ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের বিস্তারে গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরায় ভয়বহ জঙ্গি হামলার মাধ্যমে ১৭ বিদেশি নাগরিক পুলিসসহ ২০ জনের ( জঙ্গি ৫ জনসহ মোট ২৮ জন) প্রাণহানী এবং এর মাত্র পাঁচদিন পর দেশের সর্ববৃহত ঈদের জামাত শোলাকিয়ার ঈদগাহের নিকটে জঙ্গি হামলায় হতাহতের ঘটনায় সারাদেশে নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড় বইছে। এ ইস্যুতে বাংলাদেশও বড় ইমেজ সংকটের মধ্যে পড়েছে। এর প্রেক্ষিতে দেশে জঙ্গিবাদের বিস্তাররোধে জাতীয় ঐক্যের বিষয় বা ইস্যুটি এখন একটি আলোচিত বিষয়। রাজনীতির মাঠে ও টেলিভিশনের টকশো’ বা গোলটেবিল বৈঠকে এ ইস্যুতে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা অব্যাহত আছে।

বিএনপিও এই প্রথম জঙ্গিবাদ ইস্যুতে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে বলেছে, সরকারকে আমরা জঙ্গিবাদ ইস্যুতে জাতীয়ে ঐক্যের আহ্বান জানাই। সরকার যদি সব রাজনৈতিক দলকে নিয়ে জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয় তা হলে দেশবাসীকে আরো কঠিন মূল্য দিতে হবে। যদি সরকার ও সরকারী দল আওয়ামী লীগ বিএনপির এ কথাকে পরোক্ষ হুমকী বলেই মনে করছে। তারা বলছেন,‘বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার জাতীয় ঐক্যের আহ্বানে প্রধান বাধা জামায়াত। দলটির রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে কিছুতেই জামায়াত ছাড়তে পারছে না। এ কারণে সরকার ও বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ বিএনপির ঐক্যের ডাকে সাড়া দিচ্ছে না।

গুলশান ও শোলাকিয়ার জঙ্গি হামলার পর ২০ দলীয় জোটে জামায়াত থাকায় ঘরে-বাইরে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে বিএনপি। বিশেষ করে সরকারী দলের পক্ষ থেকে বিএনপি ও জামায়াতকে নিয়ে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করা হয়। এ পরিস্থিতিতে ৩ জুলাই বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া সংবাদ সম্মেলন করে জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানান। কিন্তু আওয়ামী লীগসহ সরকার সমর্থিত বিভিন্ন দলের পক্ষ থেকে বলা হয় জামায়াতের সঙ্গ না ছাড়লে বিএনপির সঙ্গে কোন ঐক্য হবে না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সরকারের মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতারা স্পষ্ট করেই বলেছেন বিএনপি জামায়াতকে না ছাড়লে তাদের সঙ্গে ঐক্য হবে না।

সেই কারণেই হয়তো ২০ দলীয় জোটে জামায়াত থাকায় জাতীয় ঐক্যের আহ্বানের কী হবে তা নিয়ে আলোচনা করতে ১২ জুলাই ২০ দলীয় জোট ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন খালেদা জিয়া। ওই বৈঠকে কেউ কেউ জোটে জামায়াত থাকলে ঐক্য হবে না এমন অভিমত দিলেও অন্যরা আপাতত জামায়াত না ছাড়ার পক্ষে মত দেন। পরদিন ১৩ জুলাই পেশাজীবীদের নিয়ে বৈঠক করেন বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। ওই বৈঠকে বিএনপিকে জামায়াত ছাড়ার জন্য প্রস্তাব দেন ক’জন পেশাজীবী। তবে কেউ কেউ এর বিরোধিতা করে বলেন, সরকার যদি জামায়াত নিষিদ্ধ করে তখন এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। কিন্তু সরকার জামায়াতকে নিষিদ্ধ না করলে বিএনপি কেন এ কাজ করতে যাবে।

সেই বৈঠকে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডাঃ জাফরউল্লাহ চৌধুরী জামায়াতের রাজনীতির বিরুদ্ধে জোরালো বক্তব্য উপস্থাপন করেন। তিনি জামায়াতের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দেশে এ দলটিকে রাজনীতি করতে হলে ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকা নিয়ে ক্ষমা চাইতে হবে। এ ছাড়া এ দলের শীর্ষ নেতাদের মুক্তিযোদ্ধাদের কবর জিয়ারত করতে হবে। তার সঙ্গে সুর মিলিয়ে প্রবীণ আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক-উল হকও বক্তব্য রাখেন।

গতকাল ১৭ জুলাই বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ বলেছেন, জঙ্গি ইস্যু নিয়ে আন্তর্জাতিক চক্রান্ত হচ্ছে, তাই জঙ্গি দমনে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠায় বিএনপি আগ্রহী। এর আগেও অনেক রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে জাতীয় ঐক্যের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু জঙ্গি দমনের পথে অন্তরায়গুলো কোথায় এবং জঙ্গি কারা, এদের রাজনৈতিক গোষ্ঠীগত পরিচয় কী ইত্যাদি সম্পর্কে সবাই একমত না হওয়ায় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়নি। শিকড় চিহ্নিতকরণ এবং তাদের উত্পত্তি ও বিস্তার সম্পর্কে সবার ঐকমত্য হলে কৌশল নির্ধারণ ও তার বাস্তবায়ন কঠিন কাজ হবে না। শত্রু না চিনলে কার বিরুদ্ধে কী করবেন?

এইতো গেল বিএনপির কথা। এর বাইরে বাংলাদেশের প্রায় সকল বিরোধীদল জঙ্গি ইস্যুতে জাতীয় ঐক্যমত্য গড়ে তোলার আহ্বান জানান, ১৬ জুলাই জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে গণফোরাম সভাপতি ও বিশিষ্ট আইনজীবী ড. কামাল হোসেন বলেন, বাঙালী জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করা একটি দুরূহ কাজ। তবে জাতির এমন বিপদের দিনে সব মতভেদ ভুলে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতেই হবে। সেই দিন জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘জঙ্গীবাদবিরোধী জাতীয় সংলাপ’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেন, খালেদা জিয়া সম্পর্ক না রাখলে অনেক আগেই জঙ্গী নির্মূল করতাম। জঙ্গীদের সঙ্গে সম্পর্ক পরিহার না করে খালেদা জিয়া বার বার পরীক্ষায় ফেল করছেন। জঙ্গীদের পক্ষ নিয়ে এবং তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করে বেগম জিয়া এই ফেলের ধারা বজায় রেখেছেন। শেখ হাসিনার সরকার সমূলে জঙ্গী নির্মূল ও ধ্বংস করার নীতিতে বিশ্বাসী। এর সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতার সম্পর্ক নেই।

১১ জুলাই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ১৪ দলের জঙ্গীবাদ, সন্ত্রাস, নৈরাজ্য ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সমাবেশে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মোহাম্মদ নাসিম বলেন, বিএনপির সঙ্গে জামায়াত থাকলে ঐক্য হবে না। তাদের জামায়াতের সঙ্গ ত্যাগ করে কথা বলতে হবে। খালেদা জিয়া দেশে কোন গণতন্ত্র ও শান্তি চান না। তিনি দেশের পরিস্থিতি ঘোলাটে করে ক্ষমতায় যেতে চান। কিন্তু দেশের মানুষ এটা করতে দেবে না। মানুষ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ আছে, থাকবে। ঐক্যবদ্ধভাবে সব ষড়যন্ত্রের মোকাবেলা করা হবে। একই অনুষ্ঠানে তৃণমূল বিএনপির সভাপতি ও ৩১ দলীয় জোট বাংলাদেশ ন্যাশনাল এ্যালায়েন্সের প্রধান ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা বলেন, খালেদা জিয়ার ঐক্যের আহ্বানকে গুরুত্ব দেয়ার কী আছে? একদল সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের মাধ্যমে দেশে অরাজকতা করছে। এ জঙ্গীবাদী কর্মকান্ড প্রতিরোধ করতে হবে।

মাননীয় প্রধান মন্ত্রীও এ ব্যাপারে কৌশলী বক্তব্য দিয়েছেন। আসেম সম্মেলন থেকে ফিরে ১৭/৭/২০১৬ বিকেলে গণভবনে জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে জঙ্গীবাদ-সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলায় সরকারের অনুসৃত ‘জিরো টলারেন্স’ অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘শুধু বাংলাদেশ নয়, জঙ্গীবাদ এখন বৈশ্বিক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা নিরলসভাবে সারাবিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি একটি সম্মানজনক অবস্থানে নিয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু গুলশানে হামলার ঘটনা আমাদের কিছুটা হলেও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। ভাবমূর্তি কিছুটা হলেও ক্ষুন্ন হয়েছে’ এটাই হচ্ছে সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক।’ গুলশানে হামলার তদন্ত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এই জঙ্গী হামলার ঘটনার তদন্ত হচ্ছে। কিছু সময় অপেক্ষা করুন। তদন্তের স্বার্থে সবকিছু বলাও যায় না। তবে যে তথ্য আসছে’ তাজ্জব হয়ে যাওয়ার মতো। তদন্ত শেষে সবকিছু বুঝতে পারবেন সবাই।’ তিনি জঙ্গিবাদ ইস্যুতে জাতীয় ঐক্যের বিষয়ে সাংবাদিকদেরেএক প্রশ্নের জবাবে অনেকটা কৌশলী বক্তব্যে বলেন,‘যাদের সঙ্গে ঐক্য করলে জঙ্গীবাদ-সন্ত্রাসবাদ নির্মূল করা যাবে, সেই জনগণের সঙ্গে ইতোমধ্যেই জাতীয় ঐক্য হয়ে গেছে। দেশের জনগণই বিপথগামীদের খুঁজে বের করে বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করবে। যারা অগ্নিসন্ত্রাস করেছে, মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করেছে, যারা যুদ্ধাপরাধী’ তাদের কথা আলাদা। তারা সর্প হয়ে দংশন করে ওঝা হয়ে ঝাড়তে চায়। তিনি ধর্মের নামে যারা তরুণদের জঙ্গীবাদে উস্কানি দিচ্ছে, অর্থ-অস্ত্র দিচ্ছে, মদদ দিচ্ছে’ তাদের খুঁজে বের করতে দেশবাসীসহ বিশ্ব নেতৃবৃন্দকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করারও আহ্বান জানান।  মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্যে অনেকটাই স্পষ্ট যে, জামায়াতকে নিয়ে বিএনপির সাথে জাতীয় ঐক্য গড়তে সরকার তথা আওয়ামী লীগ মোটেই আগ্রহী নয়।

তাই জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার বিষয়টি আগের সংলাপ সংলাপ ইস্যুর মতো ঝুলে গেল বলেই অপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে। সাম্প্রতিক জঙ্গি তৎপরতার জন্য জামায়াতের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে এবং দলটিকে পৃষ্ঠপোষকতার জন্য খালেদা জিয়াকে দায়ী করে তার ঐক্যের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেন আওয়ামী লীগের নেতারা। তাদের সাথে সুর মিলিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের অন্যান্য দল ও সরকারের সাথে থাকা ১৪ দলীয় জোটের নেতারাও।

শেষ করছি এই বলেই শেষ করছি যে, দেশে সুপরিকল্পিতভাবে কারা গুপ্তহত্যা ও টার্গেট কিলিং এবং ভয়াবহ জঙ্গিহামলা কারা চালাচ্ছে তা বুঝতে হলে রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রয়োজন নেই। তবু জঙ্গিবাদ আজ নিঃসন্দেহে একটি জাতীয় সংকট। এই সংকট মোকাবেলা করতে হলে সরকারসহ সব বড় দলের মধ্যে জাতীয় ঐক্য হওয়া খুবই প্রয়োজন। এ ব্যাপারে বিএনপি নেত্রীর আহ্বানকে অনেক দল ও ব্যক্তি স্বাগত জানালেও জামায়াতের সঙ্গে তার জোটগত সম্পর্কের বিষয়টিকে ঐক্যের পক্ষে অন্তরায় বলে মনে করছে দেশের বিশিষ্টজন ও রাজনীতি বিশ্লেষকরা। তবে বিএনপির ডাকে ঐক্য হচ্ছে না এমনটি মাথায় রেখেই বিএনপি দলের বৈরী রাজনৈতিক পরিস্থিতি কাটিয়ে তুলতে এমন রাজনৈতিক কৌশল গ্রহণ করেছে বলে মনে করছেন অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক। তারা তারা মনে করছেন গুলশান ও শোলাকিয়ার ঈদের জামাতে জঙ্গী হামলার পর দেশ-বিদেশের বিভিন্ন মহল থেকে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়। তাই এই সন্দেহ দূর করতেই বিএনপির এই কৌশলী জাতীয় ঐক্যের ডাক। কাজেই বিএনপি সত্যিকার অর্থে ঐক্য চাইলে তাদেরই সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা কি করবে।