ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য সিনিয়র আওয়ামী নেতা, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী নিজের মুখের পচনদোষে নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারলেন। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে বসবাসরত টাঙ্গাইলবাসীদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে রাসুল (স), পবিত্র হজ ও তবলীগ নিয়ে বিরূপ মন্তব্যের পর সারা দেশে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। লতিফ সিদ্দিকী যখন ধৃষ্টতাপূর্ণ বক্তব্য রাখেন তখন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা লন্ডনের পথে বিমানে ছিলেন। হিথরো বিমান বন্দরে নেমেই তিনি লতিফ সিদ্দিকীর রাসুল (স), পবিত্র হজ ও তবলীগ নিয়ে বিরূপ মন্তব্যের কথা শোনেন। বিমান বন্দর থেকে হোটেলে ফিরেই দেশে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী ও দলের নীতিনির্ধারণী নেতাদের সাথে কথা বলেন। এরপরই শেখ হাসিনা মন্ত্রী পরিষদ থেকে আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীকে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে ফেরার পর এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের খবর থেকে জানা গেছে।

ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকীর বক্তব্যে সরকার ও সরকারী দল আওয়ামী লীগও বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছে। তার বক্তব্য নিয়ে ঘরে-বাইরে সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে বিরূপ প্রতিক্রিয়া। আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা তাঁর বক্তব্যের সমালোচনা তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্যে দাবি জানায়। এ নিয়ে দেশব্যাপী তোলপাড় চলছে। তাঁর এই বক্তব্য এখন টক অব দ্যা কান্ট্রি। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের উপস্থিতিতেই সজীব ওয়াজেদ জয়ের বিরুদ্ধে মন্ত্রীর এ ধরনের বক্তব্যে বিস্মিত হয় দলের কর্মী ও সমর্থকরা। সভাস্থলেই অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করলে একপর্যায়ে মন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে চলে যান। পরে লতিফ সিদ্দিকীর ওই বক্তব্যের ভিডিও ক্লিপ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিশ্বব্যাপী ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি ওঠে। বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন এবং ব্যক্তির পক্ষ থেকে তাঁর বক্তব্যের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে তাঁকে গ্রেফতার করে শাস্তির জোর দাবি উঠেছে। ডাক ও টেলি যোগাযোগমন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীকে মুখপোড়া বলে মন্তব্য করেছেন আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও জাতীয় সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী। মঙ্গলবার আওয়ামী লীগ সভাপতির ধানমন্ডির রাজনৈতিক কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে হজ ও তবলীগ জামাত নিয়ে আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর করা মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় তিনি এ কথা বলেন। পবিত্র হজ, তবলীগ এবং প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়কে নিয়ে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য লতিফ সিদ্দিকীর বক্তব্য গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীর যে বিরূপ মন্তব্য নিয়ে দেশ-বিদেশে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বয়ে যাচ্ছে এবং আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া তার অংশবিশেষ এখানে উল্লেখ করতে চাই। পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী গত রবিবার যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক জ্যাকসন হাইটসের একটি হোটেলে সেদেশে বসবাসরত টাঙ্গাইলবাসীর সঙ্গে মতবিনিময়কালে আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী হজ ও তবলীগ জামাতসহ বিভিন্ন ধর্মীয় বিষয় সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করে সমালোচনার ঝড় তোলেন। তিনি বলেন, ‘আমি হজ আর তবলীগ জামাতের ঘোরতরবিরোধী। আমি জামায়াতে ইসলামীরও বিরোধী। তবে তার চেয়েও হজ ও তবলীগ জামাতের বেশি বিরোধী।’ এ সময় তিনি প্রধানমন্ত্রীপুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় এবং সাংবাদিকদের সম্পর্কেও আপত্তিকর মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, এ হজে যে কত ম্যানপাওয়ার নষ্ট হয়। হজের জন্য ২০ লাখ লোক আজ সৌদি আরবে গিয়েছে। এদের কোন কাম নাই। এদের কোন প্রডাকশন নাই। শুধু রিডাকশন দিচ্ছে। শুধু খাচ্ছে আর দেশের টাকা বিদেশে দিয়ে আসছে। এভারেজে যদি বাংলাদেশ থেকে এক লাখ লোক হজে যায় তাহলে প্রত্যেকের পাঁচ লাখ টাকা করে মোট ৫০০ কোটি টাকা খরচ হয়। হজ কিভাবে এসেছে এর ব্যাখ্যা দিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘আব্দুল্লাহর পুত্র মোহাম্মদ চিন্তা করল এ জাজিরাতুল আরবের লোকেরা কিভাবে চলবে। তারা তো ছিল ডাকাত। তখন একটা ব্যবস্থা করল যে আমার অনুসারীরা প্রতিবছর একবার একসঙ্গে মিলিত হবে। এর মধ্য দিয়ে একটা আয়-ইনকামের ব্যবস্থা হবে।’

তবলীগ জামাতের সমালোচনা করে আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী বলেন, তবলীগ জামাত প্রতিবছর ২০ লাখ লোকের জমায়েত করে। নিজেদের তো কোন কাজ নেই। সারাদেশের গাড়িঘোড়া তারা বন্ধ করে দেয়। তিনি তাঁর বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের বিষয়েও বিরূপ মন্তব্য করেন। প্রবাসী বাংলাদেশীদের উদ্দেশে মন্ত্রী বলেন, কথায় কথায় আপনারা জয়কে টানেন কেন। ‘জয় ভাই’ কে? জয় বাংলাদেশ সরকারের কেউ নন। তিনি কোন সিদ্ধান্ত নেয়ারও কেউ নন।

টক শো-তে যারা অংশ নেন তাদের টক মারানি আখ্যা দিয়ে লতিফ সিদ্দিকী বলেন, নিজেদের কোন কাজ না থাকায় ক্যামেরার সামনে গিয়ে তারা বিড়বিড় করে আর কোন কাজ নেই। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে তিনি বার বার উত্তেজিত হয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। এক সাংবাদিককে ধমক দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি কি তোমার মতো কথা বলব। আমি আমার মতো কথা বলব। তুমি এখানে আসলা কেন, তোমাকে কে বলেছে আসতে?’ প্রবাসীদের উদ্দেশে লতিফ সিদ্দিকী বলেন, আপনারা বিদেশে এসেছেন কামলা দিতে এবং সবসময় কামলাই দেবেন। প্রবাস থেকে প্রকাশিত পত্রপত্রিকাগুলোকে টয়লেট পেপার বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, আমি যাদের কাছে ৪ লাখ চাঁদা চেয়ে ১ লাখ টাকা পেয়েছি তাদের কোন তদ্বির এখন রক্ষা করি না। সরকারের একজন মন্ত্রীর মুখে এ ধরনের আপত্তিজনক কথাবার্তায় সভাস্থল থেকে অনেকেই বের হয়ে যান।

আগেও বিভিন্ন বিষয়ে বিরূপ ও অশালীন মন্তব্য করে সরকার ও আওয়ামী লীগকে জনসম্মুখে হেয়প্রতিপন্ন করেছেন আবদুল লতিফ সিদ্দিকী। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর সফর সঙ্গী হিসেবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগদান করতে গিয়ে দেশের ও বিশ্বের কোটি কোটি মুসলমানের ধর্মানুভূতিতে আঘাত হেনে যে ধৃষ্টতাপূর্ণ বক্তব্য রেখেছেন তা কিছুতেই মেনে নেয়া যায় না। লতিফ সিদ্দিকী বিশ্বের কোটি কোটি মুসলমানের ধর্মানুভূতিতে আঘাত করে যে সব উক্তি করছেন, তা কোন সুস্থ্য স্বাভাবিক মানুষ করতে পারেন না। আর বিভিন্ন টেলিভিশনের সংবাদে যে ভিডিও ক্লিপটি প্রচারিত হয়েছে তা দেখে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই ভাবতে পারে, তিনি বেসামাল অবস্থায় ছিলেন কিনা?

শেষ করবো এই বলেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের আবেগের প্রতি সন্মান প্রদর্শ করে লতিফ সিদ্দিকীতে মন্ত্রীসভা থেকে বরখাস্তের যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে এ জন্য তাঁকে দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, ব্যক্তিত্ব ও বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন ধন্যবাদ জানিয়েছেন। আমি প্রধানমন্ত্রীর তড়িৎ সিদ্ধান্তকে ধন্যবাদ জানাই। তিনি লতিফ সিদ্দিকী বিষয়ে তড়িৎ ব্যবস্থা না নিলে দেশের মানুষ আরো বেশি ক্ষুদ্ধ হয়ে ওঠতো। যা একসময় সরকারের পক্ষে সামাল দেয়া কঠিন হয়ে পড়তো।