ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

রবীন্দ্রনাথের সমাপ্তি গল্পের নায়ক, বাংলা ভাষায় শব্দের সীমাবদ্ধতা খুব ভাল ভাবেই বুঝতে পেরেছিলে, কিন্তু কোন উপায় না পেয়ে শুধুমাত্র আক্ষেপ প্রকাশ করেছিলেন, আজকে আমিও সেরকম অবস্থার মুখোমুখি। দেশে আজ এতোবেশি অনাচার আর অবিচার, কোনটি নিয়ে যে লিখবো বুঝতে পারিনা, আর অনাচার-অবিচারকারীরা চূড়ান্ত রকমের অন্ধ এবং বধির বলে কোন আলোচনা-সমালোচনাই এরা জানতে বা বুঝতে পারেনা নতুবা হয়তো জানতে বা বুঝতে চায় না।

যখন পড়তে শুরু করলাম, তখন থেকে এখন পর্যন্ত কতোবার যে পড়েছি, “শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড আর শিক্ষকরা জাতির বিবেক আর মেরুদন্ড তৈরির কারিগর”। কথাটি আমাদের শিক্ষাজীবনে পুরোপুরি সত্য প্রমাণিত না হলেও আদিকালে যে তেমনটাই ছিল সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোন দ্বিমত নাই। কিন্তু এখন শিক্ষক আর সন্ত্রাসীর মধ্যে আমি কোন আচরনগত পাথর্ক্য দেখতে পাই না। সন্ত্রাসীর বিবেক আর শিক্ষকের বিবেক এক হয়ে গিয়েছে বলে আমার নিকট প্রতীয়মান হয়। সন্ত্রাসী জিম্মি করে অবৈধ সুবিধা আদায় করে-এটা স্বাভাবিক বলেই আমরা ধরে নিই, কিন্তু শিক্ষকরা যখন একই পন্থায় অর্থাৎ জিম্মি করে কোন সুবিধা আদায় (যদি সেটা বৈধও হয়)করতে চায়, তখন সেটা কি? আমি কি এটিকে সন্ত্রাসী কার্যক্রম বলবো না? যে সব শিক্ষকরা এটি করে তারা কি সন্ত্রাসী না? শিক্ষকদের মহৎ দৃষ্টান্তের অনেক উদাহরণ আমরা জানি। এজন্যই গুরু দক্ষিণা বলে একটি কথা প্রচলিত। শিষ্যও বিষয়টি অবনত মস্তকে মেনে নেয়। প্রকৃত শিক্ষককে দেখলে এমনি এমনিই শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে, আর যখন শিক্ষকরুপি, শিক্ষকনামধারী সন্ত্রাসী কে দেখি তখন আমার কি অনুভূতি হয়, সেটি প্রকাশ করা এখানে সমীচীন হবেনা বলেই মনে করছি।

বর্তমান সরকার অনেক অভিনব দূর্নীতির উদ্ভাবন করেছে, এর মধ্যে শিক্ষাঙ্গনের আগ্রাসী দূর্নীতি অন্যতম বলেই আমি মনে করি। কারণ এখানে সমাজের সকল স্তরের মানুষ দূর্নীতির শিকার হচ্ছে। আর এই দূর্নীতির উদ্ভাবক হচ্ছেন স্বজ্জন মানুষ বলে পরিচিত বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসাম নাহিদ। এই নোংরা মনের মানুষ কি করে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করছে, তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ না করলে বোঝা মুশকিল। এখনো বাংলাদেশের বিশাল একটি অংশের আর্থিক অবস্থা তেমন নয় যে, তারা গৃহ শিক্ষক বা কোচিং সেন্টারে টাকা খরচ করে আলাদাভাবে পড়াশোনা করতে পারবে।এ বিষয়টি জানার পরেও শিক্ষামন্ত্রী স্কুলে টাকার বিনিময়ে কোচিংকে বাধ্যতামুলক করে দিলেন। অনেক দিন আগে থেকেই আমরা দেখে আসছি, আর্থিকভাবে অনগ্রসর ছাত্র-ছাত্রীরা বিনা বেতনে স্কুলে পড়াশোনা করেছে। প্রাইভেট পড়ার চিন্তাও তারা করতে পারেনি এবং নিজের মেধা ও যোগ্যতা প্রমান করে পাবলিক পরীক্ষায় অনেক আর্থিকভাবে অনগ্রসর ছাত্র-ছাত্রী ইর্ষনীয় ফলাফল করেছে এবং এখনো করছে। কিন্তু বর্তমানে কোচিং এর নামে শিক্ষাঙ্গনে চলছে মহা সন্ত্রাস। মফস্বল এলাকায় সরকারী স্কুলগুলোতে সাধারণত আর্থিকভাবে অনগ্রসর ছাত্র-ছাত্রীরাই শিক্ষাগ্রহণ করে থাকে আর আর্থিকভাবে অগ্রসর ছাত্র-ছাত্রীরা সাধারণত বেসরকারী ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলগুলোতে শিক্ষাগ্রহণ করে অবশ্য ব্যতিক্রমও আছে। সরকারী ঘোষণা অনুযায়ী শিক্ষকরা বাহিরে প্রাইভেট না পড়িয়ে স্কুলে কোচিং করাবে আর এর বিনিময়ে তারা ছাত্র-ছাত্রীদের কাছ থেকে কিছু আর্থিক সুবিধা নিতে পারবে আর এ সরকারী ঘোষণাই এখন শিক্ষকনামধারী সন্ত্রাসীদের মারণাস্ত্র।এর ফলে কোচিং এর নামে শুরু হয়েছে জিম্মি করে টাকা আদায়ের মহোৎসব। কোন ছাত্র-ছাত্রী কোচিং ফি পরিশোধ না করলে, বার্ষিক বা নিরবাচনী পরীক্ষায় ফেল। অথচ এই কোচিং ফি পরিশোধ করার স্বামর্থ ঐ শিক্ষার্থীদের আছে কিনা, তা দেখার প্রয়োজনতো শিক্ষকনামধারী ঐসব সন্ত্রাসীদের নেই। সরকারী নির্দেশ বলে কথা, কোচিং এর ফি পরিশোধ করতে হবে এবং শিক্ষকনামধারী ঐসব সন্ত্রাসীরা এই ফি আদায়ে তাদের কাছে থাকা সব ধরনের মারণাস্ত্র (বার্ষিক পরীক্ষা ফেল, নিরবাচনী পরীক্ষায় ফেল, সবার সামনে ঐ শিক্ষার্থীকে কান ধরিয়ে দাড় করিয়ে রাখা, ইত্যাদি) প্রয়োগ করছে।আমি ব্যক্তিগতভাবে এরকম কয়েকটি ঘটনা পর্যবেক্ষণ করেছি। আর এসব মহৎ(!) কাজ যারা সম্পাদন করছেন, তারা কি সন্ত্রাসী না? যারা রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে জড়িত, তারা সমাজের সব মানুষের সামগ্রিক অবস্থা না জেনে কি করে সরকারে যুক্ত হতে পারলো, এরকম খারাপ (স্কুলে কোচিং, অথচ শিক্ষকরা কখনোই বাহিরে প্রাইভেট পড়ানো বন্ধ করেনি, স্কুলের কোচিংও হয় না, যে কেউ বিষয়টি সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করে দেখতে পারেন) তা আমি বুঝতে পারিনা। তবে এদের বিবেক যে মৃত সে সম্বন্ধে আমার কোন সন্দেহ নাই।

আমি জানি আমাদের দেশে আলোচনা-সমালোচনা করে নেতিবাচক কোন জিনিসের পরিবর্তন কখনোই আনা যায়নি এবং যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা আবেগের উপরে ‍যুক্তিকে স্থান দিতে না পারবো, ততক্ষণ পর্যন্ত কোন পরিবর্তন হবে না। শুধূ মনের মধ্যে ক্ষোভ আর ঘৃণা পোষণ করে রাখতে পারবো, কিন্তু পরিবর্তন আনতে পারবো না, তব আশাবাদী, একদিন হয়তো মানুষের বিবেক জাগ্রত হবে, সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে সন্ত্রাসীদের মতো অর্থ আদায় বন্ধ হবে।পরিশেষে অন্যদেরকেও এসব অনাচার – অবিচার নিয়ে লেখার জন্য বিনীত অনুরোধ করছি। আমাদের বর্তমান সমাজের কাঠামোতে পচঁন ধরেছে, আবেগের উপর যুক্তিকে স্থান দিতে না পারলে, শিঘ্রই ধ্বস নামতে পারে।