ক্যাটেগরিঃ প্রযুক্তি কথা

 

রিবো নামে ২০১৬ তে একটি রোবট তৈরি করেছিলো শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দল। এই রোবটের বৈশিষ্ট্য হল এটি বাংলায় কথা বলতে পারা প্রথম রোবট। এতে কিছু ডাটা সেট করে দেয়া ছিলো যা থেকে এটি উত্তর দিতে পারতো।

ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরা তৈরি করেছে আরেকটি কথা বলা রোবট ডি-বোট। এরকম আরো কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে রোবট নিয়ে কাজ হচ্ছে।

মার্স রোবটিক চ্যালেঞ্জ-এ এর আগে বাংলাদেশের ইন্ডিপেন্ডেন্ট বিশ্ববিদ্যালয় সারাবিশ্বে ১৮তম হয়েছে। এছাড়া বুয়েট, সাস্ট, ঢাবি, জাবি তে রোবটিকস ল্যাব প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। গতবছর বুয়েটে চার কোটি টাকা ব্যয়ে রোবটিক ল্যাব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এ কাজগুলো খুবই পজিটিভ। পাশাপাশি এমার্জিং টেকনোলজি যেমন, বিগ ডাটা এনালাইসিস, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এর ক্ষেত্রেও আগ্রহ তৈরি হচ্ছে দেশের তরুণদের মধ্যে। এ প্রক্রিয়ায় যেন আরো উৎসাহ বাড়ে, সেজন্য সরকারের ইনোভেশন ডিজাইন এবং এন্ট্রেপ্রেণারশিপ একাডেমিতে স্টার্ট আপ বাংলাদেশের ক্যাম্পেইন শুরু করা হয়েছে। এ ক্যাম্পেইন এর মাধ্যমে তরুণদের মধ্য থেকে আইডিয়া গুলো নেয়া হচ্ছে। যা দিয়ে পরবর্তীতে কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

22_Digital+World_Sophia_AMO_061217_0008

সোফিয়াকে নিয়ে বেশ আলোচনা হচ্ছে। জাতীয় পর্যায়ে যেকোন চমকপ্রদ কাজেই মানুষের আগ্রহ একটু বেশিই থাকে। সেখানে সামর্থ্যের বাইরে খরচ করে কিছু করাটা তাই মানুষ খারাপভাবেই দেখবে। দেশের শীর্ষস্থ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা খাতে যেখানে বাজেট ১৪ কোটি টাকা, সেখানে ১৬ কোটি টাকা খরচ করে বিদেশ থেকে সোফিয়াকে আনাটা প্রশ্নবিদ্ধ করার মতই কাজ। যদিও পুরো টাকাটা সরকারের না। এই আয়জনের মূল স্পন্সর ইসলামী ব্যাংক।

সোফিয়ার সাথে উপরোক্ত রোবটগুলোর মূল পার্থক্য, সোফিয়ার মধ্যে ৬০০০ শব্দ বিল্ট ইন ভাবে সেভ করে তা দিয়ে সম্ভাব্য প্রশ্নগুলোর উত্তর সেট করা আছে। তাকে যখন কোনো প্রশ্ন করা হয়, তখন সে প্রশ্নের শব্দগুলো বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য উত্তর দাঁড় করায় এবং ওয়াইফাই ব্যাবহার করে গুগল থেকে তথ্য সংগ্রহ করে তা দিয়ে প্রশ্নের উত্তর দেয়। তাছাড়া সে নিজের মত করে কথা বলতে পারে, সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং নিজে থেকেই অনেক কাজ করতে পারে।

১৬ কোটি টাকা আমাদের জন্য অনেক কিছু। এই টাকাগুলো দিয়ে বাংলাদেশের অন্য ভার্সিটিগুলোতে গবেষণা খাতে বাজেট দিলে বা উপরোক্ত প্রজেক্ট কারীদেরকে দিলে তারা হয়ত এরকম রোবট বানিয়ে দিতে পারতো। সেক্ষেত্রে আমাদের দেশীয় কোম্পানীগুলোকে এসব কাজে স্পন্সর করা উচিৎ। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়েই এরকম ল্যাব প্রতিষ্ঠা করে অন্যান্য আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্স এর ব্যবহারের দিকেও দৃষ্টি দিতে হবে।

ইতোমধ্যে ব্রাক এর স্যাটেলাইট মঙ্গলে অবতরণ করেছে, চুয়েট এর মাইন সুইফার জয় করেছে মালয়েশিয়া, রুয়েটের ক্রাক প্লাটুন যাচ্ছে জাপানের ফর্মুলা ওয়ান রেসিং এ। ছোট ছোট উদ্যোগ থেকেই বড় কাজগুলো হয়ে থাকে। এর জন্য সবচেয়ে বড় যে প্রতিবন্ধকতা তা হল স্পন্সর। বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই আমরা কাজ করার সময় যে কথাটা শুনি তা হল টাকা নেই। ভার্সিটিতে দক্ষ শিক্ষকও এখন অনেক অভাব। যোগ্য নেতৃত্বের সাথে প্রয়োজনীয় অর্থের সীমাবদ্ধতা, প্লাটফর্ম এর অভাবে আমরা বেশিরভাগই থমকে যাই। বাংলাদেশে যে পরিমাণ দুর্নীতি হয়, তা থামানো গেলে এ দেশের উন্নয়ন অনেকাংশেই এগিয়ে থাকতো। পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি নির্মাণব্যায় আমাদের, সেসাথে দুর্নীতিতেও আমরা চ্যাম্পিয়ন।

দেশে যারা নতুন প্রজেক্ট নিয়ে কাজ করতে চায়, তারা প্রয়োজনীয় সুবিধা ও প্লাটফর্ম এর অভাবে তা করতে পারছেনা, ফলে বেশিরভাগ মেধাবীরই স্থান হচ্ছে বিদেশে। যার ফল আমরা দেখতে পাই বাংলাদেশি নাফিসের গ্রাফিক্স বিভাগে অস্কার জয়, ওয়াহিদ উন নবির মনোনয়ন, ইউটিউব এর প্রতিষ্ঠা, খান একাডেমী, নাসায় উচ্চপদ, ওরা যদি এদেশে আটকে থাকতো, তাহলে তা কখনই সম্ভব হতনা। কারণ এখানে সেই প্লাটফর্মটা নেই। এর জন্য সবার আগে জরুরি গবেষণা খাতে বাজেট বৃদ্ধি, প্রতিষ্ঠানগুলোতে দলীয়করণের উর্ধ্বে উঠে মেধাবী ও সৎ শিক্ষক নিয়োগ, যোগ্য প্রশাসক তৈরি এবং সর্বোপরি তরুণদের মধ্যে নতুন কিছু করার ইচ্ছা জাগিয়ে তোলাটা।

তবে এ রোবট আসার ফলে দেশজুড়ে যে একটা উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, এবং সবার মধ্যে রোবটিকস এর প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়েছে, তাও ফেলে দেয়ার মত না। বরং অন্যভাবে ভাবলে এটাও অনেকাংশে পজিটিভভাবে নেয়া যায়।

এ থেকে যদি শিক্ষার্থীরা রোবটিকস এর প্রতি আগ্রহী হয় এবং সরকারও যদি একাজে বেশি বাজেট দেয়, প্রাইভেট ফার্মগুলো যদি এগিয়ে আসে, তাহলে বাংলাদেশ সত্যিই একদিন ডিজিটাল হয়ে যাবে, তখন আয়োজন করে বলতে হবেনা, “ডিজিটাল বাংলাদেশ”।

পূর্বে প্রকাশিত