ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

পৃথিবীর সব মানুষই জানেন, জেলখানা হলো যে কোনো কয়েদীর জন্য সবচেয়ে নিরাপদ স্থান। কিন্তু সেই নিরাপদ স্থানেই খন্দকার মোশতাক ও পর্দার অন্তরালে জিয়াউর রহমানের ইঙ্গিতে জঘন্যতম যে ঘটনা ঘটে তা হল জেলখানার অভ্যন্তরে ৪ জন জাতীয় নেতার নির্মম হত্যাকান্ড। পৃথিবীর কোনো সভ্য সমাজে এমন জঘন্য কর্মকান্ডের নজীর নেই। ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করার পর খুনিরা এবং এ হত্যাকান্ডের নেপথ্যের কুশীলবরা মোটেই স্বস্তিতে ছিলেন না। আওয়ামী লীগের কিছু কিছু ভীরু ও কাপুরুষ নেতাকে বন্দুকের নলেরমুখে মোশতাকের মন্ত্রীসভায় অন্তর্ভুক্ত করা গেলেও বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে যে চার সিপাহশালার মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করে আমাদের স্বাধীনতা এনে দিয়েছিলেন, জাতীয় সে চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এএইচএম কামরুজ্জামান ও ক্যাপ্টেন মনসুর আলীকে কোন ভয় দেখিয়েই বশিভুত করতে না পারার কারণে খুনিরা নিজেদের নিরাপদ মনে করছিল না। তাদের ধারণা ছিল জাতীয় চার নেতা যে কোন সময় মুজিব হত্যার বিরুদ্ধে জনমত গঠন করে পাল্টা অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ফেলতে পারে। তাই খুনিচক্র আওয়ামী লীগকে নেতৃত্ব শন্য করার লক্ষ্যে এ কাপুরোষচিত জেল হত্যাকান্ড ঘটায়। জেল হত্যাকান্ডের বর্ণনা সে সময়কার সেনা কর্মকর্তা কর্ণেল এম. এ. হামিদ পিএসসির লেখনি থেকে উদ্ধৃত করা হলো:

২-৩ নভেম্বর গভীর রাতে সবার অজ্ঞাতে সংঘটিত হল এক জঘন্যতম হত্যাকাণ্ড। রিসালাদের মোসলেম উদ্দিনের নেতৃত্বে একটি সৈন্যদল গাড়ি করে সেন্টাল জেলে পৌঁছায়। তারা ভেতরে ঢুকে অন্তরীণ আওয়ামী লীগ নেতাদের বাইরে নিয়ে যেতে চায়। জেলার সশস্ত্র সৈন্য দেখে ভেতরে ঢোকার অনুমতি দিলেন না। এ নিয়ে তার সঙ্গে ঘাতক দলের অনেকক্ষণ কথা কাটাকাটি হলো। তখন ডি.আই.জিকে বাসা থেকে ডেকে আনা হলো। তাকে মোসলেম উদ্দিন ও তার লোকজন জানালো যে, ফারুক ও রশিদ তাদের পাঠিয়েছে। তারা তাজউদ্দিন, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, মনসুর আলী ও কমরুজ্জামানকে তাদের হাতে তুলে দিতে বললো। ডি.আই.জি প্রিজন বিনয়ের সাথে বুঝিয়ে বলেন এটা জেল আইনের পরিপন্থি। চার নেতাকে তাদের হাতে তুলে দিতে পারেন না। প্রায় আধঘন্টা ধরে কথা কাটাকাটি চলতে থাকে। মোসলেম উদ্দিন তখন তাকে বঙ্গভবনে মেজর রশিদকে ফোন করতে বলে। টেলিফোনে রশিদ ডি.আই.জি প্রিজনকে নির্দেশ দেন, মুসলেম উদ্দিনের কথামত কাজ করতে। এই নির্দেশের পরেও ডি.আই.জি প্রিজন তার সিন্ধান্তে অটল থাকেন। তিনি তার কয়েকজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনার পর বঙ্গভবনে প্রেসিডেন্ট মোশতাকের সঙ্গে সরাসরি ফোন করেন। মোশতাক মেজর রশিদের নির্দেশ মতোই কাজ করতে বলেন ডি.আই.জি প্রিজনকে। এর ফলে মোসলেম উদ্দিন ও তার দল চার নেতার সেলে যাওয়ার অনুমতি পান। খোদ প্রেসিডেন্ট নির্দেশ দিলে বেচারা ডি.আই.জি কি করতে পারেন?

সেই কলঙ্কিত হত্যাকান্ডের অনেক অজানা তথ্য প্রকাশিত হয়েছে খুনীদেও মুখ থেকেই। পাঠক আসুন আমরা জেনে নিই কিভাবে খুনি হায়েনারা রাতের অন্ধকারে জেলখানার ভেতর ঢুকে জাতীয় চার নেতাকে মির্মমভাবে হত্যা করেছিল। তাজউদ্দিন এবং নজরুল ইসলাম একই সেলে ছিলেন। পরবর্তী সেলে ছিলেন মনসুর আলী ও কামরুজ্জামান। তাদেরকে তাজউদ্দিনের সেলে এনে জড়ো করা হয়। তারপর খুব কাছে থেকে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। তাদের মধ্যে তিনজন সঙ্গে সঙ্গেই মারা যান। তাজউদ্দিনের পায়ে ও হাঁটুতে গুলি লাগে প্রচন্ড রক্তক্ষরণে তিনিও ধীরে ধীরে মারা যান। তিনি পানি পানি বলে কাৎরাচ্ছিলেন কিন্তু ভীত বিহ্বল পরিবেশ কেউ এক ফোঁটা পানি এগিয়ে দিতেও সাহস পায়নি। পাশের সেলে ছিলেন আব্দুস সামাদ আজাদ। তার নাম লিষ্টে না থাকায় ঘাতকরা তাকে ছেড়ে দেয়। বেঁচে গেলেন আজাদ। ঘটনাটি এতই বর্বরোচিত ছিল যে মুখখুলে কেউ কিছু বলতেও সাহস পায়নি। সৈনিকদের কি প্রয়োজন পড়েছিল একটি রাজনৈতিক দলের নেতাদের জেলের ভেতরে ঢুকে হত্যা করার? এর একমাত্র কারণ মনে করা হয়, খন্দকার মোশতাক আহমেদের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বি ছিলেন ওইসব রাজনৈতিক নেতা। কোন কারণে যদি তার বিরুদ্ধে পাল্টা অভ্যুত্থান ঘটার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়, তাহলে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসাবে তার প্রতিপক্ষ ব্যক্তিদের প্রথম আঘাতেই নির্মূল করে দেওয়ার পূর্ব প্রণীত প্ল্যানটিই মোসলেম উদ্দিন নীল নকশার শিডিউল অনুযায়ী কার্যকর করে।

জেলহত্যাকান্ড প্রসঙ্গে এ্যান্থনি ম্যাসকার্নহাস লিখেছেন-পাল্টা অভুত্থান শুরু হবার কারণে বাহিরে যে সাংঘাতিক অবস্থা বিরাজ করছে তার প্রতিফলন প্রেডিডেন্ট ভবনেও শুরু হবে। এদিকে টেলিফোন বাজছে। অন্যদিকে নির্দেশের পর নির্দেশ জারি করা হচ্ছে। লোকজন খবর নিয়ে উদ্ভান্তের ন্যায় ছুটাছুটি শুরু করছে। এর মাঝে, রশিদ বাইরে অবস্থানরত সৈনিকদের উপরও নজর রেখে চলেছে। ভোর ৪টা বাজার একটু পরেই রশিদ আর একটি টেলিফোনের রিসিভার উঠায়। রশিদের ভাষায়, ঐ বিশৃঙ্খলা অবস্থার মাঝেই টেলিফোনটি বেজে উঠে। টেলিফোন উঠিয়ে আমি শুনতে পেলাম, একজন ভারী কন্ঠে কথা বলছে, আমি ডিআইজি প্রিজন বলছি, মাহমান্য রাষ্ট্রপতির সাথে আমি কথা বলতে চাই।

রশিদ মোশতাককে ফোনটি দিলে, তিনি কিছুক্ষণ ধরে কেবল হ্যাঁ, হ্যাঁ করতে থাকেন। তার কথা পরিস্কার বুঝা না গেলেও যে-কোন ব্যাপারেই হোক, তিনি সম্মতিজ্ঞাপন করছিলেন এতে আর কোন সন্দেহ নেই। টেলিফোনে যখন আলাপ চলছিল, তখন ফারুকÑরশিদের পরিকল্পিত আকষ্মিক পরিকল্পনা’ কার্যকরী করার জন্য রিসালদার মুসলেহউদ্দিন তার দলবল নিয়ে কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতাকে খুন করার জন্য ভেতরে প্রবেশের অপেক্ষারত। ভেতরে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে টেলিফোনে আলাপ করে ডি.আই.জি প্রিজন মুসলেহউদ্দিনকে তার দল নিয়ে কারাগারের ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দেয়। তাজউদ্দিন আর নজরুল ইসলাম কারাগারের একটি সেলে অবস্থান করছিলেন। মনসুর আলী আর কামরুজ্জামান পাশের একটি সেলে। তাদেরকে তাজউদ্দিনের একটি সেলে একত্রিত করা হয়। খুব কাছ থেকে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের গুলিতে তাদেরকে নৃশংসভাবে খুন করা হয়। তাদের তিনজন সঙ্গে সঙ্গে প্রাণ হারালেও তাজউদ্দিনের পেটে ও পায়ে গুলি খেয়ে রক্তক্ষরণের ফলে আস্তে আস্তে নিস্তেজ হয়ে পরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। পাশের সেলে অবস্থানরত কারাবন্দি জানায় যে, সে ওখানে মৃত্যু যন্ত্রনায় কোন একজনের আর্তনাদ শুনছিলো। আর পানি পানি বলে মৃত্যুর পূর্বমুহুর্ত পর্যন্ত কাঁতরানোর মর্মবেদী শব্দও তার কানে আসছিলো। কিন্তু বর্বরঘাতক, মুসলেহউদ্দিন ও তার গ্যাং চলে যাওয়ার আগে সেলটিকে খুব শক্ত করে তালাবদ্ধ করে রেখে যাওয়ায় মৃত্যুর আগে তাজউদ্দিনের মুখে এক ফোঁটা পানিও কেউ তুলে দিতে পারেনি।

এর ভেতরই শুরু হয় আরেক প্রাসাদ ষড়যন্ত্র। এই দৃশ্যে হাজির হন ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ। তিনি কিছুকেই জুনিয়ার অফিসার তথা বরখাস্তকৃত কয়েকজন তৃতীয় সাড়ির অফিসার কর্তৃক বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের মতো বর্বরতাকে মেনে নিতে পারছিলেন না। তাই তিনি সেনাবাহিনীতে চেইন অব কমান্ড ফিরিয়ে আনার জন্য ওইসব জুনিয়ার অফিসারদেও বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়ে মোশতাকের পুতুল সরকারের কাছে কিছু দাবি পেশ করে। বিগ্রেডিয়ার খালেদ মোশাররফের দাবি দাওয়াগুলো নিয়ে বঙ্গভবনে পাঠানো হয় কর্ণেল মালেক, কর্ণেল মান্নাফ ও কর্ণেল চিশতীকে। বঙ্গভবনে অবস্থানকারীরাও দ্রুত খবর পাঠায় ক্যান্টনমেন্টে। সবশেষে ফারুকÑরশিদের ইচ্ছানুযায়ী বঙ্গভবনে সিদ্ধান্ত হলো ১৫ আগস্টের অভ্যত্থানকারীদের ক্যান্টনমেন্টে ফেরত না পাঠিয়ে দেশের বাইরে পাঠানো হবে। ৪র্থ বেঙ্গল ব্রিগেডিয়ার নুরুজ্জামান, ব্রিগেডিয়ার রউফ, কর্ণেল মালেক, কর্ণেল চিশতি প্রমূখ মিটিং-এ বসে সিদ্ধান্ত নিলেন ফারুকÑরশিদ গংদের বিদেশে পাঠানোই শ্রেয় হবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয় অতিদ্রুত ফারুক-রশিদ গংদের দেশ ত্যাগের সব ব্যবস্থা সেরে ফেলেন।

কর্ণেল (অবঃ) হামিদের মতে, ৩ তারিখ সন্ধ্যায় বাংলাদেশ বিমানের একটি প্লেন তেজগাঁও বিমান বন্দরে অপেক্ষা করছিল। অভুত্থানের সাথে জড়িত ফারুক-রশিদ সহ ১৭ জন সদস্য বিমানে আরোহন করে তারা তাদের স্ত্রীদেরও সঙ্গে নিয়ে যায়। প্লেনে আরোহনের সময় বিপদ আশঙ্কা করে মেজররা তাদের অস্ত্রসস্ত্র সাথে রাখতে চায়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেগুলো ফেলে রেখে যেতে হয়। যাওয়ার সময় তাদের বিমর্ষ দেখাচ্ছিল। সন্ধ্যা ৮-৪৫মিনিটে প্লেন তেজগাঁও বিমানবন্দর ত্যাগ করে। চট্টগ্রামে রিফুয়েলিং করে প্লেনটি আবার সরাসরি ব্যাংকক রওয়ানা দেয়।

ফারুক-রশিদ গং দেশত্যাগের পর আলোচনা, দেনদরবার চলতে থাকে সেনাবাহিনী প্রধান নিয়োগ প্রশ্নে। খালেদ মোশাররফ চাপ প্রয়োগ করতে থাকেন তাঁকে এ পদে নিয়োগ দেওয়ার জন্য। এয়ার মার্শাল তোয়াব এবং এডমিরাল এম.এইচ.খান তাঁকে জোরালো সমর্থন দিতে থাকেন। কিন্তু রাষ্ট্রপতি মোশতাক ও জেনারেল ওসমানী এতে রাজি নন।

ইতিমধ্যে জেল হত্যাকান্ডের খবর চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। সৃষ্টি হতে থাকে চরম অসন্তোষ ও ঘৃণা। এরূপ অবস্থার মধ্যেই শুরু হয় মন্ত্রীসভার মিটিং। সেখানে জেল হত্যাকান্ডের প্রসঙ্গ উত্থাপিত হলে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এজন্য রাষ্ট্রপতি মোশতাক আহমেদকে দায়ী করে উত্তপ্ত বক্তব্য প্রদান করতে থাকেন অনেকেই। এরূপ অবস্থায় কর্ণেল শাফায়াত জামিলের নেতৃত্বে একদল সশস্ত্র সেনা কর্মকর্তা-মন্ত্রীসভার বৈঠকস্থলে উপস্থিত হন। তাঁরা সকলেই ছিলেন ভীষণ উত্তেজিত প্রেসিডেন্ট মোশতাক ও তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যদের হত্যার হুমকি প্রদান করে।
খন্দকার মোশতাক আহমেদ ভীত হয়ে পড়েন এবং আত্মরক্ষার চেষ্টা চালাতে থাকেন। তাঁর অনুনয় বিনয়ে কোন কাজ হচ্ছিলো না। সেনা কর্মকর্তারা আরো উত্তেজিত হয়ে তাঁকে গালিগালাজ করতে থাকেন। এরূপ অবস্থায় খন্দকার মোশতাক আহমেদকে বাঁচাতে রাষ্ট্রপতির প্রতিরক্ষা বিষয়ক পরামর্শক জেনারেল এম.এ.জি ওসমানী ও চীপ অব ডিফেন্স ষ্টাফ খলিলুর রহমান এগিয়ে এলেন। এই দুই প্রবীণ সামরিক কর্মকর্তার মধ্যস্থতায় একটি আপসরফা হয়। এই আপসরফার শর্তগুলো ছিল এরূপ:
১. জেনারেল জিয়াউর রহমানকে বরখাস্ত করে বিগ্রেডিয়ার খালেদ মোশারফকে সেনা প্রধান নিয়োগ করতে হবে।
২. ৩ নভেম্বরের জেলহত্যাকান্ডের তদন্ত অতিদ্রুত সম্পন্ন করে দায়ি ব্যক্তিদের শাস্তি প্রদান করতে হবে।
জেনারেল এম.এ.জি ওসমানী ও জেনারেল খালিলুর রহমানের অনুরোধে রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমেদ উপরের দুটো শর্ত মেনে নেন। বিগ্রেডিয়ার খালেদ মোশারফকে সেনাপ্রধান নিয়োগ করা হয়। বিচারপতি এ.এফ.এম আহসান উদ্দিন চৌধুরীর নেতৃত্বে জেলহত্যাকান্ড তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তাছাড়াও, কি কারণে বা কোন অবস্থার কারণে জেল হত্যাকান্ডের হোতাদের দেশত্যাগ করতে দেয়া হল তা তদন্ত করার দায়িত্ব এই তদন্ত কমিটিকে প্রদান করা হয়। এদিকে ঘটনার অন্যতম প্রত্যক্ষদর্শী রাজনীতিবিদ শাহ মোয়াজ্জেম লিখেছেন-
হঠাৎ দরজা খুলে একদল সশস্ত্র সামরিক অফিসার ক্যাবিনেট রুমে ঢুকে চারিদিকে অস্ত্র উঁচিয়ে চিৎকার করতে থাকল; অশ্রাব্য ভাষায় গাল দিতে থাকল। এদের কাউকে চিনিনা, নাম জানিনা। তারা মন্ত্রিদের লক্ষ্য করে অস্ত্র তাক করে ট্রিগারে হাত রেখে প্রস্তুত। যে কোন সময় আর একটি বৃহদাকারের বিয়োগান্ত ঘটনা ঘটে যাবে। একজন কেউ চিৎকার করে বলছে-
We want khaled Mosharraf. He has to be made chief of staff. Mr. President, You are a bastared sir, you are killer. You all will now be finished.” এ ধরনের নানা গালাগালি বর্ষিত হচ্ছিল। খন্দকার মোশতাকের উপরই রাগ বেশী। তাঁকে স্যার বলছে প্রেসিডেন্ট বলে সম্বোধন করছে আবার জারজ বলেও গাল দিচ্ছে। কিন্তু তাদের উদ্দেশ্য পরিস্কার হয়ে গেল। বাইরে অপেক্ষারত খালেদ মোশাররফেকে তারা তাদের চীপ হিসেবে চায়। তারা এখন তার প্রতিশোধ নেবে। পরে যার নাম সবচেয়ে বেশী শুনেছি সে হল শাফায়াত জামিল। আরও মেজর ইকবাল, কর্ণেল আব্দুল মালেক এবং লেঃ কর্নেল জাফর ইমামও সেই দলভুক্ত ছিল। জেনারেল ওসমানী ওদের মাঝখানে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। একী করছ! খবরদার। কখনো গুলি করো না। এসো আমার সঙ্গে। তোমাদের সব দাবী পূরণ করা হবে। স্তব্দ বিমূঢ় মোশতাককেও তিনি বললেন, স্যার ওরা যা বলে সই করে দিন। যা চায় তাই করুন। এখানে তার রক্তগঙ্গা বইতে দেওয়া যায় না। আপনি সম্মত হয়ে যান। প্রেসিডেন্ট মোশতাক ঘার নেড়ে সম্মতি দিলেন। ঘরে বাজ পড়লে যে অবস্থা হয়, তেমনি অস্বাভাবিক নিস্তব্দতায় আমরা অপেক্ষা করতে থাকলাম। ওসমানী সাহেব অতি কষ্টে, শারীরিকভাবে টানাটানি করে অস্ত্রধারীদের ঘর থেকে বের করে দিতে সমর্থ হলেন। কয়েকজন ঘরের দরজায় পাহাড়ায় রইল। বেশ কিচুক্ষণ পর ওসমানী সাহেব ওদের দু’একজনকে নিয়ে কতগুলো টাইপ করা কাগজ মোসতাক সাহেবের সামনে ধরলেন; বললেন, সাক্ষর করে দিন। নিরবে মোশতাক একে একে সবকটি কাগজে সই করে দিলেন।

সে সময়কার ঢাকার স্টেশন কমান্ডার লেঃ কর্নেল এম.এ.হামিদ এর লেখনিতেও এ সময়ের ঘটনার বর্ণনা পাওয়া যায়। উল্লেখ থাকে যে, মেজর জেনারেল সফিউল্লাহ এবং মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান উভয়ের ছিলেন কর্নেল হামিদের কোর্সমেট। তবে জিয়ার সাথেই তার ঘনিষ্ঠতা ছিল বেশি। তিনি লিখেছে-
৪ নভেম্ববর। সকাল ১০টা উন্মুক্ত বঙ্গভবন। ক্যান্টনমেন্ট থেকে যখন পারছে ছুটে গিয়ে বঙ্গভবনে পৌছলেন। হাতে তার জেনারেল জিয়ার স্বহস্তে লিখিত পদত্যাগ পত্র। তখন থেকে সেনাপ্রধান নিয়োগ করার পথে আর কোন বাধাই নেই। দুপুরে বঙ্গভবনে চলতে থাকে দেনা-দরবার। বঙ্গভবনে উর্দিপরা অফিসারদের এক কক্ষ থেকে অন্য কক্ষে দ্রুত আনাগোনা। উত্তপ্ত আলোচনা। বিভিন্ন মত অফিসাররা ভিন্ন ভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত সলা পরামর্শ। বঙ্গভবনে অস্ত্রধারীদের উপস্থিতিতে বিশৃঙ্খল অবস্থা। যে কোন মুহূর্তে ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিল। উন্মুক্ত পিস্তল, স্টেনগান কাঁধে তরুণ অফিসারদের আনাগোনা। ইউনিফর্মধারী লোকজনদের ভারী বুটের খটখট শব্দে বঙ্গভবন প্রকম্পিত। ঘন ঘন ব্যস্ততা। ওসমানী, খালেদ, তোয়াব, এম এইচ খান, জেনারেল খলিল উপস্থিতি।

একটি উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে মোশতাক আহমদ ২৬ সদস্য মন্ত্রিসভার বৈঠক করেছিলেন। বৈঠকে জেলহত্যা তদন্তের জন্য সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সমন্বয়ে একটি তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়। সভায় জেলহত্যা নিয়ে এবং ফারুক রশিদদের দেশত্যাগ নিয়েও উত্তপ্ত বিতর্ক হয়। এক পর্যায়ে খালেদ মোশাররফের চীফ অব স্টাফ নিয়োগের ব্যাপারে কিছুটা বিতর্কের সৃষ্টি হয়। খালেদ মোশাররফদের সাথে ওসমানী ও মোশতাকের বেশ কিছুটা উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়। সারাদিন ধরে চলছে মিটিং। ক্যান্টনমেটে শাফাত জামিল অস্থির হয়ে উঠে। সন্ধ্যার দিকে কর্নেল মালেককে সঙ্গে নিয়ে বঙ্গভবনের দিকে ছুটে গেল। বঙ্গভবনে ঢুকেই সে চিৎকার দিয়ে ওঠে, কোথায় খালেদ মোশররফ? সবাই বলল, স্যার, তিনি কেবিনেট রুমে মিটিং করেছেন।

যখন মন্ত্রিসভায় উত্তপ্ত আলাপ-আলোচনা তখন অকস্মাৎ ঘটে এক নাটকীয় কান্ড। আকস্মিকভাবে সজোরে দরজা দাক্কা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলেন ডান্ডা হাতে কর্নেল শাফাত জামিল। পেছনে স্টেনগান হাতে পাঁচজন সশস্ত্র অফিসার। ভীত সন্ত্রস্ত মন্ত্রিসভার সদস্যগণ। আসন ছেড়ে ছুটে পালাতে উদ্যত। মেজর ইকবাল খন্দকার মোশতাকের দিকে স্টেনগান তাক করে বলতে থাকেন আপনি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার দেখেছেন কিন্তু বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মেজর দেখেননি। এখন দেখবেন। ওসমানীর অসীম সাহসে এসে দাঁড়ালেন। বললেন, খোদার ওয়াস্তে গুলাগুলি করবে না। তোমরা এসো পাগলামী বন্ধ কর। বেঁচে গেলেন মোশতাক, উন্মুক্ত মূহুর্তে ষ্টেনগান যে কোন সময়ে গর্জে উঠতে পারতো। বঙ্গভবন চত্তরে ২নং রোডে রক্তাক্ত ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতে ঘটতে থেমে গেল।

সাফাত জামিল খন্দকার মোশতাকের পদত্যাগ দাবী করে বললেন, আপনি একজন খুনি। আপনি জাতির পিতাকে খুন করেছেন। আপনার সরকার অবৈধ। আপনার ক্ষমতায় থাকার কোন অধিকার নেই। আপনাকে এখনই পদত্যাগ করতে হবে। মোশতাক মাথা নেড়ে তখনি রাজি হন। এই সময় শাফাত মোশতাকের সাথে কিছুটা রূঢ় ব্যবহার করে। ওসমানী প্রতিবাদ করে বলেন, ওনার সাথে অশোভন ব্যবহার করা ঠিক হবে না। খোদার ওয়াস্তে তোমরা এসব বন্ধ কর। রক্তপাত ঘটিওনা। শাফাত বলল, আপনি চুপ থাকুন। আপনি উপদেষ্টা হিসাবে এতদিন কি উপদেশ দিয়েছেন? জেনারেল খলিল প্রতিবাদ করে বলেন, দেখ ওনাকে এভাবে অপমান করা উচিত হবে না। দয়া করে শান্ত হোন। শাফাত জামিলের চিৎকার, আপনি চুপ থাকুন। আর কথা বলবেন না। আপনি জেলহত্যার কথা জানতেন, তাও এদের যেতে দিয়েছেন। আপনাকেও এরেষ্ট করা হল। শাফাত এই সময় উত্তেজিত। আর তার অফিসাররা শুধু সংকেতের অপেক্ষায়। শাফাত যখন চিৎকার দিয়ে ভিতরে ঢুকে তখন খালেদও বসেছিল। আসলে উত্তেজিত শাফাতের অবস্থা দেখে সে কিছু হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল।

উত্তপ্ত পরিবেশ নাজুক পরিস্থিতি জেনারেল ওসমানী উঠে তখন শাফাতকে, খালেদকে এবং অন্যদের শান্ত করার আহব্বান জানাচ্ছিলেন। এই সময় কেবিনেট মিটিংÑএর পরিবেশ সম্পূর্ণ এলোমেলো হয়ে যায়। এ সময় কর্নেল মালেক শাফাতকে বুঝিয়ে কোনক্রমে কক্ষের বাহিরে নিয়ে যান। সবাই এবার হাফ ছেড়ে বাঁচেন।
মন্ত্রিসভার কার্যক্রম আবারো শুরু করা হয়। ওসমানী তাদের বললেন, তোমাদের যা যা প্রস্তাব মিটিং- এ বলে যাও। মিটিং- এ সবই পাশ করা হবে। অতঃপর কর্নেল এম. এ. মালেক ভেতরে ঢুকলেন তিনি পয়েন্টগুলো বলে যাচ্ছিলেন। বেশ কিছু প্রস্তাব গৃহীত হলো:
১। মুজিব হত্যা এবং জেলা হত্যা বিচার বিভাগীয় তদন্ত করা হবে।
২। খালেদ মোসাররফকে, চীপ অব ষ্টাফ নিযুক্ত করা হবে।
৩। মোশতাক প্রেসিডেন্ট হিসাবে থাকবেন, যতক্ষণ না অন্য ব্যবস্থা হয়। তবে তিনি অসুস্থতার জন্য পদত্যাগ করবেন বলে সম্মত করতে বাধ্য করা হয়।
৪। বঙ্গবভন থেকে ট্রুপস কেন্টনমেন্টফিরে যাবে।

মন্ত্রিসভার বৈঠক চললেও তখন খালেদ মোশাররফ, সাফাত জামিল পালাক্রমে ঘুরাফেরা করে পয়েন্ট দিচ্ছিলেন। বন্দুকের নলের মুখে ঐ সময় বেশ কিছু কাগজ পত্রে মোশতাকের সই নেওয়া হয়। দীর্ঘ রাত পর্যন্ত মিটিং চলল। রাত্রি প্রায় ২টা মিটিং শেষ হলো। কর্নেল মালেক মন্ত্রীদের বললেন, ভদ্রমহোদ্বয়গণ, ৪জন ছাড়া আপনারা বাকী সবাই বাসায় যেতে পারেন। সবাই চমকে উঠলেন। কোন চারজন। চারজন, শাহ মোয়াজ্জেম, তাহের উদ্দিন ঠাকুর, ওবায়দুর রহমান, নুরুল ইসলাম মঞ্জুর। তারা ভয়ে কাঁপতে থাকলেন। বাকীরা উর্দ্ধশ্বাসে বঙ্গভবন ত্যাগ করে নিজ নিজ বাসায় ছুটে চললেন। ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফকে মেজর জেনারেল পদে উন্নীত করে সেনা বাহিনী প্রধান করা হয়। এয়ার মার্শাল তোয়াব এডমিরাল এম, এইচ খান হাস্যরত খালেদের কাঁধে মেজর জেনারেলের Rank পড়িয়ে দেন। দীর্ঘ ম্যারাথন মিটিং- এর পর ক্লান্ত শ্রান্ত বিধ্বস্ত মোশতাক, রাত তিনটায় বঙ্গভবনে তার শোবার ঘরে প্রত্যাবর্তন করলেন। তার এবং মন্ত্রিসভার শেষ মুহূর্ত। বর্ষীয়ান উপদেষ্টা জেনারেল ওসমানী তার সাথে কোলাকুলি করে তার কাছ থেকে বিদায় নিলেন। ওসমানী বললেন, Sorry oldman. We played a bad game. Let us forget and forget.

১৯৭৫ সালের ৫ নভেম্বর। প্রেসিডেন্ট খন্দকার মোশতাক আহমেদ-এর জীবন এ দিনটি খুবই গুরত্বপূর্ণ। প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর শেষ কর্ম দিবস। এদিনের বর্ণনা শোনা যাক কর্নেল হামিদের লেখনিতে-সকাল বেলা আর্মি হেড কোয়ার্টারে মিটিং। সভাপতিত্ব করেন আর্মির নতুন চীফ অব ষ্টাফ মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ বীরউত্তম। উপস্থিতি রয়েছেন নৌ ও বিমান বাহিনী প্রধান, ডি, জি, এফ, আই, রক্ষী বাহিনী প্রধান আইন মন্ত্রনালয়ের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ, এটর্নি জেনারেল। তারা দীর্ঘ আলোচনায় লিপ্ত হলেন, কিভাবে শান্তিপূর্ণভাবে আইনগত দিক বজায় রেখে মোশতাক আহমদের কাছ থেকে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা প্রধান বিচারপতির কাছে হস্তান্তর করা যায়।

সভায় অন্যান্য বিষয় আলোচনা করা হয়। সিদ্ধান্ত হয়, বঙ্গভবন থেকে ল্যান্সার ও টু-ফিল্ড সৈন্যদের উওঝঅজগ করে সন্ধ্যায়ই ক্যান্টনমেন্টে ফেরত পাঠানো হবে। কিন্তু পরে অকস্মাৎ খালেদ কি মনে তার সিদ্ধান্ত পাল্টালেন; বললেন, থাক, তাদের অস্ত্রসহই ক্যান্টনমেন্টে ফেরত যেতে দাও। তা নইলে তারা ঘাবড়ে যাবে। অন্য সমস্যা দাঁড়াবে। দয়ার্ত খালেদ মোশাররফ। তার পক্ষ থেকে এটি ছিল ভুল সিদ্ধান্ত। এদিনই অস্ত্রসস্ত্রসহ বেঙ্গল ল্যান্সার ও টু ফিল্ডের বাকি সৈন্যরা ক্যান্টনমেন্টে সন্ধ্যার আগেই ফিরে আসে। ৫ তারিখ সন্ধ্যা ১০ ঘটিকা। জেনারেল খালেদ মোশাররফ নৌ ও বিমান বাহিনী প্রধানের সাথে বঙ্গভবনে পৌছেন। খন্দকার মোশতাক আহমদ তখন প্রেসিডেন্ট। তারা তার কাছ থেকে পদত্যাগপত্র এবং অন্যান্য আরো কিছু কাগজ শেষ বারের মত সই করিয়ে আসেন। রাত সাড়ে এগারটায় বিদায়ী প্রেসিডেন্ট মোশতাক আহমদ পুলিশ প্রহরায় বঙ্গভবন থেকে বিদায় নিয়ে তার আগামসিহ লেনের বাসায় প্রত্যাবর্তন করেন। শেষ হল তার দুই মাস ২১ দিনব্যাপী শাসন আমল।

১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পর নিজেদের ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করার জন্য পুতুল সরকার খন্দকার মোশতাক আহমদকে সামনে রেখে মঞ্চস্থ হতে থাকে প্রাসাদ ষড়যন্ত্র নাকটের এক একটি এ্যাপিসোড। কিন্তু পর্দার অন্তরালে চলতে থাকে আরেক খেলা। সেই খেলায় প্রধান রিফারির ভূমিকায় অবতীর্ণ হন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল তাহের। সেনাবাহিনীতে পাল্টা অভ্যুত্থান ঘটিয়ে খালেদ মোশাররফকে হত্যা করে হাজির করা হয় লে.কর্নেল জিয়াউর রহমানকে। আর এ ভাবেই ১৯৭৫-এর নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহটি হয়ে ওঠে প্রাসাদ ষড়যন্ত্রে একটি কলঙ্কিত সপ্তাহ হিসেবে।