ক্যাটেগরিঃ নাগরিক মত-অমত

সেই সুপ্রাচীণকাল থেকেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও জাতিতে জাতিতে প্রথাগত ও প্রগতিবাদী, মুক্তধর্মবিশ্বাসী ও ধর্মবিশ্বাসীরা একে অপরের সাথে রক্তারক্তি ও হানাহানিতে লিপ্ত হচ্ছে। তাদের এ বিশ্বাস কখনও কখনও ধর্মযুদ্ধ বা জেহাদ ঘোষণা করে ধর্মভীরু মানুষকে তাদের দলে টানছেন। কাছে টানছেন বা দলে ভিরাচ্ছেন কথাটা বললে যেন কম বলা হবে বরং তাদের মধ্যে ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টি করে ধর্মভীরুদের বলিরপাঠা বানাচ্ছেন। ফলে, সেসব ধর্মভীরু মানুষ সেই প্রথাগত ধর্মবিশ্বাসীদের প্রচারনায় বিভ্রান্ত হয়ে অকাতরে প্রাণ দিচ্ছেন, এসব প্রাণ বিসর্জন কোন কালে কোন ধর্মই সমর্থন করেনি। পক্ষান্তরে বিশ্বে প্রগতিবাদী মুক্তচিন্তার মানুষ মাত্রেই বিশ্বাস করে মানুষের বিবর্তনের শুরু থেকে তাদের মধ্যে কোন ধর্মবিশ্বাস ছিলনা। আদিমযুগের গুহাবাসীদের জীবনযাত্রা ও জীবন ধারনের কৌশল দেখে বোঝা যায় তখন তাদের মধ্যে কোন ধর্মবিশ্বাসই কাজ করত না। এভাবে কেটে গেছে অনেক যুগ। ধীরে ধীরে তারা সৃষ্টি জগতের বিশাল বিশাল সৃষ্টি দেখে যেমন সুবিশাল পাড়ার, সাগর, বৃক্ষ, চন্দ্র-সূর্য এমন কি বিশাল প্রস্তরখন্ডকেও নিজেদের সৃষ্টির আধার বলে মনে করতো। এভাবেও কেটে গেছে আরো অনেক যুগ। এরপর প্রস্তর যুগে মানুষ পাথরে পাথরে ঘর্ষণ করে আগুন প্রজ্জলনের মাধ্যমে আগুনের আবিস্কার ও ব্যবহার শেখার মাধ্যমে প্রস্তরযুগ সভ্যতার উন্মেষ ঘটান। পাথর কেটে অস্ত্র বানানো শেখার পর পশু ও পাখি শিকার করে আগুনে ঝলসে খাওয়ার বিষয়টিও রপ্ত করে।

আলোচিত উপরোক্ত বিষয়গুলো নিয়ে প্রথাবাদী ও যুক্তিবাদী, ধর্মবিশ্বাস ও মুক্তধর্মে বিশ্বাসীদের মধ্যে অনেক সীমাবদ্ধতা ও পরস্পরবিরোধীতার কারণে সৃষ্টি হয়েছে বিরোধ, হানাহানী, মারামারি, যুদ্ধবিগ্রহ। কেননা যারা প্রথাবাদী তারা অক্ষরে অক্ষরে প্রথাগত জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ মেনে চলেছে এবং তা করছে যুক্তিবাদকে অগ্রাহ্য বা অস্বীকার করেই। এ বিষয়ে আরো আলোচনায় যাওয়ার আগে ধর্মবিশ্বাসের মতো একটি স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে স্পষ্ট ও বিশ্লেষণাত্বক কিছু না বলতে চাইলেও একটি কথা বলা জরুরী আর সে জরুরী কথাটা হলো প্রগতিবাদীবাদীরা যুক্তিতর্কের মাধ্যমে তা গ্রহণ বা অগ্রাহ্য করলেও উগ্র ধর্মবাদীরা তা কিছুতেই মানতে নারাজ। তারা সব যুক্তি ব্যাখ্যা বিশ্লেষণকে অস্বীকারের মাধ্যমে স্পষ্ট কথা বিবৃতকারীকে নাস্তিক, মুরতাদ ঘোষণা করে তার বা তাদের শিরñেদের রায় দিয়ে মাথার মূল্য ঘোষণার মাধ্যমে ধর্মীয় উন্মাদনার সৃষ্টি করতেও দ্বিধা বোধ করে না। পক্ষান্তরে প্রগতিবাদী বা মুক্তধর্মবিশ্বাসীরা সকল প্রকার কুপমন্ডুকতা, কুসংস্কার ও যুক্তিহীনতাকে মানুষের পশ্চাতপদতা বলেই গণ্য করে থাকে। তারা যুক্তি দিয়ে বিষয়টিকে বিশ্লেষণের মাধ্যমে তুলে ধরার চেষ্টা করেন। তারা সব ধরনের সামাজিক অনুশাসন মেনেও কুসংস্কার ও প্রতিক্রিয়াশীলতাকে প্রশ্রয় দেন না। এ ক্ষেত্রে যুক্তিবাদীরা বিজ্ঞানের উৎকর্ষতার প্রতি আস্থাশীল। আর প্রথাগত ধর্মবাদীদের একনিষ্ঠ বিশ্বাস শুধু ধর্মগ্রন্থের ওপর। সৃষ্টিবাদ ও সংজ্ঞাবাদনিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে তুমুল বিতর্ক শুধু বিতর্কই নয় এ মতবিরোধ নিয়ে মারামারি কাটাকাটির অনেক নজির ইসলামের ইতিহাসে সন্নিবেশিত আছে। ডারউইনের মতবাদ অনুযায়ী বিবর্তনের বিভিন্ন ধাপে মানুষ সৃষ্টি হয়। সৃষ্টির শুরু থেকে মানুষ সৃষ্টি পর্যন্ত কয়েক লক্ষ বছর লেগে যায়। মানুষ সৃষ্টির মধ্য দিয়ে শুরু হয় বিবর্তনের নতুন অধ্যায়।

বিশ্বখ্যিাত বিজ্ঞানী অইজ্যাক্ নিউটন বিশ্বতত্ত্বের আবিষ্কারের পর থেকে প্রকৃতি ও বিশ্বব্রক্ষ্মান্ড নিয়ে মানুষের মাঝে আলোড়নের সৃষ্টি হয় একই সাথে তা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এর ফলে মধ্যাকর্ষণের সূত্র অনুযায়ী মানুষ যে সত্যটি জানলো তা হলো ‘সমস্ত গ্রহগুলো সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে। কিন্তু তখনও ধর্মবাদী নেতারা এ সূত্রকে অগ্রাহ্য করে প্রচার করতে থাকেন যে, গ্রহ-নক্ষত্র সবই স্রষ্টার সৃষ্টি তিনি যে ভাবে তাদেরকে পরিচালিত করেন সেইভাবেই তারা চলেন। তাদেরকে যে ভাবে ঘুতে বলা হয়েছে সেভাবেই তারা ঘুরছে। এর পর আইনস্টাইনের আবির্ভাবের পর মধ্যাকর্ষণের সূত্রটি বিভিন্নভাবে মানুষের বিভ্রান্তি চালানোর চেষ্টা করা হয়। এই কারণেই বিজ্ঞান ও ধর্ম এমন দুইটি বিষয় যার মধ্যে বিপুল বৈপরিত্ব লক্ষণীয়। ধর্মগ্রন্থ যা বলে বিজ্ঞান তা গ্রহণ করতে পারেনি। সৃষ্টিকর্তা হিসেবে ধর্ম বলছে সৃষ্টিকর্তার কথা আর বিজ্ঞান বলছে ইভাল্যুশনের কথা। বিজ্ঞান যুক্তি-প্রমাণসহ ব্যাংখ্যা বিশ্লেষণ করেছে সব কিছু। বিজ্ঞান যুক্তি ও বিশ্লেষণের প্রমাণ করেছে স্রষ্টা যদি নিজে নিজেই সৃষ্টি হয়ে থাকেন তা হলে সৃষ্টির সব কিছুই কেন নিজে নিজে সৃষ্টি হতে পারবে না। বিজ্ঞানের এ ব্যাখ্যা ধর্মবিশ্বাসীরা কিছুতেই মানতে চাচ্ছে না। আবার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিভিন্ন আবিস্কারকে অস্বীকার করতে পারছেন না।

কেননা আজকের যুগে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহার করেই ধর্ম প্রচারনা একটি বিশেষ রূপ পরিগ্রহ করেছে। তবে ধর্মবাদীরা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে সরাসরি অস্বীকার না করে বলছে, পৃথিবীতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত যত আবিস্কার এর মূলেই রয়েছে ধর্মগ্রন্থ। কিন্তু তারা তাদের এ বক্তব্যের পক্ষে সত্যসিদ্ধ কোন প্রমাণ দেখাতে পারে না। তাদের কাছে তাদের বক্তব্যের সপক্ষে যুক্তি দাবি করলে তারা বলে ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করা ধর্মগন্থে নিষিদ্ধ আছে, এই বলেই বিজ্ঞানের প্রযুক্তি ও আবিস্কারকে ব্যবহার করেই ‘গায়ে মানে না আপনিই মোড়ল’এর মতো উগ্র ধর্মীয়বাদ, মৌলবাদ ও জঙ্গিবাদ সৃষ্টির মাধ্যমে সারা বিশ্বে ধর্মীয় উন্মাদনার বিষবাষ্প ছড়িয়ে দিচ্ছে। তারা স্রষ্টার শাসন কায়েমের স্বপ্ন দেখে। এ ক্ষেত্রে কোন ধর্মই পিছিয়ে না নাকলেও শান্তির ধর্ম ইসলামে উগ্র ধর্মীয় মৌলবাদী ও জঙ্গিবাদীরা অনেক অনেক এগিয়ে। যতই যুক্তি দিয়ে তাদের বোঝানো হোক না তারা তাদের পুরনো ধ্যান-ধারণা, প্রথা আকড়ে ধরেই থাকবে। অতিমাত্রায় ধর্ম বিশ্বাসী বা উগ্র মৌলবাদীরা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সব আবিষ্কারে ব্যবহার করেই কিন্তু এর বিরুদ্ধে কথা বলে ধর্মভীরু সাধারণ মানুষের সাথে প্রতারণা করে সারা বিশ্বে জঙ্গিবাদ, মৌলবাদ ও উগ্র সাম্প্রদায়িকতার সৃষ্টি করে চলেছে। যা বিশ্বেও শান্তিপ্রিয় মানুষ হুমকী বলেই মনে করছে। এসব মৌলবাদীরা মানুষকে বিভ্রান্ত করতেই নিজেদের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক অজ্ঞতা যাতে প্রকাশ না পায় সে জন্য তাদের বা মাদ্রাসা শিক্ষার পাঠ্যক্রমে বিজ্ঞানকে অবজ্ঞা করে ধর্মকে সর্বোচ্চ স্থান দেয়া হয়েছে। তারা এটা করে অন্ধ ধর্মবিশ্বাস প্রথা কুসংস্কার ধারণ করার কারণেই। এসব মতবাদীদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে শুধু মাত্র প্রার্থনার মাধ্যমে কাউকে বাঁচানো যাবে না। রোধ করা যাবেনা ঝড় ঝঞ্জা, বন্যা জলোচ্ছাস ভূমিকম্প বা সুনামির মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয়কে।

বিজ্ঞানীদের অভিসন্ধিজাত ধারণাটি হচ্ছে জগতের সব কিছুই এমনভাবে সৃষ্টি হয়েছে যাতে আমরা জগতে বেঁচে থাকার উপায় পেতে পারি। তবে জগত যদি অন্য রকম হতো তবে আমরা এখানে বেঁচে থাকার উপায় পেতাম না। কিন্তু ডারউইনের সময় থেকেই মানুষ প্রথম জানতে পারে জগতের সব জীব-জন্তু-সৃষ্টি তাদের পরিবেশের সঙ্গে নিজেদেরকে অভিযোজিত করে নেয়। যেখানে তারা নিজেদেরকে মানিয়ে নিতে এবং পরিবেশটির সাথে মানানসই হয়ে ওঠে। এই বিষয়টিই হলো অভিযোজনের ভিত্তি। যারা বিজ্ঞানের সাধারণ সূত্রগুলোকে গ্রহণ করেছেন তারা অবশ্যই বিশ্বাস করেন যে, মানুষ জীব-জন্তু ও সৃষ্টির এই গ্রহজীবন কোন অনন্ত জীবন নয় একদিন এ জীবন শেষ হয়ে যাবে। বিজ্ঞানীরা সৌর-ব্যবস্থার ক্ষয়জাত বিষয়টি পর্যালোচনার মাধ্যমে নিশ্চিত হয়েই বলেছেন, সৌর-ব্যবস্থার ক্ষয়জাতের একটি নিদ্দিষ্ট পর্যায়ে তা ধ্বংস হয়ে যাবে। এ বিষয়গুলো চিরন্তন সত্য হলেও পৃথিবীর সব ধর্মবাদীরা এ নিয়ে বিভিন্ন ব্যাখ্যা বিশ্লেষনের মাধ্যমে ধর্মবিশ্বাসীদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি করে রেখেছেন এবং তারা তা করছেন নিজেদের অস্তিত্ব ও স্বার্থ রক্ষার কারণে।

আমরা এখন সবাই কম বেশি জানি যে মানুষের পৃথিবীতে আগমনের প্রথম পর্যায়ে নর-নারীর মধ্যে মুক্তসম্পর্ক বজায় ছিল। বিয়ে নামক সামাজিক প্রতিষ্ঠানের জন্মই হয়নি তখন। তখন নর-নারীরা মুক্তযৌনতার মাধ্যমে তাদের জৈবিক চাহিদা পূরণ করতো। বর্তমানেও প্রতিটি ইতর প্রাণীর মধ্যে যেমন অবাধ ও মুক্তযৌনতার বিষয়টি বহাল রয়েছে তেমনি আদিমকালে মানুষের মধ্যেও তার প্রচলন ছিল। এরপর সময়ের বিবর্তনের সাথে সাথে মানুষের মধ্যে সভ্যতার বিকাশ ঘটতে থাকে। বিশ্বভ্রম্মান্ড সৃষ্টির শুরু থেকে যে বিবর্তন শুরু হয়েছে তা আজ পর্যন্ত অব্যাহত আছে। মানুষের বিবর্তনের শুরুতে উলঙ্গই ছিল। ধীরে ধীরে তারা নিজেদের লজ্জাস্থান ঢাকতে শিখে, নিজেদের মধ্যে ভাববিনিময়ের জন্য বাগযন্ত্রের ব্যবহারের মাধ্যমে শিখে ভাষার ব্যবহার। সভ্যতার এক পর্যায়ে এসে সমাজবদ্ধতা ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সৃষ্টি হয়। এর মাধ্যমেই মানুষের মধ্যে শৃঙ্খলাবোধের সৃষ্টি হয়। বিভিন্ন প্রথা ও সংস্কার চালু হয় মানুষের মধ্যে। এ প্রথা বা সংস্কারের একটি সামাজিক সংগঠন হলো বিয়ে। মানব সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকে বিবর্তনের বিভিন্ন পর্যায়ে মানুষের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে মতপ্রার্থক্য বিভাজন ও বিভক্তির কারণেই ধর্মের সৃষ্টি।

যা হোক সবচেয়ে আনন্দের কথা ধর্ম নিয়ে মানুষে মানুষে মতপার্থক্য ও বিরোধ থাকলেও বিজ্ঞানের আবিষ্কার ও এর ব্যবহার নিয়ে মানুষের মধ্যে কোন বিরোধ বা মতপার্থক্য নেই। তবে কখনো কখনো ধর্মব্যত্তারা চিকিৎসা বিজ্ঞানসহ বিজ্ঞানের বিভিন্ন নিয়ে আড়ালে আবডারে নিজেদের অনুসারিদের মধ্যে বিরূপতা প্রকাশ করলেও নিজের বা পরিবারের সদস্যদের চরম বিপদের কালে তাদেরকে কিন্তু বিজ্ঞানের কাছেই মাথা নত করতে হয়। সেটা চিকিৎসা বিজ্ঞানসহ বিজ্ঞানের সব আবিস্কারের বেলায়ই প্রযোজ্য।

শেষ কথা এই যে, মানুষ জ্ঞান, মেধা, শিক্ষা ও দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে বিজ্ঞান ও যুক্তবাদকেই গ্রহণ করার পাশাপাশি সুস্থ্য ধর্মচর্চার মাধ্যমে নিজেদের শাণিত করে এগিয়ে যাচ্ছে সামনের দিকে। আমরা চাই আমাদের সুন্দর গ্রহ এই পৃথিবী ও এর সৃষ্টিজগত আরো শান্তিময় হয়ে ওঠুক।