ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

অনেক দিন থেকেই দুর্নীতির দায় নিয়ে চিকিৎসার নাম করে লন্ডনে স্বেচ্ছানির্বাসিত খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমান বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে একের পর এক অশালীন ও বিতর্কীত বক্তব্য দিয়েই চলেছেন। ৫ নভেম্বর লন্ডনে যুক্তরাজ্য বিএনপির উদ্যোগে ‘৭ নবেম্বর বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ পালনের এক অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুকে ‘স্বাধীনতাকামী মানুষের হত্যাকারী’ বলেও আখ্যায়িত করেই ক্ষান্ত হয়নি; বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতার মামলা করার দাবি করেছেন। তারেক বলেন, ‘নতুন প্রজন্ম, যাদের মিথ্যা, বিকৃত ও খণ্ডিত ইতিহাস শেখানো হচ্ছে, তাদের জানতে হবে শুদ্ধ, প্রকৃত ও সত্য ইতিহাস।’এর আগেও তিনি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অনেকবার অনেক অশালীন ও অশোভন মন্তব্য করে সমালোচনার শিকার হয়েছিলেন। তারপরও তারেকের এ ধরনের অপকর্ম থেমে নেই।

কেন জানি মনে হয় নানা বিতর্কে জড়িয়ে সংবাদের শিরোনাম হতে চাচ্ছেন তিনি। গত ৫ নভেম্বর এমনই আরেক বিতর্কে জড়িয়ে পরছেন তারেক রহমান। বিএনপি নেতা খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে ৭ নবেম্বরের অভ্যুত্থান এবং সেই সময়ের নানা ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসার বিষয়গুলো নিজের মতো করে উপস্থাপন করতে থাকেন। জিয়াউর রহমান কতটা ‘জনপ্রিয় রাষ্ট্রনায়ক ছিলেন তা প্রমাণের অপচেষ্টা করে তার বাবা প্রয়াত প্রেসিন্ডেন্ট জিয়াউর রহমানকে বঙ্গবন্ধুর সমকক্ষ করে তোলা এবং বঙ্গবন্ধু যে আমাদের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের অবিসংবাদিত নেত নন তা প্রমাণের জন্য মরিয়া তারেক ইতিহাসের ব্যাখ্যা হাজির মতো করে দিয়ে বলেছেন বঙ্গবন্ধুকে বঙ্গবন্ধু না বলে ‘পাকবন্ধু।’ বঙ্গবন্ধুকে পাক বন্ধু ডাকার জন্যেও নতুন প্রজন্মের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তারেক জিয়া। উক্ত সভায় তারেক জিয়া আরো বলেন,‘ “ইতিহাসের ভিত্তিতে কিছু সত্য তথ্য উচ্চারণে আমার বিরুদ্ধে নাকি দেশদ্রোহী মামলা করা হয়েছে। কথায় কথায় দেশদ্রোহী মামলা হবে কেন? ইতিহাসের প্রকৃত সত্য সবার সামনে উপস্থাপন করার জন্য যদি কারও বিরুদ্ধে দেশদ্রোহী মামলা হয়, তাহলে সেটি হওয়া উচিত শেখ মুজিবের নামে।” কেননা, শেখ মুজিব একজন পাকিস্তানী নাগরিক হিসাবে এসে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসাবে শপথ নিয়েছেন।…একজন পাকিস্তানী নাগরিক কেমন করে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট হিসাবে শপথ নিলেন সেই প্রশ্নের আইনগত নিষ্পত্তির জন্য শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহী মামলা হওয়া জরুরী।’

যে দিন তারেক জিয়া বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য রাখেন সে দিনই পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চৌধুরী নিসার আলী খান বাংলাদেশের জামায়াতে ইসলামীর নেতা মতিউর রহমান নিজামীর মৃত্যুদন্ড রায়ের প্রতিক্রিয়ায় বলেন বাংলাদেশে জামায়াতি ইসলামের নেতাদের বিরুদ্ধে আইনের অপব্যবহার হচ্ছে । নিসার আলী খান অভিযোগ করে বলেন,‘ বাংলাদেশ সরকার অতীতের কবর খুঁড়ে অশান্তি সৃষ্টি করছে বলে মনে করে নিসার আলী খান।৫ নভেম্বর ২০১৪ জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামীর মৃত্যুদন্ড রায়ের রায়ের প্রতিক্রিয়ায় এক বিবৃতিতে এই শোক প্রকাশ করে চৌধুরী নিসার আলী আরও বলেন, জামায়াতের আমির নিজামীর মৃত্যুদন্ডের শোকাবহ খবর শুনে আমি খুব দুঃখ পেয়েছি। বাংলাদেশ সরকার জামায়াত নেতাদের বিরুদ্ধে আইনের অপব্যবহার করছে। তারা এই বিষয়ে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। …এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক যে, ৪৫ বছর আগে যে মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে বাংলাদেশ সরকার এখনও সেটাকে সামনে নিয়ে আসছে। তারা ভুলে যাওয়া ও ক্ষমার সাধারণ গুণ থেকে দূরে অবস্থান করছে। বাংলাদেশে যা ঘটছে তা একান্ত তাদের ব্যাপার হলেও ১৯৭১ এবং এর পরে ঘটনাসমূহ থেকে দূরে অবস্থান নিতে পারে না পাকিস্তান। …আমি এটা বুঝতে পারি না কেন বাংলাদেশ সরকার অতীতের কবর খুঁড়ে অশান্তি বাড়াচ্ছে এবং পুরনো ক্ষতগুলো তুলে ধরছে।’

বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধ মামলার বিচার নিয়ে পাকিস্তান সরকারের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার প্রেক্ষিতে সারাদেশে তোলপাড় শুরু হয়েছে। যুদ্ধাপরাধ বিচার নিয়ে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও সেদেশের জামায়াতে ইসলামীর দেয়া নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ায় ঢাকায় নিযুক্ত পাকিস্তানের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার আহমদ হোসেইন দায়োকে তলব করেছে সরকার। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে পাকিস্তান মন্ত্রিসভার এক সদস্যের দেয়া বিবৃতির জের ধরে বৃহস্পতিবার বিকেলে তাকে তলব করা হয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে পাকিস্তানের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনারের মাধ্যমে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার জন্য সেদেশের সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে এই ঘটনায় পাকিস্তানের ভূমিকাকে অনাকাক্সিক্ষত ও অগ্রহণযোগ্য বলে কঠোর প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ। ৬ নভেম্বর অপরাহ্নে ঢাকায় নিযুক্ত পাকিস্তানের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার আহমদ হোসেইন দায়োকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ডেকে আনা হয়।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রের বরাত দিয়ে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায় এর আগে আব্দুল কাদের মোল্লার ফাঁসির রায়ে কার্যকর করার পর গত বছর ডিসেম্বরে সে সময় পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে কাদের মোল্লার মৃত্যুদন্ড কার্যকরের নিন্দা জানিয়ে একটি প্রস্তাব পাস করা হয়। পাকিস্তান জামায়াতের সাংসদ শের আকবর খান তখন প্রস্তাব উত্থাপন করলে তাতে সমর্থন জানায় সরকারী দল মুসলিম লীগ। এ ছাড়া ইমরান খানের তেহরিক-ই-ইনসাফ, আওয়ামী মুসলিম লীগ, পাকিস্তান মুসলিম লীগ (কায়েদে আজম) ও জমিয়তে উলামা ইসলাম এই প্রস্তাবে সমর্থন জানায়। সেই নিন্দা প্রস্তাবে বলা হয় বাংলাদেশের উচিত হবে না ৪২ বছর আগের পুরনো ক্ষতকে নতুন করে জাগিয়ে তোলা। এতে বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধসংক্রান্ত সব ধরনের মামলা ‘পারস্পরিক সমঝোতা’র ভিত্তিতে প্রত্যাহার করে নেয়ার আহ্বান জানানো হয়। পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে আনা এই প্রস্তাবে অবশ্য সমর্থন দেয়নি পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি)। পিপিপির সাংসদ আবদুল সাত্তার বাচানি পরিষদকে এ ধরনের প্রস্তাব গ্রহণ না করার আহ্বান জানিয়ে বলেছিলেন, পুরো বিষয়টিই বাংলাদেশের একান্ত অভ্যন্তরীণ বিষয়। আমাদের উচিত হবে না একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে এ ধরনের প্রস্তাব পাস করা’। কিন্তু পিপিপির বিরোধিতা সত্ত্বেও পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে ওই নিন্দা প্রস্তাব পাস হয়।

বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন ও বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের স্টোটাসে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সরকারের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়। বিষয়টি বিভিন্ন সামাজিক গণমাধ্যমেও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কড়া প্রতিবাদ জানিয়ে এসবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য প্রতিবাদ অব্যাহত রয়েছে। আওয়ামী লীগের যুগ্মসাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ বলেছিলেন, দেশে চলমান যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে বহির্বিশ্বের হস্তক্ষেপ বরদাশত করা হবে না। এছাড়া যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরোধিতা করে পাকিস্তানের দেয়া বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় ঢাকায় দেশটির রাষ্ট্রদূতসহ কূটনৈতিক কর্মকর্তাদের বহিষ্কারের দাবি জানায় গণজাগরণ মঞ্চ। যুদ্ধাপরাধী মতিউর রহমান নিজামীর মৃত্যুদণ্ডের রায়ের প্রতিক্রিয়ায় পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ন্যাক্কারজনক প্রতিক্রিয়ায় গণজাগরণ মঞ্চের পক্ষ থেকে বলা হয়, নিসার আলী যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল এবং বাংলাদেশের সরকারকে নিয়ে নানা ধরনের দৃষ্টতাপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছে। এবং পাকিস্তান সরকারের অব্যাহত ষড়যন্ত্রের প্রতিক্রিয়া হিসেবে এ দেশের জামায়াতকে কে মদদ দিচ্ছে, জনমনে ধারণা রয়েছে। এই কূটনৈতিক কর্মকর্তাদের বহিষ্কারের দাবি জানায় গণজাগরণ মঞ্চ’।
লিখতে গেলে অনেক কথা লিখতে হবে। এতে বেড়ে যাবে কলেবর তাই কলেবর না বাড়িয়ে বলতে চাই তারেক, যার বাবা জিয়াউর রহমান ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার সঙ্গে জড়িত ছিলেন তা এখন দিবালোকের মতো মতো স্পষ্ট। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর জিয়াউর রহমান আওয়ামীলীগকে নিশ্চিন্ন করে দেয়ার সব ধরনের অপচেষ্টা করলেও বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে কখনো কোনো কটুবাক্য উচ্চারণ করেননি জিয়াউর রহমান। কিন্তু খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি পুনঃর্গঠন হওয়ার পর থেকেই এই দলটি যতটা না আওয়ামী লীগ বিরোধী ততটা বিরোধী বঙ্গবন্ধুর। কেননা, তারা ইতিমধ্যে বুঝতে পেরেছে, আওয়ামী লীগের মূল শক্তি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। কাজেই আওয়ামী লীগকে দুর্বল করতে হলে বঙ্গবন্ধুরে ভুমিকাকে বিতর্কীত করে ফায়দা হাসিল করা। কিন্তু এ চেষ্টা তাদের রুমেরাং হয়েছে। তারপরও বিএনপি থেমে নেই। এখন বঙ্গবন্ধুকে বিতর্কীত করার কাজে পুরোপুরি আত্মনিয়োগ করেছেন দুর্নীতির দায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে ২০০৭ সালের ৭ মার্চ তারেক রহমান গ্রেফতার হওয়া ও পরবর্তীতে আর কোনদিন রাজনীতি করবে এই মুচলেকা দিয়ে স্বেচ্ছানির্বাসনে লন্ডন চলে যাওয়া তারেক রহমান। তার বিরুদ্ধে প্রায় এক ডজন দুর্নীতির মামলা হয় তখন। সুপ্রীমকোর্ট থেকে জামিন নিয়ে পরের বছরের সেপ্টেম্বর মাসে চিকিৎসার চিকিৎসার অযুহাতে যুক্তরাজ্য যান।সেখানেই তারেক রহমান স্ত্রী-সন্তান নিয়ে রাজকীয় জীবন যাপন করছেন এবং পাকি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-এর মদদে একের পর এক ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়ে ব্যর্থ হওয়ার পর এখন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বিতর্কীত করার নোংরা খেলায় মেতে ওঠেছেন। তার কন্ঠে এখন নেসার আলীদের সুর।

শেষ করবো এই বলেই বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানীদের কাছে যেমন শত্রু; তেমন শত্রু তারক রহমানের কাছে। তা না হলে তিনি কেন বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে প্রায়শ: বিতর্ক সৃষ্টি করে বঙ্গবন্ধুর আকাশসমান উচ্চতার গায়ে কালিমা লেপনের নিরন্তর চেষ্টা করে চলেছেন। তার এ কথা ভুলে গেলে চলবেনা আকাশের গায়ে বিষ্টা নিক্ষেপ করতে চাইলে সেই বিষ্টায় একদিন সে নিজেই তলিয়ে যাবে। এ কথাটা সে যত তাড়াতাড়ি অনুধাব করতে পারবে, ততই মঙ্গল হবে তার ও তার দল বিএনপির জন্য।