ক্যাটেগরিঃ খেলাধূলা

 

১৯ মার্চ ২০১৫ বাংলাদেশ-ভারত দ্বিতীয় কোয়াটার ফাইন্যালে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে এবং ইন্ডিয়ার পক্ষে পক্ষপাতদুষ্ট আম্পায়ারিং দেখে ১৯৮৬ সালের ফিফা ওয়ার্ল্ডকাপে মেক্সিকান রেফারী কোডেসালের বিতর্কীত আম্পায়ারিং এর দৃশ্য আবার চোখের সামনে জ্বলজ্বল করে ওঠলো। সেবার ফিফা ওয়ার্ল্ডকাপে কোডেসালের বিতর্কীত আম্মায়ারিং যেভাবে আর্জেন্টিনার ওয়ার্ল্ডকাপ জেতার স্বপ্নকে দুঃস্বপ্নে পরিনত করেছিল এবারও ঘটলো সেই বিতর্কীত আম্পায়ারিং এর ঘটনা। এবারের বিতর্কীত আম্পায়ারিং এর শিকার হলো বাংলাদেশ। তবে পার্থক্য এবার ফিফা ওয়ার্ল্ডকাপে নয় আইসিসি ওয়ার্ল্ডকাপে ঘটেছে চরম বিতর্কীত আম্পায়ারিং এর ঘটনা। আগে একা ছিল কোডেসাল। এবারের খলনায়ক তিনজন। বাংলাদেশকে জোর করে হারাতেই যেন দুই প্রান্তে দাঁড়িয়ে ছিলেন ইংল্যান্ডের আম্পায়ার ইয়ান গোল্ড ও পাকিস্তানের আলিম দার।

শুধু এ দুইজনই নয় তাদের সঙ্গে যোগ দিলেন থার্ড আম্পায়ার অস্ট্রেলিয়ার স্টিভ ডেভিসও। এই তিন আম্পায়ারদের তিন তিনটি ভুল সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের সেমিফাইনালে ওঠার স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিনত হলো। আইসিসি বিশ্বকাপ ২০১৫ বিশ্বকাপে চরম বিতর্র্কিত আমাম্পায়ারিং বিশ্বকাপ থেকে বাংলাদেশের বিদায় ঘটল। ভারত ১০৯ রানে বাংলাদেশকে হারিয়ে উঠে গেল সেমিফাইনালে। বাংলাদেশের সাথে দ্বিতীয় কোয়াটার ফাইনালে বাংলাদেশের বিপক্ষে ইন্ডিয়া দলের সঙ্গে খেলেছেন আম্পায়াররা। সুরেশ রায়নার এলবিডব্লিউ না দেয়া, রোহিত শর্মা আউট হওয়ার পরও অহেতুক ‘নো’ ডাকা, মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ আউট না হওয়ার পরও আউট দেয়া, এ সবই আম্পায়ারদের ভুল সিদ্ধান্ত। সেই ভুলের খেসারত দিতে হলো বাংলাদেশকেই। ক্রিকেট বোদ্ধার বলছেন যে ভারত ২৫ ওভারেও ১০০ রান করতে পারেনি, আম্পায়ারদের একের পর এক ভুল সিদ্ধান্ত ভারতের পক্ষে যাওয়ায় শেষ পর্যন্ত ৫০ ওভারে ৩০২ রান করে ফেলে। পরবর্তীতে বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ে পর পর দুই ম্যাচে সেঞ্চুরি করা মাহমুদুল্লাহ রিয়াদের বিপক্ষেও দেয়া হয়েছে এক বিতর্কিত আউটের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশ ইনিংসে ভীষণ প্রভাব ফেলে। আম্পায়ারত্রয়ীর ভুল সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে শুধু বাংলাদেশ নয় নিউজিল্যান্ডের মার্টিন ক্রো ও উইন্ডিজের হোল্ডিংসহ অনেক ক্রিকেটবোদ্ধ পর্যন্ত সমালোচনামুখর হলেন। আর খোদ আইসিসি সভাপতি আ হ ম মোস্তফা কামাল আম্পায়ারদের ভুল সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ায় প্রয়োজনে আইসিসি সভাপতি পদ থেকে পদত্যাগও করবেন বলে বাংলাদেশের কোটি কোটি ক্রিকেট পাগল মানুষের সাথে একাত্বতা ঘোষণা করলেন।

এ প্রসংগে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের সমালোচনায় যে বিষয়টি বেরিয়ে এসেছে তা হলো; “ক্রিকেট নিয়ন্ত্রণ করে এখন তিন ‘মোড়ল।’ প্রধান মোড়ল বলা হয়ে থাকে ভারতকে। তার দুই সহযোগী ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া। বাংলাদেশ বিশ্বকাপে এতটাই ভাল খেলেছে যে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে ম্যাচটি পরিত্যক্ত হয়। আর ইংল্যান্ডকে হারিয়ে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় করে দিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালেই খেলা নিশ্চিত করে নেয় বাংলাদেশ। অর্থাৎ দুই মোড়লের কাছে হার হয়নি। এখন যদি প্রধান মোড়লের কাছেও হার না হয়, তাহলে তো rangking-এ নিচের সারির দল বলে যে বাংলাদেশকে হেলা করা হয় তা যে একেবারেই ঠিক নয়, সেই প্রমাণই মিলে যাবে। আইসিসিকে মোক্ষম জবাবও দেয়া হয়ে যাবে। তিন মোড়লের কাছেই সেই সঙ্গে হার না মানার নজির গড়বে বাংলাদেশ। তাই আইসিসিও যেন বাংলাদেশকে হারানোর চক্রান্তেই শামিল হয়।”।

সুরেশ রায়নার বিপক্ষে বাংলাদেশের অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজার এলবিডব্লিউ আউটের আবেদন করেও সাড়া মেলেনি। ৩৪তম ওভারে ওই আবেদনটি করেছিলেন মাশরাফি। রিভিউও নেন। তখন ভারতের রান মাত্র ১৪৭। ৩ উইকেট হারিয়ে বিপদে ভারত। সুরেশ রায়নারও রান তখন মাত্র ১০। নিয়মের ফাঁদে ফেলে সিদ্ধান্তটি বাতিল করে দিয়েছেন টিভি আম্পায়ার স্টিভ ডেভিস। মাশরাফির বলটা লেগ স্টাম্পের সামান্য বাইরে পড়েছিল। আর তাতেই নিয়ম দেখিয়ে উইকেট বঞ্চিত বাংলাদেশ। নিয়মটা হলো, লেগ স্টাম্পের বাইরে বল পড়লে কোন এলবিডব্লিউ নয়। কিন্তু মাশরাফির এই আবেদন নিয়ে ভারতের সাবেক ক্রিকেটার ও বর্তমানে ধারাভাষ্যকার সঞ্জয় মাঞ্জেরেকার বলেছেন, ‘নিয়মের দিক থেকে সিদ্ধান্তটা ঠিক, নীতির দিক থেকে ঠিক নয়।’ আর ক্রিকইনফো বলেছে, ‘এটা অনেক বেশি ক্লোজড কল ছিল। ৫১ শতাংশই আউট।’ কিন্তু ডেভিস আউট দিলেন না।

নিয়মের কথা বলে আরেকবার আম্পায়ারের বাজে সিদ্ধান্তের শিকার হয়েছে বাংলাদেশ। ৪০তম ওভারে রুবেলের একটি বলে ক্যাচ তুলেছিলেন ম্যাচে সেঞ্চুরি পাওয়া রোহিত শর্মা। তখন তার ব্যক্তিগত রান ৯০। বাংলাদেশ ক্যাচটি ধরলেও তা ‘নো বল’ ডেকে বাতিল করে দিয়েছেন অনফিল্ড ২ আম্পায়ার ইংল্যান্ডের ইয়ান গোল্ড ও পাকিস্তানের আলিম দার। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, বলটি কোমরের উপরের ছিল। কিন্তু টেলিভিশন রিপ্লেতে আম্পায়ারদের দাবির যথার্থতা মেলেনি। তবে কর্তার ইচ্ছাই কর্ম। বাংলাদেশকেও তাই এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে হয়েছে। আশ্চর্য্যরে বিষয় হলো, লেগ আম্পায়ার (আলিম দার ছিলেন) এমন ফুলটস বলে ‘নো’ ডাকেন। কিন্তু ডাকলেন ইয়ান! যখন টিভি বার বার আলিম দারের দিকে তাক করল, তিনি কিছুই বললেন না! ইয়ান ‘নো’ ডাকার পরও যদি আলিম দার তা বাতিল করতেন, রোহিত আউট হয়ে যেতেন। তখন ভারতও বিধ্বস্ত অবস্থায় পড়ে যেত। এত রান হতো না। হারও হতে পারত ভারতের।

আম্পায়ারদের ভুল সিদ্ধান্ত প্রাণ ফিরে পওয়া একজন খেলোয়ার কতটা বেপড়োয়া হয়ে ওঠতে পারে তা যেন দেখিয়ে দিল রোহিত ১৩৭ রানের ইনিংস খেলে ভারতের সংগ্রহকে টেনে নিয়েছেন অনেক দূর। যা বাংলাদেশের মানসিক ভিত এতটাই ভেঙ্গে দেয় যে এরপর ফিল্ডিংও হয় উল্টো পাল্টা। ভারতের ইনিংসে এ দুটি আউটের সিদ্ধান্ত না দেয়ায় আম্পায়ারদের নিয়ে তুমুল সমালোচনা চলছে। এমন সময় বাংলাদেশ ইনিংস যখন দাঁড়ানোর সময় তখন আরেকটি বাজে সিদ্ধান্ত দেন আম্পায়াররা। বাংলাদেশের ব্যাটিং ইনিংস চলাকালে মাহমুদুল্লাহ রিয়াদের ব্যাট ছুঁয়ে বাতাসে ভাসা বলটি বাউন্ডারি সীমানায় দ্বিতীয় চেষ্টায় তালুবন্দী করেছেন ধাওয়ান। কিন্তু বলটি তিনি যখন তালুবন্দী করেছেন তখন তার পা বাউন্ডারি লাইন স্পর্শ করেছিল। কিন্তু থার্ড আম্পায়ার তা উপেক্ষা করেই মাহমুদুল্লাহকে আউট ঘোষণা করেছেন। যদিও টিভি রিপ্লেতে এবং স্টিল ফটোগ্রাফিতে স্পষ্টই দেখা গেছে ধাওয়ানের পা লাইন স্পর্শ করেছে। যারা এই আউটের সিদ্ধান্তকে সাপোর্ট করেছেন তাদের দাবি বাউন্ডারি লাইন ও ধাওয়ানের পা’র মধ্যে ইঞ্চি খানেক ফাঁক ছিল। অথচ ছবি দেখলে ‘মাইক্রো ইঞ্চি’র পার্থক্যও খুঁজে পাওয়া যাবে না সেখানে! শেষপর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাটসম্যানরাও এতটাই মানসিক দুর্বল হয়ে পড়েন, ১৯৩ রানেই অলআউট হয়ে যায় বাংলাদেশ। যার মাধ্যমে ইংলিশ আম্পায়ার ইয়ান গোল্ডত যেন ইংল্যান্ডকে হারানোর প্রতিশোধই নিয়ে নিলেন।

কেন এমন হলো? তার উত্তর খুঁজে পাওয়া যাবে ক্রিকেট অর্থনীতির দিকে তাকালেই। আইসিসির মূল আয়ের ৮০ শতাংশ ভারতের অবদান। এ কথা ক্রিকেট বিশ্বে সবাই জানে। কোন আসরে ভারতের টিকে থাকা মানে আইসিসির লাভের এ্যাকাউন্ট ফুলে ফেঁপে ওঠা। তাই আম্পায়ারত্রয়ি যেন সিদ্ধ্ন নিয়েই মাঠে নেমেছিলেন যে ভাবেই হোক বাংলাদেশ হারাতেই হবে। অনেকে এ কথাও বলছেন যে, আইসিসি মানে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল নয়, ইন্ডিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিল! আর তাই ১৬ কোটি বাংলাদেশীর মন ভেঙ্গে দিতে কোন কৃপণতা করেনি আম্পায়ারা। আইসিসির ক্রিকেট ক্রিকেট অর্থনীতি প্রসংগে যোগাযোগের মাধ্যমে একজন বিশিষ্ট ক্রীড়া সাংবাদিক লিখেছেন, ‘টিভি স্বত্ব ভারতের, টাইটেল স্পন্সর ভারতের। এমন দলকে কি আর এত তাড়াতাড়ি টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় হতে দেয়া যায়? শেষ দাওয়াই টেবিল গেম।’

শেষ করবো এই বলেই আম্পায়ারদের এমন পক্ষপাতদুষ্ট সিদ্ধান্ত বাংলাদেশকে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকেও দিল এটাই আজ চরম সত্য। দুর্দান্ত খেলতে থাকা টাইগাররা হঠাৎ এমন করেই নিকৃষ্ট সিদ্ধান্তগুলোর শিকার হলো। তবে বিশ্ববাসী দেখেছে কতটা অবিচার করা হয়েছে টাইগারদের প্রতি। কিন্তু আইসিসিকে মনে রাখতে হবে, এখানেই শেষ নয়। টাইগাররা এখন আর কারো হেলাফেলা বা করুনার পত্র নয়। তারা বুক চিতিয়ে যে ভাবে এবারের বিশ্বকাপে লড়াই করে নিজেদের সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছে তাতে শত ঘড়যন্ত্র করেও আগামীতে আর আমাদের জয়রথ কিছুতেই থামতে পারবে না। আম্পায়ারের ভুল সিদ্ধান্তগুলোতে আমাদের স্বপ্ন ভঙ্গ হলো ঠিক, কিন্তু এবারের বিশ্বকাপে টাইগারদের যে অর্জন সে অর্জনই ভয় পাইয়ে দিয়েছে ক্রিকেটের তিন মোড়লকে। তাই একথা আজ জোর দিয়ে বলতে পারি, বাংলাদেশকে কেউ কোন চক্রান্ত করে আর দমিয়ে রাখতে পারবে না। বাংলাদেশ মাথা উঁচু করে মর্যাদার সাথে ক্রিকেট বিশ্বে টিকে থাকবেই। সেদিন বেশি দূরে নয় একদিন ক্রিকেট উৎসবের সুর, বিজয়ের জয়ধ্বনিতে মুখরিত হবেই বিশ্বের আকাশ বাতাস। যার প্রমাণ এ অন্যায়ের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের লক্ষ-কোটি ক্রিকেটপাগল জনতার বিক্ষোভ।