ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

জামায়াত-শিবিরের বিরুদ্ধে অব্যাহত সন্ত্রাসীমূলক কর্মকান্ড পরিচালনার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের মাঝে জামায়াতবিরোধী মনোভাব জেগে ওটা ও সরকারের কঠোর মনোভাবের কারণে শুধু রাজনৈতিকভাবেই নয় এখন সামাজিকভাবেও দিনে দিনে একঘরে হয়ে পড়ছে জামায়াত-শিবির। সাধারণ মানুষের মনে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পুনঃর্জাগরণ ও মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের অপকর্ম এবং যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের প্রেক্ষিতে ধর্মকে পূঁজি করে রাজনীতি করা এ গোষ্ঠীর সব অপকর্ম ফাঁস হয়ে যাওয়ায় দেশের সাধরণ মানুষ বিশেষ করে তরুণপ্রজন্ম এদের দিকে থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। তাই এদের কোনো কর্মসূচিই এখন সফল হচ্ছেনা। জনগণের সমর্থন হারানোর ভয়ে তাদের জোট ও ভোটবন্ধু বিএনপি এবং সমমনা দলগুলোও এখন এড়িয়ে চলছে জামায়াত-শিবিরকে। যুদ্ধাপরধাদের দায়ে অভিযুক্ত দলটির শীর্ষ নেতাদের ফাঁসি ও কারো কারো অমৃত্যু বা দীর্ঘ মেয়াদী সাজার কারণে দ্বিতীয় সারির অনেক নেতাই এখন আন্ডারগ্রাউন্ডে। তাই নেতা-কর্মীদের মধ্যে সমন্বয়হীনতা, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ইত্যাদি কারণে আন্দোলনের কোন কর্মসূচিই সফল করতে পারছে না। এখন চোরাগোপ্তা হামলা, ঝটিকা মিছিলে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে জামায়াত শিবিরের কর্মকান্ড। কর্মসূচী পরিচালিত হচ্ছে ই-মেইল, ফেসবুক, এসএমএসেই।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শক্ত অবস্থান আর জনরোষের প্রতিরোধের মুখে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা এখন অনেকটাই পালিয়ে বেড়াচ্ছে। কেউ কেউ সীমান্ত পারি দিয়ে চলে যাচ্ছে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে। দলের ভবিষ্যত নিয়ে নেতাকর্মীদের মাঝে ছড়িয়ে পড়েছে হতাশা। দিনে দিনে দুর্বল হয়ে পড়ছে জামায়াতের মূল চালিকাশক্তি ইসলামী ছাত্রশিবির। কেবল দেশের সাধারণ মানুষই নয় শিবির করাকে এখন আর ভাল চোখে দেখছে না পরিবারগুলো। অভিভাবকরা এতদিনে বোঝে গেছেন জামায়াত-শিবির সত্যিকারের কোন ইসলামী সংগঠন নয়, ইসলামের নামে পরিচালিত একটি সন্ত্রাসী রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম। তাই এখন শিবিরে নতুন নিয়োগও বন্ধ। ওয়াকিফহাল মহলের মতে বিভিন্ন কারণে এই মুহূর্তে জটিল পরিস্থিতিতে পড়েছে স্বাধীনতাবিরোধী গোষ্ঠীটি। কারণগুলো হচ্ছে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে একের পর এক জামায়াতের শীর্ষনেতাদের ফাঁসির আদেশ ও রায় কার্যকরের উদ্যোগ, গুরু গোলাম আযমের মৃত্যু, স্বল্পসময়ের ব্যবধানে কয়েক হাজার নেতাকর্মী গ্রেফতার এবং মানবতাবিরোধী বিচারবন্ধে ক্রমশ বিদেশীবন্ধু রাষ্ট্রগুলোর হস্তক্ষেপ ও প্রভাব হ্রাস। নিবন্ধন বাতিলের সঙ্গে সঙ্কট আরও ঘনীভূত হয়েছে দল হিসেবে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার উদ্যোগে। শীঘ্রই বিল আকারে মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর সংসদে উত্থাপনের প্রস্তুতি রয়েছে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের। জনরোষের বিএনপিও সেভাবে সমর্থন করতে পারছে না জামায়াতকে, যা জামায়াতের চিন্তার অন্যতম কারণ।

আমরা সবাই জানি যে, স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর সরকার জামায়াতকে নিষিদ্ধ করেছিল । ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত জামায়াত নিষিদ্ধ ছিল। পরে জিয়ার সরকার এ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেন। শুধু তা ই নয় তিনি ১৯৭৩ সালেরর দালাল আইন বাতিল করে জেলখানায় আটক ১১ হাজার মানবতাবিরোধী (রাজাকার, আল-বদ, আল-শামস যাদের সিংহভাগই ছিল জামায়াতের নেতাকর্মী) মাফ করে দিয়ে রাজনীতি করার সুযোগ করে দেন। প্রথম দিকে তারা ইসলামিক ডেমোক্র্যাটিক লীগ (আইডিএল) নামে তাদের কার্যক্রম চালায়। পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমানের সরকারের তথাকথিত গণতন্ত্র চালু করলে জামায়াতে ইসলামী আবারও রাজনীতি করার সুযোগ পায়। জিয়ার মৃত্যুর পর জিয়াপত্নী খালেদা ও বিএনপির অানুকূল্য ও পৃষ্ঠপোষকতায় জামায়াত-শিবিরের বাড়বাড়ন্তের পর এমন দুঃসময়ে কখনও পতিত হয়নি দলটির। জামায়াত পুনরায় বাংলাদেশে রাজনীতির সুযোগ পেয়ে ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে ১০টি, ১৯৯১ সালের নির্বাচনে ১৮টি, ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে তিনটি, ২০০১ সালের নির্বাচনে ১৭টি ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে দুটি আসন লাভ করে। ১৯৯৯ সালে বিএনপির সঙ্গে জোট বেঁধে ২০০১ সালের নির্বাচনে জামায়াত শুধু ১৭টি আসনে জয়লাভই করেনি, দুটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ। শুধু তাই নয়, মন্ত্রিপরিষদেও তারা হয়ে ওঠেন অত্যন্ত প্রভাবশালী। কিন্তু ২০০৮ সালের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সরকার গঠিত হয়। আওয়ামী লগের নির্বাচনী ইস্তিহারের অঙ্গিকার অনুযায়ী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ১৯৭১ সালে যুদ্ধকালে খুন, হত্যা, অগ্নিসংযোগ ও ধর্ষণের সঙ্গে যুক্ত ছিল, তাদের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে। প্রাথমিকভাবে জামায়াতের ১০ শীর্ষ ও বিএনপির দু’জন প্রভাবশালী নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠিত হয়। চলছে বিচার আর একের পর এক রায়ে এখন দিশেহারা স্বাধীনতাবিরোধী গোষ্ঠী। বর্তমানে দেশব্যাপী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থানের কারণে সক্রিয় নেতাকর্মীরাও রয়েছেন আত্মগোপনে। মগবাজারের কেন্দ্রীয় কার্যালয়, পুরানা পল্টনের মহানগরী অফিসসহ অধিকাংশ মহানগর, জেলা-উপজেলা কার্যালয় এখন তালাবদ্ধ। প্রকাশ্যে কর্মসূচীর ঘোষণা দিলেও সফল করতে পারছে না দলটির নেতাকর্মীরা। দলীয় কার্যালয় দূরের কথা, বাসাবাড়ি, ব্যক্তিগত অফিস, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কোথাও একটানা অবস্থান করছেন না তারা। ঝটিকা মিছিল, ভাংচুর ছাড়া চলছে না প্রকাশ্য কোন সাংগঠনিক কার্যক্রম। এভাবেই আস্তে আস্তে ভেঙ্গে পড়েছে জামায়াত শিবিরের সাংগঠনিক কাঠামো।

অক্টোবরের শেষ সমপ্তাহ ও নভেম্বরের প্রথম সপ্তায় তিন যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির রায়ের পর টানা কর্মসূচী ঘোষণা করলেও হরতাল ডেকে মাঠে নামেনি জামায়াত-শিবিরের অধিকাংশ নেতাকর্মী। সংবাদ পত্রে প্রকাশিত খবরে জানা গেছে জামায়াত-শিবির এ মুহূর্তে ঝুঁকি নিতে রাজি নয় বলে জানিয়েছেন মাঠপর্যায়ের নেতারা। দেশের যেসব এলাকায় জামায়াতের শক্ত অবস্থান রয়েছে, সেসব এলাকায়ও হরতালে দলটির তেমন তৎপরতা ছিল না। নেতৃত্ব সঙ্কটের কারণেও আন্দোলন জোরদার হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন তৃণমূল নেতাকর্মীরা। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ১০ জন জামায়াত নেতা বিচারের সম্মুখীন হওয়ায় দলটি নেতৃত্বহীন হয়ে পড়েছে। বিচার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর থেকে জামায়াতের বিভিন্ন নেতাকর্মী সবচেয়ে বেশি সহিংস হয়ে উঠেছিলেন। তারা ধারণা করেছিলেন, জামায়াতের পর্যাপ্ত পেশীশক্তি রয়েছে এবং সঙ্গে রয়েছে দেশের অন্যতম বড় রাজনৈতিক দল বিএনপি সুতরাং পেশীশক্তি ব্যবহার করে বিচার বাধাগ্রস্ত করতে পারবেন। কিন্তু হিতে বিপরীত হয়েছে। জামায়াতের ধারণা ছিল অসংখ্য নেতাকর্মী গ্রেফতার হলে দেশ ও বিদেশে প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে এবং সরকার ও অপরাধ ট্রাইব্যুনাল বিপাকে পড়বে, তা হয়নি। ইতোমধ্যেই জামায়াতের হাজার হাজার নেতাকর্মী দেশব্যাপী সহিংসতার পথ অবলম্বন করতে গিয়ে গ্রেফতার হয়েছে। এ নিয়ে সরকার এখন কোন চাপই অনুভব করছে না। মাঠে বর্তমান পরিস্থিতি এমন, যেন জামায়াত একটি নিষিদ্ধ দল। জামায়াতের রাজনীতির অধিকার নয়, বরং তাদের বিরুদ্ধে যে কোন শক্ত অবস্থানকেই স্বাগত জানাচ্ছে সাধারণ মানুষ।

পবিত্র ইসলাম ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে করে ধর্ম ব্যবসায়ী স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত-শিবির এ যাবত একটি নির্দিষ্ট উগ্রবাদী জনগোষ্ঠীর সমর্থন নিয়ে টিকে থাকলেও দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে সারা দেশে অব্যাহত লাগাতার সহিংস অবস্থান নেয়ায় জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। শিবিরের সন্ত্রাসী ক্যাডাররা পালিয়ে বেড়ালেও তাদের বাবা-মা ভাই-বোনরাও আছে আতঙ্কে। ছেলে তাই এ মুহূর্তে অনেক অভিভাবকই চাইছেন তার সন্তানরা শিবির ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসুক। শিবির করাকে এখন আর ভাল চোখে দেখছে না পরিবারগুলো। আসছে সংসার থেকেও চাপ। সাধারণ মানুষের মধ্যে এখন শিবিরের গ্রহণযোগ্যতা নেই বললেই চলে। কেননা দেশের মানুষ ইতিমধ্যেই পুরোপুরি জেনে গেছে যে, জামায়াত ইসলামী দল নয়। এরা ধর্মব্যবসায়ী। এরা স্বাধীনতাবিরোধী। নারী অগ্রগতিবিরোধী। দেশবিরোধী। একাত্তরের ঘাতক।

শেষ করবো এই বলেই, আজ (১৩ নবেম্বর) দশম সংসদের চতুর্থ অধিবেশন বসছে। সম্ভবতঃ এই অধিবেশনে রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার বিল উত্থাপিত হতে পারে। সংসদে এ সংক্রান্ত বিলটি পাশ হয়ে জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধ হলে দলটি আরও কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। সে ক্ষেত্রে জামায়াত আন্ডারগ্রাউন্ড তৎপরতা শুরু করতে পারে। তাতে অবশ্য জামায়াতের মূল উদ্দেশ্য ব্যর্থ হবে। নিষিদ্ধ হলে প্রকাশ্যে গণতান্ত্রিক দলের সুবিধা নিয়ে সাধারণ মানুষকে ব্যবহার করে আর তৎপরতা চালাতে পারবে না। তা হলে ভবিষ্যতে জামায়াত-শিবির আবার কোন নামে আবির্ভূত হয়, আবার নতুন নামেও আবির্ভূত হতে পারবে কিনা সেটা ভবিষ্যতের হাতেই ছেড়ে দেয়া হলো।