ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

কয়েক বছর আগের কথা, বাংলাদেশে তখন পর্নোগ্রাফির ছড়াছড়ি চলছিল। এফডিসির চলচ্চিত্র মানেই তখন ছিল প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগি ছবি। এর ফলে দেশীয় চলচ্চিত্র তখন মুখথোবড়ে পড়ছিল, বলা হচ্ছিল, বাংলাদেশের চলচ্চিত্র তখন মুমূর্ষূ অবস্তায় ছিল। এজন্য কেউ অভিমান করে চলচ্চিত্রে কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছিল, আবার কেউ ঐ পরিস্থিতিতে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিয়ে পুরোদমে কাজ শুরু করে দিয়েছিল, অনেক বহিরাগত তথাকথিত নায়ক-নায়িকার আমদানী হয়েছিল। ব্যতিক্রম কেউ কেউ তখন এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য দেন-দরবার করছিল কিংবা সুস্থ ধারার চলচ্চিত্র বানিয়ে কিছুটা প্রতিরোধ করার চেষ্টা করছিল। এ অবস্থায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও এফডিসি’র পর্নোগ্রাফির কলা-কুশলী এবং নির্মাতাদের বিরুদ্ধে অভিযানে নামে। এ অবস্থায় মিডিয়া একটি জোরালো ভূমিকা নিয়েছিল এই পর্নোগ্রাফির বিরুদ্ধে। তো তখন এক পর্নোগ্রাফির নির্মাতাকে পর্নোগ্রাফি কেন করছেন জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন- নগ্নতাই অশ্লীলতা নয়। খুবই চমৎকার সংলাপ। আমরা এই উক্তি শুনে শিহরিত হয়েছিলাম আর ভাবছিলাম- ইস! যদি এরকম একটি সৃজনশীল সংলাপ নিজে উদ্ভাবন করতে পারতাম! আরো মজা পেয়েছিলাম যখন এই পর্নোগ্রাফি জায়েজ করার জন্য একজন প্রথম সারির নায়ক কাম প্রযোজক আরো এগিয়ে বলেছিলেন- আমাদের সিনেমার দর্শক হলো রিকশাওয়ালা আর ঠেলাওয়ালা। তাই এদের চাহিদা অনুযায়ীই তো আমাদেরকে সিনেমা বানাতে হবে, নতুবা লগ্নি উঠে আসবে কি ভাবে? তাইতো, লগ্নি উঠে আসবে কি ভাবে? ব্যবসা মানেই তো লাভ, নৈতিক না অনৈতিক সেটা ভাবা কি উচিত?

আজকে আমি সিনেমা নিয়ে লিখতে বসিনি। প্রাসঙ্গিকতার প্রয়োজনে একটু বলে নিলাম আর কি। আমাদের দেশে কোন বিষয় ব্যাখ্যা করার জন্য লোকজন যে কতো দক্ষ, তা নিজের চোখে না দেখলে, না শুনলে বিশ্বাস করা যায় না। উপরের সংলাপটিই তার প্রমান। দেশের বা সমাজের কোন লোক যদি এরকম অপব্যাখ্যার মাধ্যমে কোন বিষয় তুলে আনে, তাহলে আমরা তার প্রতিবাদ করিনা, কারণ তার অপব্যাখ্যা সমাজে প্রভাব ফেলতে পারবে না বলেই আমরা বিশ্বাস করি। কিন্তু যদি রাষ্ট্রের সরবোচ্চ পরযায় থেকে এরকম অপব্যাখ্যা আসে, তাহলে উদ্বিঘ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ তো অবশ্যই থাকে। কারণ, তারা হলেন দেশের নীতি নির্ধারক। তাদের অপব্যাখ্যার কারণে সমাজে তথা দেশে বিপর্যয় ঘটতে পারে।

এমনই একটি অপব্যাখ্যার জন্ম দেয়া হয়েছে বিশ্বজিতের হত্যাকান্ডকে কেন্দ্র করে এবং এই অপব্যাখ্যাটি রাষ্ট্রের সরবোচ্ছ পরযায় থেকে এসেছে বলেই আমরা ভয় অনুভব করছি। মিডিয়ার কল্যাণে বিশ্বজিতের হত্যাকান্ডটি আমরা সরাসরি তো দেখেছিই, তাছাড়া মাঝে মাঝেই এই হত্যাকান্ডটি কোন না কোন টিভি চ্যানেলে দেখানো হচ্ছে। কারা বিশ্বজিতের হত্যাকারী তা সবাই দেখেছে এবং রাষ্ট্রের সরবোচ্ছ পরযায়ের ব্যাক্তিরাও নিশ্চয়ই একবার হলেও এটি দেখেছেন। এখন প্রশ্ন হলো, হত্যাকারীর যথাযথ শাস্থি হবে কিনা? নাকি বিশ্বজিতকে রাজনীতির বলীর পাঠা বানানো হয়েছে?

হত্যাকারীর পারিবারিক পরিচয় এখানে গৌন। প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে যাবার পর দায়-দায়িত্ব নিজের, পরিবারের নয় এবং বিশ্বজিতের হত্যাকারীরা প্রাপ্তবয়স্ক-এ বিবেচনায় এদের যথাযথ শাস্তি হওয়া উচিৎ। অপব্যাখ্যার মাধ্যমে পারিবারিক পরিচয়ের আড়ালে হত্যাকারীকে রক্ষার চেষ্টা রাষ্ট্রের সরবোচ্চ পরযায়ের ব্যাক্তিদের করা উচিত নয়। কাম্যও নয়। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী সব সময়ই বলেন-স্বজন হারানোর বেদনা উনি বুঝেন। যদি তাই হয়ে থাকে, তাহলে বিশ্বজিতের পরিবারের সদস্যদের বেদনা ও নিশ্চয়ই তিনি অনুভব করতে পারছেন। আর একটি বিষয় হলো, বিশ্বজিত একজন সংখ্যালঘু পরিবারের সদস্য ছিল, যে পরিবার দাবী করছে তারা সব সময় নৌকায় ভোট দিয়েছে। এখন প্রধানমন্ত্রীর তো রাজনৈতিক দায়ও জন্মেছে। কারণ রাজনৈতিক সমর্থকদের রক্ষার দায়তো নিশ্চয়ই সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলের। আমরা আশা করবো, রাষ্ট্রের কর্তাব্যাক্তিরা তাদের দায়িত্বের পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে হত্যাকারীদের র্সবোচ্ছ শাস্তি নিশ্চিত করবেন এবং অপব্যাখ্যার আড়ালে সত্য গোপনের অপচেষ্টা থেকে বিরত থাকবেন।