ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

 

অন্য দশজনের মতো আমার মধ্যেও কেন জানি মৃত্যুচিন্তা এসে ভর করেছে। মৃত্যু মানুষের জীবনে অমোঘ এক নিয়তি। তাই মৃত্যুর সাথে আমাদের অহর্নিশ উঠা-বসা চলাফেরা। জন্মিলেই মৃত্যু হবে জেনে মানুষ নিজকে কতনা উর্ধে মনে করে। মৃত্যুর এমনই এক ক্ষমতা, যার ওপর জারি হয়ে যায় ফরমান, তাকে বাঁচাতে পারে এমন শক্তি সৃষ্টি কর্তা মানুষের হাতে রাখেননি। তারপরও জীবন ও মৃত্যু নিয়ে সৃষ্টি কর্তার সাথে নিরন্তর লড়াই চলছে। আর মৃত্যুকে আমরা উপেক্ষা করি বলেই আমাদের ক্ষুব্দ প্রতিক্রিয়ায় আমাদের জীবনাবসান ঘটান। তবে এটাই চিরন্তন সত্য যে, জন্ম থেকেই জীবন ও মৃত্যুর মধ্যে চলে এক অসম প্রতিযোগিতা। শুধু মানুষ কেন কোনো প্রাণীই তাকে কোনোদিনই অতিক্রম করতে পারেনি, কোনোদিন পারবেও না। কাউকে জীবন দান করা ও কারো জীবন কেড়ে নেয়ার একছত্র অধিকার একমাত্র ওপরওয়ালার।

একদিন মৃত্যু আসবেই কিন্তু আমাদের জানা নেই মৃত্যুর স্বরূপ কেমন; জানি না তার অবয়ব আকৃতি কেমন। মৃত্যুই আমাদের আমাদের ভালবাসারজনকে কেড়ে নেয় তখন সে হয়ে যায় প্রতিদ্বন্দ্বী। মৃত্যু যে কী পরিমাণে পক্ষপাতদুষ্ট, প্রতিকুল এবং কঠোর বোধগম্য হয় যখন সে আমাদের পরিবর্তে আমাদের ভালবাসার মানুষকে নিয়ে যায়। মেহিকোর কবি হাবিয়ের বিইয়াররুতিয়া বলেছেন “মৃত্যুর প্রতি স্মৃতিকাতরতা” নিয়ে তার জন্য অপেক্ষমান। আমাদের জীবনকে আমরা নিরুপণ এবং তৈরী করতে সক্ষম কিন্তু এও জানি শেষমেশ মৃত্যুই হলো সার কথা।

তারপরও মানুষের জীবনের এমন একটা সময় আসে যখন তাকে মৃত্যু নিয়েও ভাবতে হয়। ভাবতে হয় পবিত্র কোরআনের বাণী‘ প্রত্যেক ‘নর-নারীকেই মৃত্যুর কঠিন স্বাদ গ্রহণ করতেই হইবে।’ একথা চিরন্তন সত্য জেনেও মানুষ বেঁচে থাকার জন্য সংগ্রাম করে মৃত্যুর সাথে। বেঁচে থাকার মানুষের এই যে অনন্ত তৃষ্ণা এ তৃষ্ণা মেটাতে চায় সে তার নিজের সন্তান-সন্ততির মাধ্যমে। সে দেখে যেতে চায়, যে জিন সে তার সন্তান-সন্ততির ও বংশধরদের মাঝে ছড়িয়ে দিয়েছ তার ফলাফল কতটুকু সফল। এর ফলাফল যদি ইতিবাচক হয় তা হলে এতে সে যে প্রশান্তি লাভ করে সে প্রশান্তি তাকে আরো বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা যোগায়।

ওয়াদারিং হাইটস্-এর ওপর লেখা এক প্রবন্ধে জর্জ বাতাইয়ে বলেছেন, মৃত্যু হলো ছদ্মবেশের মোড়কে একটি মৌল। ভালবাসার মূল সময়ে যখন ফেরা সম্ভব নয়, প্রেমিক-প্রেমিকার তীব্র অনুরাগ চূড়ান্তভাবে উপভোগ করার স্থান ও কাল হলো চিরন্তন এবং অপরিবর্তনীয় মৃত্যুপারের সময়। মৃত্যু হলো সীমাহীন সময়। কেন? কারণ আদি অর্থে মৃত্যুই হলো সকল লাভ-ক্ষতির হিসাবের উর্দ্ধে। মৃত কোনও ব্যক্তিই বলতে পারবে না, “এটাই আমার জন্য ঠিক”, কিংবা “এটা আমার জন্য ঠিক নয়,” “আমিই জয়ী” কিংবা “আমি পরাজিত”, “আমিই সবাইকে ছাড়িয়ে”, কিংবা “আমি শেষ।”

আমাদের চারপাশে এত যে, আতান্তর ভারবাহী জীবনের কঠিন বোঝা। অচেনা সব দুঃখ এর মাঝে প্রত্যেক মানুষকেই বেঁচে থাকার নিয়মেই বাঁচতে হয়। খোলা আকাশ, রেলস্টেশন, রাস্তার ফুটপাতে না খেয়ে উপোস করে দিন কাটায় তবু মানুষ বেঁচে থাকতে চায়, মরতে চায়না কখনো। তাই হয়তো জীবনের মতো মধুর কিছু নেই। কেন বাঁচতে চায়, কার জন্যে বাঁচতে চায়, কি উদ্দেশ্যে বাঁচতে চায় এসব প্রশ্ন মানুষের কাছে মূল্যহীন। সব কিছুই চুলায় যাক; শুধু একটি কথা, বেঁচে থাকার মধ্যেই পরম সুখ।