ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

৪ নভেম্বর ২০১৪ জাতীয় প্রেসক্লাবে যুবদলের সভাপতি সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলালসহ সকল বিএরপির নেতাকর্মীদের মুক্তির দাবিতে যুবদল আয়োজিত সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন,‘আন্দোলনের মাধ্যমেই দখলদার সরকারকে বাংলার মাটিতে টিকতে দেয়া হবে না। তিনি আরও বলেন, ‘‘জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক জীবনে যদি ভুল থাকে, সেটা হলো শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনা এবং তাঁকে রাজনীতি করার সুযোগ করে দেয়া। সেই ভুলের খেসারত দিতে হচ্ছে এখন সমগ্র জাতিকে।’’

বাংলাদেশের সংখ্যালঘু নাগরিকদের কাছে `হিন্দু রাজাকার’ বলে চিহ্নিত গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের শেখ হাসিনা সম্পর্কে ধৃষ্টতাপূর্ণ বক্তব্যে দেশব্যাপী তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। তার এ অনাকাঙ্খিত ও ধৃষ্টতাপূর্ণ বক্তব্য নিয়ে বিভিন্ন টকশো’ ও আলোচনায় ক্ষুব্দ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন বিশিষ্টজন ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে ‘রাজনৈতিক ধান্ধাবাজ, সাম্প্রায়িক রাজনৈতিক শক্তির উচ্ছ্বিষ্টভোগী এই নেতার শেখ হাসিনার ওপর কেন এত আক্রোশ তা বোধগম্য নয়। এ কথা তার মনে রাখা উচিত, শেখ হাসিনার বাবা বঙ্গবন্ধু যদি এ দেশ স্বাধীন না করতো তা হলে সেসহ তার দলের শীর্ষ নেত্রীত্ব পরাধীন পূর্ব পাকিস্তানে সুইপার, পিয়ন-চাপরাসি, কাজের বুয়ার কাজও জুটাতে পারতো না। তাদেরকেসহ সমগ্র বাঙালীকে গোলামের অধিক গোলাম, ক্রীতদাসের অধিক ক্রীতদাস এবং পাকিস্তানের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হয়ে থাকতে হতো।
যাক প্রসঙ্গে ফিরে আসি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের মাত্র সাড়েতিন বছরের মাথায়, সামরিক জান্তা জিয়াউর রহমান ও দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট স্বপরিবারে বঙ্গবন্ধু নিহত হলে; বিদেশে অবস্থানের কারণে সেদিন এ নৃশংস হত্যাকান্ডের হাত থেকে বেঁচে যান বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। ১৯৮১ সালের ১৭ মে শেখ হাসিনা বাংলার মানুষের অধিকার আদায়ের দীপ্ত শপথ নিয়ে দীর্ঘ ছয় বছরের নির্বাসন থেকে বাংলার মাটিতে পা রেখেছিলেন । আন্তর্জাতিক মহলের সমর্থন নিয়ে তিনি নির্বাসন থেকে দেশে ফিরেছিলেন, তাঁর মহান পিতা বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা জাতির জনক বঙ্গবন্দু শেখ মুজিবুর রহমানের নিজ হাতে গড়া বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের কান্ডারী হয়ে।
প্রিয় পাঠক সে সময়ের রাজনৈতিক অবস্থা সন্মন্ধে যাদের জানা নেই, তাদের জন্য আমার এ নিবন্ধের অবতারণা। আসুন এ পর্যায়ে জেনে নেয়া যাক কোন অবস্থার প্রেক্ষিতে জিয়াউর রহমান শেখ হাসিনাকে দেশে আসতে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। সেনাশাসক জিয়াউর রহমান ও এদেশের আইএসআই-এর এজেন্ট রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস, বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের বেনিফিসিয়ারী প্রতিক্রিয়াশীল চক্র ও চৈনিকপন্থী কমিউনিষ্টরা চায়নি বঙ্গবন্ধুর উত্তরাধীকার শেখ হাসিনা কিছুতেই বাংলাদেশে ফিরে আসুক। কিন্তু বিশ্ব নেত্রীবৃন্দ ও জনমতের চাপে জিয়াউর রহমান শেখ হাসিনাকে দেশে আসতে দিতে বাধ্য হয়। কিন্তু সেনাশাসক জিয়াউর রহমান, শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরে আসতে দিতে বাধ্য হলেও নানাভাবে দেশে ফিরে আসার পথে বাঁধার সৃষ্টি করেন। বিশ্ব জনমতের চাপে সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান দেশে গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হলেও তিনি চাননি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রক্তের উত্তরাধিকার শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগ নেতৃত্বে ফিরে আসুক। ১৯৮১ সালে তৎকালীন হোটেল ইডেনে আওয়ামী লীগের যে দিন কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়, সেদিন সেনাশাসক জিয়াউর রহমান বঙ্গভবনে নির্ঘুম রাত কাটিয়েছিলে। ওয়াকিটকিতে জিয়ার গোয়েন্দা অফিসাররা সারাক্ষণ খোঁজ নিয়েছেন কী হচ্ছে আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে। জিয়ার সামরিক গোয়েন্দাদের ইন্দনে দলীয় নেতৃত্বে কোন্দল সৃষ্টি করে দলকে ভাঙ্গারও চেষ্টা করা হয়। ১৯৮১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আওয়ামী লীগের জাতীয় কাউন্সিলে শেখ হাসিনাকে দলের সভানেত্রী নির্বাচিত করা হয়। সুতরাং জিয়ার পক্ষে শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরে আসতে না দিয়ে কোন উপায় ছিল না। কিন্তু দেশে ফিরে আসায় বাঁধা সৃষ্টির জন্যে সামরিক জান্তা জেনারেল জিয়াউর রহমান ও তার প্রশাসনযন্ত্র শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে নানাবিদ অপপ্রচারে মেতে ওঠে।
জিয়া প্রশাসনের সম্মিলিত অপপ্রচারের সাথে তাল মিলিয়ে তার সমর্থক বিভিন্ন পত্র-পত্রিকাও শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে নানা ধরনের অলীক কল্পকাহিনী প্রচার করতে থাকে। ২৭ ফেব্রুয়ারী খুনী চক্রের মুখপত্র সাপ্তাহিক ইত্তেহাদের এক রিপোর্টে বলা হয়-‘ইন্দিরার নীল নকশা এখন বাস্তবায়নের পথে। বাংলাদেশকে সিকিম বানানোর জন্যই শেখ হাসিনাকে দেশে পাঠানো হচ্ছে। আরো বলা হয়, ১৯৭৫-এর পর তারা দিল্লি ও লন্ডনে বাংলাদেশ বিরোধী প্রচারণা চালায়। লন্ডনের জমে ওঠে দিল্লির সেবাদাসদের আড্ডা। তারাই আজ বাকশালী কমিটির ছত্রছায়ায় দেশে ফিরছে। সমস্ত কিছু ঠিকঠাক করে শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে পাঠানো হচ্ছে।’
আরও অপপ্রচার চালানো হয় সরকারী পত্রিকা ‘দৈনিক বাংলা’র মাধ্যমে। ‘দৈনিক বাংলা’ শেখ হাসিনাকে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী নির্বাচিত সভানেত্রী ঘোষণা করায় ভারতীয় পত্র-পত্রিকায় খুশির জোয়ার।’ জাতীয় সংবাদ প্রচার করে জনগণকে বিভ্রান্ত করে ধোঁকা দেয়ার চেষ্টা করে।’ ১৪ মে ১৯৮১ জিয়া সরকারের মালিকানাধীন বাংলাদেশ টাইমস এ সকল সভ্যতাভব্যতা ত্যাগ করে খুবই ইতর ভাষায় এক মনগড়া সংবাদ প্রতিবেদনে বলা হয়,‘ভারতের ক্ষমতাসীন পার্টি তাদের এক দালালকে ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।’ জিয়াউর রহমান শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তায় ভীত হয়ে তাঁর প্রতি নানা বিদ্বেষমূলক অপপ্রচারের নিমিত্তে তার সমস্ত প্রশাসনযন্ত্রকে ব্যবহার করেন। সেই কারণে শেখ হাসিনা দেশে ফেরার প্রাক্কালে ‘তালপট্টি দ্বীপ’ সংক্রান্ত পাকিস্তানী পুরনো বিবাদ উসকে দিয়ে শেখ হাসিনাকে ভারতীয় সেবাদাস প্রমাণের নানা ফন্দিফিকির করা হয়। জেনারেল জিয়া জনগণকে সাবধান করে দিয়ে বলেন,‘বাংলাদেশের অভ্যন্তরীন শক্তির সাথে হাত মিলিয়ে বিদেশি শক্তিবর্গ দেশের ভিতর বিশংখলা ও অশান্তি সৃষ্টির জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। শেখ হাসিনার পার্টি পুনরায় দেশে একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠা করে জনগণ ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণ করতে চায়।’ এতসব অপপ্রচার ও প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে মোকাবেলা করে শেখ হাসিনা দেশে ফিরে এসে শক্ত হাতে বিধ্বস্থ ও বহুধাবিভক্ত আওয়ামী লীগের হাল ধরতে কুন্ঠাবোধ করেননি।
‘শেখ হাসিনাকে দেশে আসতে দেয়া জিয়ার সবচেয়ে বড় ভুল’ বিএনপি নেতা গয়েশ্বর রায়ের এমন বক্তব্যের কঠোর সমালোচনা করে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ বলেছেন, “কারো দয়া বা অনুকম্পায় শেখ হাসিনা দেশে আসেন নি। তিনি দেশে এসেছেন জনগণের চাওয়া ও ভালবাসায়।” শেখ হাসিনাকে দেশে না আসতে দেয়ার কোনো ক্ষমতা জিয়াউর রহমানের ছিল না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।…গয়েশ্বরকে উদ্দেশ করে হানিফ বলেন, “বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বে, বাংলাদশে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে আমরা যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছি। এই দেশ আপনার নেতা জিয়াউর রহমানের তালুক নয়। আপনার কথায় পরিষ্কার হয়েছে আসলে আপনাদের মাথা থেকে এখনো পাকিস্তানের ভূত দূর হয়নি।”
শেষ করবো এই বলেই যে, শত চক্রান্ত করেও শেখ হাসিনাকে হটাতে না পেরে এবং বার বার চেষ্টা করে তাকে হত্যা করতে না পেরে; শেখ হাসিনার সাহসী ও বিচক্ষণ নেতৃত্বের কাছে বার বার মার খেয়ে গয়েশ্বরদের মাথা নষ্ট হয়ে গেছে। কখন কোথায় কি বলবে, না বলবে তারও হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে পাগলের প্রলাপ বকছেন। তারা কিছুতেই বুঝতে পারছেন না, তাদের এ পাগলের প্রলাপ ও মিথ্যা অপপ্রচার এখন দেশের শিক্ষিত তরুণ প্রজন্ম আর কিছুতেই বিশ্বাস করে না। বরং যতই দিন যাচ্ছে তরুণ প্রজন্ম ততই তাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। এ কথা বোঝতে বিএনপি নেতৃত্ব যত দেরি করবে ততই তারা জনগণ থেকে দূরে চলে যাবে। তখন তাদের পতন আর কেউ ঠেকাতে পারবে না।