ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক

%e0%a7%a6%e0%a7%a9%e0%a7%a9 f46a79c703d7c4efe4f82d79db755455-08

দেশের অনেক মহাসড়ক এবং বিভিন্ন স্থানের দোকানপাটে অসৎ মাহুতরা হাতি নিয়ে চাঁদাবাজী করে বেড়াচ্ছে। এদের সাথে যুক্ত আছে স্থানীয় মাস্তান ও টাউট বাটপারও। এ নিয়ে জনকন্ঠ, প্রথম আলো, বিডিনিউজ২৪.কম, জাগো নিউজ, বাংলানিউজ ও সময়ের কন্ঠস্বরসহ পত্রিকায় অনেক লেখালেখি হয়েছে। কিন্তু হাতি দিয়ে চাঁদাবাজী প্রতিকারে কারো নজরই নেই। এরই মধ্যে আমি নিজেও ঈদের ছুটিতে বাড়ি যাওয়ার-আসার পথে হাতি চাঁদাবাজীর শিকার হয়েছি দু’দুবার।  ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৬ স্বপরিবারে মৌলভীবাজার থেকে যাচ্ছিলাম গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার তিতাসে। আমাদের কারটি ড্রাইভ করছিল আমার ছেলে। তার পাশেই আমি বসাছিলাম। বি.বাড়িয়া-কুমিল্লা রোডের ‘কুটি চৌমুহনী’ কাছাকাছি আসতেই তিনটি বিশালদেহী গজদঁন্তি হাতি আমাদের গাড়ির পথরোধ করে দাঁড়ালো। মাঝখানের হাতিটা আমাদের কার-এর উইন্ডশিলের সামানে দ্রুতগকিতে শুঁড় নাড়াচ্ছে। আমার পরিবারের সবারই হাতি দিয়ে গাড়ির মালিকদের ভয় দেখিয়ে চাঁদাবাজীর খবরটি জানা ছিল। কিছুদিন আগে এমনই এক ঘটনায় গাড়ি চালক হাতিকে দশ টাকা নজরানা দিলে, ক্ষুব্দ হাতি সেই গাড়ির পুরো সন্মুখভাগ গুড়িয়ে দিয়েছিল। সেটি মনে করেই হয়তো আমার ছেলে-মেয়ে, বৌ-মা এবং আমার ম্যাডাম একযোগে চিৎকার শুরু করলো, দশ বিশ টাকা দিলে হবেনা, ১০০/- টাকা দিয়ে দাও; না হলে হাতির মাহুতের প্ররোচনায় অঘটন ঘটিয়ে দিতে পারে। শেষ পর্যন্ত ওদের সবার কথায় গাড়ির কাঁচ নামিয়ে ১০০/- টাকার একটা নোট এগিয়ে দিতেই শুঁড় দিয়ে ছোঁ মেরে টাকাটা নিয়ে গাড়ির সামনে থেকে চলে গেল। একটু এগিয়ে গিয়ে লুকিংগ্লাসে তাকাতেই দেখা গেল, একটি পাজেরোর পথরোধ করে দাঁড়িয়েছে হাতি তিনটি। শেষ পর্যন্ত পাজেরো মলিককেও হাতি ও মাহুতের কাছে অসহায় আত্মসমর্পন করতে হলো।

একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটলো ২০ সেপ্টেম্বর বাড়ি থেকে ফিরে আসার পথেও। এ ঘটানাটি ঘটেছে কুমিল্লা জেলার মুরাদনগর উপজেলার বাখরাবাদ-জাহাপুর সড়কে। ওইদিন আমরা স্বপরিবারে কর্মস্থলে ফিরছিলাম একই পথে। ‘বাখরাবাদ-জাহাপুর’ সড়কে ধরে ফিরছিলাম মৌলভীবাজারের উদ্দেশ্যে। কিছুদূর যেতেই আবার সেই সেই তিন হাতি আমাদের কারটির পথরোধ করে দাঁড়ালো আমি এর বিরোধিতা করতে যেয়েও পরিবারের অন্য সদস্যদের বাধার কারণে কিছুই বলতে পারলাম না। অবস্থা বিচেনায় সবাই আমাকে আটকে দিল। কিন্তু এযাত্রায় আমি টাকা দিলাম না। আমার ম্যাডাম তার পার্স খুলে ৫০ টাকা দিয়ে দিল অনাকাঙ্খিত সমস্যা এড়ানোর জন্য। টাকা নিয়ে হাতিরা এগিয়ে যেতে লাগলো তাদের নতুন শিকারের উদ্দেশ্যে। হাতির পিছনে পিছনে ছুটছে গ্রামের শত শত উলঙ্গ, অর্ধউলঙ্গ শিশুদের দল।

এ বিষয়টি নিয়ে এরই মধ্যে পত্র-পত্রিকায় অনেক খবর ও প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে হাতি দিয়ে চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে একটি চক্রের বিরুদ্ধে। পত্রিকার খবরে জানা গেল একটি চক্র সালামির নাম করে গাড়ি থামিয়ে টাকা আদায় করছে । এলাকাবাসীর অভিযোগ, কাঞ্চন পৌর এলাকার জুয়েল ও তার সহযোগীরা স্থানীয় প্রভাবশালীদের সহায়তায় প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে সার্কাস শিল্পে ব্যবহৃত বান্দরবানের হারবং মারমার মালিকানাধীন দুটি হাতিকে মাসিক ভাড়ায় রূপগঞ্জ নিয়ে আসে।
প্রতি মাসে বিশ হাজার টাকা ভাড়ার বিনিময়ে চাঁদাবাজরা হাতি দুটি পালা বদল করে ভাড়া নিয়ে নেয়। আর এ ভাড়ার টাকা তুলতে এ হাতি দুটি দিয়ে বিভিন্ন সড়ক মহাসড়কে চলাচলরত যানবাহন থামিয়ে জিম্মি করে চাঁদা করে। মহাসড়কে চলাচলরত যানবাহন থামিয়ে সালাম করার নামে আদায় করা হয় ৫০ টাকা থেকে ১০০ টাকা। মাহুতের চাহিদা মতো টাকা না দেয়া হলে গাড়ির সামনে হাতি দাঁড় করিয়ে দীর্ঘক্ষণ গাড়ি আটকে রাখে মাহুত। এতে গাড়িতে থাকা যাত্রীরা হাতির ভয়ে ভীত হয়ে দ্রুত টাকা দিয়ে দেয়। সালামির নামে এ চাঁদার টাকা হাতি শুড় বাড়িয়ে নিয়ে মাহুতের কাছে দেয়।

কিছুদিন আগে কাঞ্চন-কুড়িল বিশ্বরোডে এ দৃশ্য দেখা যায় বলে পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে। এয়ারপোর্ট থেকে আসা প্রবাসী আব্দুল কাইয়ুম বলেন, ভাই আগে জানতাম মানুষ চাঁদাবাজি করে এখন হাতি চাঁদাবাজি করছে। এটা আবার কেমন চাঁদাবাজি।  এছাড়া রূপগঞ্জের বিনোদন পার্কে বেড়াতে আসা লোকজনও এ হাতির চাঁদাবাজি থেকে রক্ষা পাচ্ছে না। জিন্দা পার্কের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তোবারক হোসেন কুসুম বলেন, জিন্দা পার্কে বেড়াতে আসা লোকজন হাতির চাঁদাবাজি থেকে রক্ষা পাচ্ছে না। এ ব্যাপারে আমরা থানা পুলিশকে জানিয়েছি। হাতির মালিক জুয়েল মিয়া বলেন, এ ধরনের অভিযোগ সঠিক নয়। হাতি দিয়ে আমি চাঁদাবাজি করি না।

রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার বানেশ্বর এলাকার রাজশাহী-নাটোর মহাসড়কে একই ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ ওঠেছে। মহাসড়কে কোনো যানবাহন দেখলেই তার পথ আগলে দাঁড়িয়ে গেছে একটি হাতি। শুঁড় বাড়িয়ে দিয়েছে ‘চাঁদা’র জন্য। টাকা না দিয়ে মহাসড়ক পার হতে পারেনি ট্রাক, বাস, অটোরিকশা এমনকি মোটরসাইকেলও। যে হাতিটি এই ‘চাঁদাবাজি’ চালিয়েছে, তার নাম রোমিও। আর তার মাহুতের নাম রাজু

এ নিয়ে আরও খোঁজ-খবর নিয়ে জানা গেছে, ব্রা‏হ্মণবাড়িয়া থেকে রাজশাহীর বাঘার এলাকায় ঈদ মেলায় সার্কাস দেখাতে এসেছিলেন তাঁরা। মেলা শেষ হয়ে গেছে। শো আর জমছে না। তাই টাকার বড় টান। তাঁর দাবি, এটা চাঁদাবাজি নয়। হাতির খাবার জোগাড় করতেই রোমিওকে নিয়ে ভিক্ষা করছেন তিনি। ইতোমধ্যে হাতি দিয়ে দিনাজপুর, ঘোড়াঘাট, রাউজান, সাটুরিয়া, ঠাকুরগাও, মতলব, চাঁদপুর, জিনাইদহ, কিশোরগঞ্জ, গাইবান্ধা এমন কি খোদ রাজধানী ঢাকাতেও সড়ক-মহাসড়ক, ও দোকানপাটে হাতি দিয়ে চাঁদাবাজী হচ্ছে।

এ ব্যপারে বনবিভাগ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা যাচ্ছে। এ নিয়ে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি হলেও প্রশাসন নির্বিকার। এখনই এ  প্রবণতা বন্ধে সহসাই  কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ করা না হলে, যে কোন সময় যে কোন অঘটন ঘটতে পারে বলে মহাসড়কে গাড়ি নিয়ে চলাচলকারী ও সাধারণ মানুষের ধারণা।