ক্যাটেগরিঃ ব্লগ

কিছুদিন পর পরই বাংলাদেশের প্রধান রপ্তনিখাত গার্মেন্টস সেক্টরে বেতনভাতা বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে জ্বালাও পোড়াও ভাংচুরসহ যে ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ শুরু হয় আমি অন্তত: এটাকে শ্রমিক অসন্তোষ বলে মানতে রাজি নই। কেননা নিয়মতান্ত্রিক কোনো শ্রমিক আন্দোলনে এ ধরনের কোনো সহিংস ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ কখনো মেনে নেয়া যায় না। যে স্তন্যদায়িনী মা নিজের বুকের দুগ্ধ খাইয়ে তার সন্তানদের পরিপুষ্ট করে গড়ে তুলেন; সত্যিকারের কোনো সন্তান সে মায়ের পেটে লাথি মারতে পারে না। যে তৈরী পোশাকখাত ৪০ লক্ষ শ্রমিক ও তাদের পরিবারের মুখে ক্ষুদারঅন্ন তুলে দিচ্ছে, কিছু কিছু শ্রমিকের ছদ্মবেশী দেশবিরোধী, মায়ের মতো সেই পোশাক খাতের পেটে লাথিই মারছে না; এ কে ধ্বংস করে দেয়ার মতো এক বিপজ্জনক খেলায় মেতে ওঠে। আমরা সকলেই কম বেশী জানি বাংলাদেশের তৈরী পোশাকখাত বিকশিত না হলে দেশ বেকারের বাগাড়ে পরিনত হতো। কিন্তু তৈরী পোশাকখাত আমাদেরকে সে ধরণের পরিস্থিতি থেকে রক্ষা করেছে। আমরা এটাও জানি যে বর্তমানে জীবযাত্রার মান বৃদ্ধি, মূল্যষ্ফিতি ইত্যাদি কারণে গার্মেন্টস খাতের একজন শ্রমিক যে বেতন ভাতা পাচ্ছে তা দিয়ে তাদের সংসার সংসার চলাতে কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু বিশ্বমন্দার কারণে আমাদের দেশের তৈরী পোশাক খাতের ওপর যে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে, তা ও তো অস্বীকার করলে চলবে না।

বাংলাদেশের এ খাতের মজুরি কয়েকটি দেশের মজুরির সাথে তুলনা করে শ্রমিক নেতারা প্রায়শই যে চিত্রটি তুলে ধরেন তা অপাতদৃষ্টিতে বেশ তারতম্য মনে হলেও বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে তা যুক্তিযুক্ত নয়। শ্রমিক নেতাদের যুক্তি হলো,‘বাংলাদেশের গার্মেন্টসে শ্রমিকদের প্রতি ঘন্টা মজুরি যেখানে ৩১ মার্কিন সেন্ট, চীনে সেখানে ১.৬৬ ডলার, পাকিস্তানে ৫৬ সেন্ট, ভারতে ৫১ সেন্ট, ইন্দোনেশিয়ায় ৪৪ সেন্ট এবং ভিয়েতনামে ৩৬ সেন্ট। শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি প্রসংগে বিশেষজ্ঞদের অভিমত হলো,‘শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির বিষয়টি তাদের সক্ষমতার সঙ্গে জড়িত। বাংলাদেশের শ্রমিকদের ন্যুনতম মজুরি অন্যান্য দেশের চেয়ে কম হওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে তাদের সক্ষমতা। সক্ষমতার দিক থেকে আমাদের দেশের শ্রমিকরা অনেক পিছিয়ে। ভিয়েতনামের চেয়ে বাংলাদেশের শ্রমিকদের উৎপাদন ক্ষমতা তিনভাগের দুইভাগ মাত্র। ফলে উৎপাদন ক্ষমতা না বাড়িয়ে শুধু মজুরি বৃদ্ধি করলেই চলবে না। এ ক্ষেত্রে সরকার কর্তৃক গড় ৮০ ভাগ মজুরি বৃদ্ধি অনেক বেশি। আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের মূল্য অনুযায়ি বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে এ মজুরী কম নয়।

গত মজুরি কাঠামো ঘোষণা করে শ্রমমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ বলেছেন,‘শ্রমিকদের মানবেতর জীবনযাপনের ব্যাপারে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী খুবই সংবেদনশীল। তাই আন্দোলনের আগেই নির্দিষ্ট সময়ের প্রায় দেড় বৎসর আগে মজুরি বোর্ড গঠন করে মজুরি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তিনি আরো বলেন, ‘শুধু পোশাকখাত নয় , সরকার ৩৬টি খাতের শ্রমিকদের ন্যুনতম মজুরী কাঠামো পর্যালোচনা এবং নুতন মজুরী কাঠামো ঘোষণার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।’ মাননীয় মন্ত্রী শ্রমিকদের মজুরি কাঠামো মেনে নেয়ার আহ্বান জানিয়ে আরো বলেন,‘সর্বসম্মতভাবে মজুরি বোর্ড এ কাঠামো প্রণয়ন করেছে। মালিকরা তা বাস্তবায়ন করবে। তাই বাস্তবায়নের জন্য তাদের তিনমাস সময় দেয়া হয়েছে। এর আইনী প্রক্রিয়া শেষ করতেও তিনমাস সময় লাগবে। তবে জরুরী প্রয়োজনে ভবিষ্যতে এটি আরো পর্যালোচনা করে নতুন মজুরি কাঠামো ঘোষণা করা হবে।’ এ ঘোষণার পরও রাজধানীর বিভিন্ন শিল্প এলাকায় এই নিয়ে কিছু সংখ্যাক শ্রমিক পুলিশের সাশে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে একটা অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি অপপ্রয়াস চালিয়েছিল। তবে অধিকাংশ শ্রমিক সরকার ঘোষিত মজুরি মেনে কাজে যোগদান করলেও কিছুসংখ্যাক নামদারী শ্রমিক এই ইস্যুটি জিইয়ে রেখে ফায়দালুটার চেষ্টা করে। তারা রাজপথে গাড়ি ভাংচুর অরাজগতা, কারখানায় কারকাখানায় ভাংচুর চালিয়ে যোগদানকৃত শ্রমিকদের কাজ থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সাধারণ শ্রমিরা ইতিবাচক পদক্ষেপে বিশৃঙ্খলাকারীরা বেশিদূর এগুতে পারেনি।

এর পরই প্রেক্ষিতে শ্রমমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মালিক প্রতিনিধি ও শ্রমিকদের ৪২টি শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের নিয়ে বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে মালিক ও শ্রমিক উভয় পক্ষই সরকার কর্তৃক ঘোষিত ন্যুনতম মজুরি কাঠামো মেনে নেয় এবং বন্ধ কারখানা খুলে দেয়া ও শ্রমিকদের কাজে যোগদানের ব্যাপারে ত্রিপক্ষীয় সমঝোতা হয়। তার পরও স্বার্থান্বেষী মহলের মদদপুষ্ট কিছু শ্রমিক নামধারীনেতার কারণে তা বেস্তে যেতে বসেছিল। আমার প্রশ্ন হলো সরকার ও মালিক পক্ষ শ্রমিকদের প্রতি উদার ও নমনীয় হওয়ার পরও কারপার্রাস সার্ভ করতে ওইসব শ্রমিক নামধারীরা গার্মেন্টস সেক্টরে অস্তিতিশীলতা সৃষ্টির মাধ্যমে মাঝে মাঝে গার্মেন্টস সেক্টরকে অস্তিতিশীল করে তোলে। আর কারাই বা তাদের পেছনে ইন্দন যোগাচ্ছে?

তৈরী পোশাক খাতে বর্তমানে বাংলাদেশে চার হাজারেরও বেশি শিল্প কারখানা গড়ে ওঠেছে। এই শিল্পে কাজ করছে প্রায় ৪০ লক্ষ শ্রমিক যার আবার ৮৫ শতাংশই নারী। এই শিল্প প্রসারের কারণেই নারীদের সামাজিক মর্যাদা বেড়েছে। কর্ম সংস্থানের ক্ষেত্রে দূর হয়েছে সামাজিক বৈষম্য। এ ধরণের অনাকাংখিত অস্তিরতার কারণে তৈরী পোশাক শিল্পখাতটি ধ্বংস হয়ে গেলে এই বিপুল সংখ্যক শ্রমিক ও তাদের ওপর নির্ভরশীলরা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তাও শ্রমিকদের বুদ্ধি ও বিবেক দিয়ে বিচার করতে হবে। আমরা মনে করি পোশাক শিল্প টিকে থাকলেই শ্রমিক বেঁচে থাকবে। তাই আগে পোশাক শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। বর্তমানে বৈশ্বিক মন্দর উত্তরণ ঘটছে, এ অবস্থায় এর চেয়ে বেশি মজুরি প্রদান যুক্তিযুক্ত মনে করি না। একটা কথা সবাইকে মনে রাখতে হবে শুধু মাত্র মজুরী বাড়ালেই চলবে না। সাথে সাথে উৎপাদন ও শ্রমিকদেও সক্ষমতাও বাড়াতে হবে। এক রিপোর্টে জানা গেছে ইপিজেড এলাকায় গার্মেন্টস শিল্পে আমাদের শ্রমিকদের উৎপাদন সক্ষমতা ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ। আর ইপিজেডের বাইরে সক্ষমতা হচ্ছে মাত্র ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ।

শত বাধা বিপত্তি পার হয়েও আমাদের গার্মেন্টস সেক্টর এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু দেশের বিকাশমান গার্মেন্টস শিল্পকে ধ্বংস করে যারা দেশের অর্থনীতিকে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেয়ার এক আত্মঘাতি ষড়যন্ত্র মেতে ওঠেছে। দেশের তৈরী পোশাকশিল্প খাত ধ্বংস হয়ে গেলে আমাদের জাতীয় বাজেটের অর্ধেকের সমপরিমান প্রায় একচতুর্থাংশ বিনিয়োগ বন্ধ হয়ে যাবে। আমাদের রপ্তানি আয়ের ৭৭ ভাগ আসে তৈরী পোশাকশিল্প খাত থেকে। তাই এ খাতের অস্থিরতা ও অরাজক পরিস্থিতি রপ্তানি আয়ে ধ্বস অনিবার্য করে তুলবে। শুধু মাত্র তৈরী পোশাক শিল্প খাত ধ্বংস হয়ে গেলে চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরের আয় কমে যাবে ৮০ ভাগ। বন্ধ হয়ে যাবে পরিবহন খাতে সাড়ে ৫ শত কোটি টাকার অতিরিক্ত আয়। একই সাথে বন্ধ হয়ে যাবে প্যাকেজিং ও প্রিন্টিং শিল্পে তৈরী পোশাক শিল্পকেন্দ্রিক ৫ শত কোটি টাকার কাজ। বেসরকারী ব্যাকের মুনাফা হ্রাস পাবে শতকরা ৮০ ভাগ।

এক রিপোর্টে জানা গেছে দেশের গার্মেন্টস সেক্টরের শ্রমিকদের প্রায় ৮০ ভাগই নারী। এতে ২৮ লাখ তাদের জন্য গড়ে ওঠা ২০০ কোটি টাকার প্রসাধন বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যাবে। গাণিতিক সমীকরণ, পরিসংখ্যান ও তথ্য-উপাত্ত দিয়ে স্থায়ী কমিটির রিপোর্টে বলা হয়েছে, গার্মেন্টস শিল্প ধ্বস হয়ে গেলে এ সেক্টরে সরাসরি সক্রিয় ৩৪ লাখ লোক কর্মহীন হয়ে পড়বে। এ খাত সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ক্ষেত্রে সক্রিয় আরো ২৫ লাখ লোক বেকার হয়ে যাবে। সার্বিকভাবে গার্মেন্টস শিল্প ধ্বংসের প্রভাব পড়বে দেশের আড়াই কোটি লোকের ওপর। গার্মেন্টস শিল্পে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে জাতীয় অর্থনীতি ধ্বংসের এ বক্তব্য প্রমাণে দেশের অর্থনীতিকে গার্মেন্টসের বি¯তৃত ও সামগ্রিক প্রভাব তুলে ধরা হয়। দেশে বার্ষিক বাজেটের প্রায় অর্ধেকের সমপরিমান বিনিয়োগ হয় গার্মেন্টস সেক্টরে। এ সেক্টরের ১০ ভাগ বিনিয়োগ গার্মেন্টস মালিকদের বাকি অর্থ রাষ্ট্র ও জনগণের। ব্যাংক বীমা ও বিভিন্ন অর্থলগ্নি প্রতিষ্ঠান গার্মেন্টেসে বিনিয়োগের ৯০ভাগ যোগান দিয়ে থাকে। ২০০৮-০৯ অর্থবৎসরে চট্টগ্রাম বন্দরের মোট আয় হয়েছে ৬৭৬ কোটি টাকা এর মধ্যে ৫৩৬ কোটি টাকা এসেছে তৈরী পোশাকশিল্প খাত থেকে। ২০০৯ সালে দেশের প্রাইভেট ব্যাংকসমুহ মুনাফা করেছে ৫ হাজার ৫’শ ৬৯ কোটি টাকা এই মুনাফার ৩ হাজার ৯’শ কোটি টাকা এসেছে তৈরী পোশাকশিল্প খাত থেকে।

উপরোক্ত আলোচনা থেকে সহজেই অনুমেয় তৈরী পোশাকশিল্প খাত আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তাই দেশি-বিদেশি চক্রের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি গোষ্ঠী চাচ্ছে এই সেক্টরটিকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিতে। তাই শ্রমিক নামধারী যে সব দেশবিরোধীচক্র গার্মেন্টস সেক্টর ধ্বংসের পায়তারা লিপ্ত তাদেরকে চিহ্নিত করতে হবে শ্রমিকদেরকেই। তবে সাধারণ শ্রমিকদের কথা হলো যারা মাঝে মাঝেই গার্মেন্টস সেক্টরে এ ধরণের অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির কাজে লিপ্ত হয় তাদের অনেকেই নাকি গার্মেন্টস শ্রমিক নয়। এরা বেশিরভাগই বহিরাগত। সাধারণ কর্মীরা বলছে বিক্ষোভের সময় অনেক অপরিচিত মুখ দেখা যায় যারা গার্মেন্টস কর্মী নয়। এরা বগিরাগত। দেশের গোয়েন্দা সংস্থাও বিভিন্ন হামলার সময় ধারণকৃত ভিডিও ফুটেজ দেখে বলেছে হামলার সময় অনেক জামায়াত-শিবির ও নিষিদ্ধ ঘোষিত আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন হিযবুত তাহরীর সদস্য উপস্থিত থাকে। তারা শ্রমিকদের উস্কে দিয়ে ও নিজেরা অংশ গ্রহণ করে অগ্নিসংযোগ ও ভাংচুরের ঘটনা ঘটিয়ে সটকে পড়ে। এদের সাথে জড়িত আছে শ্রমিক নামধারী বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কিছু নেতাও।

সুতরাং দেশের একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমার কথা হলো, বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি, প্রায় ৪০ লক্ষ শ্রমিক ও তাদেও পরিবার ও পোষ্যের অন্নদাতা আমাদের গার্মেন্টস সেক্টর। এই সেক্টরের ওপর শকুনের দৃষ্টি পড়েছে। যেভাইে হোক বাংলাদেশের গার্মেন্টস সেক্টরকে ধ্বংস করে দিতে পারলেই বাংলাদেশের অগ্রগতিকে থামিয়ে দেয়া যাবে। কাজেই দেশ যখন মধ্যম আয়ের দেশের পথে এগিয়ে যাচ্ছে তখন এই সেক্টর নিয়ে আরও খেলা হবে। জিএসপি সুবিধা বন্ধ রাখতে এখনো দেশের ভেতর থেকে লবিং করা হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশ দেখিয়ে দিয়েছে, জিএসপি সুবিধা বন্ধ রাখার পরও এই সেক্টরে রপ্তানী আয় বেড়েছে অনেক। পরিশেষে দেশের সকল দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দল, শ্রমিক সংগঠনের নেত্রীবৃন্দের প্রতি নিবেদন আমরা যেন আর নিজের নাক কেটে অন্যের যাত্রা ভংগের মতো কাজ না করে, সকলেই এ সেক্টরকে আরও এগিয়ে নেয়ার কাজে সামিল হই।