ক্যাটেগরিঃ প্রকৃতি-পরিবেশ

 

বাংলা বার মাসের মধ্যে পৌষ ও মাঘ মাস হলো আমাদের শীত ঋতু। এই শীত ঋতুতেই প্রথম দেশের অন্যতম ‘দৈনিক বাংলাদেশ সময়’ ঋতু ভিত্তিক বিশেষ প্র্রকাশনা ‘কলধ্বনী’ প্রকাশ করতে যাচ্ছে। যা আমাদেরকে বিপুল উদ্দীপিত করেছে। আর আমরা যারা দু’চার কলম লিখি তাদের জন্যতো এ খবরটি সত্যি সত্যি মহার্ঘ। আসছে শীতেই যেহেতু ‘কলধ্বনী’র প্রথম সংখ্যটি প্রকাশ হচ্ছে তাই একটা কিছু লিখার ইচ্ছাকে কিছুতেই দমন করতে পারলাম না। জানিনা কতটুকু লিখতে পারবো। তবুও কলম ধরেছি।

শীতের সংস্কৃতি নিয়ে বিষদ লিখতে যাওয়ার আগে সবার আগে সংস্কৃতি শব্দটির ব্যাখ্যার দাবি রাখে। তাই সর্বাগ্রেই আমি এ শব্দটির ব্যাখ্যা দিতে চাই। সংস্কৃতি শব্দটির ব্যাখ্যা বা সংজ্ঞা নিয়ে পন্ডিতদের মধ্যে মতভেদ থাকলেও এর রক্ষনশীল ব্যাখ্যাটি এ রকম: একটি জাতির দীর্ঘদিনের জীবনাচারণের ভেতর দিয়ে যে মানবিক মূল্যবোধ সুন্দর ও কল্যাণের পথে নিয়ে যায়, তা ই হলো সংস্কৃতি। বা অন্যভাবে বলা যায়, সংস্কৃতি হলো কোনো জাতি গোষ্ঠীর আত্মবিশ্বাস বা আত্মোপলব্দির এক প্রত্যয়। সে হিসাবে শীতের সংস্কৃতি বলতে শীত ঋতু বা কালকে উপলক্ষ করে আমাদের জীবনাচারণে যে পরিবর্তন সাধিত হয় সেটাই হলো গিয়ে শীতের সংস্কৃতি।

হাজার বছরের বাঙ্গালি সংস্কৃতি কৃষ্টি, ঐতিহ্য অনুযায়ী আমাদের জীবনাচরণে শীতের প্রভাব নিয়ে আলোচনাই এই নিবন্ধের প্রতিপাদ্য বিষয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ঋতু বৈচিত্র বিভিন্ন রকমের এবং ঋতুর স্থায়িত্বকালও একেক দেশে একেক রকম। শীত প্রধান দেশের ঋতু বৈচিত্র যেমন একরূপ তেমনি গ্রীষ্ম প্রধান দেশের ঋতুর পালাবদল ও স্থায়ীত্ব অন্য রকম। কিন্তু আমাদের বাংলাদেশে ঋতু বৈচিত্রের রয়েছে এক নৈসর্গিক গর্বিত ঐতিহ্য। আর নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের একটি দেশ হিসাবে আমাদের দেশের ঋতু বৈচিত্র ভিন্ন মাত্রা ও বৈভবে সম্পূর্ণ আলাদা। আবহমান কাল থেকেই আমাদের দেশে দুই মাস অন্তর ঋতুর পালাবদল হয়। গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত এই ঋতুচক্রের বৃত্তে আবর্তমান আমাদের সময়ের পরিক্রমায় একেক ঋতুতে একেক রূপ ধারণ করে আমাদের বাংলাদেশ। এই ঋতু বৈচিত্র ও বিত্ত বৈভবের মুগ্ধতায় একটি জনপ্রিয় দ্বিজেন্দ্র গীতি এ’রকম –

‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি
সকল দেশের রাণী সে যে আমার জন্মভূমি’

ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে আমাদের দেশের আবহাওয়া ও জলবায়ুতেও বিশেষ বিশেষ পরিবর্তন ঘটে। পরিবর্তন ঘটে মানুষের দৈনন্দিন জীবনাচারণে। গ্রীষ্মের তাপদাহে এবং বর্ষার অবিরাম বৃষ্টিপাতে আমাদের জীবন যেমন ওষ্টাগত করে তোলে তেমনি হেমন্তের ঝিরঝির মৃদুমন্দ্র বাতাস আমাদের মনে- প্রাণে এনে দেয় এক প্রশান্তির প্রচ্ছায়া। আর শীতের আবেশে ও কর্মচাঞ্চল্যে ভরে তোলে আমাদের জীবনধারাকে। নুতন ফসলের মৌ মৌ গন্ধে ভরে ওঠে বাংলার আকাশ বাতাস। তাই এই রূপময় বৈচিত্রের দ্যোতনা বর্ণনা করতে গিয়ে কবি জীবনানন্দ দাশ ‘রূপসী বাংলা’ বলে বাংলাদেশের প্রশস্তি গেয়েছেন-

বাংলার রূপ আমি দেখিয়াছি, তাই পৃথিবীর রূপ

খুঁজিতে যাইনা আর… অথবা
আবার আসিব ফিরে ধানসিড়িটির তীরে এই বাংলায়
হয়তো মানুষ নয় হয়তো বা শঙ্খচিল শালিকের বেশে;…

আর বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলাদেশের রূপ সৌন্দর্যে বিমোহিত হয়ে রচনা করেছেন তাঁর অনেক বিখ্যাত সাহিত্যকর্ম। তাঁর গানের সুরে সুরে বেজে ওঠেছে বাংলা ও বাঙ্গালির প্রাণের সুর। তাঁর কালজয়ী ভালোবাসার আবেগমথিত গান-

‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবসি
চিরদিন তোমার আকাশ তোমার বাতাস
আমার প্রাণে বাজায় বাঁশি’…যা আজ আমাদের জাতীয় সঙ্গীত।

তেমনি ভাবে আমাদের বিদ্রোহী ও জাতীয় কবি কাজি নজরুল ইসলাম তো বাংলাদেশের নদ-নদী, পাহাড় অরণ্যের প্রাকৃতিক শোভায় বিমুগ্ধ হয়ে বিশ্ববাসীকে আমন্ত্রনই জানিয়েছেন এভাবেইÑ

‘আমার শ্যামলা বরন বাংলা ময়ের
রূপ দেখে যা আয়রে আয়-
গিরি দারী বনে মাঠে প্রান্তরে রূপ ছাপিয়ে যায়’

শীত ঋতু বাঙ্গালির জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই বিশেষ প্রভার বিস্তার করে। এর আবেদন চিরন্তন। আমাদের বিভিন্ন সাহিত্য কর্মে বসন্তকে ঋতুরাজ বসন্ত হিসাবে আখ্যায়িত করলেও শীতের একটা অংশ জুড়েই যে বিরাজ থাকে শীতের আবহাওয়া তা হয়তো আমাদের অলক্ষ্যেই চলে যায়। শীতের প্রচন্ড দাপট কখনো কখনো ক্ষণিকের জন্য আমাদের জীবনকে আড়ষ্ট করে তোললেও বাড়িয়ে দেয় মনের সজিবতা। ভোরের শিশিরে স্পর্শে যেমন আমাদের দিন শুরু হয়, শেষ হয় আবার শিশিরের স্পর্শেই। আগেই বলেছি শীত বাঙ্গালি জীবনে যে বিশেষ প্রভাব ফেলে সে কথা। যারা কিছুটা বেশী শীতকাতুরে তাদের কাছে না হলেও অধিকাংশ মানুষেরই প্রিয় ঋতু হলো শীত।

এই শীত ঋতুতেই বাংলাদেশে নবান্নের উৎসব শেষে চলে নানাবিদ উৎসবাদির আয়োজন। কার্তিকের মরা মঙ্গাকে অতিক্রম করে কৃষকের গোলা ভরে ওঠে ধানে ধানে। শুরু হয় রবিশস্যের নুতন আবাদ। এর ফাঁকে ফাঁকেই চলে সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক নানা উৎসবের আয়োজন। বর্তমান তথ্য প্রযুক্তি ও টিভি চ্যানেল সংস্কৃতির যুগে আগের মতো না হলেও আমাদের বিণোদনের একটি অন্যতম অনুসঙ্গ হিসাবে যাত্রা ও পালা গানের আবেদন একেবারেই ফুরিয়ে যায়নি। তা আমরা টের পাই শীত এলেই। শীত এলেই যাত্রা ও পালা গানের শিল্পিরা বেড়িয়ে পড়ে গ্রামের পথে প্রান্তরে, এমন কি অনেক শহর বন্দরেও যাত্রা উৎসবের শুরু হয়। জমানো শীতে চাদর মুড়ি দিয়ে রাত জেগে যাত্রাশিল্পিদের অভিনয়ের আনন্দ বেদনা, সুখ দুঃখের সাথে একাকার হয়ে যাওয়ার অনুভুতি যে কতটা আনন্দের তা যাত্রা শিল্পের সাথে জড়িত অভিনেতা, অভিনেত্রী, কলাকুশলী এবং দর্শকশ্রোতা মাত্রই জানে।

এই শীতে সূফি ও বাউল ভাব দর্শনে বিশ্বাসী জনগোষ্ঠী মেতে ওঠে নানাবিদ আচার অনুষ্ঠানে। বিভিন্ন মরমী সাধকদের মাজার ও খানকাকে ঘিরে শুরু হয় ওরস ও মেলার আয়োজন। এই সব অনুষ্ঠানাদীকে ঘিরেই বিকাশ হয় গ্রামীণ সংস্কৃতির। বিণোদনের পাশাপাশি ধর্মচর্চার সুযোগ পায় জাতি ধর্ম বর্ণ ও বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ। সাথে সাথে শরিয়তের আধ্যাতিœকতায় বিশ্বাসী মুসলমানেরা ওয়াজ মাহফিল ও তফসিরুল কোরআনের মাধ্যমে নিজেদের বিশ্বাস, ইমান ও আকিদার খুঁত গুলোকে ঝালাই করে নেয়ার সুযোগ পায়।

ফসল ওঠানো শেষ করে গায়ের বধূরা বাবার বাড়িতে নাইয়র আসে। মেয়ে ও মেয়েজামাই এলেই চলে ঘরে ঘরে পিঠা পুলির আয়োজন। এই সময়টাতে মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা অনেকটাই সাবলীল থাকার কারণে গ্রামে গ্রামে চলে বিয়ে শাদী সুন্নতে খত্নার আয়োজন। এসবের মাধ্যমে বাংলার গ্রামীণ সংস্কৃতিতে যোগ হয় নুতন মাত্রা। হাটবাজার গুলো ভরে ওঠে সবুজ সতেজ শাকশব্জিতে। বর্ষার পানি সরে গিয়ে জেগে ওঠে দেশের নদী নালা হাওড় বাওড়। তখন মাছের সরবরাহ বেড়ে কমে আসে মাছের অগ্নিমূল্য।

শীত ঋতুতে আমাদের প্রকৃতি পরিবেশ প্রতিবেশে কিছুটা রুক্ষ্মতার ছোঁয়া লাগে। আবহাওয়ায় জলীয়বাষ্পের পরিমান কমে গিয়ে এ রুক্ষ্মতার সৃষ্টি হয়। বৃক্ষরাজী পাতা ঝরিয়ে কেমন ন্যাড়া ন্যাড়া হয়ে ওঠে। রসের অভাবে যেখানে গাছ-পালা হরিৎ বর্ণ ধারণ করে, সেখানে খেঁজুরের রসে ভরে ওঠে গাছিদের রসের হাড়ি। কী বিশাল বৈপরিত্ব যেন ভাবাই যায় না। আর খেঁজুর রসে ডুবিয়ে ভাঁপা পিঠা খাওয়ার মজাটাই যেন হয়ে ওঠে অন্য রকম।

শীতকালে আমাদের পোশাক সংস্কৃতিতেও আসে অনেক পরিবর্তন। শীতের তীব্রতা থেকে বাঁচার জন্য মানুষজন তখন পরিধান করে গরম পোশাক। ছেলে বুড়ো সবায় গরম কাপড়ে গা ঢেকে শীত থেকে রক্ষা পাওয়ার চেষ্টা করে। তবে শহরে কি গ্রামে দরীদ্র মানুষের জীবনে শীত আসে অভিশাপ হয়ে। শীত নিবারনের জন্য থাকেনা তাদের তেমন গরম পোশাক। লোকালয়ের ভাঙ্গাঘরে এবং শহরের বস্তিতে শীতের তীব্রতায় কুঁকড়ে থাকে হতদরীদ্র মানুষ। খড়কুটো বা কাগজ কুড়িয়ে আগুন জ্বালিয়ে দলবদ্ধ হয়ে তারা শীত নিবারনের চেষ্টা করে থাকে। হতদরীদ্রের এ কষ্ট উপলব্দি করেই হয়তো কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য লিখেছিলেন এই মর্মস্পর্শী কবিতাটি-

হে সূর্য, তুমি তো জানো
আমাদের গরম কাপড়ের কত অভাব
সারারাত খড়কুটা জ্বালিয়ে
এক টুকরো কাপড়ে কান ঢেকে
কত কষ্টে আমরা শীত আটকাই।

এই শীতের দাপট ও কিছুটা রুক্ষ্মতার কথা বাদ দিলে শীত আমাদের সবার কাছেই প্রিয় ঋতু। এই ঋতুতে আমরা নিজেদের সাজাই অন্যরূপে। এই সময়টাতে গোলাপ, বেলী, গাদা, চন্দ্রমল্লিকা, বকুল, চামিলীর সৌরভ ও সৌন্দর্য ফুটে ওঠে শীতের ছোঁয়ায়। দিগন্ত বি¯তৃত সবুজ মাঠ তখন ভরে ওঠে সর্ষে ফুলের হলুদ আভায়। মনে হয় সারা মাঠে বুঝি হলুদ গালিচা পাতা। এক সময় পাতা ঝরা ন্যাড়া গাছ জেগে ওঠে নুতন প্রাণের সঞ্জিবনে। তারপর শীত পেড়িয়ে হাজির হয় ঋতুরাজ বসন্ত।