ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

52_Golam+azam_Home_Visitors_24102014_0002

রাজাকার শিরোমণি, কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী জামায়াতের সাবেক আমির আমৃত্যু দন্ডপ্রাপ্ত গোলাম আযমের স্বাভাবিক মৃত্যুর কারণে আজীবনের কারাভোগের নরক যন্ত্রনা থেকে বেঁচে গেলেন। তা না হলে যতদিন বেঁচে থাকতেন ততদিন তাকে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের আজীবনের কারাভোগের দন্ড ভোগ করে যেতে হতো। সে দিক থেকে গোলাম. আযম মরে গিয়ে বেঁচেই গেলেন বলা যায়। আর মৃত্যুর মাধ্যমেই এ রাজাকার শিরোমণীর জীবনের যত কালো অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটলেও তার নামটি ইতিহাসের পাতায় যুক্ত থাকবে একজন বাংলাদেশবিরোধী কুখ্যাত ঘৃণিত ব্যক্তি হিসেবে।

বাংলাদেশের প্রতিটি দেশপ্রেমিক নাগরিক জানে যে, একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধকালে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ২০১৩ খ্রীস্টাব্দের ১৫ জুলাই গোলাম আযমকে ৯০ বছরের কারাদন্ডাদেশ দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। রায়ে বিচারক বলেছিলেন,‘ গোলাম আযমের অপরাধ মৃত্যুদন্ড পাওয়ার যোগ্য হলেও বয়স ও শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় তাঁকে এই দন্ড দেয়া হলো।’ এই রায়ের বিরুদ্ধে খালাস চেয়ে ওই বছরের ৫ আগস্ট আপীল করেন গোলাম আযম। আর সর্বোচ্চ শাস্তি চেয়ে গত বছরের ১২ আগস্ট রাষ্ট্রপক্ষ আপীল করে। এই গোলাম আযম কেবল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামের পাকি দালাল, রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামস শিরোমণিই ছিলেন না; স্বাধীনতা লাভের পরও তিনি ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান পুনরুদ্ধার আন্দোলনের পাকি দোসর। এই ব্যক্তি মুক্তিযুদ্ধের পর পাকিস্তানে পালিয়ে গিয়ে সৌদি আরবসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ঘুরে বেরিয়েছেন যাতে কেউ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি না দেয়। তাই তার অপরাধ ছিল সীমাহীন। একজন মুক্তিযোদ্ধা হয়েও জেনারেল জিয়াউর রহমান গোলাম আযমকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে এনে লাখো শহীদের রক্তের সাথে বেঈমানী করেছিলেন। পাপ যে বাপকেও ছাড়েনা তার প্রমাণ আমৃত্যু দন্ডাদেশ নিয়ে তার মৃত্যু।

যাক, আমৃত্যু কারাদন্ডাদেশ মাথায় নিয়ে গোলাম আযম মৃত্যু বরণ করেছেন। বৃহস্পতিবার রাতে একটি টিভি অনুষ্ঠানে শাহরিয়ার কবির আলোচনা করার সময় গোলাম আযমের মৃত্যুর সংবাদ প্রচারিত হলে এই সাথে গোলাম আযমের আইনজীবী তাজুল ইসলাম বলছিলেন, গোলাম আযম মগবাজারে পারিবারিক কবরস্থানে সমাহিত হতে চেয়েছেন এবং সাঈদী অথবা নিজামীর ইমামতিতে জানাজা পড়ানোর ইচ্ছার কথা তিনি জানিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধকালে গোলাম আযমের মতো সাঈদীও যুদ্ধাপরাধের দায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত। দলটির আমির নিজামীরও বিচার চলছে। আইনজীবী তাজুল ইসলামের ওই বক্তব্য শুনে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাহরিয়ার কবির তাৎক্ষণিকভাবে ঐ আলোচনা অনুষ্ঠানেই বলেন, ‘গোলাম আযম মৃত্যুর সময়ও ‘রাজনীতি’ করে গেলেন ’।

যা হোক গোলাম আযম বাংলাদেশের প্রগতিশীল মানুষ ও রাজনৈতিক দলের কাছে কতটা ঘৃণিত ছিলেন তা তা আরো স্পষ্ট হয়েছে তার মৃত্যুতে কোন শোক প্রকাশ না করে ঘৃণা প্রকাশ থেকে। আর বিএনপির জোটের প্রধান শক্তি জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আযমের মৃত্যুতে বিএনপির শীর্ষ পর্যায় থেকে কোন শোকবার্তা বা শোক প্রকাশ না করায় জামায়াতের শীর্ষ থেকে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা গণমাধ্যমে বিএনপির প্রতি যে বিষোদগার করছে তা দেশের মানুষ জেনে গেছে ইতমধ্যেই। তবে গোলাম আযমের মৃত্যুতে যে একেবারেই শোক প্রকাশ করা হয়নি তা ঠিক নয়। গোলাম আযমের মুত্যুতে শোক প্রকাশ করেছে, বাংলাদেশে নয়; তার পিয়ারে পাকিস্তানের জামায়াতে ইসলামের পক্ষ থেকে। শোক প্রকাশ করেছে গোলাম আযমের গায়েবানা নামাজ পড়ার মাধ্যমে। পাকিস্তানের জামায়াতে ইসলাম শোক প্রকাশ করেই ক্ষান্ত হয়নি, তারা গোলাম আযমের মৃত্যুর জন্য বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দায়ী করে তাকে উচিত শিক্ষা দেয়া হবে বলেও হুশিয়ারী উচ্চারণ করেছে, যা বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের কল্যাণে আমরা দেখতে পেলাম। আর বিশ্ব মিডিয়া গোলাম আযমকে কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী হিসেবে অভিহিত করে ফলাও করে প্রচার করেছে।

আর বাংলাদেশে গোলাম আযমের মৃত্যু সংবাদ প্রচার হওয়ার পর পরই আনন্দ মিছিল বের করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ছাত্র সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন। বৃহস্পতিবার রাত দেড়টার দিকে টিএসসিতে তাদের মিছিল চলছিল। বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী বিভিন্ন হল থেকে আনন্দ মিছিল সহকারে টিএসসিতে যোগ দেয়। গোলাম আযমের মৃত্যুর খবর শুনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে রাজু সন্ত্রাসবিরোধী ভাস্কর্যের সামনে সাধারণ ছাত্র জনতা আনন্দ মিছিল ও সমাবেশ করে। সমাবেশে বক্তারা বলেন, গোলাম আযমের জানাজা ও দাফন বাংলাদেশে করতে দেয়া হবে না। মিরপুরের শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থান ও বনানী কবরস্থানসহ অন্যান্য কবরস্থানে তার দাফন এবং বায়তুল মোকাররম মসজিদে তার জানাজা করতে দেব না। কারণ এসব জায়গায় অনেক শহীদকে জানাজা ও দাফন করা হয়েছে।

শুধু তা ই নয়, যুদ্ধাপরাধী জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির গোলাম আযমের কফিনে জুতো নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। প্রায় তেত্রিশ বছর আগে আরও একবার এই মসজিদেই জুতোপেটার শিকার হয়েছিল নরঘাতক গোলাম আযম। নামাজে জানাজার জন্য জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের পশ্চিম পাশে কফিন নামানো হলে একাধিক জুতো নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। এ নিয়ে ব্যাপক হইচই হয়। শেষ পর্যন্ত কড়া প্রতিবাদ আর প্রতিরোধের মুখে জাতীয় মসজিদের উত্তর গেটে যানবাহন রাখার স্থান হিসেবে ব্যবহৃত সাধারণ জায়গায় কফিন রেখে জানাজা করা হয় নরঘাতক গোলাম আযমের। তারপরই পৌনে ১২টার দিকে বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে পর পর ৭টি ককটেলের বিক্ষোরণ ঘটে। পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অতিরিক্ত পুলিশ সেখানে হাজির হলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।
জানাজায় শত শত লোকের সমাগম ঘটেছিল তা বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে দিয়েছে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা। কেউ কেউ ছবি ও ভিডিওর নিচে ক্যাপশন ও করেছে,‘হাসিনা সরকার দেখ! গোলাম অাযম ও জামায়াত-শিবির কত জনপ্রিয়’। তবে গোলাম আযমের জানাযায় জামাতিরা যতই লোক সমাগমের ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করুক না কেন, এর মধ্যে উৎসুক মানুষের পরিমাণও কম ছিল না। গোলাম আযমের জানাজায় অংশ নেয়াদের অধিকাংশই ঢাকা, ঢাকার আশপাশ এলাকা মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, সাভার, কেরানীগঞ্জ, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ছাড়াও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে গাড়ি দিয়ে আনানো হয়েছিল। জানাযায় অংশগ্রহণকারীদের পথ খরচ (রাহা) দিয়ে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে লোক আনা হয়েছিল। যেই কারণে বিদেশে অবস্থারত গোলাম আযমের ছেলে-মেয়েদের আসার অপেক্ষার অজুহাতে জানাযায় বিলম্ব করেছিল। গোলাম আযমের জানাজা উপলক্ষে ব্যাপক লোক সমাগম ঘটিয়ে জামায়াত-শিবিরের বড় ধরনের শোডাউন করার উদ্দেশ্যই জানাযা নিয়ে কালক্ষেপণ করা হয়েছে বলে অনেকেই মনে করেন। তবে জানাজায় অংশগ্রহণকারীদের প্রায় শতভাগই যে জামায়াত-শিবির নেতাকর্মী ছিল তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। যারা বিভিন্ন জেলা উপজেলা থেকে এসেছে এদের গাড়ি ভাড়া করে আনা হয়েছে। জানাজায় অংশ নেয়ার পাশাপাশি জানাজা উপলক্ষে বড় ধরনের শোডাউন করতে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের থেকেও এমন নির্দেশই হয়েছে বলে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে।

শেষ করবো এই বলেই, মৃত্যুর সময়ও কুখ্যাত মানবতাবিরোধী ও যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযম যুদ্ধাপরাধী ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাজাপ্রাপ্ত মতিউর রহমান নিজামী ও দেলাওয়ার হোসেন সাঈদীকে দিয়ে নামাজে জানাযা পড়ানোর অছিয়ত করার মাধ্যমে আবারও নষ্ট রাজনীতি করে গেলেন। গোলাম আযেমের এ অছিয়তের পেছনে যে কু-মতলব ও নষ্ট রাজনীতি ছিল তা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের বিভিন্ন বিশ্লেষণে বেরিয়ে এসেছে। এই অছিয়তের মাধ্যমে যে, গোলাম আযম জামায়াত-শিবিরের প্রাণ ভ্রমরায় প্রাণ ফিরিয়ে আনার অপচেষ্টা করে গেছে তা এখন দিবালোকের মতো সত্য।