ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, স্বাধিকার চেতনা

 
13934841_276390302718720_8819199740150311942_n

পাকিস্তানের ২৪ বৎসরের শাসন কালের ১৪ বৎসরই বাঙ্গালীদের দাবী আদায়ের সংগ্রামের জন্য যে মহান নেতার কারাগারে কেটেছে, যার উজ্জীবনী নেতৃত্বে ঘুমন্ত বাঙালী জাতি পাকিস্তানী দুঃশাসনের নাগপাশ ছিড়ে জেগে ওঠেছিল মুক্তির অদম্য সাহসে, যার ডাকে সারা দিয়ে বাঙালী আবাল বৃদ্ধ বনিতা ঝাপিয়ে পড়েছিল সশস্র মুক্তিযুদ্ধে এবং ত্রিশলক্ষ জীবন ও তিনলক্ষ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে ছিনিয়ে এনেছিল স্বাধীনতার লাল সূর্য পতাকা। দেশী বিদেশী চক্রান্তে মাত্র সাড়ে তিন বৎসরের মাথায় সেই দেশ প্রেমিক মহান নেতা, স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট স্বপরিবারে হত্যা করে দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্রকারীরা। যতই দিন যাচ্ছে ততই এ হত্যাকান্ডে দেশী-বিদেশী ও জিয়াউর রহমানের সংশ্লিষ্টতার তথ্য প্রমাণ বেড়িয়ে আসছে।

 

আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তান ও তাদের সম্মিলিত মিত্রশক্তি ও এদেশীয় তাদের দোসর এবং বেনিফেসিয়ারীরা তাদের চরম পরাজয়ের প্রতিশোধ নিয়ে আওয়ামী লীগকে নিশ্চিন্ন করে এদেশকে আবার পাকিস্তানী সেবাদাসে পরিনত করতে চেয়েছিল। কিন্তু কথায় আছেনা ‘ধর্মের কল বাতাসে নড়ে’ সেই সূত্রেই যে জিয়াউর রহমান পর্দার অন্তরালে থেকে বঙ্গবন্ধু হত্যার কলকাঠি নেড়েছেন এবং খুনীদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহযোগিতা করে তাদেরকে বিদেশী মিশনে চাকুরী দিয়ে পুরষ্কৃত করেছিলেন সেই ষড়যন্ত্রকারী জিয়াউর রহমানকেও ইতিহাসের অমোঘ বিধানে ১৯৮১ সালের ৩০শে মে মাত্র পাঁচ বছরে মাথায় চট্রগ্রাম সাকিট হাউজে এক সেনা অভ্যুত্থানে প্রাণ দিতে হয়েছে।

zia

বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডে জিয়াউর রহমানের যে পরোক্ষ সম্পৃক্ততা ও সংস্রব ছিল তা এখন মার্কিন আর্কাইভসের বাংলাদেশ সংক্রান্ত গোপন দলিলপত্র থেকেই বেরিয়ে আসছে। তাই এই হত্যাকান্ডে ইতিহাসের রহস্যপুরুষ জিয়াউর রহমানের গোপন সম্পৃক্ততা নিয়ে  আজ আর কারো মনে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। ইতিহাসের এ   নৃশংস জঘন্যতম হত্যাকান্ডে জিয়াউর রহমানের জড়িত থাকার বিষয়ে একটি বিদেশী মিডিয়ায় প্রথমেই হাটে হাড়ি ভেঙে দেয় খুনী কর্নেল রশিদ। খুনী রশিদ সে সাক্ষাতকারে বলেছিল,‘ শেখ মুজিবুর রহমানের মানুষকে উজ্জীবীত করার এমনই এক ক্ষমতা ছিল যে, তাকে এভাবে সরিয়ে না দিয়ে কিছুতেই ক্ষমতা থেকে হটানো সম্ভব ছিলনা। কর্নেল রশিদ তার ঐ সাক্ষাতকারে আরো বলেছে,‘ আমরা শেখ মুজিবকে ক্ষমতাচ্যুত করার বিষয়টি নিয়ে তৎকালীন উপ-সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের সাথে আলাপ করতে গেলে তিনি আমাদের এই বলে বিদায় করেছিলেন যে,‘ আমাকে এ ব্যপারটিতে সরাসরি না জড়িয়ে তোমরা জুনিয়ররা যা পার তা করে ফেল।’ জিয়াউর রহমানের এ বক্তব্যের মাধ্যমে সন্দেহাতীত ভাবে প্রমাণিত হয় যে, তিনিও ছিলেন বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের মূল হোতাদের অন্যতম। তিনি সরাসরি হত্যাকান্ডে অংশগ্রহণ না করে পর্দার আড়ালে থেকে জুনিয়র অফিসারদের দ্বারা এ হত্যকান্ড সংগঠিত করেছিলেন। (খুনী রশিদের এ সাক্ষাতকারটি দেশের বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেক্টনিকস মিডিয়ায় বহুবার প্রচারিত হয়েছে। তা ছাড়াও ১৯৯৬ সালের ১২ নভেম্বর ঢাকার মেট্টোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আফজালুর রহমানের কাছে ফৌজদারী কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় লে.কর্নেল রশীদের স্ত্রী জোবায়দা খাতুন যে স্বীকারোক্তি মূলক জবাববন্ধি দিয়েছেন তার অংশ বিশেষ পাঠকদের জ্ঞাতার্থে এখানে তুলে ধরা হলো: …বঙ্গবন্ধুর হত্যার  ষড়যন্ত্রকারী মেজর রশীদ ও মেজর ফারুক এ বিষয়ে মেজর জেনারেল জিয়াউর রমানের সাথে যোগাযোগ রাখত। ঐ সময় এক রাতে মেজর ফারুক মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের বাসা থেকে ফিরে রশীদকে জানায় যে সরকার পরিবর্তন হলে জিয়া প্রেসিডেন্ট হতে চায়। জেনারেল জিয়া নাকি তাদেরকে বলেছিল যদি এ মিশন সফল হয় আমার কাছে এসো না হলে আমাকে সংশ্লিষ্ট করো না।… জোবায়দা রশীদ আরও বলেন যে,(১৯৭৫ সালের) পনের আগষ্ট বিকালেই বঙ্গভবনে জেনারেল জিয়াউর রহমান মেজর রশীদের কাছে সেনা প্রধান হওয়ার জন্য ঘুর ঘুর করছিল। পরে ১৬ বা ১৭ আগষ্ট প্রাক্তন মন্ত্রী সাইফুর রহমানের গুলশানের বাসায় সাইফুর রহমান, রশীদ ও জিয়ার উপস্থিতিতে জিয়াকে সেনা প্রধান করার ঠিক হয়। এবং এও ঠিক হয় যে পরবর্তীতে জিয়াউর রহমান প্রেসিডেন্ট হবে…। এ ছাড়াও ১৫ আগষ্ট ২০০৯ বিটিবিতে প্রচারিত জাতীয় শোক দিবসের এক স্মৃতিচারণমূলক এক অনুষ্ঠানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সংস্থাপন মন্ত্রনালয় বিষয়ক উপদেষ্টা জনাব এইচ টি ইমাম পচাত্তরের ১৫ই আগস্ট খুনীদের সাথে জিয়াউর রহমানের সখ্যতা ও তার রহ্যজনক ভূমিকার কথা বলেছেন।

 

তাই আমি মনে করি এত সব কিছু আগেভাগে জেনেও মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুকে সতর্ক না করে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার লোভে এ হত্যাকাণ্ডের সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করে ফেলেছিলেন। সেই ধারাবাহিকতায় জিয়াউর রহমানের পত্নী ও এক সামরিক শাসকের ২৬ বৎসরের শাসনামলে খুনীদের বিভিন্নভাবে পুরষ্কৃত করেছেন। বিএনপি শাসনামলে খুনী নূর চৌধুরী কানাডায় অবস্থানকালে বাংলাদেশে যাতে তার আসতে না হয় সে জন্যে বাংলাদেশ থেকে পাসপোর্ট করিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে খুনী আজিজ পাশাকে চাকুরীচ্যুত করার পর বিএনপি-জামাত জোট পুনরায় ক্ষমতায় এসে তার চাকুরী ফিরিয়ে দিয়ে অবসর কালীন বেতন ভাতা সহ সব ধরনের আর্থিক ও লজিষ্টিক সাপোর্টও তাকে দেয়। মোশতাক সরকারের আমল থেকে খুনীদের রাষ্ট্রীয়ভাবে পুরষ্কৃত করার ধারাবাহিকতায় তাদের বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাসে চাকুরী, ফরেন সার্ভিসে অন্তর্ভুক্ত করা সহ রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধা প্রদান করে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। এরশাদ সরকারের আমলেও খুনীরা নানা রাষ্ট্রীয় আনুকল্য পায়। ১৯৮৬ সালে কর্নেল ফারুক এরশাদের সাথে আঁতাত করে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ গ্রহণের সুযোগ পায় এবং ৮৭ সালে সরকারের ছত্রছায়ায় ফ্রিডম পার্টি ও প্রগশের মত রাজনৈতিক দল গঠন করে অসুস্থ ধারার রাজনীতি করার সুযোগ লাভ করে। খালেদা জিয়ার আমলে ১৫ই ফেব্রুয়ারীর ভোটার বিহীন নির্বাচনে কর্নেল রশিদকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত করিয়ে আনা হয়। এসব যে করা হয়েছে বিএনপি জামায়াতকে রাজনীতি করার সুযোগ দানের কৃতজ্ঞতাবোধ থেকে তা কী আর বলার অপেক্ষা রাখে? কারণ পচাত্তরের সেই কলঙ্কজনক হত্যাকান্ড সংগঠিত না হলে বঙ্গবন্ধুর মত নেতা জীবিত থাকলে বিএনপি নামের কোনো দলই সৃষ্টি হত না এবং খালেদা জিয়ার মত আন্ডার মেট্রিক নের্তীর পক্ষে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়ে ভাঙা স্যুটকেস আর ছেঁড়া গেঞ্জি থেকে হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হত না। জামায়াত ও আর  এদেশের মাটিতে রাজনীতি করতে পারত না।

 

বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডে এইতো গেল দেশীয় ষড়যন্ত্রকারী এবং এ হত্যাকান্ডের বেনিফেসিয়ারীদের কথা। আমি এখন আলোচনা করতে চাই এই নৃশংস হত্যাকান্ডে আন্তর্জাতিক সংশ্লিষ্টতার বিষয়-আসয় নিয়ে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড যে শুধু মাত্র গুটিকয়েক বিপদগামী জুনিয়র সেনা কর্মকর্তা দ্বারা সংগঠিত হয়েছে, তা আর বিশ্বাস করার কোনো অবকাশ আছে বলে আমি মনে করি না। কেননা, বঙ্গবন্ধুর মত এমন একজন বিশ্ববরেণ্য জাতীয়তাবদী নেতাকে আন্তর্জাতিক কোনো সাহায্য সহযোগিতা ও ইন্দন ছাড়া আর্মির কয়েকজন চুনোপুটি পেটি অফিসার ব্যক্তি আক্রোশের বশবর্তী হয়ে হত্যা করে ফেলবে তা কোনো সুস্থ মানুষ কেনো কোনো বদ্ধ পাগলেও বিশ্বাস করবে না। এই হত্যাকান্ডে আন্তর্জাতিক যে শক্তি বলয়টি কাজ করেছে তার মধ্যে অন্যতম পাকিস্তান, আমেরিকা, চীন, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের আরো কয়েকটি দেশ যে জড়িত ছিল; বঙ্গবন্ধুর আত্ম স্বীকৃত হত্যাকারীদের কোনো কোনো আরব দেশ আশ্রয় দিয়ে এবং তাদের ভরণপোষনের ব্যবস্থা করে এ হত্যাকান্ডের সাথে নিজেদের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণই দিয়েছে।

 

স্বাধীনতা লাভের সূচনালগ্ন থেকেই পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই বাংলাদেশের পিছনে লেগে আছে। এ ক্ষেত্রে কাজে লাগায় আইএসআই এর সাবেক বিশ্বস্ত কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানকে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড যে আইএসআইয়ের সবচে বড় এসাইনমেন্ট ছিল তা আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী, মাসুদা ভাট্টি, শাহরিয়ার কবিরসহ দেশ-বিদেশের বহু রাজনৈতিক ভাষ্যকারের লেখায় ওঠে এসেছে। তাই এখানে আমি এর বিশদ বিবরণ দিয়ে লেখার পরিধি না বাড়িয়ে পাকিস্তান নামের রাষ্ট্রটির বাংলাদেশ সম্মন্ধে তাদের বৈরিতার বিষয়ের ওপর আলোকপাত করছি।

 

একাত্তুরের মুক্তিযুদ্ধে পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে বঙ্গবন্ধু সরকারের যাত্রার শুরু থেকেই পাকিস্তান ও তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার আলবদরেরা সরকারের বিরুদ্ধে নানামুখী ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে দেশকে অস্থিতিশীল করার চক্রান্ত চালিয়ে যেতে থাকে তা এখানে ২২ জুলাই একটি সহযোগি দৈনিকে প্রকাশিত মাসুদা ভাট্টির ‘বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড ও পাকিস্তানের ব্যাক-আপ প্ল্যান’ শিরোনামের নিবন্ধের অংশ বিশেষ এখানে তুলে ধরছি। ‘ বঙ্গবন্ধুকে যখন সপরিবারে হত্যা করা হয় তখন তাঁর পাশে প্রশাসনের কারা ছিল… প্রেসিডেন্ট সেক্রেটারিয়েটে সামরিক সচিব ছিলেন ব্রিগেডিয়ার মাশরুরুল হক, নিরাপত্তা কর্মকর্তা জামিল উদ্দিন, এডিসি যথাক্রমে-ক্যাপ্টেন শরিফ আজিজ, ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মোশারফ হোসেইন, লেফট্যান্টে(নৌ) গোলাম রাব্বানী; প্রেসিডেন্টের সেক্রেটারী ছিলেন পিএসসি আব্দুর রহিম, ভিজিলেন্স ও ইনসপেকশন টিমের প্রধান ছিলেন এবিএম সফদার; এদের কেউই মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়নি। আইজি পুলিশ ছিলেন নুরুল ইসলাম, ডিআইজি স্পেশাল ব্রাঞ্চে ছিলেন ই এ চৌধুরী… এরাও মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেননি। মোট কথা ডিজিএফআই, এনএসআই, বিডিআর, জাতীয় রক্ষীবাহিনী এবং গোটা সেনা বাহিনীতে গুরুত্বপূর্ণ পদে মুক্তিযোদ্ধা অফিসারের সংখ্যা ছিল মাত্র ১৪ জন। …বঙ্গবন্ধু কেন তার চারপাশে এসব অমুক্তিযোদ্ধাদের ঠাঁই দিয়েছিলেন সে প্রশ্নের একটি সহজ সরল উত্তর হচ্ছে- অত্যান্ত সুকৌশলে এদেরকে এসব গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়েছিল। দেশ স্বাধীন হয়েছিল ঠিকই কিন্তু এর রন্ধ্রে রন্ধ্রে পাতিস্তানী ভূত ঠিকই শক্তিশালী হয়ে ওঠেছিল এবং তাতে সর্বাত্মক সহযোগিতা যুগিয়েছিল পাকিস্তানের রেখে যাওয়া এই সব প্রেতাত্মা এবং এদেরকে দিয়েই পাকিস্তান তার ব্যাক-আপ প্ল্যান কার্যকর… করে। সম্প্রতি প্রকাশিত তথ্য থেকে একথা এখন স্পষ্টতর হয়ে যায় যে, পাকিস্তান এই প্ল্যান কার্যকর করার জন্য স্বাধীনতার পরপরই যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব ও চীনের সহযোগিতা লাভে তৎপর হয় এবং দেখা যায় বঙ্গবন্ধুর খুনীরা মার্কিন দূতাবাসে অস্ত্র সাহায্যের জন্য ছুটে যায় বাহাত্তুর তিয়াত্তরেও। এবং এ অস্ত্রপ্রার্থী দলটির সঙ্গে আমাদের আলোচ্য সেনা কর্মকর্তা জেনারেল জিয়াও সমান ভাবে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার জন্য দৌড়ঝাপ শুরু করে।’ পরবর্তিতে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে তারা তাদের চক্রান্তকে সফল করে।

 

১৫ আগষ্টের নৃশংস জঘন্য হত্যাকান্ড সংগঠিত হওয়ার সাথে সাথেই ইসলামাবাদ বাংলাদেশকে কূটনৈতিক স্বীকৃতি দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তাদের এ তড়িগড়ি সিদ্ধান্তের কারণ ব্যাখ্যা করলেই এ রক্তাক্ত হত্যাকান্ডে তাদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শুধু পাকিস্তান নিজেই স্বীকৃতি দেয়নি তারা ইসলামী ও তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোকেও বাংলাদেশের নয়া সরকারের প্রতি স্বীকৃতি দেয়ার আহ্বান জানায়। এবং নয়া অবৈধ মোশতাক সরকারে প্রতি বন্ধুত্বের নিদর্শন স্বরূপ ৫০ হাজার টন চাল, এবং দেড়কোটি গজ কাপড় উপহার দিয়েছিল (জনকন্ঠে প্রকাশিত মোহাম্মদ জালালের সংগ্রহ ও এনামুল হকের অনুবাদ থেকে )। সাথে সাথে আমেরিকাও নুতন অবৈধ সরকারের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের জন্য উন্মুখ হয়ে ওঠে। ১৬ আগস্ট ৭৫ টাইমস অব ইন্ডিয়া ও পেট্টেয়ট এর রিপোর্টে বলা হয় যে, বাংলাদেশের অভ্যুত্থানের খবর সর্বপ্রথম আমেরিকাই পেয়েছিল। সেই সুবাধে ১৫ আগস্ট সকাল থেকেই মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর থেকে এ অভ্যুত্থানের খবর ফলোআপ করা হচ্ছিল। এমনই এক বার্তায় বাংলাদেশে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত বোষ্টার বাংলাদেশ বেতারের উদ্ধিৃতি দিয়ে উল্লেখ করেন,‘ শেখ মুজিব নিহত হয়েছেন, খন্দকার মোশতাক আহমদের নেতৃত্বে সেনাবাহিনী সরকার গঠন করেছে। মুজিবের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে এই পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।’ বোষ্টার তখন বাংলাদেশ পরিস্থিতির উপর কিছক্ষণ পর পরই রিপোর্ট পাঠাচ্ছিলেন। অন্যদিকে ওয়াশিংটন ষ্টেট ডিপার্টমেন্ট মুখপাত্র এক প্রেস ব্রিফিং এ বলেছিলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের নয়া সরকারের সঙ্গে স্বাভাবিক কাজ কম চালিয়ে যেতে প্রস্তুত। কাজেই আমি নিদ্ধিধায় বলতে পারি যে, আমেরিকাও বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিল। আর সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ তো বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের তাদের দেশে প্রথম আশ্রয়দান করার আমন্ত্রন জানিয়ে এ চক্রান্তে তাদের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ অনেক আগেই দিয়েছে একথা আর নুতন করে বলার অপেক্ষা রাখেনা।

 

এসব দেশের মুক্তিযুদ্ধে পরাজয়ের প্রতিশোধ গ্রহণ ছাড়াও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিশ্ববরেণ্য নেতায় অধিষ্ঠান হওয়াকেও তাদের আরো অধিক প্রতিহিংসা পরায়ণ করে তোলেছিল। তারা ভেবেছিল শেখ মুজিবুর রহমান বেঁচে থাকলে একদিন সে তাঁর ক্যারিশমেটিক লিডারশিপের মাধ্যমে বিশ্বনেতায় পরিনত হবেন। এর পিছনে নিয়ামক হিসাবে কাজ করেছে বঙ্গবন্ধুর জুলিওকুরি উপাধি লাভ, আলজিয়ার্সে জোট নিরপেক্ষ সম্মেলন উপলক্ষে বিশ্বের জীবিত কোনো নেতার মধ্যে শুধুমাত্র বঙ্গবন্ধুর নামে তোরণ নির্মাণ, ১৯৭৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ভাষণে অস্ত্র সংবরনের আহ্বানও পরাশক্তি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী শক্তিকে ক্ষুব্দ করে তোলেছিল। বঙ্গবন্ধু তাঁর সেই ঐতিহাসিক ভাষণে বলেছিলেন,‘ … বর্তমান অস্ত্র প্রতিযোগিতার নিয়ন্ত্রণ করার জরুরী ব্যবস্থা নিতে হইবে। ইহাতে শুধু মাত্র এই ধরণের পরিবেশই সৃষ্টি হইবেনা ইহাতে অস্ত্র সজ্জার যে বিপুল সম্পদ অপচয় হইতেছে তা ও মানবতার কল্যানে নিয়োজিত করা যাইবে।’ তাছাড়াও বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘পৃথিবী আজ শাসিত ও শোষিত দুটি ধারায় বিভক্ত, আমি শোষিতের পক্ষে।’ অস্ত্র সংবরণ ও শোষিতের পক্ষে বঙ্গবন্ধুর এ দৃঢ় অবস্থান পরাশক্তির ভিত্কে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। উপরন্তু ওআইসি সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুর যোগদানের পূর্বশর্ত হিসাবে বাংলাদেশকে পাকিস্তানের স্বীকৃতি দানের বিষয়ে দৃঢ় অবস্থানগ্রহণ করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, ‘পাকিস্তান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি না দিলে পাকিস্তানের সাথে ওআইসি সম্মেলনে একই ছাতার নিচে কিছুতেই আমার যোগদান করা সম্ভব নয়। তাঁর এ দৃঢ়চেতা অবস্থানের কারণেই ইসলামী বিশ্বের চাপে পাকিস্তান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়েছিল এবং আনোয়ার সাদাতসহ ইসলামী বিশ্বের বেশ ক’জন প্রভাবশালী নেতা বিশেষ বিমানে উড়ে এসে বঙ্গবন্ধুকে ওআইসি সম্মেলনে নিয়ে যান। বিশ্ব ও বিশ্ব নেতৃবৃন্দের কাছে বঙ্গবন্ধুর এ উচ্চ অবস্থানও তাঁর হত্যাকান্ডের অন্যতম কারণ বলে অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন। এছাড়াও ভারতের ইন্দিরাগান্ধী সরকারের সাথেও স্বল্পতম সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় সেনাবাহিনীকে ফিরিয়ে নেয়ার বঙ্গবন্ধুর আহ্বান নিয়ে অন্তর্গত মন-মালিন্যের বিষয়টিও কাজ করেছে বলে অনেক বোদ্ধাই মনে করেন। কারণ বঙ্গবন্ধু হত্যার পর ভারতের নিস্কৃয়তা এবং সহসাই মোশতাক সরকারের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার বিষয়টিও হেলাফেলার ছিলনা। কেননা বাংলাদেশ থেকে অতি দ্রুত ভারতীয় সেনাবাহিনীকে ফিরিয়ে নেয়ার বঙ্গবন্ধুর আপোষহীন মনোভাব ও এর পেছনে কাজ করতে পারে। বঙ্গবন্ধুর সাথে ঘনিষ্ট কয়েকজন বিশিষ্ট নাগরিকের সাক্ষাতকার ও প্রবন্ধে নিবন্ধেও বিষয়টি ওঠে এসেছে। তাঁর বক্তব্য ছিল,‘ এক দখলদার বাহিনীকে সরিয়ে আরেক দখলদার বাহিনীর হাতে আমি আমার স্বাধীন বাংলাদেশকে তোলে দিতে পারিনা। সুতরাং আমাদের প্রথম স্বাধীনতা দিবস উদ্যাপনের আগেই বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় সেনা বাহিনীকে ফিরিয়ে নিতে হবে। ভারত মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশকে অস্ত্র দিয়ে, আশ্রয় দিয়ে, এককোটি শরনার্থীকে আশ্রয় দিয়ে সাহায্য করেছে, তাদের সেনাবাহিনীর অনেক সদস্য জীবন দিয়েছে, এ জন্য বাংলাদেশের মানুষ চিরদিন ভারতবাসীর নিকট কৃতজ্ঞ থাকবে; তাই বলে বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ভারতীয় সেনাবাহিনীর অবস্থান আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারিনা।’ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের এ আপোষহীন নেতৃত্বের কারণেই মাত্র ৫০ দিনের মাথায় ১২ মার্চ ১৯৭২ ভারত তার সেনা বাহিনী ফিরিয়ে নেয়ার কাজ শুরু করে। যা ছিল সদ্যস্বাধীন একটি দেশের ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা।

 

সুতরাং আমি আজ নিদ্বিধায় এ কথা বলতে পারি যে, যতই দিন যাবে ততই বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের এ জঘন্য নৃশংস হত্যাকান্ডের আরো অনেক অজানা তথ্য বেরিয়ে আসবে, এবং তা আসবে ইতিহাসের অমোঘ বিধানেই। কেননা ইতিহাসের পথে কেউ কেনোদিন বাঁধা দিয়ে রাখতে পারেনা। ইতিহাস তার আপন নিয়মেই নিজের পথ তৈরী করে নেবে।