষ ভরসা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়; শেষ পর্যন্ত তারাও শেখ হাসিনা সরকারকে যেভাবে সমর্থন ও সহযোগীতার আশ্বাস দিয়েছেন তাতে আরও হতাশ হয়ে পড়েছে বিএনপি নেতাকর্মীরা। যার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে বিএনপি চেয়ার পার্সনের উপদেষ্টা ও বার কাউন্সিলের সহসভাপতি এ্যাডভোটে মাহবুব হোসেনের কথায়। তিনি ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৪ ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে জাতীয়তাবাদী ৭১ প্রজন্ম আয়োজিত এক আলোচন সভায় বলেন, একাত্তরে কে কী করেছে তা ভুলে সবাইকে এক হয়ে মাঠে নামতে হবে। এর কোন বিকল্প নেই। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা থেকে বিদায় নিলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। তিনি বলেন, সমস্যা একটা, সমাধানও একটাই। আমাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া অবৈধ সরকারকে বিদায় করতে হবে ’।বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন হতাশা থেকে খন্দকার মাহবুব হোসনে ৭১ কে ভুলে যাওয়ার কথা বলেছেন। তিনি কী একবারও ভেবে দেখেছেন ৭১ কে ভুলে গেলে যে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামের গৌরবগাথা ও চেতনাকেই ভুলে যেতে হবে। বাংলাদেশেকে পরিচয় দিতে হবে জিয়ার শাসনামল থেকে!

যাক এখন ফিরে আসি প্রসঙ্গে। ২৭ সেপ্টেম্বর শনিবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রথম সরাসরি বৈঠক হয় নিউইয়র্কে। শেখ হাসিনা বৈঠককালে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীকে স্থল সীমানা চুক্তি কার্যকর এবং তিস্তা চুক্তিসহ দুই দেশের অমীমাংসিত ইস্যুগুলো সমাধানের উদ্যোগ নেয়ার আন্তরিক আহ্বান জানান। মোদির জবাব ছিল ‘ম্যায় রাস্তা নিকাল রাহাহু’ । শুধু তাই নয়, শেখ হাসিনা নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে বাংলাদেশের সরাসরি স্থল যোগাযোগের ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায়গুলো তুলে নিতে মোদি সরকারের সহযোগিতা চাইলে তাতেও তিনি ইতিবাচক সাড়া দেন। মোদি বাংলাদেশকে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেয়ার পাশাপাশি খুবই আন্তরিকতার সাথে বলেছেন, বাংলাদেশ ও ভারতের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত এক সুতোয় গাঁথা। ‘বঙ্গবন্ধু দেশ বানায়া, উসকি লাড়কি দেশ বাঁচায়া।’ যার বাংলা অর্থ দাঁড়ায় ‘বঙ্গবন্ধু দেশ গড়েছেন আর তাঁর কন্যা বাংলাদেশকে রক্ষা করেছেন।’

নিশ্চয়ই সবার মনে থাকার কথা যে, ভারতের নির্বাচনে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপি সরকারের ভরাডুবির পর মোদি সরকার ক্ষমতায় আসায় বিএনপি শিবিরে রীতিমতো উল্লাস সৃষ্টি হয়েছিল এই মনে করে যে, এবার আওয়ামী লীগ সরকার আর কিছুতেই ভারতের নতুন মোদী সরকারের সমর্থন পাবে না। মোদি সরকারের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা পাবে বিএনপি ও তার নেতৃত্বাধীন জোট। কেননা, বিএনপি-জামায়াত জোটের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল পশ্চিমবঙ্গে বাম দলকে পরাজিত করে তৃণমূল যেহেতু ক্ষমতাশীল এবং বিএনপি-জামায়াত জোট তৃণমূলকে ক্ষমতায় আনার ব্যাপারে কাজ করেছে সেহেতু কিছুতেই আওয়ামী লীগ আর ভারতের নতুন সরকারের সমর্থন পাবেনা। পশ্চিমা দেশের ইচ্ছায় তৃণমূল নেত্রী বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষ শেখ হাসিনার সরকার পতনের জন্য কথা থাকা সত্ত্বেও ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সফরসঙ্গী হননি! তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি এবং ছিটমহল আদান-প্রদান চুক্তিগুলোকেও ঝুলিয়ে রেখেছে শেখ হাসিনা সরকারকে অজনপ্রিয় করে তোলার লক্ষ্যে যেমনটি ঘটেছিল পদ্মা সেতু নিয়ে। মোদী সরকারও একই ধারাবাহিকতা বজায় রাখবে। কিন্তু বর্তমানে একটি উল্টো বা একেবারে বিপরীত চিত্র ভারত ও পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। যে বিজেপি নেতা মোদিকে ধর্মান্ধ, সাম্প্রদায়িক, ধর্মীয় জঙ্গীত্বের দোসর হিসেবে দেখা হতো, তিনি এখন হয়ে উঠেছেন ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশের সহযোগী!

৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে ও পরে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা সবারই জানা। নির্বাচনের আগে কুটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে সরিয়ে বিএনপি –জামায়াতকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনার জন্য যুক্তরাষ্টের বাংলাদেশে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত মাজেনা ভারতসহ বিভিন্ন দেশে দূতিয়ালী করেছিলেন। কিন্তু তাতে মাজেনা সফল না হলেও একেবারে হাল ছেড়ে দেননি। নির্বাচনের পরে মধ্যবর্তী নির্বাচনের ইঙ্গিত দিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিরোধ নিরসন করে অনেকদিন থেকেই রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে সংলাপের আহ্বান জানিয়ে আসছিলেন। কিন্তু মজেনার কথাই এখন উল্টো সুর। ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৪ রবিবার ঢাকায় ডিপ্লোমেটিক করেসপন্ডেন্টস এ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ডিক্যাব) আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে মজেনা বলেছেন, ‘আমি মনে করি এটা একটা অভ্যন্তরীণ বিষয়, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো ও জনগণের মীমাংসা করা প্রয়োজন। বিএনপির শেষ ভরসা সুপার পাওয়ার আমেরিকার বাংলাদেশে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত মজেনার এ কথাও বিএনপির শেষ ভরসার কফিনের শেষ পেরেকটি টুকে দিল।

পরিশেষে শেষ করবো এই বলেই, মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধের মামলায় জামায়াত ও এর শীর্ষ নেতাদের কয়েকজন অভিযুক্ত হয়ে এক অনিশ্চিত অবস্থায় নিপতিত হয়েছে। ইতোমধ্যেই বিএনপি ও জামায়াতের সম্পর্কে ফাটল সৃষ্টি হয়ে রাজনীতির চেহারা পাল্টে গেছে। জামায়াত চলছে অনেকটা একলা চল নীতিতে। আর বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বিভিন্ন দুর্নীতির মামলায় আসামি হয়ে এখন গ্রেফতার আতঙ্কে পড়ে বিভিন্ন জনসভায় বলে বেড়াচ্ছেন ‘গ্রেফতারে ভয় পাই না। আমাকে বন্দী করার আগে নিজেদের পালানোর রাস্তা পরিষ্কার করুন।’ সম্প্রতি ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও জামালপুরের দুটি জনসভায় বিএনপি নেত্রী জামায়াতের সঙ্গে তাদের ফাটল ধরানো যাবে না বলে বক্তব্য রেখে নতুন করে আন্দোলনের হুঁশিয়ারিও প্রদান করেছেন। এ ধরনের হুঁশিয়ারি এ পর্যন্ত বহুবার ব্যক্ত দেয়া হয়েছে। কিন্তু কিছুতেই সরকারের কিছুই করতে পারছেনা। তাই বিএনপি ও জোটের নেতাকর্মীরা কোন আন্দোলন কর্মসূচিতেই আশ্বস্ত হতে পারছেন না। বিএনপি-জামায়াত তথা বিশদলীয় জোট আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনার রাজনীতির কৌশল, বিদেশনীতি ও কুটনীতির সাথে কিছুতেই কুলিয়ে উঠতে পারছে না দল হিসেবে বিএনপি ও বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া। গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ করেনি। নির্বাচনের আগে ও পরে এবং বর্তমানে বিএনপির সব হুঙ্কার, হুঁশিয়ারি সবই ধূলিষ্যাৎ হয়ে গেছে আওয়ামী লীগের বিশেষ করে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কৌশলের কাছে।