ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

এটি বাংলাদেশে প্রচলিত অনেক পুরনো প্রবাদ। টানা ৯২দিন পর গুলশানের কার্যালয়ে অবস্থান শেষে শূন্য হাতে খালেদার বাসায় ফেরা এ নিয়েই এ নিবন্ধের অবতারণা এবং এ নিবন্ধের সাথে খুবই যুথসই মনে করেই এই শিরোনাম। ‘যৌক্তিক পরিণতিতে’ না পৌঁছানো পর্যন্ত নেতাকর্মীদের প্রতি আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার এমন ধনুকভাঙা পণ করেও শেষ পর্যন্ত কথিত আপোষহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ‘রণেবঙ্গ’ দিয়ে নিরবে-নিবৃতে বাসায় ফিরে যাবেন, তা বিএনপির নেতা-কর্মী, সমর্থক-শুভকাঙ্খি দূরে থাক কোন শত্রুও ভাবতে পারেনি। অনেকেই এখন বলাবলি করছে খালেদা জিয়া এভাবে একা একা বাসায় চলে না এসে তাঁর দলের সমর্থক বুদ্ধিজীবী টক’শোজীবীওয়ালারাও যদি বেগম খালেদা জিয়াকে বাসায় এসে দিয়ে যেতেন তা হলেওতো কিছুটা হলেও মান রক্ষা হতো। তাই এভাবে একজন পরাজিত সেনাপতির মতো মাথা নিচু করে চলে আসাতে নেতাকর্মীদের আর মুখ দেখাবার পথটিও তিনি বন্ধ করে দিলেন। আর হতাশ নেতকর্মীদের অবরোধ ও হরতালের মাঠে রেখে, শত শত নেতাকর্মীকে মামলায় জড়িয়ে কারাগারে রেখে বেগম জিয়ার একা বাড়ি ফিরে যাওয়াকে কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না কেউই।
শেখ হাসিনার সরকারকে হঠানোর জন্য ৯২ দিন ধরে খালেদা জিয়ার গুলশান কার্যালয়ে অবস্থান এবং ৮৯ দিন ধরে চলা নেতিবাচক আন্দোলনে বিএনপি বা তাদের নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট কিছু অর্জন করতে না পারলেও সারাদেশে জানমালের ব্যাপক ক্ষতি হয়। এ কর্মসূচী সফল করার লক্ষ্যে বিএনপি-জামায়াতের ক্যাডাররা পেট্রোলবোমাসহ বিভিন্নভাবে নাশকতা চালিয়ে প্রায় দেড় শ’ মানুষ হত্যা করেছে। শুধু পেট্রোলবোমার আগুনে দ্বগ্ধ হয়ে মারা গেছে প্রায় ৭০ জন। পেট্রোলবোমায় অগ্নিদগ্ধ হয়ে সারাদেশের বিভিন্ন হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে এখনও মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে কয়েকশত মানুষ। এ কর্মসূচী চলাকালে সহস্রাধিক যানবাহন আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে বিএনপি-জামায়াত। ভাংচুর করেছে কয়েক হাজার যানবাহন। এ ছাড়া সারাদেশের বেশ কিছু ভূমি অফিস এমনকি স্কুল-কলেজ ও ডিসি অফিসে পর্যন্ত বোমা বিস্ফোরণ ও অগ্নিসংযোগ করেছে তারা। গুলশান কার্যালয়ে খালেদা জিয়ার অবস্থানকালে এক মিনিটের জন্যও তিনি কার্যালয়ের বাইরে যাননি। ১৯ জানুয়ারি জিয়াউর রহমানের জন্মদিন উপলক্ষে তার মাজারে এবং ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারেও যাননি খালেদা জিয়া। প্রতিবছর বিশ্ব এজতেমায় গেলেও এবার টানা অবরোধ দিয়ে তিনি ঘরে বসেছিলেন। এমনকি ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যুর পরও খালেদা জিয়া গুলশান কার্যালয় থেকে বের হননি। কোকোর মরদেহকেও শেষ বিদায় জানিয়েছেন এখান থেকেই। কোকোর কুলখানি না হলেও তার আত্মার মাগফিরাত কামনায় মিলাদ পড়ানো হয়েছে গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয়েই। অন্যান্যবারের মতো এবার ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসেও খালেদা জিয়া জাতীয় স্মৃতিসৌধে যাননি।
বিএনপি জামায়েতের নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের টানা অবরোধ ও ৬৭ দিনের হরতাল, ৯২ দিন গুলশানের দলীয় কার্যালয়ে অবস্থানের আন্দোলনে সারাদেশে পেট্রোলবোমার আগুনে পুড়িয়ে ৭৫ জনসহ ১৩৬ জন মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, দ্বগ্ধ ও আহত হয়েছে ১ হাজার ২শ’ জন। যারা হতাহত হয়েছে তাদের বেশিরভাগই নিরীহ, নিরপরাধ, দরিদ্র, অসহায় পরিবারের লোকজন। শুধু তাই নয়, ২ হাজারেরও বেশি যানবাহনে আগুন, ভাংচুরে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে বহু সংখ্যক। রেলওয়ের নাশকতা ঘটানো হয়েছে ১শ’ ৩১ স্থানে। আর দেশের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৪ হাজার ৯শ’ কোটি টাকা। আন্দোলন ‘যৌক্তিক পরিণতিতে’ না পৌঁছা পর্যন্ত অব্যাহত থাকার ঘোষণা দিয়ে, অতঃপর বাড়ি ফেরার মধ্য দিয়ে রণে ভঙ্গ দিলেন বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া।
গত ৫ জানুয়ারি থেকে বিএনপি-জামায়াত জোটের নেতৃত্বে সারাদেশে অনির্দিষ্টকালের অবরোধ-হরতালের ডাক দিয়ে পেট্রোলবোমার আগুনে পুড়িয়ে মারাসহ সহিংস সন্ত্রাসের তান্ডলীলায় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির হিসাব অনুযায়ী, কেবলমাত্র যানবাহনে পেট্রোলবোমা, অগ্নিসংযোগ, সংঘর্ষে ৩০ জন পরিবহন শ্রমিক মারা গেছেন। আগুন ও পেট্রোলবোমায় পুড়েছে ১২শ’ গাড়ি ও ভাংচুর হয়েছে ৮ যানবাহনে। প্রতিদিন ক্ষতি হয়েছে তাদের ৩শ’ কোটি টাকা। পরিবহন ক্ষতির পরিমাণ ১০ হাজার কোটি টাকা দাবি করা হয়েছে। সংবাদ সম্মেলন করে এ তথ্য দিয়েছেন ঢাকা সড়ক পরিবহন সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহ। বাংলাদেশ রেলওয়ের হিসাব অনুযায়ী, সারাদেশে ট্রেনে অগ্নিসংযোগ, রেললাইন উপড়ে ফেলা, ফিসপ্লেট খুলে ফেলাসহ ১৩১টি নাশকতার ঘটনা ঘটানো হয়েছে। এতে রেলওয়ের ৩৩ কোটি টাকার ক্ষতিসহ জনজীবনে দুর্ভোগ ও জিম্মি করাসহ আতঙ্ক, উদ্বেগের মধ্যে রাখা হয়।
বেসরকারী গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিএনপি-জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ২০ দলের টানা অবরোধ ও ৬৭ দিনের হরতালে দেশের অর্থনীতির ৪ হাজার ৯০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এই রাজনৈতিক অস্থিরতায় দেশের অর্থনৈতিক কর্মকা- বাধাগ্রস্ত হয়েছে প্রতিদিন। এছাড়া জিডিপির দশমিক ৫৫ শতাংশ ক্ষতি হয়েছে। গত ১৭ মার্চ পর্যন্ত সময়ের ওপর তৈরি প্রতিবেদনে মোট ১১টি খাতের ক্ষতির চিত্র তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত খাত হলো পোশাকশিল্প। এ খাতে ক্ষতি ১৩১৮ কোটি টাকা। এরপর রয়েছে পর্যটন ও পরিবহন। এ দুই খাতে ক্ষতি যথাক্রমে ৮২৫ কোটি ও ৭৪৪ কোটি টাকা। হিমায়িত খাতে ৭৪১ কোটি টাকা ও পোল্ট্রিতে ক্ষতি ৬০৬ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া কৃষি খাতে ৩৯৮ কোটি, প্লাস্টিক খাতে ২৪৪ কোটি, ব্যাংক ও বীমায় ১৫৬ কোটি এবং খুচরা বাজারে ৪৪৮ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
খালেদার ৯২ দিন পর একরকম শূন্য হাতে ঘরে ফেরায় সমালোচনার ঝড় বইছে বিএনপিতে। প্রায় তিন মাস ধরে অবরোধ-হরতাল চালিয়েও হঠাৎ করে বিএনপি নেত্রীর কার্যত ‘রাজনৈতিক আত্মসমর্পণ’-এর ঘটনায় ফের অস্তিত্বের সঙ্কটে পড়তে হয়েছে দলটিকে। এখন তাই মাঠে-ঘাটে, শহরে-বন্দরে, চায়ের দোকানে সব শ্রেণী পেশার মানুষের এখন একই প্রশ্ন- এতো মানুষের জীবনহানি ঘটিয়ে কী অর্জন হলো বিএনপি-জামায়াত জোটের? এতো ক্ষয়-ক্ষতিরই বা কী জবাব দেবেন বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া?
অনেক আশায় বুক বেধেছিল বিএনপি নেতাকর্মীরা। হয়তো এবারের আন্দোলনে একটা কিছু হবে। বাস্তবে সরকারের কাছ থেকেএকটি দাবি আদায় করতে পারেননি খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি-জামায়াত জোট। উল্টো প্রায় দেড়শ’ মানুষ পুড়িয়ে হত্যা, দেশের সীমাহীন সম্পদহানির ঘটনায় দায়েরকৃত মামলার খড়গ মাথায় নিয়ে বিএনপির নেতাকর্মীরা আতঙ্কে দিনতিপাত করছেন। আর মনে মনে বলছেন “সেই যদি মল খসালী, তবে কেন লোক হাসালি।”