ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনের চারিত্রিক গুণাবলী নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে এ কথা নিশ্চিত করে বলা যায় যে, একজন বিশ্ববরেণ্য জননন্দিত নেতার ব্যক্তিচরিত্রে যেসব মানবিক গুণাবলী থাকার কথা তার সব কিছু নিয়েই যেন জন্মগ্রহণ করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এ জন্যেই আরব্য সাহিত্যের কবি আব্দুল হাফিজ লিখেছেন,‘আমি তার মধ্যে তিনটি মহৎ গুণ পেয়েছি-সেগুলো হলো দয়া, ক্ষমা ও দানশীলতা।’ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যার রাজনৈতিক ছিল বহুল বর্ণিল, তাঁর কন্ঠে ছিল ইন্দ্রজাল; সেই ইন্দ্রজালিক শক্তিতেই তিনি ঘুমন্ত নিরস্ত্র বাঙালিকে দেশপ্রেম ও স্বাধীনতার স্বপ্ন জাগিয়ে এক কাতারে সামিল করতে পেরেছিলেন। নির্ভীক ও স্বপ্নের কারিগর বঙ্গবন্ধু নিজ হাতে নির্মাণ করেছিলেন, স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ ও এর গৌরবদীপ্ত সাফল্যের ইতিহাস। তিনি ছিলেন এক রাজনীতির মহান কবি। যার ভাষণের পঙ্ক্তিতে পঙ্ক্তিতে ছিল কাব্যিক ব্যঞ্জনা, অনুপ্রাস ও মাত্রাবোধের এক অপূর্ব সম্মিলন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের চরিত্র ও কৃতিত্ব নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে একটি কথা বলা এখানে অবশ্যই যুক্তিযুক্ত যে, বাঙালি জাতির আত্মপ্রতিষ্ঠার সংগ্রাম রাজা শশাঙ্কের সময় থেকে শুরু হয়। কিন্তু এ সংগ্রামে তারা সফল হতে পারেননি। কারণ তারা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে নেতৃত্ব দিতে ব্যর্থ হয়েছেন। তাই পাল রাজারাও রাষ্ট্র গঠন করতে পারেননি। গৌড়ের সুলতান বাঙালি জাতিকে একটি রূপ দিতে কিছুটা সক্ষম হন। কিন্তু পুরোপুরি একটি স্বাধীন জাতি রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি। আর মোগল স¤্রাটগণ বাঙালির ওপর ফার্সি ও ইংরেজগণ ইংরেজি চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছেন। এই চাপিয়ে দেয়া বাঙালিরা কখনও মেনে নেয়নি। তারা যেমন সেনদের সংস্কৃত ভাষা গ্রহণ করেনি তেমনি গ্রহণ করেনি মোগলদের ফার্সি ও ইংরেজদেল ইরেজি ভাষাকেও। তাই আত্মপ্রতিষ্ঠার সংগ্রাম শশাঙ্ক থেকে সিরাজ এবং সিরাজ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত চলে। জাতি হিসেবে আত্মপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আবুল কাশেম ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোওরাওয়ার্দী মাওলানা ভাসানী বিশেষ ভুমিকা পালন করেন। বিভিন্ন সময়ের বিভিন্ন জাতীয়তাবাদের আন্দোলন চললেও জাতীয়তাবাদ আন্দোলনের পূর্ণতা ও সফল পরিনতি দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

জাতীয়তাবাদী চেতনা বিকাশের ক্ষেত্রে অন্যান্য বাঙালি নেতাদের বিশেষ করে আবুল একে ফজলুল হক, মাওলানা ভাসানী ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী অবদান থাকলেও তারা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে স্বাধীনতা অর্জন করতে পারেননি। কিন্তু বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও আত্মনিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিার বিভিন্ন সংগ্রাম ও আন্দোলনের সফল পরিসমাপ্তি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতেই হয়েছিল। তিনি ঘুমন্ত বাঙালিকে জাগিয়ে তোলে ঐক্যবদ্ধ ও সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধেও মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। বাঙালি জাতিরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তিনি যেমন বাংলাদেশ নামক স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা তেমনি বাঙালির জাতির জনক।

বাংলাদেশে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রেরণা যুগিয়েছে সমাজতান্ত্রিক কর্মসূচি। জনগণের সার্বিক উন্নয়নে সমাজতন্ত্র হলো একটি সহজ ও দ্রুত পথ। তাই বঙ্গবন্ধু আমাদের শাসনতন্ত্রে সমাজতান্ত্রিক কর্মসূচিকে অন্তর্ভূক্ত করেছিলেন। এ কর্মসূচির লক্ষ্য অর্জনের জন্য তিনি পরিকল্পনা কমিশন গঠন ও পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা প্রণয়ন করেন। ব্যাংক, বীমা, শিল্পকারখানা জাতীয়করণের মাধ্যমে হাজার বছর ধরে অবহেলিত বাঙালির সমাজ জীবনে পরিবর্তন ও উন্নয়ন সাধনের চেষ্টায় ব্রতি হয়েছিলেন। পাকিস্তানী ঔপনিবেশ আমলে আমাদের সমাজ ও অর্থনৈতিক জীবনে পুঁজিবাদ গড়ে ওঠে। এই সুযোগে ধনী আরো ধনী হয় গরিব আরো গরিব হতে থাকে। তাই বঙ্গবন্ধু ঘুণে ধরা সমাজ ব্যবস্থা ভেঙে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য দ্বিতীয় বিপ্লবের ডাক দেন। তাঁর দ্বিতীয় বিপ্লবের উদ্দেশ্য ছিল দুর্নীতি দমন, কৃষি-শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, নিরক্ষরতা দূরীকরণ ও অর্থনৈতিক সুষম বন্টনের মাধ্যমে অবহেলিত ও বঞ্চিত বাঙালি জাতিকে উন্নতির শিখরে পৌঁছে দেয়া। অন্যদিকে ধর্ম নিয়ে রাজনীতি মানব ইতিহাসে দেশে দেশে রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে অনেক রক্তপাত ঘটিয়েছে। এর জন্য জীবন দিতে হয়েছে হাজার হাজার মানুষকে। যদিও বঙ্গবন্ধুর রাজনীতি শুরু হয়েছিল ধর্মভিত্তিক রাজনীতির মধ্য দিয়ে তাই এ রাজনীতি নিয়ে তার যথেষ্ট অভিজ্ঞতা ছিল। বাংলাদেশের ১৫ ভাগ সংখ্যালঘু হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান। ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র হলে তারা দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে পরিনত হবে। তাই বঙ্গবন্ধু মৌলবাদীদের বিরোধিতা সত্বেও শাসনতন্ত্রে ধর্ম নিরপেক্ষতা অন্তুর্ভুক্ত করেন। এ নিয়ে মৌলবাদীদের ‘ধর্মনিরপেক্ষতা হলো ধর্মহীনতা’ এ জতীয় অপপ্রচার সত্বেও বঙ্গবন্ধু সংখ্যাগুরু মুসলমানকে বোঝাতে সক্ষম হন যে, ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়।’ প্রত্যেক সম্প্রদায় তাদের ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করতে পারবে। ইসলাম অর্থ শান্তি এবং শান্তির ধর্মকে রাজনীতিতে না আনার জন্য সকলের কাছে উদাত্ত্ব আহ্বান জানান।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনযাপন ছিল অতি সাধারণ। তাই দেশের রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর পদে অধিষ্ঠিত থাকার পরও আধুনিক সাজ-সজ্জার সরকারী বাসভবন ‘গণভবনে’র রাজকীয় জৌলসপূর্ণ জীবন পরিত্যাগ করে পরিবার পরিজন নিয়ে বসবাস করেছিলেন ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের ৬৭৭ নং সাদামাটা বাসভবনে, এবং এখানেই থেকেছেন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ইতিহাসের সেই কলঙ্কিত রাতে বঙ্গবন্ধুর বাড়িটি যে অবস্থায় ছিল তার সবকিছু অবিকল ও অবিকৃত রেখেই এটিকে ‘বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর’ করা হয়েছে। ইতিহাসের এ বাড়িটিতে প্রবেশ করলে একজন সাধারণ দর্শনার্থীও বোঝতে পারেন কী সাদাসিদে জীবন যাপনই করেছিলেন তিনি। ঘরের ভেতর সাধারণ মানে আসবাবপত্র ও একটি ১৪ ইঞ্চি সাদাকালো টেলিভিশনই বলে দেয় কেমন ধরনের জীবন যাপন করতেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাই সকলেই আজ বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বরের বাড়িটিকে দেশের প্রতিষ্ঠাতা, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর সাধারণ জীবন যাপনের উদাহরণ হিসেবেই গণ্য করে।

তাঁর এ সাধারণ জীবন যাপনই বলে দেয় তিনি নিজের জন্য কখনো ভাবতেন না। তাঁর সকল ভাবনাই ছিল দেশের মানুষকে নিয়ে তিনি মানুষকে যেমন বিশ্বাস করতেন তেমনি প্রাণ দিয়ে ভালও বাসতেন। বঙ্গবন্ধুর মানুষকে ভালবাসার হাজারো কাহিনীর মধ্যে একটি কাহিনীই বলে দেয় দেশের সাধারণ মানুষের প্রতি তাঁর অকৃত্তিম ভালবাসার কথা। তিনি যখন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট, তখন তাঁর ৩২ নম্বরের বাড়িটি দেখার অনেকের মধ্যেই কৌতুহল ছিল। আর ৩২ নম্বরের বঙ্গবন্ধুর বাড়িটির দরজাও সাধারণ মানুষের জন্য ছিল সবসময় খোলা। কিন্তু কেউ সাহস করে বাড়িতে না ঢুকে উঁকিঝুঁকি মারলেই বঙ্গবন্ধু ঢেকে নিতেন সেই আগন্তুককে। পাশে বসিয়ে, মাথায় হাত বুলিয়ে জানতে চাইতেন তাদের অভাব অভিযোগের কথা। সেই আগতন্তুককে চা না দিয়ে পারলেও নিদেনপক্ষে মুড়ি দিয়ে আপ্যান করতেন, আপ্যায়ন করতেন নিজ হাতেই। বঙ্গবন্ধু শেষ মুজিবুর রহমানের চরিত্রে মানবিকতার সকল গুণাবলীই নিহীত ছিল। তাই অনেক ঐতিহাসিক বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামী জীবনকে জোসেফ স্টালিন, সানইয়াত সেন, কঙ্গোর লৌহমানব লুবুম্ব, কিউবার ফিদেল ক্যাস্ট্রো, দক্ষিণ আফ্রিকার নেলসন ম্যান্ডেলা, ভিয়েতনামের হো চি মিন, আলজেরিয়ার বেনবেল্লা ও কেনিয়ার জোমো কেনিয়াত্তার সাথে তুলনা করেছেন। তিনি যেমন ছিলন বাঙালি জাতির স্বপ্নদ্রষ্ট্রা, বাঙালি জাতিরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা তেমনি ছিলেন বিশ্বের শান্তিকামী মানুষের চেতনার মূর্ত প্রতীক। আর চিরদিনের শোষিত-বঞ্চিত বাঙালিদের ছিলেন মুকুটবিহীন সম্রাট। বঙ্গবন্ধু চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল তিনি কখনো অন্যায়কে প্রশ্রয় দিতেন না এবং নীতির প্রশ্নে আপোষ করতেন না কখনো। এ জন্য তাঁকে বাবর বার পাকিস্তানেী শাসকদের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে কারাগারে যেতে হয়েছে এবং সহ্য করতে হয়েছে সীমাহীন অত্যাচার ও নিপীড়ণ। তিনি যে তিনি ছিলেন অনন্য এক বিদ্রোহী সত্তার অধিকারী , তাঁর মতো এমন বিদ্রোহী বাঙালি এ ভূ-খন্ডে জন্মগ্রহণ করেনি আর করবে কিনা সন্দেহ।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন এক কোমল ও মহৎ তাঁর ভাবনা দর্শনে ছিল একটি মাত্র চিন্তা কি করে বাঙালিদের গোলামীর জিঞ্জির থেকে মুক্ত করা যায়। তাই তিনি মনে-প্রাণে চেয়েছিলেন বাংলাদেশে যেন একটি সুসম সমাজতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। তিনি ছিলেন এক নির্ভীক দুর্জয় সাহসী জাতীয়তাবাদী নেতা। আত্মবিশ্বাস ছিল তাঁর বড় শক্তি। বিশ্বের একজন ত্যাগী সংগ্রামী নেতা হিসাবে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন মানুষের সেবায়। মানুষের কল্যাণে উৎসর্গ করেছিলেন যৌবনের মহিমান্বিত সময়গুলো। তাই তাঁর যাদুকরী নেতৃত্বে এই ভূখন্ডের মানুষ বাঙালির হাজার বছরের পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে ছিনিয়ে এনছিল স্বাধীনতা। বিখ্যাত সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্ট একবার বঙ্গবন্ধুকে প্রশ্ন করেছিলেন‘হোয়াট ইজ ইউর কোয়ালিফিকেশন?’ বঙ্গবন্ধু সাথে সাথে উত্তর দিয়েছিলেন,‘আই লাভ মাই পিপল।’ তারপর ফ্রস্ট আবার প্রশ্ন করলেন,‘হোয়াট ইজ ইউর ডিসকোয়ালিফিকেশন?’ বঙ্গবন্ধু বললেন,‘আই লাভ দেম টুমাচ’। বঙ্গবন্ধু এ কথার মাধ্যমেই বোঝা যায় তিনি মানুষকে কতটা ভালবাসতেন। সাধারণ মানুষকে ভালবাসতেন বলেই ঢাকা বিশ্বদ্যিালয়ের চতুর্থশ্রেণীর কর্মচারীদের ন্যায়সঙ্গত আন্দোলনে অংশগ্রহণের জন্য ১৯৪৯ সালের ২৬ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে এক চরমপত্র দেয়। তাঁকেসহ ৫ জনকে ১৫ টাকা জরিমানা দিয়ে এবং অভিভাবক মারফত মুচলেকা দিয়ে ছাত্রত্ব রক্ষার জন্য বলা হয়। কিন্তু অজন্ম প্রতিবাদী ও আপোষহীন বঙ্গবন্ধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এ সিদ্ধান্ত ঘৃণাভরে প্রত্যাক্ষান করেন। কিন্তু কর্মচারীদের দাবী আদায়ের আন্দোলন থেকে সরে না আসায় ১৯৪৯ সালের ১৮ এপ্রিল তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র হিসাবে বহিস্কার করা হয়।

বিখ্যাত উর্দু কবি নওশাদ নূরী তাঁর টুঙ্গিপাড়া নামক কবিতায় বঙ্গবন্ধু সন্মন্ধে এভাবেই বলেছেন-
পথের শুরুটা হয়েছিল এইখানে
পথ খোয়া গেল, হায় সেও এইখানে

অসীম সাহসিকতার জন্য ব্রিটিশ রাজকবি টেড হিউজ বঙ্গবন্ধুকে টাইগার অব বেঙ্গল বলে অভিহিত করেছেন। বিখ্যাত লেখক, দার্শনিক ও রাজনীতিবিদ আঁন্দ্রে মার্লোবঙ্গবন্ধুকে বাঘের বাচ্চার সাথে তুলনা করেছিলেন। আমেরিকার প্রথাবিরোধী কবি এ্যালেন গীনসবার্গ বঙ্গবন্ধুকে বাঙালি জাতির একজন প্রকৃত নেতা মনে করতেন। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্ধী পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো বলেছেন,‘শেখ মুজিবুর রহমান সন্মোহনী বাগ্মী ছিলেন। তিনি তাঁর রাজনৈতিক কৌশল আধিপত্য নিয়ে ব্যবহার করেছেন। এক্ষেত্রে আজ পর্যন্ত কোনো বাঙালি নেতা তার সমকক্ষ বা তাকে অতিক্রম করতে পারেননি।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন আপাদমস্তক একজন খাঁটি বাঙালি। সহজ সরল জীবন যাপনের মাধ্যমে তিনি নিজকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বাঙালিয়ানার প্রবাদপুরুষ হিসেবে। কথাবার্তা, চলনে-বলনে, পোশাক-আসাকে তিনি ছিলেন একজন স্বার্থক বাঙালি। বঙ্গবন্ধুর চরিত্রে দেশপ্রেম, নিজের ভাষা-সংস্কৃতি ও মানুষের প্রতি প্রবল ভালবাসার যে বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে তা পৃথিবীর অন্য কোনো নেতার চরিত্রে ঘটেনি। তিনি সব সময় সাদামাটা পোশাক পরিধান করতেন। বাইরের পায়জামা ও পাঞ্জাবী পরলেও ঘরে তিনি তাঁতের লুঙ্গি ও হাতকাটা গেঞ্জি পরিধান করতেন। তাঁর সাথে ঘনিষ্ঠ অনেকেই বলেছেন,‘বঙ্গবন্ধু বাঙালির চিরায়ত খাদ্য ভাত ও মাছ পছন্দ করতেন। সকালের নাস্তায় রুটির পরিবর্তে পান্তাভাত খেতে বেশী পছন্দ করতেন।

শিল্প-সাহিত্যানুরগী বঙ্গবন্ধু ছিলেন এর প্রতি বিশেষ শ্রদ্ধাশীল। কবি, সাহিত্যিক ও শিল্পীদের প্রতি ছিল তাঁর ভালোবাসা ও সু-দৃষ্টি। রবীন্দ্র প্রিয় বঙ্গবন্ধু রবীন্দ্র সঙ্গীতকে জাতীয় সঙ্গীতের মর্যাদা দিয়েছিলেন। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের গানকে তিনি রণসঙ্গীত হিসেবে নির্বাচিত করেছিলেন। শুধু তা ই নয় অসুস্থ কবি কাজী নজরুল ইসলামকে তিনি কলকাতা থেকে ঢাকায় এনে ভাতা ও বাসভবন প্রদান করেছেন। কবির নামানুসারে ঢাকার একটি সড়কের নামকরণ করেন কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ। স্বাধীনতার পর কবি র্ফরুখ আহমদকে অনুদান, শিল্পী কমল দাশগুপ্তকে রেডিওতে চাকুরী, কবি জসিমউদ্দীনকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগদান, অসুস্থ কবি হুমায়ুন কাদির, আবুল হাসান, মহাদেব সাহাকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে প্রেরণ। মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে লেখার কারণে কবি দাউদ হায়দারকে নিরাপত্তা দিয়ে কলকাতায় প্রেরণ। জেলখানা থেকে মুক্তি দিয়ে কবি আল মাহমুদকে চাকুরীর ব্যবস্থা। নাটকের ওপর থেকে প্রমোদ কর ও সেন্সর প্রথা সহজতর করে দেশে সাংস্কৃতি বিকাশের নতুন দ্বার উন্মোচন করেন।

বাংলাভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রবল অনুরাগী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রাদেশিক পরিষদের মন্ত্রী থাকাকালে ১৯৫৭ সালের ৩ এপ্রিল আইন সভায় বাংলা একাডেমি আইন পাশ হয়। বাংলাদেশ চলচিত্র উন্নয়ন সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা ও তিনি। পূর্ব পাকিস্তানের শিল্পমন্ত্রী থাকা কালে ১৯৫৭ সালের ৪ এপ্রিল তিনি প্রাদেশিক আইন পরিষদে চলচিত্র উন্নয়ন সংস্থা বিল উত্থাপন করেন।

বঙ্গবন্ধুর মনের উদারতা তাঁর চরিত্রকে করেছে আরো মহিমান্বিত। দেশবাসীও তাকে ভালোবাসতো প্রাণ দিয়ে। তাঁর নেতৃত্বেও এমনই একটি জাদুকরি শক্তি ছিল যে, দেশের সব শ্রেণী-পেশার মানুষ তাঁর নির্দেশে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছে এবং অকাতরে প্রাণ বিলিয়ে দিতে কুন্ঠাবোধ করেনি। কেননা, প্রতিটি বাঙালি জানতো ও বিশ্বাস করতো বঙ্গবন্ধু এমনই এক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব যার নিজের কোনো চাওয়া পাওয়া নেই। তাঁর একমাত্র লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল চিরনিপীড়িত মানুষের মুখে হাসি ফোটানো। তিনি মানুষের ভালবাসা ছাড়া আর কিছুই চান না। না প্রধানমন্ত্রীত্ব না প্রভুত্ব। তাঁর কাছে, অর্থ, সম্পদ, আড়ম্বরপূর্ণ জীবন ও ঐশ্বর্য সবই ছিল তুচ্ছ। মানুষকে ভালবাসতেন বলেই জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু থেকে গেছেন মানুষের কাতারেই।

এই ভালবাসা মানুষের প্রতি বিশ্বাসই একদিন কাল হলো। মানবিকতা ও মনুষ্যত্বেও ধারক বঙ্গবন্ধুর বিশ্বাস ছিল কোনো বাঙালি কোন দিন তাকে হত্যা করতে পারে না। তিনি সবার কাছে বলতেন সবাই আমার সন্তান তাই কে আমাতে মারতে আসবে। মানুষের প্রতি এই অবিচল বিশ্বাসই তাঁর মধ্যে মানবতাবাদের উৎকৃষ্ট গুণাবলীর উন্বেষ ঘটেছিল। তিনি শুধু বাঙালি বাংলাদেশের মানুষের প্রিয় নেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন বিশ্বের সব মানবতাবাদী ও শান্তিকামী মানুষের আদর্শ ও চেতনার মূর্তপ্রতীক। তিনি যখন কোথাও বক্তৃতা করতেন তা সবাই মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনতো। তাই বিশ্বেও অনেক বরেণ্য ব্যক্তি, গবেষক ও ইতিহাসবিদ বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অনেক মূল্যবান মন্তব্য করেছেন এর মধ্যে ইতিহাসবিদ উলপার্ট মুজিব-ভুট্টোর সাথে তুলনা করে বলেছিলেন যে, ‘সমগ্র পূর্বাঞ্চলে মুজিবের জনপ্রিয়তা জুলফিকারের পশ্চিমের তুলনায় অনেক বেশি ছিল। কারণ পূর্বাঞ্চলে ১ কোটি লোক বেশি। তারা সকলেই বাংলায় কথা বলে ও বোঝে। মুজিব বাংলা ভাষণে একজন অপ্রতিদ্ব›দ্ধী বাগ্নী।’
বক্তা হিসেবে বঙ্গবন্ধুর শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করে ভুট্টো নিজেই বলেছিলেন,‘শেখ মুজিবুর রহমান সম্মোহনী বাগ্মী ছিলেন। তিনি তাঁর রাজনৈতিক কৌশল অধিপত্য নিয়ে ব্যবহার করেছেন। এ ক্ষেত্রে আজ পর্যন্ত কোনো বাঙালি নেতা তার সমকক্ষ বা তাকে অতিক্রম করতে পারেননি।

ব্যক্তিত্বের উচ্চতা, চরিত্রের দৃঢ়তায় বিশ্বের সমসাময়িক নেত্রীবৃন্দকে টপকে গিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। তিনি যেমন ছিলেন সাহসী বিন¤্র ও বলিষ্ঠ চিত্রের মানুষ তেমনি ছিলেন দেশ-মাটি-মানুষকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরার জন্য নিঃশঙ্কচিত্র। তিনি এমনই এক দৃঢ় মনোবলের অধিকারী ছিলেন, যাকে বার বার জেলে নিয়ে নিগ্রিহিত করে, এমন কি মৃত্যুর ভয় দেখিয়েও পশ্চিমা শাসক-শোষকেরা তাঁর মনোবলে এইটুকুন চিড় ধরাতে পারেননি। তাঁকে দেশদ্রোহী প্রমাণের জন্য আগরতলা মামলা সাজিয়ে প্রাণনাশের চেষ্টাও করা হয়েছিল। সকল ভয়-ভীতি তুচ্ছ করে নির্ভয় ও নির্বার বঙ্গবন্ধু ঘুমন্ত বাঙালি জাতিকে জাগিয়ে তোলার শক্তি আয়ত্ব করে প্রত্যাঘাত হেনে সকল ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তকে প্রতিহত করেছিলেন। হন্তারকদের বুলেটে প্রাণ হারানোর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু কারো সাথে অন্যায় আপোষ করেননি। বরং তিনি মাথা উঁচু করে বাঙালি জাতিকে বিশ্বের দরবারে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে গেছেন।

বঙ্গবন্ধু ছিলেন মহত ও ক্ষমাশীল হৃদয়ের অধিকারী। তাই তিনি মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ বিরোধী দল ও সংগঠনের লোকজন বিশেষ করে রাজাকার, আলবদর, আল-শামস যারা সরাসরি পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর পক্ষে বাঙালি ও স্বাধীনতাকামী মুক্তিযোদ্ধাদের বিরোদ্ধে যুদ্ধ করেছিল তাদের অনেককেই ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। কিন্তু হত্যা, লুন্ঠন, অগ্নিসংযোগ ও ধর্ষণের মতো অপরাধের সাথে জড়িত ছিল তাদের ক্ষমা করেননি। সেই ক্ষমা করে দেয়ার জন্য আজও মহত প্রাণের বঙ্গবন্ধুকে সমালোচনা শুনতে হয়।

একজন বিশাল হৃদয়ের মানবতাবাদী নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধু বিংশ শতাব্দীর একজন শ্রেষ্ঠ রাজনীতিবিদ ও রাষ্ট্র নায়ক দৃঢ় চরিত্র ও দেশপ্রেমের পরিচয় পাওয়া যায় তাঁর চরিত্র বৈশিষ্ট্যে। সে সব ঘটনার মধ্যে অন্যতম ঘটনাটি দেশপ্রেমের উজ্জল ও শ্রেষ্ঠ উদাহরণটি হলো; দেশ স্বাধীন হওয়ার মাত্র তিন মাসের মধ্যে ভারতীয় মিত্র বাহিনীর সকল সেনাসদস্যকে বাংলাদেশের ভুখন্ড থেকে প্রত্যাহার করে নিতে একরকম বাধ্য হয়েছিল ইন্দিরা সরকার। এ থেকে তাঁর ব্যক্তিত্বে এক অসাধারণত্ব প্রকাশ পায়। যে ভারত ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বাঙালিদের জন্য এতকিছু করলো, সে ভারতকে তিন মাসের মধ্যেই বাংলাদেশ ছেড়ে চলে যেতে হয়েছিল যা বিশ্বেও যুদ্ধ ইতিহাসে একটি বিরল ঘটনা। কেননা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পঞ্চাশ বছর পরেও জার্মানীর মাটিতে মার্কিন, সোভিয়েত, ব্রিটিশ ও ফরাসী সেনাবাহিনীর অবস্থান ছিল। কোরিয় যুদ্ধের পঞ্চাশ বছর পরও দক্ষিণ কোরিয়ায় মার্কিন সৈন্য আর আর জাপানে এখনো মার্কিন সৈন্য অবস্থানের কথা উল্লেখ করা যায়।

বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন,‘আমাদের পরিস্কার কথা-আফ্রিকা হোক, লেটিন আমেরিকা হোক, আরব দেশ হোক, যেখানেই মানুষ শোষিত, যেখানে মানুষ অত্যাচারিত, যেখানে মানুষ দুঃখী, যেখানে মানুষ সা¤্রাজ্যবাদীদের দ্বারা নির্যাতিত আমরা বাংলার মানুষ দুঃখী মানুষের সঙ্গে আছি ও থাকবো।’ তাঁর এ দীপ্ত ঘোষণায়ই শেষ পর্যন্ত কাল হলো। সামাজ্যবাদী শক্তির রক্তচক্ষুর মুখোমুখী হলেন তিনি। তবু তিনি অবিচল থেকেছেন তাঁর কথা ও কাজে। মার্কিন ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তকে ব্যর্থ করে দিয়ে আমাদের স্বাধীনতা লাভ এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীন নীতি অনুসরণের অপরাধ সা¤্রাজ্রবাদীরা সহ্য করতে পারেনি। তাই স্বাধীনতা লাভের শুরু থেকেই আমেরিকার রোষানলে পড়েন বঙ্গবন্ধু। তাই তারা যে কোনো মূল্যে তাঁকে দুনিয়া থেকে চিরতরে সরিয়ে দেয়ার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে অর্থ ও খাদ্য সাহায্য বন্ধ করে দিয়ে কৃত্তিম খাদ্য সঙ্কট সৃষ্টির মাধ্যমে দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করে বঙ্গবন্ধুর পর্বত সমান জনপ্রিয়তায় ধ্বস নামানোর হেন কৌশল নেই যা তারা করেনি। সর্বোপরি, বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডে আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থা সি-আই-এ-এর জড়িত থাকার বিষয়টি এখন ওপেন সিক্রেট। আমেরিকা তাদের গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে; আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধুর আজন্ম শত্রু পাকিস্তান ও পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আই-এস-আই-এর সহযোগীতায় জিয়া, মোসতাক, ডালিম, ফারুক, রশিদের মতো ক্ষুনীদের দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করে।

তারপরও মৃত মুজিবের সাথে শুরু করে নতুন শত্রুতা। তাঁকে ইতিহাসের পাতা থেকে চিরতরে মুছে ফেলার জন্য বিভিন্ন সময়ে বঙ্গবন্ধুবিরোধী দেশি-বিদেশী শক্তি সরকারী প্রচার মাধ্যম ব্যবহার করে ইতিহাস থেকে বঙ্গবন্ধুর নাম নিশানা মুছে ফেলার অপতৎপরতা চালায়। নতুন প্রজন্মেও কাছে বঙ্গবন্ধুকে অচ্ছুত করে তোলার জন্য স্কুল,কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসার পাঠ্য বইতে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্নদ্রষ্ট্রা বঙ্গবন্ধুকে খলনায়কে পরিনত করার জন্য ইতিহাস বিকৃতির যত চেষ্টা আছে করা হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার মহানায়ক বঙ্গবন্ধুর অবিস্মরনীয় অবদানকে মুছে ফেলার কোনো অপচেষ্টাই তাদের সফল হয়নি। তাই স্বাধীনতার চল্লিশ বছর পরও তাঁর মহিমা ও কীর্তিগাঁথা প্রদ্যোত আলোর বিচ্ছুরণের ন্যায় বাঙালির প্রাণে প্রাণে ছড়িয়ে পড়েছে। তিনি চির অক্ষয়, বাঙালির হৃদয়ের মণিকোঠায় একান্ত আপনজন। জীবিত অবস্থায় পাকিস্তানী শোষকগোষ্ঠী তাঁকে বার বার গ্রেফতার করে, ভারত তাবেদারীর নানা অপবাদ দিয়েও যেমন স্থিমিত করতে পারেননি, তেমনি বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পর পাকিস্তানী হানাদার ও আই-এস-আই-এর এদেশীয় দোসর ও প্রেতাত্মরা শত চেষ্টা করেও বঙ্গবন্ধু মুজিবের নাম বাঙালির হৃদয় থেকে মুছে ফেলতে পারেনি।

তাই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের চরিত্র ও কৃতিত্ব বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখতে পাই, তিনি এমনই এক ব্যক্তিত্ব যিনি ত্যাগের মহিমা ও দেশপ্রেমের অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ, গৌরবে গৌরবান্বিত। বঙ্গবন্ধু মুজিব এখন বাঙালির প্রাণের প্রদীপ, বিদ্রোহের অগ্নিশিখা যিনি আমাদের যাবতীয় আতান্তরে পথ দেখান। ত্যাগ ও দেশপ্রেমের মহিমায় প্রদ্যোত তাঁর জীবন। বাংলা ও বাঙালির মুক্তির জন্য তিনি দীর্ঘ এক যুগেরও বেশী সময় কাটিয়েছেন কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে। অবহেলিত, শোষিত বাঙালির মুক্তি অন্দোলনে নিবেদিত প্রাণ বঙ্গবন্ধুর দুর্জয় সংকল্প স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠীর নির্মমতায় অবদমিত হয়নি। তিনি বারবার কারাগারে নিক্ষিপ্ত হয়েছেন। তাঁর জীবনের সুবর্ণ সময়গুলো অতিবাহিত হয়েছে পাকিস্তানী শোষকদের নির্জন, নিষ্ঠুর কারাগারের লৌহ কপাটের অন্তরালে। তাই বঙ্গবন্ধু শুধু কোনো ঐতিহাসিক চরিত্র নয়; মানুষের মুক্তি সংগ্রামে নির্ভীক নেতৃত্বের ক্ষেত্রে তাঁর অনন্যসাধারণ অবদান ইতিহাসকে করেছে সমৃদ্ধ, তাই বাঙালিরা যেমন তার কাছে ঋণী, তেমনি ঋণী বাংলাদেশ ও বাঙালির ইতিহাসও।