ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

“আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যত” এই নীতিবাক্যটি আমরা সবাই জানি। শিশুরাই আগামীর কর্ণধার। শিশুরা নিষ্পাপ। তা জানার পরও আমাদের দেশের শিশুরা আজকাল প্রায়ই দুর্বৃত্তদের ঘৃণ্য টার্গেটে পরিণত হচ্ছে। কোমলমতি শিশুরা শিকার হচ্ছে খুন, গুম, অপহরণ, নির্যাতনসহ বিভিন্ন সহিংসতার। শিশুহত্যা সমাজে এক ধরনের মানবিক বিপর্যয়। বর্তমানে বাংলাদেশে শিশুদের নিরাপত্তা চরম ঝুঁকির মুখে। বর্তমানে সারা দেশেই কিছু স্বার্থান্বেষী মহলের শিশুর ওপর নির্মম ও বর্বরোচিত আচরণ দংশন করছে মানবতাবোধকে। চলতি বছরের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতেই একাধিক শিশু খুন ও সহিংসতার শিকার হয়েছে। শিশু অপহরণ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়েই চলেছে, যা সভ্য সমাজের জন্য মোটেই কাম্য হতে পারেনা। শিশুরা যে শুধু দুর্বৃত্তদের দ্বারাই আক্রান্ত বা আহত নিহত হচ্ছে তা ই নয়। শিশুরা নিজ পরিবারের সদস্য এমন কী নিজ গর্ভধারিণী মা, বা জন্মদাতা বাবার হাতেও খুন হচ্ছে। অনেক সময় পারিবারিক কলহে পড়ে মা-বাবাসহ আত্মীয়স্বজনরা শিশুর সর্বনাশ করছে। ‘আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) প্রতিবেদনে প্রকাশিত-‘২০১৫ সালে দেশে ১৩৩ শিশু হত্যার শিকার হয়েছে। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের হিসাবে, গত চার বছরে এক হাজার ৬৯ জন শিশুহত্যা, এক হাজার শিশু ধর্ষণ এবং প্রায় ৫০০ শিশু অপহরণের শিকার হয়েছে’। এসব হত্যাকান্ডের মধ্যে অনেক ঘটনা, মা-বাবা বা স্বজনদের দ্বারা সংঘটিত হয়েছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

কেন এমন সমাজবিরোধী ঘটনা ঘটছে তার মূল কারণ সামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধের অভাব, অপ্রতিরোধ্য শিশুশ্রম, পরকীয়া, সম্পদের লোভ, বেকারত্ব, ভিনদেশী কালচার-সংস্কৃতির প্রভাব, অনলাইন প্রযুক্তিতে পর্নোগ্রাফির প্রসার ও সহজলভ্যতা, বেপরোয়া জীবনযাপন, পাচার, কর্তৃত্বের বিরোধ-শত্রুতা, ব্যক্তি স্বার্থপরতা ইত্যাদি নেতিবাচক প্রভাবে সমাজের বিবেক বর্জিত কতিপয় নোংরা মস্তিষ্কের লোক শিশুদের প্রতি নৃশংস আচরণে সম্পৃক্ত হচ্ছে। তাই এসব নৃশংসতা বন্ধ করতে হলে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি ও কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ অতি গুরুত্বপূর্ণ।

প্রিয় পাঠক বর্তমান সময়ে আমাদের দেশে শিশুর প্রতি কি পরিমাণ সহিংসতা হচ্ছে তা নিচের তথ্যগুলো পর্যালোচনা করলেই বোঝা যাবে। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের (বিএসএএফ) তথ্য অনুযায়ী, গত চার বছরে এক হাজার ৬৯ শিশু হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৫ সালে ২৯২টি, ২০১৪ সালে ৩৫০টি, ২০১৩ সালে ২১৮টি এবং ২০১২ সালে ২০৯টি শিশু খুন হয়েছে। চার বছরে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৯৭৬ শিশু। গত বছর ধর্ষণের পরিমাণ আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। ২০১৫ সালে ৫২১ শিশুকে ধর্ষণ করা হয়েছে, যার মধ্যে ৯১ শিশু গণধর্ষণের শিকার হয়। ২০১৪ সালে ধর্ষণের শিকার হয় ১৯৯ শিশু, ২০১৩ সালে ১৭০ এবং ২০১২ সালে ৮৬ শিশু।

পুলিশ সদর দপ্তরের সংকলিত নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলার সংখ্যা পর্যালোচনা থেকে দেখা যায় ২০১৪ সালে ২১২৯১ টি মামলা হলেও ২০১৫ সালে ২১৭২২টি মামলা (প্রাক্কলিত, ১১ মাসে ১৯৯০২টি) রেকর্ড হয়েছে। যা অন্তত ২% মামলা বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়। বাংলাদেশে  নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় প্রতিদিন গড়ে ৬০টি মামলা দায়ের হয়, যা ঘন্টায় ২.৪৭টি! সর্বাধিক ৪৭১৪টি মামলা ঢাকা রেঞ্জে এবং সর্বনিম্ন রেলওয়ে রেঞ্জে ৫টি মামলার রেকর্ড পরিলক্ষিত হয়েছে। বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির বিভিন্ন আইনী সেবা কেন্দ্রে ২০১৫ সালে ১৭৬৮৪জন নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশু আইনী সহায়তার জন্য আবেদন করেছেন, যা বিগত কয়েক বছরের তুলনায় সর্বাধিক। এ থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় ২০১৫ সালে নারী ও শিশু নির্যাতন বৃদ্ধি পেয়েছে।

শিশুদের মানবাধিকার এবং সকল শিশুর জন্য অধিকার সংরক্ষণে সব দেশের সরকারকে যে নিরিখগুলো অবশ্যই গ্রহণ করতে হবে সেগুলো খুব সংক্ষেপে অথচ সম্পূর্ণভাবে বিবৃত হয়েছে একটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তিতে। এটি হচ্ছে শিশু অধিকার সনদ। এ সনদ ইতিহাসের সবচেয়ে সর্বজনীন মানবাধিকার দলিল। তাই এ দলিল মানবাধিকারের সর্বজনীন প্রয়োগ অন্বেষায় অনন্যভাবে শিশুদেরকে মধ্যমণি করে তুলেছে। দলিলটি অনুমোদনের মাধ্যমে জাতীয় সরকারগুলো শিশুদের অধিকার রক্ষা ও নিশ্চিত করতে অঙ্গীকারাবদ্ধ হয়েছে এবং এ অঙ্গীকার বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে নিজেদের দায়বদ্ধ করে তুলেছে।
বৈচিত্র্যপূর্ণ আইনব্যবস্থা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের আলোকে তৈরি শিশু অধিকার সনদটি সর্বজনীনভাবে গৃহিত কিছু অবিনিমেয় নিরিখ ও দায়দায়িত্বের সমাহার। এতে বর্ণিত রয়েছে শিশুরা সর্বত্র বৈষম্যহীনভাবে ভোগ করতে পারে এমন কিছু মৌলিক মানবাধিকার: বেঁচে থাকার অধিকার; পূর্ণ মাত্রায় বিকাশের অধিকার; কুপ্রভাব, নির্যাতন ও শোষণ থেকে নিরাপদ থাকার অধিকার; এবং পারিবারিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক জীবনে পুরোপুরি অংশগ্রহণের অধিকার। সনদে বর্ণিত প্রতিটি অধিকার প্রত্যেক শিশুর মানবিক মর্যাদা ও সুষম বিকাশের জন্য অপরিহার্য। স্বাস্থ্য পরিচর্যা, শিক্ষা ও আইনগত, নাগরিক ও সামাজিক সেবা প্রদানের মান নির্ধারণের মাধ্যমে এ সনদ শিশুদের অধিকার সংরক্ষণ করে থাকে। এ মানগুলোর নিরিখে এসব ক্ষেত্রে অগ্রগতি পরিমাপ করা যাবে। যেসব রাষ্ট্র এই সনদের শরিক তারা শিশুদের সর্বোচ্চ স্বার্থের আলোকে যাবতীয় নীতি প্রণয়ন ও কার্যক্রম গ্রহণ করতে দায়বদ্ধ।

শিশু অধিকার সনদ আইনগতভাবে বাধ্যবাধকতাপূর্ণ প্রথম আন্তর্জাতিক দলিল যাতে সব ধরনের মানবাধিকার- নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার এবং অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার- সন্নিবেশিত হয়েছে। সনদের বিধানগুলোকে জোরালো করতে সশস্ত্র সংঘাতে শিশুদের জড়িত করা ও শিশু বিক্রয়, শিশুদের পতিতাবৃত্তি ও তাদের নিয়ে অশ্লীল চলচ্চিত্র সম্পর্কে দুটি ঐচ্ছিক প্রটোকল গৃহিত হয়ে। প্রটোকলগুলো যথাক্রমে ২০০২ সালের ১২ ফেব্র“য়ারি ও ১৮ জানুয়ারি তারিখে বলবৎ হয়।

জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদে যেখানে কোনো ধরনের বৈষম্য ব্যতিরেকে শিশুদের তাদের মাতাপিতার জাতি, বর্ণ, লিঙ্গ, ভাষা, ধর্ম, রাজনৈতিক বা অন্যান্য মতামত, জাতীয় উৎস, নৃগোষ্ঠীগত বা সামাজিক উৎস, সম্পত্তি, অক্ষমতা, জন্মগত বা অন্যবিধ মর্যাদা অধিকার দিয়েছে। এতসব জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আইনের বিধান থাকা সত্ত্বেও কি চলতে থাকবে শিশুদের প্রতি সহিংসতা? সরকারের উচিত এ সহিংস আচরণ থেকে শিশুদের রক্ষা করার জন্য সচেতন উদ্যোগ গ্রহণ করা।

শিশুদের প্রতি নৃসংশতা বন্ধ এবং তাদের সুরক্ষার জন্য পরিবারের ভূমিকার পাশাপাশি সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করা খুবই জরুরী। শিশু নির্যাতন ও হত্যার মতো অমানবিক ঘৃণ্য অপরাধ প্রতিরোধ করতে আমাদের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা ও সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। কোমলমতি শিশুদের জীবনের নিরাপত্তায় শিশু নিরাপত্তা আইনের প্রয়োগ দেশের প্রতিটি মানুষের ঐকান্তিক দাবি। আইন প্রয়োগে শীথিলতার কারণে আমাদের দেশে অব্যাহতভাবে শিশুর প্রতি নৃশংসতা বেড়েই চলেছে। সম্প্রতি রাজধানীর রামপুরায় মা তার গর্ভজাত দুই সন্তানকে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করেছে। এ নৃশংস হত্যাকান্ড যেন আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের ভিতকে নাড়িয়ে দিয়েছে। তাই এখনই সময় শিশুদের প্রতি সহিংসতা ও নৃশংসতা বন্ধ করতে জরুরী পদক্ষেপ গ্রহণ। আমরা আর কোন কোমলমতি শিশু হত্যার খবর শুনতে চাইনা। আমাদের বিবেক জাগ্রত হোক। জাগ্রত হোক মানবিক মূল্যবোধ। বন্ধ হোক শিশুর প্রতি সহিংসতা ও যত অনাচার।