ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

সংবিধানিক বাধ্যবাধকতা সত্বেও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দেয়া নিয়ে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ৪ দলীয় জোট সরকার ও তথা বেগম খালেদা জিয়ার নানা ছল-চাতুরী, টালবাহনা, ও ষড়যন্ত্রের সুযোগ নিয়ে তথাকথিত ১/১১ সেনাশাসিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার নামের তিন উদ্দিনের সরকার ( মঈন উদ্দীন, ইয়াজ উদ্দীন ও ফখর উদ্দীন ) ক্ষমতা গ্রহণ করেই শেখ হাসিনা তথা বঙ্গবন্ধু কন্যার প্রতি অদৃশ্য জিঘাংসা চরিতার্থ করতেই তাঁকে গ্রেফতার করে। আমাদের দেশের তথাকথিত সুশীল সমাজের ষড়যন্ত্রে ক্ষমতা দখল করে বাংলাদেশকে যে রাজনীতিকরণের উদ্যোগ নেয় এই তিন উদ্দীনের সরকার। যার তার প্রথম শিকার হন তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা। ১৬ জুলাই, ২০০৭ জননেত্রী শেখ হাসিনাকে গ্রেফতার করে মঈন-ফখরুদ্দিন সরকার। ঠিক এদিন থেকেই উল্টা-গণনা শুরু হয় এ সরকারের। বিএনপি-জামাত জোটের পাঁচ বছরের দুঃশাসন, দুর্নীতি, সন্ত্রাস, দমন, নিপীড়ণের ফলে এদেশের জনগণ বাধ্য হয়ে স্বাগত জানিয়েছিল ১/১১ এর মঈন-ফখরুদ্দিন সরকারকে। যে ১/১১ এর সরকার ১৬০ জন রাজনীতিক ও শীর্ষ ব্যবসায়ীদের গ্রেফতার করেও উল্লেখযোগ্য কোন প্রতিবন্ধকতা ছাড়া দেশ পরিচালনা করছিল; তারাই যখন বিরাজনীতিকরণের ধারা অনুসরণ করে ড. ইউনুস বা তৃতীয় শক্তিকে ক্ষমতায় বসাতে শেখ হাসিনাকে গ্রেফতার করে, তখন পাল্টে যেতে থাকে সম্পূর্ণ দৃশ্যপট।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে, খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার করা হয় শেখ হাসিনাকে গ্রেফতারের প্রায় দু’মাস পরে। এর কারণ ছিল খালেদা জিয়া তার দুই পুত্রসহ চিরতরে সৌদি আরব চলে যেতে সম্মত হয়েছিলেন। আপোষহীন নেত্রীকে নিয়ে দেশ-বিদেশের প্রায় সকল সংবাদ-মাধ্যমের শিরোনাম ছিল: “Former PM Khaleda Zia, has reportedly agreed an exile deal.”।

যাক দেশি-বিদেশি নানামুখি ষড়যন্ত্রে ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই ভোরে ধানমণ্ডির বাসভবন থেকে শেখ হাসিনা গ্রেফতার হন। আর এ গ্রেফতারের প্রেক্ষাপট তৈরী করেছিলেন ডেইলী স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম।  ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম এক-এগারোর সময় মিথ্যা সংবাদ পরিবেশন করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে গ্রেফতারের পটভূমি তৈরি করেছিলেন। যা মাহফুজ ইতমধ্যে স্বীকার ও করেছেন। এ প্রসংগে বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রী মাহফুজ আনামের উদ্দেশে নাসিম বলেছিলেন, ‘আপনি শিক্ষিত মানুষ, আপনার স্মরণ আছে। সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউনের বিরুদ্ধে মিথ্যা সংবাদ প্রকাশ করেছিল ‘নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ডের’ সাময়িকী ‘স্টার নিউজ’। পরে এ সংবাদ পরিবেশনের কারণে পদত্যাগ করেছিলেন সাময়িকী সম্পাদক রেবেকা। সঙ্গে-সঙ্গে ভুল স্বীকার করে পদত্যাগ করেছিলেন নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ডের সম্পাদকও। আমি মনে করি, ওই সম্পাদকের মতো ভুল স্বীকার করে আপনারও পদত্যাগ করা উচিত।’ তিনি আরও নাসিম বলেছিলেন,  শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে যে ভুল সংবাদ প্রকাশ করেছিলেন, তা স্বীকারও করেছেন। এ স্বীকারের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে, তিনি ওই সময় শেখ হাসিনাকে গ্রেফতারের পটভূমি তৈরি করেছিলেন। তাই মাহফুজ আনামের পদত্যাগ করা উচিত।’ কিন্তু এমন গর্হিত কাজ করেও ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম পদত্যাগ করেননি।

যাক, গ্রেফতারের পর শেখ হাসিনাকে প্রথমে ঢাকা মেট্রোপলিটন আদালতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে সংসদ ভবন চত্বরে স্থাপিত বিশেষ কারাগার নিয়ে আটক রাখা হয়। এ সময় কারাগারের অভ্যন্তরে শেখ হাসিনা শারীরিকভাবে মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েন। তখন তার চিকিত্সকরা তাকে বিদেশে চিকিত্সার জন্য পরামর্শ দেন। কিন্তু সেনাশাসিত সরকার শেখ হাসিনাকে চিকিৎসার জন্য বিদেশ যেতে বাধাদান করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জেল, জুলুম, হামলা-মামলার ভয়কে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা আন্দোলন গড়ে তুলে, গ্রেপ্তারের পর কারাগারের অভ্যন্তরে শেখ হাসিনা অসুস্থ হয়ে পড়েন। তখন বিদেশে চিকিৎসার জন্য তাঁকে মুক্তি দেওয়ার দাবি ওঠে বিভিন্ন মহল থেকে। একপর্যায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার শেখ হাসিনাকে মুক্তি দেয়। শেখ হাসিনা প্যারলে মুক্তি নিয়ে বিদেশে চিকিৎসা নিতে যান।

চিকিৎসা শেষে শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আসতে চাইলে তিন উদ্দীনের সরকার শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরে আসতে নিষেধাজ্ঞা ১৭ এপ্রিল, ২০০৭।   এনিয়ে সংবাদপত্রে শিরোনাম হয়েছিল “The government barred Hasina from returning, saying that her return could cause disorder.”  তবু শেখ হাসিনা এ নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে দেশে ফিরে আসতে অনঢ় অবস্থান গ্রহণ করেন। শেখ হাসিনা তখন দৃঢ়তার সাথে ঘোষণা করেন “কোন শক্তি আমাকে দেশে ফিরতে বাধা দিতে পারবে না। আমি আমার জনগণকে সাথে নিয়ে মিথ্যা মামলার বিরুদ্ধে আইনী লড়াই চালাবো এবং দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম অব্যহত রাখবো।”প্রকৃতপক্ষে তারা জানতো শেখ হাসিনা দেশে এলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় কি করতে পারবেন। তাই ফিরতে না দেয়ার সময়কালে প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের প্রচেষ্টা চলে। সেদিনই শেখ হাসিনা ২৩ এপ্রিল দেশে ফেরার ঘোষণা দেন। ২২ এপ্রিল শেখ হাসিনার নামে হত্যা ও চাঁদাবাজির মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়।

৫১ দিনের প্রচেষ্টার পর সকল রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে ৭ মে, ২০০৭ তিনি দেশে ফিরলেন। সরকারের ভয়ে পিডিবি বা ইউনুসের প্রস্তাবিত দল ছাড়া কেউ রাজনৈতিক কর্মসূচি আয়োজন করতো না। অথচ ৭ মে, ২০০৭ জননেত্রীকে স্বাগত জানাতে লোকে লোকারণ্য হয়। ১৬ মে, ২০০৭ শেখ হাসিনাকে সুধা সদন থেকে গ্রেফতার করা হয়। স্পিকারের বাসভবনকে সাবজেল ঘোষণা করে অন্তরীণ রাখা হয়। শেখ হাসিনাকে গ্রেফতারের পর বিশেষ অনুমতি ও কারণ ছাড়া কারো দেখা করার অনুমতি না থাকলেও সাধারণ নেতা-কর্মী-সমর্থকদের অপরিসীম ভালবাসার কেন্দ্র ছিল যেন সেই সাবজেল! দেখা করা যাবে না জেনেও সকাল থেকে রাত অবধি কি আশায়, কিসের প্রতীক্ষায় এ মানুষগুলো সমবেত হতো! তা কেবল তারাই জানতো।

কিন্তু জেলখানায় বন্দি করেও বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে দমানো যায়নি বরং জেলখানা থেকেই গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার জন্য আওয়ামী লীগের নেতাকর্মদের প্রতি আহ্বান জানা। সেনাশাসিত সরকার ক্ষমতায় থাকা অবস্থায়ও আওয়ামী লীগসহ অন্য সহযোগী সংগঠনের ক্রমাগত  চাপ, আপসহীন মনোভাব ও অনড় দাবির পরিপ্রেক্ষিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার শেখ হাসিনাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। দীর্ঘ প্রায় ১১ মাস কারাভোগের পর ২০০৮ সালের ১১ জুন সংসদ ভবন চত্বরে স্থাপিত বিশেষ কারাগার থেকে তিনি মুক্তি পান। সেনা সমর্থিত ১/১১’র তত্ত্বাবধায়ক সরকার। শেখ হাসিনা এবং সজীব ওয়াজেদ যখন দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় বিশ্বে জনমত তৈরি করছিলেন; তখন খালেদা জিয়া, মঈন-ফখরুদ্দিনের সাথে সসম্মানে দেশ ত্যাগের সমঝোতা করছিলেন। শেখ হাসিনার অনড় অবস্থানের কারণে খালেদা জিয়াও রাজনীতিতে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সুযোগ পান। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ প্রভাবশালী সরকার প্রধান ও সংস্থার চাপে এবং দেশে সম্ভাব্য গণঅভ্যুত্থান থেকে নিজেদের রক্ষায় ক্ষমতা ত্যাগ করে নির্বাচন দিতে বাধ্য হয় মঈন-ফখরুদ্দিন সরকার।

শেষ করবো এই বলেই যে, রাজনীতি নিয়ে যারা আজ বড় বড় কথা বলে, তাদের অবশ্যই অতীতের সেই বিভীষিকাময় ১/১১ সেনাশাসিত সরকারের সময়ের দিকে ফিরে তাকানো উচিত। সে সময় যদি জীবনের মায়া তুচ্ছ করে চিকিৎসা শেষে শেখ হাসিনা দেশে ফিরে না আসতেন তা হলে আজকে বাংলাদেশের ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হতো। কেননা, শেখ হাসিনাকে বাগে আনতে পারলেই এই তিন উদ্দীনের সরকার তথাকথিত সুশীল সমাজের সমর্থন নিয়ে এরশাদের মতো তাদের ক্ষতা দীর্ঘয়িত করতো। বাংলাদেশের কলাপালে যুক্ত হতো আরও একটি সেনা শাসনের কলঙ্কতিলক।