ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

বিএনপি এক সময় চরম ভারতবিরোধী অবস্থানে থাকলেও ভারতের প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশে সফরকে কেন্দ্র করে মোদির সাথে খালেদা জিয়ার সাক্ষাত আয়োজন করার জন্য যে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছিল এবং শেষ পর্যন্ত মোদির সাক্ষাত পেয়ে শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে ‘দেশে গণতন্ত্র নেই’ বলে নালিশও করেছেন যা নিয়ে সারা দেশে আলোচনা সমালোচনা বেশ জমে ওঠেছে। ভারতের বিষয়ে হঠাৎ বিএনপির এ অবস্থান পরিবর্তন না ক্ষমতায় যাওয়ার পথ প্রশস্ত করার সাময়িক কৌশল এ নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিএনপি প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দলের নেতাকর্মীরা ভারতবিরোধী প্রচারণা শুরু করেন। তারা অব্যাহতভাবে বলে আসছেন স্বাধীনতার পর শেখ মুজিবুর রহমান ভারতের সঙ্গে ২৫ বছরের গোলামী চুক্তি করে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে ভারতের হাতে তুলে দিয়েছেন। এ চুক্তি নিয়ে চালানো হয়েছে নানা উৎকট প্রচারণা। ১৯৭৯ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির পক্ষ থেকে ভারতবিরোধী প্রচারণা মাঠে ছড়ানো হয়। এই ভারত বিরোধিতাকে কাজে লাগিয়ে নির্বাচনী বৈতরণী পার হয়ে যায় বিএনপির। ১৯৮১ সালের ৩০ মে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর তার স্ত্রী খালেদা জিয়া বিএনপির দায়িত্ব নেন। তিনিও জিয়াউর রহমানের রেখে যাওয়া ভারতবিরোধী প্রচারণা অব্যাহত রাখেন।

শুধু তাই নয় সেনা শাসক জিয়াউর রহমানের শাসনকাল থেকে শুরু করে বেগম খালেদা জিয়ার শাসনকালীন পুরো সময়েই বাংলাদেশকে ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর অভয়ারণ্যে পরিণত হওয়ার সুযোগ প্রদান করা হয়েছে। বেগম খালেদা জিয়ার শাসন আমলে তো অনেক সময় মনে হতো উলফা বোঝি বাংলাদেশের শাসনকার্য নিয়ন্ত্রণ করছে। এ প্রেক্ষিতে জামায়াত নেতা মাওলানা নিজামীর নেতৃত্বে দশ ট্রাক অস্ত্রবাহী চালান আটক হওয়ায় জনমনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়; যা ভারতের সেভেন সিস্টার্স খ্যাত প্রদেশসমূহে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের জন্য আইএসআই’র সহায়তায় আনা হয়। সে অনেক কথা অনেক ইতিহাস।

নানাবিদ কারণে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপি নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের ব্যাপারে বিশ্বের বিভিন্ন প্রভাবশালী দেশের সহযোগিতা পেলেও ভারতের কাছ থেকে কোন সহায়তা পায়নি। তাই ২০১৩ সালের ৪ মার্চ বাংলাদেশ সফরের সময় ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জীর সঙ্গে সেনারগাঁও হোটেলে গিয়ে সাক্ষাত করার কথা থাকলেও বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া সেদিন ২০ দলীয় জোটে বিএনপির শরিক দল জামায়াতের ডাকা হরতালের অজুহাতে প্রণব মুখার্জীর সঙ্গে সাক্ষাত করতে যাননি। হরতালের মধ্যে গাড়িবহর নিয়ে গুলশানের বাসা থেকে সোনারগাঁও হোটেলে গেলে হরতাল ভঙ্গ করা হবে এবং এ জন্য দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মিত্র জামায়াত নাখোশ হবে বলে সেদিন খালেদা জিয়া প্রণব মুখার্জীর সঙ্গে সাক্ষাত করতে না গিয়ে শিষ্টাচারবহির্ভূত কাজ করেন। প্রণব মুখার্জীর সঙ্গে পূর্বনির্ধারিত সাক্ষাত অনুষ্ঠানে না গিয়ে খালেদা জিয়া যে অসৌজন্যতা দেখিয়েছেন সে বিষয়টিকে ভালভাবে নেয়নি ভারত। তাই বিএনপি নেত্রীর সাথে মোদির সাক্ষাত নিয়ে অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হয়। এবার মোদির সাথে সাক্ষাত না পেলে রাজনীতিতে বিএনপির অনেক ক্ষতি হয়ে যাবে এ বিবেচনায় বিভিন্ন কূটনৈতিক চ্যানেলে দেনদরবার করে শেষ পর্যন্ত মোদির সাক্ষাত মেলে। সেই সাক্ষাতে বিএনপি নেত্রী বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে অনেক নালিশ করে এসেছেন।

বিভিন্ন সাংবাদ মাধ্যম সূত্রে জানা গেছে মোদির সাথে সাক্ষাতকালে দেশে গণতন্ত্র নেই বলে নালিশ করেছেন বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে তিনি ভারতের সহযোগিতা চেয়েছেন।
এছাড়া বিরোধী দলের ওপর সরকার চরম অত্যাচার নির্যাতন করছে বলেও জানান তিনি। সাক্ষাত শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান বলেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও গণতন্ত্রের অনুপস্থিতি নিয়ে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার আলোচনা হয়েছে। এ সাক্ষাত আমাদের জন্য ইতিবাচক। আমরা দেশের গণতন্ত্র অনুপস্থিতিসহ বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেছি।

মঈন খান আরও বলেন,‘বলেন, মোদির সঙ্গে সাক্ষাতে তাঁরা দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্কের প্রতিটি বিষয় তুলে ধরেছেন। তবে সবচেয়ে গুরুত্ব পেয়েছে দেশের গণতন্ত্রের অনুপস্থিতির বিষয়টি। তিনি বলেন, দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন গণতন্ত্র ও জবাবদিহিতা। …আমরা ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে বলেছি সরকার আসবে, সরকার যাবে, কিন্তু দেশের মানুষ দেশেই থাকবে। একটি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আস্থার ওপর প্রতিষ্ঠিত করতে হলে দুই দেশের মানুষের মধ্যে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। মঈন খান বলেন, যারা বলেন উন্নয়ন আগে গণতন্ত্র পরে তাদের কথা বাস্তব সম্মত নয়। দেশে গণতন্ত্র, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, মানবাধিকার এবং প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিরপেক্ষ না থাকে তাহলে উন্নয়ন কোন কাজে আসবে না। তাই দেশে গণতন্ত্র এবং সবার জন্য সমান সুযোগ থাকতে হবে। এ বিষয়গুলো নিয়ে আমরা মোদির সঙ্গে কথা বলেছি। মোদি তাঁদের নালিশের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের ভাষায় ‘বাংলাদেশে গণতন্ত্র নেই’ এর বিষয়ে কিছু আস্বস্থ করেছেন কি না তা অবশ্য জানাতে পারেননি মঈন খান।

শেষ করবো এই বলেই যে বিএনপি নেত্রীর এ নালিশ তাদেরকে কতটুকু রাজনৈতিক সুবিধা এনে দেবে তা ভবিষ্যতই বলবে। তবে তাদের এ নালিশ দেশের সচেতন মানুষ ভালভাবে নেয়নি। তারা যে এখনো সেই নেতিবাচক রাজনীতির বৃত্তেই ঘুরপাক খাচ্ছেন, তা মোদির কাছে দেশ গনতন্ত্র নেই নালিশের মাধ্যমে আবারো প্রমাণিত হলো।