ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

বিভিন্ন উন্নয়ন সূচকে বাংলাদেশ যে প্রতিটি ক্ষেত্রেই এগিয়ে যাচ্ছে তা কেবল সরকার, মন্ত্রী, এমপি ও দেশের মানুষই বলছে না; বলছে বিশ্বের বাঘা বাঘা দেশ ও বিশ্বব্যাংকসহ বিশ্বের তাবত অর্থনীতিবিদরা। তাদের আরও অভিমত হলো ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি থেকে অবরোধের নামে ৯২ দিনব্যাপী বিএনপি-জামায়াত কর্তৃক সৃষ্টি অগ্নিসন্ত্রাস, নাশকতা ও দেশবিরোধী অর্থনীতিবিধ্বংসী কার্যকলাপ পরিচালিত না হলে দেশ আরো এগিয়ে যেত। আমাদের দেশের জিডিপি হতে পারতো ৭ শতাংশ পর্যন্ত।

গত ১২ জানুয়ারি ২০১৬ শেখ হাসিনা তার সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদের দুই বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে জাতির উদ্দেশ্যে যে ভাষণ দিয়েছেন তাতে তিনি তাঁর সরকারের বিগত দুই বছরের উন্নয়ন নিয়ে যে সেব কথা বলেছেন সে ভাষণটিও ছিল বেশ গুছালো। সেটি কোন আবেগনির্ভর ভাষণ ছিলনা। দ্বিতীয় মেয়াদে সরকারের এসে তিনি দেশ জাতি ও জনগণের উন্ননয়নের জন্য কী কী কাজ করেছেন এবং আগামী তিন বছরে তাঁর সরকারের পরিকল্পনায় যে সব মেগাপ্রকল্প রয়েছে তার অবস্থা কি তা জানিয়েছেন।

শেষ হাসিনার এ ভাষণ নিয়ে আমি অনেকের সাথে আলাপ করেছি, সবাই বলেছেন, শেখ হাসিনার এ বক্তব্যে কোনো অতিরঞ্জন ছিল না বরং গত দুই বছরের তাঁর সরকার যা করেছে তা যথাযথভাবেই উপস্থাপন করেছেন। যাক ২০১৪ সালের পর থেকে বিশেষ করে দেশের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশ যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছেন তা এক কথায় অভাবনীয়।

সেদিন শেখ হাসিনা যেদিন রেডিও, টেলিভিশনের জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিয়েছেন; ওই দিনই দেশের সকল সংবাদ মাধ্যমে একটা খবর প্রকাশিত হয়েছে। খবরটি ছিল ‘উইন ও গ্যালাপ ইন্টারন্যাশনাল’নামের একটি খ্যাতিমান প্রতিষ্ঠানের জরিপের ফলাফল। ওই জরিপে সারাবিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশকে সবচেয়ে আশাবাদের দেশ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এখানে বলে রাখা ভাল জরিপটি কোন বাংলাদেশী প্রতিষ্ঠান করেনি, সরকারের তো নয়ই। যারা করেছে সেই প্রতিষ্ঠানের নাম ‘উইন ও গ্যালাপ ইন্টারন্যাশনাল’। এটি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান। ওই জরিপে দেখা যাচ্ছে, সবচেয়ে আশাবাদের দেশ হচ্ছে বাংলাদেশ। আশাবাদের প্রশ্নে বাংলাদেশের ‘স্কোর’ হচ্ছে ৭৪ শতাংশ। দশটি দেশের মধ্যে আশাবাদের নিরিখে দ্বিতীয় দেশটি হচ্ছে চীন। তাদের স্কোর হচ্ছে ৭০ শতাংশ। এই তালিকায় পাকিস্তান দশ নম্বরে আর ভারত নয় নম্বরে। তাদের স্কোর যথাক্রমে ৪২ ও ৪৭ শতাংশ।

অন্য যারা এই তালিকায় স্থান পেয়েছে তারা হচ্ছে- নাইজিরিয়া, ফিজি, মরক্কো, সৌদি আরব, ভিয়েতনাম ও আর্জেন্টিনা। এদিকে অর্থনৈতিক সম্ভাবনার ভিত্তিতে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশ এই দশটি দেশের মধ্যে দ্বিতীয়। এখানে ‘স্কোর’ ৬০ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনা নাইজিরিয়ার। তাদের স্কোর ৬১ শতাংশ। সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ব্যাপার হচ্ছে, চীন এই তালিকায় তৃতীয়, স্কোর ৫৪ শতাংশ। ভারতের স্কোর ৪৪ শতাংশ এবং তালিকায় স্থান ছয় নম্বরে। তিনটি আলাদা সূচকের ভিত্তিতে বিশ্বের শীর্ষ ১০টি আশাবাদী ও শীর্ষ ১০টি নৈরাশ্যবাদী দেশের তালিকা করা হয়েছে। আশাবাদ, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও সুখ এ তিন সূচক এক্ষেত্রে বিবেচনায় নেয়া হয়। বিশ্বব্যাপী ৬৬ হাজার ৪০ জন মানুষের ওপর জরিপটি চালিয়েছে গ্যালাপ। অংশগ্রহণকারী প্রতিটি দেশের প্রায় এক হাজার নারী-পুরুষের সাক্ষাতকার নিয়ে সংগ্রহ করা হয়েছে তথ্য। গত বছরের ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর সময়ে এ কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। আর প্রাপ্ত এ তথ্য বিশ্লেষণ করে সম্প্রতি প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে উইন-গ্যালাপ।

এ জরিপ প্রসংগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরে সাবেক শিক্ষক ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যানেজমেন্ট ইকোনমিস্ট ড. আর.এম দেবনাথ ১৫ জানুয়ারি ২০১৬ তাঁর ‘সবচেয়ে আশাবাদের দেশ’ সৃষ্টির কারিগরকে অভিনন্দন” শিরোনামের নিবন্ধে বলেছেন,“যারা মনোযোগসহকারে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ভাষণটি পড়বেন তারাই বুঝতে পারবেন মানুষ আশাবাদী হচ্ছে অনেক কারণে, যার একটা ইঙ্গিত তিনি তার ভাষণে দিয়েছেন। আমার কাছে মনে হচ্ছে আশাবাদের কারণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উভয়ই।

১৬ কোটি মানুষ পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে ২০১৪ সালের নির্বাচন পূর্বকালীন ভয়াবহ দিনগুলো এখন শুধুই স্মৃতি। গত দুই বছর যাবত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিরাজ করছে। জ্বালাও-পোড়াও নেই। এই স্থিতিশীলতার ফল পাচ্ছে অর্থনীতি, ফল পাচ্ছে সাধারণ মানুষ। শুধু দুই বছরের বিষয় নয়, দেখা যাচ্ছে বিগত সাত বছর যাবত অব্যাহতভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতি ছয় শতাংশের ওপর ‘জিডিপি’ প্রবৃদ্ধি অর্জন করে যাচ্ছে, যা একটা আশাপ্রদ ঘটনা এবং আঞ্চলিকভাবে একটা বড় উদারহণ। দেখা যাচ্ছে, এই দ্রুত অব্যাহত উন্নয়নের ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতি ‘জিডিপি’র ভিত্তিতে আজ বিশ্বে ৪৫তম। আর যদি ক্রয়ক্ষমতার ভিত্তিতে (পিপিপি অর্থাৎ পারচেইজিং পাওয়ার প্যারিটি) হিসাব করা হয় তাহলে আমাদের অর্থনীতি আজ বিশ্বে ৩৩তম।”

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লর রহমান এ প্রসংগে তার বক্তব্যে বলেন, “স্বাধীন বাংলাদেশের অন্যতম অর্জন হলো, সাধারণ মানুষের ব্যক্তিত্ব ও আকাঙ্ক্ষার বিপ্লব। কোনো মানুষ এখন আর শুধু ভাগ্যের ওপর নির্ভর করে বাঁচতে চায় না। তার ব্যক্তিত্বের আকাঙ্খা প্রকাশ পায় আশাবাদের মাধ্যমে। তবে এ আশাবাদ তার প্রকৃত অবস্থার প্রতিফলন নয়। আসলে কোনো অবস্থাতেই বাংলাদেশের মানুষ এখন আর পিছিয়ে থাকতে চায় না। আর এ আশাবাদগুলোরই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে আলোচ্য প্রতিবেদনে।

ওই জরিপে আরও উল্লেখ করা হয়েছে বাংলাদেশের ৮১ শতাংশ মানুষের প্রত্যাশা, ২০১৬ সালে তাদের জীবনে সমৃদ্ধি আসবে। ৭ শতাংশ মানুষ এ বিষয়ে নৈরাশ্যবাদী। জরিপে অংশ নেয়া ১১ শতাংশ মানুষ মনে করছে, তাদের বর্তমান অবস্থার পরিবর্তন এ বছরে ঘটবে না। আর ২ শতাংশ মানুষের কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। সব মিলিয়ে ৭৪ শতাংশ বাংলাদেশী চলতি বছর উন্নত ভবিষ্যতের ব্যাপারে আশাবাদী। তাদের এ আশাবাদ গ্যালাপের সূচকে বিশ্বের শীর্ষ ১০ আশাবাদী দেশের তালিকায় প্রথম স্থানটি নিশ্চিত করেছে।

এ জরিপের ফলাফলে এই আশাবাদের ভিত্তি কী তা আর কেউ প্রশ্ন কওে জানতে চাননা। কেননা, তারা চোখে প্রতিনিয়ত বাংলাদেশের কোন কোন না উন্নয়ন দৃশ্যমান হচ্ছে। বিজ্ঞজনেরা মনে করে আশাবাদের শক্ত ভিত্তি বাংলাদেশ ইতমধ্যেই অর্জন করেছে। কেননা, এ ব্যাপারে উদাহরণ দিতে গেলে বেশিদূর যেতে হবে না। বিএনপি জামায়াত শাসিত শাসনামল এবং সেনাশাসিত তত্বাবধায়ক সরকারের ২০০৯ সালের দিকে দেশে খাবার নেই, টাকা দিয়েও বিশ্বে চাল পাওয়া যায় না। তখন বাংলাদেশের তখনকার অন্ধকার দিনগুলোর কথা তো মানুষ এখনও স্মিৃত হয়ে যায়নি। মানুষের ঘরে খাবার নেই। বিদ্যুৎ নেই ২৪ ঘন্টার মধ্যে ১৬ ঘন্টাই লোডসেডিং অফিসে বিদ্যু নেই, বিদ্যুতের অভাবে কারখানায় অচল, বিদ্যুতের অভাবে মানুষ তাদেও কৃষি জমিতি সেচ দিতে পারছেনা। খাদ্যের অভাবেদেশের মানুষকে ‘আলু খাওয়ার’ গান শোনানো হয়। ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ। ব্যবসায়ীরা নাজেহাল।

তা হলে বর্তমানে দেশের প্রতিটি ক্ষেত্রে উন্নয়নের ফলে মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস কেন ফেলবেই না। চালে দেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ। চালের দাম স্থিতিশীল। বাজারে অফুরন্ত চাল। চালের অভাবে, ভাতের অভাবে কেউ ভোগে না। উত্তরবঙ্গে মঙ্গা নেই। মঙ্গা শব্দটি নির্বাসিত। প্রধানমন্ত্রীসেদিন তার ভাষণে বলেছেন পাঁচ কোটি লোক নিম্ন আয় থেকে মধ্য আয়ে উন্নীত হয়েছে। বলাবাহুল্য, এই পাঁচ কোটি লোকের একটা বড় বাজারের দেশ বাংলাদেশ। এটা কিন্তু বিশাল ঘটনা। বাংলাদেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ লোক বাজার অর্থনীতির বড় অংশীদার। তারাই ক্রেতা, বড় বড় ক্রেতা। ফ্ল্যাট কিনছে তারা, গাড়ি কিনছে তারা। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়, প্রাইভেট মেডিক্যাল কলেজ ইত্যাদির সেবা নিচ্ছে এরা। এরাই দেশ-বিদেশ চাকুরী করছে। এসব পরিশ্রমি মানুষ শুধু অর্থনীতির ভিত্তিই শুধু শক্ত করছে না, সমাজকে করছে উদার ও জ্ঞানভিত্তিক। এগুলো অবশ্যই আশাবাদী হওয়ার মূল কারণ।

শেষ করতে চাই এই বলেই বর্তমান সরকারের যুগপোযুগি উন্নয়ন ব্যবস্থাপনা ও বাস্তবায়নের ফলে দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা আর দৈনন্দিন জীবনের টানাপড়েন এতসব বিপত্তির পরও আশাবাদী বাংলাদেশের মানুষ। আগামীতে সুদিন আসছে এমন আশায় বিশ্বাস রাখছে তারা। ফলে বিশ্বের সবচেয়ে আশাবাদী দেশের তকমা এখন বাংলাদেশের। এ প্রসংগে পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল-এর এর বক্তব্য দিয়েই শেষ করতে চাই তা হলো তিনি সংবাদ মাধ্যমে বলেছেন, “একটি দেশের মানুষের আশাবাদী হওয়ার পেছনে যেসব বিষয় কাজ করে, তার মধ্যে অন্যতম বড় স্বপ্ন দেখা এবং তার বাস্তবায়ন। এক দশক আগেও দেশের মানুষ যেসব বিষয় কল্পনাও করতে পারত না, এখন সেগুলো বাস্তবে প্রত্যক্ষ করছে। এর পাশাপাশি সরকার নিজস্ব অর্থায়নে অনেক বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের সাহস দেখিয়েছে। এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের মনে। এর সঙ্গে যে বিষয় কাজ করছে তা হলো, আমাদের জাতীয়তাবোধ ধীরে ধীরে আরো সুসংহত হচ্ছে।”