ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

 

বর্তমানে আমাদের দেশের একটি বিশেষ গোষ্ঠী ব্লগকে ইসলামবিরোধী ও ব্লগার নাস্তিক শব্দ দু’টিকে সমার্থক করে তুলেছে। তারা আমাদের দেশের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে এটা বোঝাতে অনেকটাই সক্ষম হয়েছে যে, ব্লগ হলো ইসলাম-ইমান ও আকীদাবিরোধী একটি জঘন্য কাজ। আর যারা ব্লগ লিখেন তারা সবাই নাস্তিক। তাদের মতে ব্লগ যেহেতু ইসলাম বিরোধী এবং যিনি ব্লগ লিখেন তিনি হলেন নাস্তিক সেহেতু ব্লগ ও ব্লগারের বিরুদ্ধে তাদের যত অপপ্রচার, শুধু অপপ্রচারে লিপ্ত থেকেই তারা বসে থাকেনি, ব্লগারদের জবাই করা ইমানী কাজ বলে মানুষকে বিভ্রান্ত করছেন। এবং শতাধিক ব্লগারের নাম ঠিকানা ধরে হত্যার ফরমানও জারি করেছেন এবং ইতমধ্যেই রাজিবসহ ছয়জন ব্লগারকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে যা খুবই অমানবিক ও বেদনাদায়ক। ব্লগ ও ব্লগার নিয়ে কিছুটা আলোচনার জন্যই আমার আজকের এ নিবন্ধের অবতারনা।

ব্লগ শব্দটি ইংরেজ Blog এর বাংলা প্রতিশব্দ, যা এক ধরণের অনলাইন ব্যক্তিগত দিনলিপি বা ব্যক্তিকেন্দ্রিক পত্রিকা। আমাদের দেশে ব্লগের ইতিহাস দীর্ঘদিনের নয়। ইন্টারনেট জগতে ব্লগ এর বয়স প্রায় দশ বছর । Blog শব্দটির আবির্ভাব Weblog থেকে। Weblog শব্দটিসর্বপ্রথম ব্যবহার করা হয় দশ বছর আগে ১৯৯৭ সালের ১৭ ডিসেম্বর। শব্দটির স্রষ্ট্রা মার্কিন নাগরিক জন বার্জার। এর ঠিক দু’বছর পর ১৯৯৯ সালের এপ্রিল এবং মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে পিটার মহোলজ নামে একব্যাক্তি Weblog শব্দটিকে ভেঙ্গে দুই ভাগ করেন-We Blog এর পরই সারা বিশ্বব্যাপী ব্লগ জনপ্রিয় হতে শুরু করে। অনলাইনে দিনলিপি লেখার সুবিধা নিয়ে যাত্রা শুরু করে ‘ওপেন ডায়েরি’ যা ছিল অনেকটা এখনকার ব্লগের মতোই। যারা ব্লগে পোস্ট দেয় তাদেরকে ব্লগার বলা হয়। ইংরেজী Blog শব্দের অর্থে Oxford Dictionary তে বলা হয়েছে- Blog is a personal record that somebody puts on their website giving an account of their activities and opinions and discussing places on the Internet they have visited. আজকের তথ্য-প্রযুক্তির এ উৎকর্ষতার যুগে ব্লগাররা প্রতিনিয়ত বিভিন্ন ওয়েবসাইটে ব্যক্তিগত, সমাজও রাষ্ট্রের বিভিন্ন বিষয়াবলী নিয়ে তাদের নিজস্ব ভাবনার প্রকাশ ঘটিয়ে থাকেন। আর অন্যান্য ব্যবহারকারীরা সেখানে তাদের মন্তব্য করতে পারেন। এছাড়াও আজকাল অনেকেকে প্রিন্ট মিডিয়া বা পত্র পত্রিকার চেয়েও ব্লগকে ফ্রিলান্স সাংবাদিকতার একটা মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছেন।

কিন্তু আসলেই কি ব্লগার মানে নাস্তিক? ডায়েরি লিখলে যদি নাস্তিক না হয়, তবে ব্লগে লিখলে বা ব্লগার হলে তিনি নাস্তিক হবেন কেন? ব্লগের বিরুদ্ধে এমন অপপ্রচার করা হয়েছে যে, ব্লগে লিখলেই তিনি নাস্তিক। নাস্তিক আর ব্লগারকে সমার্থক করার অপচেষ্টা করা হচ্ছে। ২০১৩ সালে একাত্তরের মানবতাবিরোধীদের শাস্তির দাবিতে গড়ে ওঠা শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরের গণজাগরণ মঞ্চের দুর্বার আন্দোলনকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার জন্য একটি গোষ্ঠী জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টার ফলশ্রুতিতেই ব্লগ ও ব্লগারদের বিরুদ্ধে অপপ্রচারে লিপ্ত হয়। দেশের হাজার হাজার নিরীহ, কোমমতি শিশু বিশেষ করে মাদ্রাসা ছাত্রকে ভুল বুঝিয়ে একটি কথা প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করা হয় যে ব্লগ হলো আমাদের ধর্ম ইমান ও আকীদাবিরোধী একটি কাজ আর যারা ব্লগ লিখেন তারা হলো নাস্তিক।

ব্লগ হচ্ছে শিক্ষিত ও সচেতন মানুষের মুক্তচিন্তা ও মত প্রকাশের মাধ্যম। এটি বিশেষ ধরনের ওয়েবসাইট্, অনেকে ব্লগকে ব্যাক্তিগত ডায়রীও বলে থাকে। তবে সময়ের সাথে সাথে ব্লগিং ধারণাতে অনেক পরিবর্তন এসেছে। আগে বা এখনো যাদের ব্লগিং করার সুযোগ সীমিত তারা নোট বই বা ব্যক্তিগত ডাইরীতে নিজেদের চিনপুঞ্জি লিপিবদ্ধ করে রাখেন আর যাদের ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ আছে তারা ব্যাক্তিগত ডায়রীর পরিবর্তে ব্লগ ব্লগে অনায়াসে সে কাজটি করছেন। তা ছাড়া ব্লগকে আমরা গণমাধ্যম হিসেবে আখ্যায়িত করতে পারি। সে হিসেবে কোন একটি নির্দিষ্ট ওয়েব সাইটে কোন বিষয়কে পাঠকদের মতামত প্রদানের জন্য তুলে ধরা হলো ব্লগিং । আজকের যুগে ব্লগ হলো মত প্রকাশের একটি অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম। তাই এ কথা জোর দিয়েই বলা যেতে পারে যে, ব্লগ আমাদের জীবনযাত্রায় এনেছে নতুন মাত্রা।

তাই হয়তো যারা প্রতিনিয়ত ব্লগ ও ব্লগারের বিরুদ্ধে অপপ্রচার করছে এবং নাস্তিক ঘোষণা করে ব্লগারদের হত্যার ফরমান জারি করছে তারাও কিন্তু অনলাইন ও বিভিন্ন যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন ওয়েভপেইজ বা পেইজ খুলে মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য ব্লগিং করছে। সেগুলোর মধ্যে থেকে এখানে কয়েকটির নাম উল্লেখ করা যেতে পারে: যেমন- বাঁশের কেল্লা, সোনার বাংলা, তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা, আওয়ামী ট্রাইব্যুনাল, বাকশাল নিপাত যাক, আই এ্যাম বাংলাদেশী, ডিজিটালরূপে বাকশাল, বাঁশখালী নিউজ টুয়েন্টিফোর, ইসলামী অনলাইন এ্যাক্টিভিস্ট, তরুণ প্রজন্ম, মুক্ত খবর বিডি, নতুন বাঁশের কেল্লা, ইসলামী কেল্লা, স্টোরি অব বাংলাদেশ, বায়তুল মাল, মাইক, মতিঝিল স্কোয়ার, এসো আলোর পথে, আসলে আমরা সবাই পারি প্রভৃতি।

কোন ব্লগে কি ধরনের পোস্ট দেওয়া হয় তার উপর ভিত্তি করে ব্লগকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা হয়েছে। যেমন-

১. ব্যাক্তিগত ব্লগ: এখানে ব্যাক্তি কোন একটি বিষয়ের উপর তার মতামত পোষ্ট আকারে তুলে ধরেন এবং পাঠকদের সাথে এর উপর মতামত আদান প্রদান করেন। এই ধরনের ব্লগে সাধারনত কোন ব্যক্তি তার প্রতিদিনের জীবন যাত্রা এবং তার নিজস্ব মতামত প্রকাশ করে। ব্যক্তিগত ব্লগ বর্তমানে সবচেয়ে জনপ্রিয়। এ ধরণের ব্লগ ব্লগার তার নিজের শখ থেকে করে থাকে। তাদের ব্লগ কেউ পড়ুক বা না পড়–ক এতে তাদের কোন আসে যায় না। নিজের আনন্দ লাভ করা এ ধরণের ব্লগের মূল উদ্দেশ্য।

২. সামাজিক ব্লগ: সামাজিক ব্লগ হল এমন ব্লগ সাইট যেখানে বিভিন্ন ব্যক্তি তাদের মতামত বা মুক্ত চিন্তা তুলে ধরতে পারে। একজন ব্যক্তি একটি পোষ্ট দেবার পর উক্ত ব্লগের অন্যান্য ব্লগাররা তার পোষ্টর উপর মন্তব্য করতে পারে। যেমন- সামহয়্যারইন ব্লগ, আমার ব্লগ ইত্যাদি সামাজিক ব্লগের অন্তর্ভূক্ত।

৩. ব্যবসায়িক ব্লগ: কোম্পানী/ প্রতিষ্ঠান তাদের কোন পন্য বা সেবার উপর নতুন নতুন তথ্য প্রদান করেন এবং পাঠক তাদের মতামত প্রদান করতে পারেন। এ ধরনের ব্লগ সাধারণত কোন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান তাদের পন্যের প্রচার বা গ্রাহকদের সাথে যোগাযোগ রক্ষার্থে করে থাকে। যেমন- গুগল ব্লগ, অপেরা ডেস্কটপ টিম ইত্যাদি।

৪. প্রশ্ন ব্লগ: প্রশ্ন ব্লগে ব্লগার প্রশ্নের উত্তর দিয়ে থাকেন। এই প্রশ্ন কোন ফর্ম বা ই-মেইলের মাধম্যে ব্লগাদের কাছে পৌছান হয়। যেমন: ইয়াহু এনসার হল প্রশ্ন ব্লগ।

৫. খবর ব্লগ: যে সকল ব্লগে বিভিন্ন সা¤প্রতিক খবরের উপর বিশ্লেষন স্থান পায় তাদেরকে খবর ব্লগ বা News Blog বলে।
আরো কয়েক ধরনের ব্লগ বর্তমানে খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে যেমন মাইক্রো ব্লগ, টুইটার এমন একটি ব্লগ। এটি ব্যক্তিগত ব্লগের ভেতরেও পরে। এখানে কোন ব্লগার এখন কি করছেন বা ভাবছেন তা অতি সংক্ষিপ্ত আকারে লিখে থাকেন। যেমন: আমার টুইটার ব্লগ।

পোষ্ট করা ব্লগের ধরন অনুযায়ী ব্লগকে আবার কয়েকভাগে ভাগ করা যায়। এগুলো হল:

১) ফটোলগ: এ ধরনের ব্লগে ব্লগার তাদের ডিজিটাল ক্যামেরা দিয়ে তোলা
বা স্ক্যান করা ছবি আদান প্রদান করে থাকে।

২) ভিলগ: যে ব্লগে ব্লগার ভিডিও শেয়ার করা হয় তাকে ভিলগ বলে।

৩) লিংকলগ: বিভিন্ন ওয়েব সাইটের ঠিকানা দ্বারা গঠিত ব্লগ হল লিংকলগ।

আমরা জানি যে যুগে যুগে মুক্তচিন্তা ও বিজ্ঞানমনস্ক মানুষের বিরুদ্ধে প্রগতিবিরোধী গোষ্ঠী ও রাজন্যবর্গ বিভিন্ন অপপ্রচারে লিপ্ত থেকে তাদের বিরুদ্ধে নানাবিদ অপপ্রচার করে প্রগতির চাকাকে থামিয়ে দিতে চেষ্টা করেছে। সক্রেটিস গ্রীসের প্রাচীন, জেঁকে বসা, পশ্চাৎপদ ধ্যানধারণার বিরুদ্ধে গণকল্যাণকামী প্রগতির কথা বলেছিলেন। তা ওই সময়ের প্রেক্ষাপটে ছিল একেবারে নতুন ও রাজশক্তির কাছে অসহনীয় ছিল। তাই সক্রেটিসকে নিজের জীবন দিতে হয়েছে। কেননা চিন্তার মুক্তিতে দেয়াল ভাঙার সংগ্রাম ছিল তাঁর লক্ষ্য। কিন্তু তাঁর এ দর্শন মুক্তচিন্তার দর্শন কাল হয়ে দাঁড়ায়। এজন্য তখনকার সমাজ ও রাষ্ট্র তাঁর প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ায়। শেষ পর্যন্ত প্রহসনমূলক বিচারের মাধ্যমে হেমলক পান করিয়ে তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল । সক্রেটিসের হাজার হাজার বছর পরে এ অন্যতম রবীন্দ্রনাথ সেই একই গতিবিরোধীদের হাতে হয়েছিলেন নাজেহাল, যদিও তা শারীরিকভাবে নয়। পাকিস্তানে তিনি সাম্প্রদায়িকতার শিকার হন, বর্জন করা হয় তাঁর সৃষ্টিকর্ম। কাজী নজরুল শুধু রাষ্ট্র কর্তৃকই নয়, সমাজ থেকেও হয়েছেন বৈরিতার শিকার। মানুষে মানুষে ভেদাভেদ, শ্রেণী বৈষম্য, ধর্মান্ধতা, বকধার্মিক, গোষ্ঠীর শোষণ-শাসনের বিরুদ্ধে ছিল তাঁর অবস্থান। মুক্তচিন্তাময় তাঁর এ অবস্থান সে সময় রাষ্ট্র ও সমাজ মেনে নিতে পারেনি, তাই তিনি হয়ে ওঠেন এদের চক্ষুঃশূল। রাষ্ট্র তাঁর সৃষ্টিকর্ম নিষিদ্ধ করেই ক্ষান্ত হয়নি মুক্তচিন্তা-চেতনার জন্য তাঁকে কারারুদ্ধ পর্যন্ত করা হয়।

শেষ করবো এই বলেই যে, তথ্য প্রযুক্তির বর্তমান উৎকর্ষতার যুগে সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে চলছে সমগ্র বিশ্ব। এগিয়ে যাচ্ছে মানব সভ্যতা। দিনে দিনে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার মানুষের কাছে সহজ থেকে সহজতর হচ্ছে। এই প্রযুক্তিগত উন্নয়নের অন্যতম নির্ধারক হিবেবে কাজ করছে ইন্টারনেট ও অনলাইন সেবা। তাই প্রতিনিয়তই ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ব্যাপক পরিমানে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এরই সাথে পরিবর্তন হচ্ছে মানুষের ধ্যান-ধারণা। বিজ্ঞানমনস্ক মুক্তচিন্তা মানবকল্যাণকামী হলেও যুগে যুগে এ চিন্তার রোধ করতে পশ্চাতমুখী, কিছু অপশক্তি বার বার এর বিরুদ্ধে অপপ্রচারে লিপ্ত থেকে মানুষকে হত্যা করেছে, যা বর্তমানে আরো অনেক বেড়ে গেছে। কাজেই এ কূপমন্ডকতার পথ থেকে বেরিয়ে আসতে হলে চাই আরো অধিক আধুনিক বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষার প্রসার যার মাধ্যমে ভুলপথের যাত্রীদের সঠিক পথে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে আমার বিশ্বাস।