ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়ে লিখতে যেয়ে প্রথমেই যে কথাটি না বললেই নয় তা হলো, বর্তমান বিশ্বের একমাত্র সুপার পাওয়ার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সেই দেশ যে দেশ পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর পক্ষ নিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপ্নকে আতুর ঘরেই গলাটিপে হত্যা করতে চেয়েছিল। সাতসমুদ্র তের নদীর ওপারের দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন পাকিস্তানকে অস্ত্র, গোলাবরুদ, অর্থ ও নৈতিক সমর্থন দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পদে পদে মার খেয়ে নাস্তানাবুদ হয়ে পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে গিয়ে ঠেকছিল ঠিক তখনই বাংলাদেশ সৃষ্টির বিরুদ্ধে মার্কিন সপ্তম নৌবহর যখন ভারত মহাসাগরের দিকে যাত্রা করেছিল এর প্রতিবাদে তখন বিশ্বের আরেক সুপার পাওয়ার রাশিয়া অষ্টম নৌবহর পাঠানোর ঘোষণা দিলে মার্কিন সপ্তম নৌবহর ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছিল তখনকার যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন। আমাদের সেই বিপন্নকালে যদি ভারত ও রাশিয়ার মতো শক্তি আমাদের পাশে এসে না দাঁড়াতো তা হলে মার্কিন প্রশাসন আমাদের স্বাধীনতার লালিত স্বপ্নকে গলা টিপে হত্য করে বঙ্গোপসাগরের গভীর জলে ভাসিয়ে দিত। আর আমরা বাঙালিরা চিরদিন হয়ে থাকতাম পাকিস্তানের কৃতদাস, দাসের অধিক দাস।

সেই সুপার পাওয়ার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রক্তচক্ষুকে ও সকল ষড়যন্ত্রকে নস্যাৎ করে দিয়ে মাত্র নয় মাসের যুদ্ধে পাকিস্তানী দুর্ধর্ষ সেনাবাহিনীকে পরাজিত করে বীর বাঙালিরা ছিনিয়ে এনেছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা, আর মুক্ত আকাশে উড়িয়ে দিয়েছিল ত্রিশ লক্ষ শহীদ ও দুই লাখ মা-বোনের ইজ্জত-আব্রু ও রক্তের বিনিময়ে অর্জিত লাল- সবুজ পতাকা। পাকিস্তানের প্রধান ও অন্যতম মিত্রশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কোন দিনই ভাবতেই পারিনি যে তাদের মতো সুপার পাওয়ার ও বিশ্বের দুর্ধর্ষ পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে মাত্র নয় মাসের যুদ্ধে যুদ্ধে পরাজিত করে বাংলাদেশ নামক কোন স্বাধীন দেশের জন্ম হবে।পৃথিবীর মানচিত্রে জন্ম নেবে স্বাধীনসার্বভৌম বাংলাদেশ । যা ছিল রীতিমতো বিশ্বের অন্যতম সুপার পাওয়ার মার্কিন প্রশাসনের গালে চপেটাঘাতের শামিল। সেই চপেটাঘাতের প্রতিশোধ নিতেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের মাত্র সাড়ে ৩ বছরের মাথায় মার্কিন গোয়েন্দ সংস্থা সিআইএ ও পাকিস্তানী গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির সাথে হাত মিলিয়ে দেশে কৃত্তিম খাদ্য সংকট সৃষ্টি করে একটি তথাকথিত দুর্ভিক্ষ সৃষ্টির মাধ্যমে সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশের বঙ্গবন্ধু সরকারকে অজনপ্রিয় করে তুলতে এমন কোন মেশিনারী নেই যা তারা ব্যবহার করেনি। এর ফলশ্রুতিতেই ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে সৃশংসভাবে হত্যা করে সেই পরাজয় বা চপেটাঘাতের প্রতিশোধ নিয়েছিল মার্কন যুক্তরাষ্ট্র। যার নেপথ্যের কুশিলব ছিলেন আইএসআইয়ের সাবেক কর্মকর্তা, সেক্টর কমান্ডার ও পরবর্তীকালে মেজর জেনারেল ও বাংলাদেশের স্বঘোষিত প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। বঙ্গবন্ধু হত্যান্ডের মাধ্যমেই মার্কিন যুদ্ধরাষ্ট্র তাদের মিত্র পাকিস্তানের তাবেদার রাষ্ট্র বানাতে হেন চেষ্টা নেই করেননি।

কিন্তু শেখ হাসিনা নির্বাসন থেকে দেশে ফিরে আওয়ামী লীগের সভানেত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করে তাদের সব হিসাব-নিকাষ পাল্টে দেয়। কিন্তু শেখ হাসিনার নেত্রীত্বে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বকারী আওয়ামী লীগ যাতে কোনদিনই ক্ষমতায় ফিরে আসতে না পারে সে জন্য মার্কিন প্রশাসন তাদের বাংলাদেশীয় দোসরদের সাথে মিলে অনেক ষড়যন্ত্র ও চত্রান্ত করেছে। কিন্তু শেখ হাসিনার সাহসী নেতৃত্ব ও দেশপ্রেমের কাছে তাদের সব ধরনের চেষ্টা করেই ব্যর্থ হয়েছেন। এ জন্য অবশ্য আওয়ামী লীগকে ২১ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। কিন্তু ২০০১ সালের সাধারণ নির্বাচনের আগেই আমেরিকার নেতৃত্বে ‘টুয়েসডে গ্রুপ’ শেখ হাসিনা যাতে নির্বাচনে জয়ী হয়ে পুনরায় ক্ষমতায় আসতে না পারে সে জন্য জোর তৎপরতা চালায়। সেই নির্বাচনে রাষ্ট্রপতি শাহাবুদ্দিন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান সাবেক প্রধান বিচারপতি লতিফ সাহেব ও প্রধান নির্বাচন কমিশনার সাইদকে প্রভাবিত করে ভোটের ফলাফল জালিয়াতির মাধ্যমে বিএনপি-জামায়াত জোটকে দুই তৃতীয়াংশেরও অধিক আসনে বিজয়ী করে ক্ষমতায় বসায়। যা বাংলাদেশের নির্বাচনের ইতিহাসে ‘শালসা’ মার্কা নির্বাচন হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। সে ইতিহাস সবারই কম-বেশি জানা। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মহাজোট সরকার আবার তিন চতুর্থাংশ আসনে বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসে এবং দেশ পরিচালনায় ব্যাপক সফলতা অর্জন করে। উচ্চাদালতের রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল হয়ে গেলে বিএনপি-জামায়াত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধিনে নির্বাচন ছাড়া নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করবে বলে গো ধরে। এবং ৫ জানুয়ারির নির্বাচন অনুষ্ঠান বয়কট করে নির্বাচন প্রতিহতের ঘোষণা দিয়ে সারা দেশে ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ বর্বরতা চালায়। তখনও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নির্বাচন বন্ধের জন্যে ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রভাবশালী দেশে দূতিয়ালী শুরু করে একই সাথে শেখ হাসিনাকে নির্বাচন না করার জন্য বার বার চাপ দিতে থাকে। কিন্তু শেখ হাসিনার সাহস ও নির্ভকতা প্রদর্শন করে যুক্তরাষ্টের্রর চাপ উপেক্ষা করে ৫ জানুয়ারি নির্বাচন করে সরকার গঠন করে বিভিন্ন যুগান্তরকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন, এবং নিজেদের জনপ্রিয়তা অনেকটাই বাড়িয়ে নিয়েছেন।

এখন আবার যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির কন্ঠে কন্ঠ মিলিয়ে মধবর্তী নির্বাচনের দাবি নিয়ে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি অপপ্রয়াস চালাচ্ছেন। এর অংশ হিসেবেই যুক্তরাষ্ট্রে সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেশাই সরকারের আমন্ত্রন ছাড়াই বাংলাদেশে এসে নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন মহলের সাথে বৈঠক করে গেছেন। এ প্রসঙ্গে আজ ২ ডিসেম্বর ২০১৪ দৈনিক জনকন্ঠের উপসম্পাদকীয়তে ‘‘নিশা দেশাই বিসওয়ালের সফর কী নিলেন? কী পেলেন?’ শিরোনামে সাংবাদিক কলামিস্ট মাসুদা ভাট্টি লিখেছেন,‘বাংলাদেশে বহু ধরনের বিদেশী অতিথি প্রতিবছর এসে থাকেন। কিন্তু রাষ্ট্রীয়ভাবে যারা আমন্ত্রিত হয়ে আসেন তাদের নিঃসন্দেহে বলার মতো এবং দেয়ার মতো অনেক কথা থাকে। আমরা উল্লেখ করতে পারি ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং কিংবা নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ, জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কথা। তাঁদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল কিংবা তাঁরা নিজেদেরই প্রয়োজনে এসেছিলেন এদেশে, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অতিথি হয়ে। কিন্তু নিশা দেশাই বিসওয়ালকে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল কিনা? এ প্রশ্ন কেউ করিনি আমরা। কিন্তু উত্তরটা পেয়ে যাচ্ছি, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফের বক্তব্যে, তিনি বেশ কড়া ভাষায় (খানিকটা কূটনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূতও) তাঁর সমালোচনা করেছেন। শোনা যাচ্ছে, প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাত প্রার্থী হয়েও নিশা দেশাই তা পাননি। সুতরাং, তাঁকে যে এদেশে আমন্ত্রণ করে সরকার আনেনি, সে কথাটি আমরা স্পষ্ট বুঝতে পারছি। অতএব, আমরা ধরেই নিচ্ছি, তিনি স্বতঃপ্রণোদিত হয়েই এদেশে এসেছিলেন। এসেছিলেন নেপাল থেকে, সার্ক সম্মেলনে অতিথি হয়ে এসেছিলেন, সেখান থেকেই এখানে এসেছেন। রাষ্ট্রের সঙ্গে তাঁর কাজ থাকলে সেখানেই তাঁর কাউন্টারপার্ট আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে তিনি আলাপ সেরে নিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা না করে এদেশে এসেছেন এবং দেখা করেছেন অনেকের সঙ্গেই’।বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার খবরে জানা গেছে, মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বাসায় এক মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করা হয়। সেখানে যারা আমন্ত্রিত হয়ে গিয়েছিলেন তাদের অনেকেই আমেরিকার এদশীয় এজেন্ট। সুশাসনের জন্য নাগরিকের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার, অধিকারের সেক্রেটারি আদিলুর রহমান খান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শাহিদুজ্জামান, সাংবাদিক মাহফুজউল্লাহ, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নূর খান লিটন এবং বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস্ ফাউন্ডেশনের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান এ্যাডভোকেট এলিনা খান। বৈঠক শেষে বদিউল আলম মজুমদার নিজেই বলেছেন, ৫ জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচন নিয়ে নিশা দেশাই প্রশ্ন তুলেছেন এবং দেশে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন দরকার বলে তিনি নিশা দেশাইকে জানিয়েছেন। দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর থেকে আরও জানা গেছে নিশা দেশাইয়ের কাছে বিএনপি প্রধান খালেদা জিয়া এন্তার জিয়া নালিশ করেছেন। তিনি বর্তমান সরকারকে অবৈধ দাবি করে সবকিছুর জন্য শেখ হাসিনাকে দায়ী করেছেন এবং মধ্যবর্তী নির্বাচনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির অনুরোধ জানিয়েছেন।

পরিশেষে এই বলেই শেষ করবো আওয়ামী লীগ বিশেষ করে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকলে মার্কিন প্রশাসন বেশ অস্বস্থিবোধ করে। কেননা, যুক্তরাষ্ট্র খালেদা জিয়া বা বিএনপিকে দিয়ে দেশের স্বার্থবিরোধী যত কাজ করিয়ে নেয়া সহজ শেখ হাসিনাকে দিয়ে তা কখনো করানো সম্ভব হয় না। একই সাথে কাজ করে মুক্তিযুদ্ধে পরাজয়ের সেই পুরনো ক্ষতের বিষয়টি। তাই আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলেই কখনও গণতন্ত্র, কখনও বিভিন্ন অজুহাতে নির্বাচনের আওয়াজ তুলে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে সরাতে অপতৎপরতা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু বঙ্গবন্ধু কন্যা এসব খুব কমই পাত্তা দেন।