ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

 

প্রিয় পাঠক! শরণার্থী নিয়ে বিশদ আলোচনায় যাওয়ার আগে পাঠকদের জন্য এই শব্দটির কিছুটা বিশ্লেষণের প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি। শরণার্থী শব্দটির ইংরেজী প্রতিশব্দ Refugee. (Refugee- mens a person or a group of comiunity apply for a shelter in a foreign country to pursuit or danger or trouble of their own country) যার বাংলা আভিধানিক অর্থ আশ্রয়প্রার্থী বা আশ্রয়ের জন্য আবেদন করে এমন। অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী, সম্প্রদায়, বা জাতিগোষ্ঠী যদি অত্যাচার, নির্যাতন, নিরাপত্তাহীনতা, দুঃশাসন বা দখলদারিত্বের কারণে বিপদগ্রস্ত হয়ে নিজ দেশ ছেড়ে অন্য কোন দেশে সাময়িক আশ্রয় প্রার্থনা করে তখন তাকে শরণার্থী (refugee ) বা রিফিউজি বলে। শরণার্থী বা উদ্বাস্তু (ইংরেজি: Refugee) একজন ব্যক্তি যিনি নিজ ভূমি ছেড়ে অথবা আশ্রয়ের সন্ধানে অন্য দেশে অস্থায়ীভাবে অবস্থান করেন।

জাতিগত সহিংসতা, ধর্মীয় উগ্রতা, জাতীয়তাবোধ, রাজনৈতিক আদর্শগত কারণে সমাজবদ্ধ জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তাহীনতায় আক্রান্তই এর প্রধান কারণ। যিনি শরণার্থী বা উদ্বাস্তুরূপে স্থানান্তরিত হন, তিনি আশ্রয়প্রার্থী হিসেবে পরিচিত হন। আশ্রয়প্রার্থী ব্যক্তির স্বপক্ষে তার দাবীগুলোকে রাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকৃত হতে হবে। ১৯৫১ সালে জাতিসংঘ কর্তৃক শরণার্থীদের মর্যাদা বিষয়ক সম্মেলনে অনুচ্ছেদ ১এ-তে সংক্ষিপ্ত আকারে শরণার্থীর সংজ্ঞা তুলে ধরে। সে সংজ্ঞায় বলা হয়েছে: একজন ব্যক্তি যদি গভীরভাবে উপলদ্ধি করেন ও দেখতে পান যে, তিনি জাতিগত সহিংসতা, ধর্মীয় উন্মাদনা, জাতীয়তাবোধ, রাজনৈতিক আদর্শ, সমাজবদ্ধ জনগোষ্ঠীর সদস্য হওয়ায় ঐ দেশের নাগরিকের অধিকার থেকে দূরে সরানো হচ্ছে, ব্যাপক ভয়-ভীতিকর পরিবেশ বিদ্যমান, রাষ্ট্র কর্তৃক পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে; তখনই তিনি শরণার্থী হিসেবে বিবেচিত হন। ১৯৬৭ সালের সম্মেলনের খসড়া দলিলে উদ্বাস্তুর সংজ্ঞাকে বিস্তৃত করা হয়। আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকায় অনুষ্ঠিত আঞ্চলিক সম্মেলনে যুদ্ধ এবং অন্যান্য সহিংসতায় আক্রান্ত ব্যক্তি কর্তৃক নিজ দেশত্যাগ করাকেও অন্তর্ভূক্ত করা হয়। এ সংজ্ঞায় শরণার্থীকে প্রায়শঃই ভাসমান ব্যক্তিরূপে অন্তর্ভূক্ত করা হয়। সম্মেলনে গৃহীত সংজ্ঞার বাইরে থেকে যদি যুদ্ধের কারণে নির্যাতন-নিপীড়নে আক্রান্ত না হয়েও মাতৃভূমি পরিত্যাগ করেন অথবা, জোরপূর্বক নিজ ভূমি থেকে বিতাড়িত হন-তাহলে তারা শরণার্থী হিসেবে বিবেচিত হবেন।
১৮৮৯ সালের মন্টেভিডিও চুক্তি, ১৯১১ সালের কারাকাস চুক্তি, ১৯২৮ সালের হাবানা কনভেনশন, ১৯৩৩ সালের রাজনৈতিক আশ্রয় সংক্রান্ত মন্টেভিডিও কনভেনশন, ১৯৫৪ সালের কুটনৈতিক আশ্রয়দান সংক্রান্ত কনভেনশন অনযায়ী প্রত্যেক সদস্য দেশ কর্তৃক এই কনভেনশন মেনে চলতে অঙ্গিকার করা হয়েছে। সে কনভেশন অনুযায়ী রোহিঙ্গ শরণার্থীদের প্রথম বাংলাদেশে আশ্রয়দানের ব্যবস্থা করে। যেহেতু ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্দে প্রায় ১ কোটি মানুষ আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে শরনার্থী হিসেবে আশ্রয়গ্রহণ করেছিল ভারতও সেই কনভেনশন মেনে উদার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বাংলাদেশের পাকিস্তানী হায়েনাদের অত্যার-নির্যাতনের হাত থেকে আত্মরক্ষার জন্যে প্রাণের ভয়ে ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিল। তাই শুরু থেকেই রোহিঙ্গা শরনার্থীদের ব্যপারে বাংলাদেশ সরকার ও এদেশের জনগণ সহানুভূতিশীল ছিল। কিন্তু বর্তমানে সরকারী হিসেব মতেই ৫ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে বসবাস করছে। এ হিসাবের বাইরেও হাজার হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশী মুসলমান পরিচয়ে বসবাস করে আসছে। তোদের চেহারার সাথে যেহেতু বার্মার মুসলমানদের চেহারার অনেকটাই মিল রয়েছে সে হিসাবে বাংলাদেশী পরিচয়ে থাকতে তাদের কোন সমস্যা হচ্ছে না। আর এদের প্রশ্রয় দিয়ে অঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হচ্ছে এক শ্রেণীর গডফাদার। এর ফলে রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যা বালাদেশের বিষফোঁড়া হয়ে দেখো দিয়েছে। মায়ানমার সরকার শরণার্থীদের ফিরিয়ে নেয়ার ব্যাপারে বাংলাদেশের সাথে বার বার অঙ্গিকার করা সত্বেও সে দেশের সরকার সে অঙ্গিকার রক্ষা করতেছে না।

উইকিডিয়ার এ সংক্রান্ত তথ্য থেকে জানা যায় ‘রোহিঙ্গা আদিবাসী জনগোষ্ঠী পশ্চিম মায়ানমারের আরাকান রাজ্যের নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী। এরা ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত। মায়ানমারের আকিয়াব, রেথেডাং, বুথিডাং মংডু, কিয়ক্টাও, মাম্ব্রা, পাত্তরকিল্লা এলাকায় এদের বাস। বর্তমান ২০১২ সাল পর্যন্ত সেখানে, প্রায় ৮,০০,০০০ রোহিঙ্গা মায়ানমারে বসবাস করছিল। যার বর্তমান সংখ্যা তার চেয়ে দ্বিগুণ মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সরকারী হিসাব মতে ৫ লক্ষের অধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে বর্তমানে বসবাস করছে। এ হিসাবের বাইরেও অনেক রোহিঙ্গা বিয়ে-শাদীর মা্যেমে বাংলাদেশীদের সাথে মিশে আছে। বিভিন্ন সময় বার্মা সরকার ও সেদেশের রাখাইন সম্প্রদায়ের নির্যাতনের কারণে দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হয় মুসলম রোহিঙ্গারা। জাতিসংঘের তথ্যমতে, রোহিঙ্গারা বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে নির্যাতিত জনগোষ্ঠী। বর্তমান মিয়ানমারের রোহিং (আরাকানের পুরনো নাম) এলাকায় এ জনগোষ্ঠীর বসবাস। ইতিহাস ঐতিহাসিকদের মতে রাখাইন প্রদেশের উত্তর অংশে বাঙালি, পার্সিয়ান, তুর্কি, মোগল, আরবীয় ও পাঠানরা বঙ্গোপসাগরের উপকূল বরাবর বসতি স্থাপন করেছে। তাদের কথ্য ভাষায় চট্টগ্রামের স্থানীয় উচ্চারণের প্রভাব রয়েছে। উর্দু, হিন্দি, আরবি শব্দও রয়েছে। রাখাইনে দুটি সম্প্রদায়ের বসবাস ‘মগ’ ও ‘রোহিঙ্গা’। মগরা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। মগের মুল্লুক কথাটি বাংলাদেশে পরিচিত। দস্যুবৃত্তির কারণেই এমন নাম হয়েছে ‘মগ’দের। ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, ১৪৩০ থেকে ১৭৮৪ সাল পর্যন্ত ২২ হাজার বর্গমাইল আয়তনের রোহিঙ্গা স্বাধীন রাজ্য ছিল। মিয়ানমারের রাজা বোদাওফায়া এ রাজ্য দখল করার পর বৌদ্ধ আধিপত্য শুরু হয়।

এছাড়াও বিভিন্ন তথ্যসূত্রে জানা যায় ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি মিয়ানমার স্বাধীনতা অর্জন করে এবং বহুদলীয় গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু হয়। সে সময়ে পার্লামেন্টে রোহিঙ্গাদের প্রতিনিধিত্ব ছিল। এ জনগোষ্ঠীর কয়েকজন পদস্থ সরকারি দায়িত্বও পালন করেন। কিন্তু ১৯৬২ সালে জেনারেল নে উইন সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করলে মিয়ানমারের যাত্রাপথ ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হতে শুরু করে। রোহিঙ্গাদের জন্য শুরু হয় দুর্ভোগের নতুন অধ্যায়। সামরিক জান্তা তাদের বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত করে। তাদের নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়। ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। ধর্মীয়ভাবেও অত্যাচার করা হতে থাকে। তাদের ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানে বাধা দেওয়া হয়। রোহিঙ্গাদের ওপর হত্যা-ধর্ষণ হয়ে পড়ে নিয়মিত ঘটনা। তাদের সম্পত্তি জবরদখল করে রনয়া হয়। জোর করে কেড়ে নেওয়া হয় এবং বাধ্যতামূলক শ্রমে নিয়োজিত করে তাদের ওপর কৃতদাসের জীবন চাপিয়ে দেয়া হয়। তাই শিক্ষা তাদের শিক্ষা-স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ থেকেও দিনে দিনে রোহিঙ্গারা বঞ্চিক হতে থাকে। তাদের বিয়ে করার অনুমতি নেই। সন্তান হলে নিবন্ধন নেই। জাতিগত পরিচয় প্রকাশ করতে দেওয়া হয় না। সংখ্যা যাতে না বাড়ে, সে জন্য আরোপিত হয় একের পর এক বিধিনিষেধ। বিশ্ববাসীর সমূহ উদ্বেগ উপেক্ষা করে মিয়ানমার সরকার একের পর এক জাতিবিদ্বেষী ভয়ঙ্কর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন অব্যাহত রেখেছে। সম্প্রতি রাখাইন অ্যাকশন প্লান নামের বিতর্কিত পরিকল্পনার অন্তরালে রাখাইন রাজ্যে বসবাসরত রোহিঙ্গা মুসলমান সংখ্যালঘুদের দীর্ঘমেয়াদে পৈতৃক ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে দেশটি। এরই ধারাবাহিকতায় আদমশুমারিতে গণনা থেকে বাদ দেয়ার পর এবার তাদের বাঙালি হিসেবে জোরপূর্বক নিবন্ধনের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে দেশটি যেমন তার অমানবিক রাষ্ট্রীয় চরিত্রটি খোলাসা করল, তেমনি বাংলাদেশের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টির মাধ্যম চরম অপ্রতিবেশীসুলভ আচরণের বহিঃপ্রকাশ ঘটাল।

এক সময় ১৮৮৯ সালের মন্টেভিডিও চুক্তি, ১৯১১ সালের কারাকাস চুক্তি, ১৯২৮ সালের হাবানা কনভেনশন, ১৯৩৩ সালের রাজনৈতিক আশ্রয় সংক্রান্ত মন্টেভিডিও কনভেনশন, ১৯৫৪ সালের কুটনৈতিক আশ্রয়দান সংক্রান্ত কনভেনশন অনযায়ী বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয় প্রদান করলেও এদেরকে আর ফিরিয়ে নিচ্ছে না মিয়ানমার সরকার। তাই রোহিঙ্গা শরনার্থী সমস্যাটি এখন বিপুল জনঅধ্যূষিত বাংলাদেশের জন্য ‘গোদের ওপর বিষ ফোঁড়া’র বিশাল সমস্যা হয়ে দেখ দিয়েছে। তার পরও প্রতিনিয়তই মিয়ানমার থেকে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ অব্যাহত রয়েছে। শরণার্থী শিবির ব্যবহৃত হচ্ছে ট্রানজিট ক্যাম্পে কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং ও টেকনাফের নয়াপাড়া, লেদা শরণার্থী শিবিরকে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ার ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করছে। এদিকে এখানকার শরণার্থী শিবির অন্যত্র স্থানান্তর প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার খবরে অনেক রোহিঙ্গা শিবির ছেড়ে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ছে। এসব ব্যাপার নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাঝে উদাসীনতার অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে সরকার সম্প্রতি কক্সবাজার ও বান্দরবান এলাকায় ৫১ জন শীর্ষ রোহিঙ্গা গডফাদারের তালিকা ককরে এসব গডফাদাররা নগদ নজরানার মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে দিচ্ছে। তাই গডফাদারদের তালিকা প্রকাশ করেও এদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা না নেয়ায় রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ থামানো যাচ্ছে না।

রোহিঙ্গা শরণার্থীদের কারণে আর্থ সামাজিক অবস্থায় দেখা দিয়েছে বিরূপ প্রতিক্রিয়া। রোহিঙ্গারা এখন বাংলাদেশীদের নাম-ঠিকানা ব্যবহার করে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে।এসব রোহিঙ্গা বিদেশে গিয়ে বিভিন্ন অপকর্মের সঙ্গেও জড়িত হয়ে পড়ছে যার দায় পড়ছে বাংলাদেশীদের ওপর। বলার অপেক্ষা রাখে না এর ফলে বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশীদের ইমেজ নষ্ট হচ্ছে। এর বাইরেও ভয়ঙ্কর খবর যেটি সেটি হলো, রোহিঙ্গা রমনীরা আশ্রয়কেন্দ্র ছেড়ে অনেকেই যৌনপেশায় নেমে পড়েছে। এতে বাংলাদেশে বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারসহ পুরো চট্টগ্রাম বিভাবে এর বিপুল প্রভাব পড়েছে। এরা দিনে দিনে রাজধাণী ঢাকাসহ দেশের বড় শহরে ছড়িয়ে পড়েছে, এবং ইয়াবা ব্যবসাকে সারা দেশেই রমরমা করে তুলেছে। এ ব্যাপারে শিগগির পদক্ষেপ নেয়া দরকার। না হলে এর ফলে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশ আর্থ-সামজিকসহ বিভিন্ন দিক দিয়েই সংকটাপন্ন অবস্থায় পড়বে। যা দেশের ভাবমূর্তি জন্য অশনি সংকেত। আর বিদেশে বাংলাদেশী শ্রমিকদের পাসপোর্ট হারানোর ছুতো করে কৌশলে চলে আসছে দেশে। সেই পাসপোর্ট আদম পাচারকারী দালাল চক্রের মাধ্যমে গলাকাটা পাসপোর্ট তৈরি হচ্ছে। যাতে নাম, ঠিকানা ও ভিসাপ্রাপ্তি সবই ঠিক থাকে, শুধু ছবি পরিবর্তন করা হচ্ছে। আর এই গলাকাটা পাসপোর্ট দিয়ে বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন দেশে রোহিঙ্গাদের পাঠানো হচ্ছে। গত এক মাসে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ব্যবহার করে প্রায় অর্ধশত ব্যক্তি গলাকাটা পাসপোর্ট ব্যবহার করে বিদেশ যাওয়ার সময় পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে। এই অর্ধশত ব্যক্তির মধ্যে প্রায় ২৫ জনই রোহিঙ্গা সদস্য বলে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে। আর বিদেশে তাদের অপকর্মের দায় পড়ছে বাংলাদেশীদের ঘাড়ে। অনেক ক্ষেত্রেই এদের অপকর্মের মাশুল গুনতে হচ্ছে বিদেশে কর্মরত গোটা বাঙালি কমিউনিটিকে। বিদেশীদের পাঠানো রেমিট্রেন্স এখন দেশের অর্থনীতিতে একটা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে। এই রেমিট্রেন্স প্রবাহ নির্ভর করছে বিদেশে বাংলাদেশী শ্রমিকদের কর্মদক্ষতা ও ইমেজের ওপর। বাংলাদেশী পাসপোর্টধারী রোহিঙ্গারা বিদেশে গিয়ে অপকর্ম করলে সে দায় পড়বে বাংলাদেশীদের ওপরই। অর্থাৎ বাংলাদেশীদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হবে। এর পরিণামে বিদেশী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্রেন্স প্রবাহ শ্লথ হয়ে গেলে এর বিরূপ প্রভাব পড়বে দেশের অর্থনীতিতে। তাই বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।

রোহিঙ্গারা বাংলাদেশীদের পাসপোর্ট জালিয়তি করেই বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে। কাজেই এই পাসপোর্ট জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত রয়েছে বাংলাদেশী এক শ্রেণীর দালালচক্র। যারা রোহিঙ্গাদের অর্থের বিনিময়ে এসব অবৈধ সুযোগ-সুবিধা করে দিচ্ছে। এসব পাসপোর্ট জালিয়াতি ও আদম বেপারীর সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক না কেন তাদের আইনের আওতায় নিয়ে এসে শাস্তির ব্যবস্থা করা জরুরী হয়ে পড়েছে। একই সাথে রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে মায়ানমার সরকারের সঙ্গেও যত দ্রুত সম্ভব সমঝোতায় পৌঁছানো দরকার।
কেননা, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের জামায়াত ও বিভিন্ন জঙ্গীগ্রুপের মদদপুষ্ঠ ইত্তেহাদুল জমিয়াতুল রোহিঙ্গা সংগঠনকে শক্তিশালী করতে বিদেশী এনজিও সংস্থা থেকে কোটি কোটি টাকার ফান্ড সংগ্রহ করে রোহিঙ্গা জঙ্গিদের নিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে অস্থিতিশীলতার সৃষ্টির পাশাপাশি আরকান রাজ্য প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে পরিকল্পনা গ্রহণ করে আসছে। সম্প্রতি চট্টগ্রামের গোয়েন্দা পুলিশের হাতে খুলশী থানার জিইসি মোড় হোটেল লর্ডস ইন থেকে আটক হয় পাকিস্তানী নাগরিকসহ ৫ জঙ্গি। এরপর নাইক্ষ্যংছড়ির ৫০ ব্যাটলিয়নের বিজিবির সদস্যরা মিয়ানমার সীমান্ত এলাকা দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় আটক জঙ্গি নেতা সালামত উলহর শ্যালক হাফেজ জোনাইদকে গ্রেপ্তার করে। চট্টগ্রামে পুলিশের হাতে আটক হওয়া পাকিস্তানী রোহিঙ্গা সংগঠন গুলোবল রোহিঙ্গা সংগঠনের নেতা মোঃ আলম সম্প্রতি কুতুপালং ক্যাম্পে এসে রোহিঙ্গা সংগঠনকে সক্রিয় করতে স্থানীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত এক মৌলভীর বাড়িতে গোপন বৈঠক করেছিল বলে জানা গেছে।

রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যা সেমাধানে আন্তর্জাতিক মহলও বিশেষ কোন ভূমিকা পাল করছে না। বরং আমেরিকাসহ বিভিন্ন দাদা দেশের পক্ষ পক্ষ থেকে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে বাংলাদশ সরকারের ওপর ক্রমাগত চাপ অব্যাহত রেখেছে। সম্প্রতি মার্কিন রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামার মিয়ানমার সফরের আগে সে দেশ থেকে বাংলাদেশে শরণার্থী আসা রোহিঙ্গা মুসলমানদের সামগ্রিক পরিস্থিতি জানতেই প্রতিনিধি দলটি কক্সবাজার সফর করেছেন। প্রতিনিধি দলটির প্রধান মার্কিন সরকারের অভিবাসন, মানবাধিকার ও শরণার্থী বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী (আন্ডার সেক্রেটারি) মারিয়া ওটেরো জানান, মিয়ানমার এখন পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এ পরিবর্তনে শুধু রোহিঙ্গা নয়, আরও বেশকিছু সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে তারা। বাংলাদেশ সরকারের শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) ফিরোজ সালাহউদ্দিন জানিয়েছেন, বাংলাদেশ স্পষ্টভাবেই বলে দিয়েছে, রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে স্থায়ী করা সম্ভব নয়। সঠিক সমাধান হবে, তাদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেয়া। মার্কিন প্রতিমন্ত্রী মারিয়া ওটেরো সাংবাদিকদের বলেন, ‘রোহিঙ্গা বিষয়ে আমরা মিয়ানমারের রাখাইন অঙ্গরাজ্যে আন্তঃসাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও টানাপড়েন পর্যবেক্ষণ অব্যাহত রেখেছি।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাম ওবামা নামকাওয়াস্তে রোহিঙ্গানণার্থী সমাধানে মিয়ানমার সরকারকে তাগিদ দিয়েছেন। তিনি সফরে সামরিক সরকার প্রধানের সঙ্গে আলাপকালে বলেছেন আমরা চাই অতি দ্রুত রোহিঙ্গা শরণার্থীরা যারা বায়লাদেশে শরনার্থী হিসেবে আছে তাদের নিজ দেশে ফিরিয়ে অানা হোক। বারাম ওবামার এসব কথা কুটনৈতিক কুটচালের কথা খুবই গতানুগতিক। এতে আমরা কিছুতেই আশ্বস্ত হতে পারি না। রোহিঙ্গা সমস্যা একটি জাতিগত মানবিক সমস্যা। মিয়ানমার সরকার এ মানবিক সমস্যা সমাধান না করে উপরন্তু মুখে কুলুপ এটে বসে আছে। আমরা বাংলাদেশের মানুষ আশা করবো জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও প্রভাবশালী দেশগুলো এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ রোহিঙ্গা সমস্যা এখন আর কোনো স্থানীয় ইস্যু নয়, এটি আন্তর্জাতিক ইস্যু হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে পড়েছে। আর সবচেয়ে বড় সত্য যেটি; সেটি হলো বাংলাদেশের পক্ষে দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্য রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেয় সম্ভব নয়। কাজেই এ বিষয়ে দ্রুত সমাধানকল্পে আন্তর্জাতিক মহলকে দ্রুতই এগিয়ে আসতে হবে। এমন সমস্যা কিছুতেই যুগ যুগ ধরে চলতে পারে না। বাংলাদেশের মানুষ অতিদ্রুত এ সমস্যাটির সমাধান চায়।