ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

গত সোমবার ২৫ জানুয়ারি ২০১৬ রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউশনের সেমিনার হলে জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি সম্মেলনে বক্তৃতাকালে বিএনপির ভরপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তাদের দলীয় প্রধান খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতির দায়ে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা দায়েরের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, এ সরকার দেশনেত্রীর বিরুদ্ধে একটা পর একটা মিথ্যা মামলা করছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলা, অমুক মামলা করছে। সর্বশেষ তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা করা হলো। যিনি ১৯৭১ সালে রাষ্ট্রের জন্য কারাবরণ করেছেন।‘এ ত্যাগের জন্য তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা হতে পারে না’ – যার স্বামী স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন। আর তিনি তিনবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন।

তিনি আরও বলেন,“সরকার খালেদা জিয়াকে দেশের রাজনীতি থেকে সরাতে চায় বলেই তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা করিয়েছে। বেগম জিয়া বাইরে থাকলে, রাজনীতিতে থাকলে, রাস্তায় বের হলে তাদের টনক নড়ে যায়। তাদের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়ে। সেজন্য তারা বেগম জিয়াকে রাজনীতি থেকে সরাতে চায়। দেশের মানুষ এ চেষ্টা কোনভাবেই মেনে নেবে না ।

এখানে উল্লেখ্য যে, মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের সংখ্যা নিয়ে এবং বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা নয়, বরং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে চেয়েছিলেন এমন আপত্তিজনক মন্তব্য করার ঘটনায় রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার পর বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে সমন জারি হয়েছে। আদালত আগামী ৩ মার্চের মধ্যে খালেদা জিয়াকে আদালতে হাজির হয়ে অভিযোগের বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে নির্দেশ দিয়েছেন। সুপ্রীমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক এ্যাডভোকেট ড. মোমতাজউদ্দিন আহমদ মেহেদীর দায়ের করা রাষ্ট্রদ্রোহের মামলায় এ আদেশ দেয়া হয়।

মির্জা ফকরুলের এ জাতীয় বক্তব্য প্রসংগে বলতে চাই যে, তার দলীয় প্রধানের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা নিয়ে তিনি আক্ষেপ করতেই পারেন, এটা নিয়ে কারো কিছু বলার নেই। কিন্তু আপত্তি হলো ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে খাদেলা জিয়া “কারাবরণ করেছেন” …এ ইতিহাস বিকৃতি নিয়ে। আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস চর্চা করি সবাই জানি মুক্তিযুদ্ধের সময় ঘটনাচক্রে তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করলেও তার স্ত্রী মুক্তিযুদ্ধের পুরো নয় মাস পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর কুখ্যাত উর্ধতন সামরিক অফিসার জানজুয়ার ডেরায় “বিশেষ মেহমান” হিসেবে আয়েশি জীবনযাপন করেছেন। সে সময় মেজর জিয়া খালেদাকে তার কাছে চলে যাওয়ার জন্য বিশেষ দূত মারফত বার বার চেষ্টা করলেও খালেদা জিয়া পাকিস্তান সেনাবাহিনী বিশেষ আতিথ্য ছেড়ে কিছুতেই জিয়ার কাছে যেতে রাজি হননি। এ নিয়ে বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় অনেক লেখা হয়েছে। তাই নিয়ে নিয়ে কোন অরুচিকর লেখা লিখতে নিজের রুচিতেও বাধে, কিন্তু মির্জা ফকরুল যখন বলেন “যিনি ১৯৭১ সালে রাষ্ট্রের জন্য কারাবরণ করেছেন।‘এ ত্যাগের জন্য তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা হতে পারে না’ – তখন এমন জগন্য ইতিহাস বিকৃতি ও মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে কিছু একটা না লিখে বসে থাকা যায় না।

জনাব মির্জা ফকরুল ইসলাম আলমগীরের হয়তো জানা নেই যে, মুক্তিযুদ্ধের পর মেজর জিয়া খালেদা জিয়াকে স্ত্রী হিসেবে নিজ গৃহে ফিরিয়ে নিতে অস্বীকার করলে বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনুরোধেই বঙ্গবন্ধুর মধ্যস্থতায় খালেদা জিয়াকে মেজর জিয়া নিজ গৃহে ফিরিয়ে নিয়েছিলেন। আর এখন কি না মির্জা ফকরুল বলেন,“ ১৯৭১ সালে রাষ্ট্রের জন্য কারাবরণ করেছেন।‘এ ত্যাগের জন্য তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা হতে পারে না’। ফকরুলের এ বক্তব্য যে কত বড় ইতিহাস বিকৃতি তা নিয়ে বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের ‘টকশো’তে নিন্দা জানানো হয়েছে।

দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা গেছে, এ মামলায় যদি সত্যি সত্যি খালেদা জিয়া ফেঁসে যান তা হলে বিএনপির খবর আছে। আইনজ্ঞদের এ মামলার বিভিন্ন ধারা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণে করে বলেছেন, মামলায় দন্ডবিধির ১২৪ (ক) ধারার রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগের পাশাপাশি ১২৩ (ক) ধারায় বাংলাদেশ সৃষ্টির নিন্দা ও তার সার্বভৌমত্ব বিলোপে সমর্থন করার এবং ৫০৫ ধারায় জনগণের অনিষ্ট সাধন সহায়ক বিবৃতি দেয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। আদালত ৩টি ধারায়ই অভিযোগ আমলে নিয়ে সমন জারির ওই আদেশ দেন। মামলার ৩টি ধারার মধ্যে ১২৪ (ক) ধারায় সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন পর্যন্ত সশ্রম কারাদন্ড ও সর্বনিম্ন ৩ বছর কারাদন্ড ও যে কোন পরিমাণ অর্থদন্ড অথবা শুধু যে কোন পরিমাণ অর্থদন্ড, দন্ডবিধির ১২৩(ক) ধারায় সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত যে কোন মেয়াদের সশ্রম কারাদন্ডসহ অর্থদন্ড এবং দন্ডবিধির ৫০৫ ধারায় সর্বোচ্চ ২ বছর কারাদন্ড ও অর্থদন্ড অথবা উভয় দন্ডের বিধান রয়েছে। মামলায় দৈনিক আমাদের সময় পত্রিকার প্রকাশক এসএম বক্স কল্লোলসহ ৮ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে।

তারপরও বিএনপি নেতাদের ইতিহাস বিকৃত ও নতুন ইতিহাস সৃষ্টির অপপ্রয়াস বন্ধ হয়নি। তারা এখন খালেদা জিয়াকে ডিফেন্ড করার জন্য মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নতুন নতুন তত্ব আবিষ্কার করে জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর তো দাবিই তুলেছেন যে, মুক্তিযুদ্ধে আসলে কতজন শহীদ বা হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছে সে তথ্য খানাতল্লাসি করে সরকারকেই বের করতে হবে। আর এক নেতা যিসন ইতমধ্যে দেশের মানুষের কাছে গোয়েবলস এর প্রেতাত্মা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন। সেই নেতা রিজভী সাহেব ২৮ জানুয়ারি ২০১৬ ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে (ড্যাব) আয়োজিত চিকিৎসক সমাবেশে বলেন, ‘যুদ্ধে যাদের ভূমিকা নেই তাদের দিয়ে জাতির পিতা বা স্বাধীনতার ঘোষক বানাতে চাইলেই বানানো যায় না।’ তিনি আরও বলেন,‘বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের শহীদদের সংখ্যা উল্লেখ করেননি। তিনি বলেছেন, শহীদদের সংখ্যা নিয়ে বির্তক আছে। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক তাজউদ্দীন আহমদ বলেছিলেন, ১০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি। তার এ বক্তব্যের জন্য খালেদা জিয়ার আগে তাজউদ্দীন আহমদের নামে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা হওয়া উচিত। এরপর আরও অনেকেই শহীদদের বিভিন্ন সংখ্যার কথা বলেছেন।’
আমাদের মহান স্বাধীনতার স্থপতি, যিনি মহান মুক্তিযুদ্ধের ডাক দিয়েছিলেন; যার নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে, দেশ স্বাধীন হয়েছে তিনিই নাকি মুক্তিযুদ্ধ দেখেননি! এসব কথা যারা বলেন, তাদেরকে পাগল বললে কী ভুল বা অপরাধ হবে? এই দলটির পক্ষে ইতিহাস বিকৃতির ঘটনা নতুন কিছু নয়। ১৯৭৫ সালের পর বিএনপি প্রিতিষ্ঠার পর থেকে যে তাদের ইতিহাস বিকৃতি শুরু হয়েছে, এখন তা সমান তালে চলছে। মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের সংখ্যা নিয়ে নতুন করে তাদের ইতিহাস বিকৃতির সাথে জনাব ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের লেখাটি প্রাসঙ্গিক বলেই পাঠকদের জন্য সেই লেখাটি অংশবিশেষ এখানে উদ্ধৃত করছি।
২৯ জানুয়ারী ২০১৬ শাহজালালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক লেখক ও কলামিস্ট জনাব মুহম্মদ জাফর ইকবাল দৈনিক জনকন্ঠে “সাদাসিধে কথা” শিরোনামে প্রকাশিত তাঁর লেখায় বলেছেন,“যারা গণহত্যা করে তারা কখনই স্বীকার করতে চায় না যে তারা গণহত্যা করেছে। আর্মেনিয়ানরা প্রায় এক শ’ বছর ধরে চেষ্টা করে আসছে তবুও তুরস্ককে স্বীকার করাতে পারেনি যে তারা গণহত্যা করেছে। পাকিস্তানও বলতে শুরু করেছে তারাও বাংলাদেশে গণহত্যা করেনি। যারা স্বীকার করতে চায়না হয় তারাও সব সময় চেষ্টা করে সংখ্যাটাকে ছোট করে দেখাতে। হত্যাকান্ডের এ রকম পরিসংখ্যান দেখে আমরা মোটেও অবাক হই না। কারণ আমরা সবাই জানি হত্যাকারীরা তালিকা করে হত্যাকান্ড ঘটায় না এবং হত্যা করার পর তারা সেই তালিকা প্রকাশও করে না। কাজেই সবাই একটা আনুমানিক সংখ্যা বলে থাকেন। …আমাদের বাংলাদেশের বেলাতেও তাই হয়েছে, একটা আনুমানিক সংখ্যা বলা হয়েছে। একাত্তর সালে প্রায় এক কোটি শরণার্থী দেশ ছেড়ে চলে গিয়েছিল তাদের একটা বড় অংশ রোগে শোকে মারা গেছে, তাদের সংখ্যাটা ধরা হলে একাত্তরে শহীদের সংখ্যা খুব সহজেই ত্রিশ লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে।… যে দেশের বড় বড় বুদ্ধিজীবী মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন করেন সেই দেশে খালেদা জিয়ার মতো একজন সেটাকে আরও এক কাঠি এগিয়ে নিয়ে গেলে আমাদের অবাক হবার কিছু নেই। পাকিস্তানের জন্য তার মমতা আছে। একাত্তরে তিনি পাকিস্তানীদের সাথে মিলিটারি ক্যান্টনমেন্টে ছিলেন। শুধু যে খালেদা জিয়া এই দেশের শহীদদের অসম্মান করেছেন তা নয়, তার দলও খালেদা জিয়ার বক্তব্যকে সমর্থন করে গেছে। দলটির মাথা থেকে আরও উদ্ভট কিছু বুদ্ধি বের হয়েছে, সেটি হচ্ছে জরিপ করে মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের সংখ্যাটি বের করে ফেলা! জরিপ করে মানুষের পছন্দ-অপছন্দের কথা জানা যায় কিন্তু একটি তথ্য বের করে ফেলা যায় সেটি আমি জন্মেও শুনিনি!”

শেষ করবো এই বলেই যে, বিএনপি নামক দলটি আর কত ইতিহাস বিকৃত করবে। তারা কেন বুঝতে চায় না, দেশের সচেতন মানুষ এখন আর তাদের এসব ইতিহাস বিকৃতি আর মিথ্যাচারে বিশ্বাস করে না। বিএনপির যে আজ এ করুন হাল তার জন্য শতভাগ দায়ি তাদের ইতিহাস বিকৃতি ও মিথ্যাচার। সম্প্রতি পৌরসভা নির্বাচনের ফলাফল দেখেও কী তাদের বোধদ্বয় হবে না!