ক্যাটেগরিঃ জানা-অজানা

 

একজন কিশোর তার শ্রেণীকক্ষে একদিন দেরি করে আসলো। এই শ্রেণীকক্ষের সব ছাত্রদের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের মতই হলো তাদের চোখে একজোড়া চশমা। এই চশমার মূল কারণ হলো, তাদের প্রত্যেকের সামনে নিজস্ব ল্যাপটপ। কিশোর দেখলো ক্লাস শুরু হয়ে গেছে। সবার যার যার নিজস্ব ল্যাপটপের দিকে মনোযোগ। স্যার যা বলছেন, সবাই টাইপ করছে এমনভাবে যে কিবোর্ডের শব্দ-ই বলে দিচ্ছে তারা কতটা দ্রুত লিখতে পারে। সেই কিশোর মাঝামাঝি একটা সিটে বসে পড়লো। ব্যাগ থেকে বের করলো খাতা আর কলম। স্যার কি বলছেন তাতে তার মন নেই। সে খাতায় ঘচঘচ করে আঁকিবুঁকি করছে। হঠাৎ করেই চোখ গেল স্যারের, ঐ কিশোরের দিকে। এই ছেলে তুমি কি করছো? (কলমে ধরে) এটা কি? কোথায় পেলে এটা? এই ছেলে কথা বলছ না কেন? চশমার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে বললো, জ্বি মানে স্যার (!) এটা স্টোর হাউজ পরিস্কার করতে গিয়ে পেয়েছি। সবাই ল্যাপটপের সামনে থেকে চোখ সরিয়ে চশমা যুগল দিয়ে কিশোরের দিকে তাকালো। কিশোর তখন একটা গর্ববোধ নিয়ে হাসছিল। ভাবখানা এমন যে মনে হয় সে কোনো এলিয়েন পেয়ে গেছে। স্যার তখন বিস্ময়ের সাথে কলমটা ধরে এপিঠ ওপিঠ দেখছিলেন। কলমের নামটি মুছে গেছে বলে আফসোসও করছিলেন। আহাহা যদি নামটা থাকতো…!!!

প্রিয় পাঠক, লেখার উপরিভাগে ভবিষ্যতের কথা লিখার সামান্য চেষ্টা করলাম। বর্তমানে আমরা প্রযুক্তির উপর এতটাই নির্ভর হয়ে গিয়েছি যে, ক্লাস আর পরীক্ষা ছাড়া কোনো ছাত্র/ছাত্রী কলম দিয়ে লেখেন কম। বাসায় প্র্যাকটিসের জন্যে হয়তো টুকটাক লিখা হয়। ব্যস তাতেই চলে।

বাকিটা সময় ল্যাপটপ অথবা স্মার্টফোনের কিবোর্ডে। একটা সময় আসবে যখন চোখের ওজনের থেকে চশমার ওজন হবে বেশি কারণ চশমাতে এত পাওয়ার থাকবে। এর মূল কারণ ল্যাপটপ আর স্মার্টফোন।  

আমরা জানি একসময় কলম ছিলনা। আদিম যুগে মানুষ যখন গুহার ভেতরে বাস করত তখন গুহার ভেতরের দেয়ালে কোনো তীক্ষ্ণ জিনিস দিয়ে ছবি আঁকত বা হিজিবিজি আঁকত। আবার অনেক সময় কোনো পাতা বা শিকারের রস বা রক্ত দিয়ে আঁকিবুকি কাটত। তার অনেক পরে যখন সভ্যতার একটু একটু উন্মেষ ঘটল তখন কাঁদামাটির পাটায় বা নরম পাথরে লিখা শুরু করে, এদের মাঝে চীনে উটের লোম দিয়ে তৈরি তুলির ব্যবহার লক্ষ করা যায়।

তবে প্রথমে মিশরীয়রা একটা কাঠির ডগায় তামার নিবের মত কিছু একটা পরিয়ে লিখা শুরু করে। আর প্রায় হাজার চার বছর আগে গ্রীসবাসীরা রীতিমত লিখা শুরু করে দেয়।

এদের কলম তৈরি হত হাতির দাঁত বা এই জাতীয় কিছু দিয়ে। যার নাম ছিল স্টাইলস (Stylus )। সেজন্য এখনও লিখার ধরন কে “স্টাইল” (Style) বলা হয়ে থাকে। আর মধ্যযুগে কাগজের আবিস্কারের পরে পালকের কলম দিয়ে লিখা প্রচলিত হয়।

ইংল্যান্ডে ১৭৮০ সালে নিব পরান কলমের প্রচলন ছিল কিন্তু তার প্রায় ৫০ বছর ধরে খুব একটা ব্যবহার হত না। ১৮৮৪ সালে ওয়াটারম্যান (L.E. Waterman) আবিস্কার করেন ফাউন্টেন পেন। তবে এর নিব তৈরিতে প্রয়োজন হত ১৪ ক্যারেট সোনা। আর ডগা তৈরিতে লাগত ইরিডিয়াম। এরপরে অনেক দেশও ফাউন্টেন পেন তৈরি করা শুরু করে। আর বিংশ শতাব্দীতে তৈরি হয় বল পয়েন্ট পেন বা বল পেন।

[মুক্ত প্রাণের প্রতিধ্বনি ভোরের কাগজ পত্রিকায় ২০১৫ সালের আগস্ট মাসের ৩ তারিখে “কলম আবিষ্কারের ইতিহাস” নামের প্রতিবেদন থেকে সংগৃহীত]

 

ব্রিটিশ শাসনের শেষ দিকে তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেন যোধপুরের মহারাজাকে একটি বিশেষ কলম উপহার-স্বরুপ দিয়েছিলেন। এই কলমের একদিকে দিয়ে যেমন লেখা যেত, তেমনি অপরদিকে ছিল আত্মরক্ষার জন্য বন্দুক। কবিগুরু তাঁর পুত্র শমীন্দ্রনাথকে একটি ঝরনা (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-ই এই নামটি দিয়েছিলেন) কলম উপহার দিয়েছিলেন বলে আমরা জানি।

ব্যাবিলনের মানুষরা নরম মাটির ফলকে পশুপাখির হাড়, হাতির দাঁত, কাঠ প্রভৃতি দিয়ে লিখতে শুরু করে। মোটামুটি ৩০০০  খ্রিস্ট্রপূর্বাব্দে রিড (খাগড়া) পেন (নলখাগড়ার বা খাগের কলম) দিয়ে লেখা শুরু করে মিশরীয়রা, প্যাপিরাসের ওপরে। একইসময়ে গ্রীকরাও সরু ধারালো পাথরের ফলা দিয়ে মোমের প্রলেপ লাগানো পাতলা কাঠের ফলকে লেখা শুরু করেছিল। অতীতে দীর্ঘসময় ধরেই পাখির পালকের সূচালো অগ্রভাগ (কুইল) কালিতে চুবিয়ে লেখার জনপ্রিয় চল ছিল। জানা যায়, কুইল পেন ডান হাতে ধরে লেখার ক্ষেত্রে, পাখির বাঁ-দিকের পাখনার পালক সংগ্রহ করা হত। কারণ পাখনাগুলি খানিকটা ডান দিকে বেঁকে থাকায় হাতে ধরে লেখার সুবিধে হত বেশি। আবার অগ্রভাগ সঠিকভাবে সূচালো করারও নির্দিষ্ট পদ্ধতি ছিল। মোটামুটিভাবে ষষ্ঠ বা সপ্তম শতক থেকে কুইল পেনের ব্যবহার শুরু হয়। ইউরোপে ষোড়শ থেকে মোটামুটি অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগ অবধি কুইল পেনের ব্যবহারই জনপ্রিয় ছিল।

১৬৩৬ সালে জার্মান গণিতজ্ঞ ড্যানিয়েল শো এন্টারের ‘Delicate Physico-Mathematicae’ গ্রন্থে কুইল ফাউন্টেন পেনেরও উল্লেখ পাওয়া যায়। আমেরিকার সংবিধানও লেখা হয়েছিল ১৭৮৭ সালে কুইল পেন দিয়েই। রিড পেনের পর জনপ্রিয় হয় কুইল নিবের পেন। তারপর আসে স্টীলের নিব এবং পরে ফাউন্টেন। তবে ইতালির পম্পেই শহরের ধ্বংসাবশেষ থেকে প্রত্নতত্ত্ববিদরা তামার নিব পাওয়ায় মনে করা হয়, এইসময়েও (আনুমানিক ৭৯ খ্রিস্ট্রাব্দে) ধাতু দিয়ে তৈরী নিব ব্যবহারের প্রচলন ছিল।

১৭৮০ সালে ইংল্যাণ্ডের জন মিচেল মেশিনের সাহায্যে স্টীল পেন তৈরির পন্থা আবিস্কার করেন। ফাউন্টেন পেনের জগতে একের পর এক বড় পরিবর্তনগুলো আসা শুরু করে উনবিংশ শতক থেকে। ১৮০৩ সালে ইংল্যাণ্ডে ধাতুর তৈরি পেনের প্রথম স্বত্ব ঘোষণা করা হলেও তা বাণিজ্যপযোগী হয়ে ওঠেনি। ১৮০৯ সালে প্রথম কালি সংরক্ষণের ব্যবস্থাযুক্ত পেনের স্বত্ব পান বার্থহলোমিউ ফল্ক। ১৮০৩ এর পর ১৮১১ সালে, ব্রায়ান ডানকিনের ধাতু দিয়ে তৈরী কলম বিক্রয়যোগ্যভাবে উৎপাদন করার স্বীকৃতি লাভ করে। সাধারণ মানুষের ব্যবহারপোযোগী ধাতুর নিবযুক্ত পেনের সূচনা ঘটে ১৮২২ সালে। ফাউন্টেন পেনের বির্বতনে একটি আলাদা অধ্যায়েয় সূচনা হল ১৮২৭ সালে-প্রেত্রাক পোনেরু আবিস্কার করলেন নতুন এক ধরনের ফাউন্টেন পেন, যার ভেতরেই তরল কালি ভরে রেখে তা দিয়ে টানা অনেকটা লেখা সম্ভবপর হল। জানা যায়, ৯৫৩ সালে মিশরে নাকি প্রথম এই ধরনের কালি রাখার আধারযুক্ত কলম তৈরি হয়েছিল। যদিও এর ঐতিহাসিক সত্যতা নিয়ে বিতর্ক আছে। ১৮৩০-এ স্টীল পয়েন্ট পেনে কালির প্রবাহের ক্ষেত্রে সাফল্য পেয়েছিলেন জেমস পেরি। ১৮৫০ সালের পর থেকে আমেরিকা এবং ফ্রান্সে সাধারণ ফাউন্টেন পেনের স্বত্ব পান অনেকেই। ফাউন্টেন পেনের ব্যবহার এই সময়র বেশ কিছুটা আগে থেকে শুরু হলেও নিবের সাথে কলমের সংযুক্তি কিন্তু যথাযথ ছিল না। একইসাথে কালির প্রবাহের দিক থেকেও সেগুলির গুণমান খুব খারাপ ছিল।

এই চিত্র বদলাতে শুরু ১৮৫০ সালের পর থেকে। ১৮৮৪ সালে কেপিলারি ধর্ম অর্থাৎ সরু ক্ষেত্রের মধ্য দিয়ে মাধ্যাকর্ষণের বাধা অতিক্রম করে তরল পদার্থ প্রবাহের নীতিকে কাজে লাগিয়ে প্রথম ফাউন্টেন পেন তৈরীর স্বত্ব পান লিউইস এডসন ওয়াটারম্যান। ওয়াটারম্যানের কলমের অন্যতম বৈশিষ্ট্যই ছিল ভালো ফিড’র (নিবের নিচের যে অংশ দিয়ে কালি প্রবাহিত হয়) ব্যবহার।

বাণিজ্যিকভাবে স্টীল কলমের বহুল উৎপাদন শুরু হয় আমেরিকায়, ১৮৫০ সালের পর থেকেই। পরে বিংশ শতকের গোড়ায় ওয়াটারম্যান পেনের খ্যাতি আরো ছড়িয়ে পড়ে এবং ১৯১০ সালের মধ্যেই পার্কার, শেফার পেন কোম্পানীগুলিও বাজারে প্রবেশ করে। উল্লেখ্য, এই পুরো উনবিংশ শতক জুড়েই স্টীল তথা ফাউন্টেন কলমের উদ্ভব তথা বিকাশ এবং তার স্বত্ব পাওয়ার ঘটনাবলীর তালিকা কিন্তু বেশ দীর্ঘ ৷

আজকের যুগের বহুল ব্যবহৃত বল পয়েন্ট বা ডট পয়েন্ট পেনের ব্যবহার বিংশ শতক থেকেই খুব জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ১৮৮৮ সালে জন জে লাউড, ডট বা বল পয়েন্ট পেন প্রথম আবিস্কারের স্বত্ব লাভ করেন ৷ চামড়ার তৈরী এই কলমের ডিজাইন কিন্তু করেছিলেন বিজ্ঞানী গ্যালিলিও ৷ পরবর্তী সময়ে স্যাভেলজার এডোয়ার্ড বল পয়েন্ট পেনের কালিকে উন্নত ঘন মানের করে তোলেন ৷ ১৯৩৮ সালে হাঙ্গেরির লাজলো বিরো, (যিনি পেশায় সংবাদপত্র সম্পাদক ছিলেন) আরোও ভালোমানের বল পয়েন্ট পেন তৈরীর স্বত্ব পেলেও বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার না হওয়ার দরুণ তা নষ্ট হয়ে যায় ৷

বিংশ শতকের এই সময়ে বল পয়েন্ট পেনের স্বত্ব আদায় নিয়ে অনেকে চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছিলেন ৷ বাণিজ্যিকভাবে বল পয়েন্ট পেন উৎপাদন শুরু হয় হাঙ্গেরিতে ৷ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এই কলম এরোপ্লেন পাইলটদের কাছে ভীষণ ভাবেই জনপ্রিয় হয়েছিল ৷ যার কারণ অধিক উচ্চতাতেও পেন থেকে অপ্রয়োজনীয় কালি বেরোত না ৷ ১৯৪১ সালে বিরোম’ নামের বল পেন খুব জনপ্রিয় হয় ৷ আর্জেন্টিনাতে বিরো এবং হোয়ান জর্জ মেইনে-এরা দু’জন মিলে ‘বিরো পেনস’ নামে সংস্থা থেকে পেনটি তৈরি করা শুরু করেন ৷ এরপর ১৯৪৫ সালে রেনল্ডস্ ইন্টারন্যাশনাল পেন কোম্পানি বাজারে আনে মিলটন রেনল্ডস্ ৷ ১৯৬০ এর দশকে জাপানের ইউকি হোরি সংস্থা উন্নত মানের মার্কার পেন বাজারে আনে ৷  ১৯৭০ এর সময়ে রোলার বল পেন এবং ১৯৮৪ তে জাপানের সাকুরা কালার প্রোডাক্ট কর্পোরেশন প্রথম তৈরি করে জেল পেন ৷ ১৯০০ সালে ডঃ আর.এন. সাহা, প্রথম ভারতীয় হিসেবে স্টাইলো-ফাউন্টেন পেনের স্বত্ব পান।

বর্তমান যুগে, মানুষ প্রযুক্তির সাহায্যেই মনের ভাব প্রকাশে অনেক বেশী স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে ৷ কলমের জগতেও এই প্রযুক্তির বিচরণ অবাধ ৷ অতীত থেকে বর্তমান সময়ের আধুনিকতা কলমের জগতে প্রবেশ করলে, আমাদের সাবেকী ধারণা একেবারেই বদলে যাবে।কারণ নতুন প্রজন্মের কলমে কালি-র জায়গা নিয়েছে স্পর্শ-প্রযুক্তি। আর কলমকে আমরা উল্লেখ করছি ডিজিট্যাল, অ্যাক্টিভ কিৎবা স্টাইলাস পেন হিসেবে ৷ ব্যবহারের মাধ্যম হয়েছে লিক্যুইড ক্রিস্ট্রাল ডিসপ্লে (বা LCD) দিয়ে তৈরি স্ক্রীন যেমন-ট্যাবলেট কমপিউটার, স্মার্টফোন ৷ এই যন্ত্রগুলির পর্দায় ডিজিট্যাল পেন ব্যবহার করলে সবই ডিজিট্যাল পদ্ধতিতে নির্দেশিত হয়ে থাকে ৷

প্রজন্মভিত্তিক পর্যায় অনুযায়ী এর বিকাশ দ্রুতগতিতে হয়েই চলেছে ৷ আবার বস্তুসর্বস্ব পৃথিবীতে বহুল উৎপাদিত কিন্তু দ্রুতগতিতে বাতিল করে দেওয়া কলম-কালি কিংবা প্রযুক্তভিত্তিক যন্ত্রগুলির প্রসঙ্গে উঠে আসছে পরিবেশ-দূষণের চিন্তাও ৷ তাই এখন কলম তৈরি আর ব্যবহারের ক্ষেত্রে আধুনিকতা আর পরিবেশ-বান্ধবতার মধ্যে কিভাবে ভারসাম্য রক্ষা করা যায় তা নিয়েও চলছে গবেষণা ৷ফাউন্টেন পেনকে যদি আমরা সাবেকী এবং বল পয়েন্ট পেন যদি বর্তমান হয়ে থাকে তবে নিঃসন্দেহে সাধ্যের মধ্যে সাধ পূরণের আশ্বাস দেয় সাধারণ রোলার বল কলম বা জেল পেন৷ এরই সাথে উল্লেখ করা যায় Retractable pen-এর কথাও ৷ পেনের ওপরের দিকে বা মাথায় টিপ-এর সাথে স্প্রিং ৷ সেখানে চাপ দিলে তার সাথে সংযুক্ত ভেতরে থাকা রিফিলেও গিয়ে চাপ পড়ে এবং নিব বাইরে বেরিয়ে আসে ৷ কলমের মাথায় থাকা টিপ-টি ভিতরে এসে আটকে যায় নির্দিষ্ট খাঁজে ৷ সঙ্কোচন ও প্রসারণের ওপর ভিত্তি করেই পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়, যার ফলে বারংবার একটি আওয়াজের সৃষ্টি হয়, যা অনেকসময় আমাদের মনস্তাত্ত্বিক চিন্তা-ভাবনার সাথে একটা যোগসূত্র স্থাপন করে ৷ দৃশ্য-শ্রাব্য মাধ্যমে চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক অভিব্যক্তির প্রতীকি প্রকাশে, এই ধরণের পেনের ব্যবহার তাই অনেকসময় আমরা জনপ্রিয়ভাবে হতে দেখে থাকি ৷

সারা পৃথিবী জুড়ে বহুল বিক্রীত জনপ্রিয় কিছু ফাউন্টেন এবং বল পয়েন্ট পেন-উৎপাদনকারী সংস্থা তথা এদের তৈরি নানা ধরণের পেনগুলি হল-শেফার, ওয়াট্যারম্যান, পিয়েরে কারডিন, অরোরা, ক্যামলিন, ফাবের-ক্যাস্টেল, মন্টব্ল্যাঙ্ক, পার্কার, পেলিক্যান, পাইলট, ইউনি-বল, ক্রস প্রভৃতি ৷ ভারতীয় ক্ষেত্রে সেলো, রেইণল্ডস্, অ্যাড, ফ্লেয়ার-প্রভৃতি সংস্থার কথাও বলা যেতে পারে। [৪ঠা আগস্ট ২০১৫ সালে ইচ্ছেঘুড়ি পত্রিকার প্রতিবেদন থেকে সংগৃহীত।]

সম্প্রতি “বুদ্ধিমান কলম” উদ্ভাবন করেছেন জার্মানির গবেষকেরা। গবেষকেরা বলছেন, এটি ঠিক কলম নয়-ছোটখাটো একটা কম্পিউটার। এবিসি নিউজের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছেন তাঁরা। গবেষকেরা জানিয়েছেন, লার্নশিফট নামের বিশেষ এই কলমের ভেতর বসানো রয়েছে মোশন সেন্সর ও ক্ষুদ্র ব্যাটারি চালিত লিনাক্স অপারেটিং সিস্টেম নির্ভর কম্পিউটার ও ওয়াই-ফাই চিপ। যদিও কলম-কম্পিউটার সাধারণ কলমের মতোই ব্যবহার করা যায়। উদ্ভাবকের দাবি, বিশেষ এ কলম লেখার গতি-প্রকৃতি বুঝতে পারবে আর যখন লেখার মধ্যে অস্পষ্টতা বা বানান ভুল দেখবে তখন কলমটি কাঁপতে থাকবে। কলমটিতে ‘ক্যালিগ্রাফি’ মোড ও ‘অর্থ্রোগ্রাফি’ মোড নির্বাচন করে দেওয়া যাবে। এ কলমে শব্দের বিশেষ ডেটাবেজ সংরক্ষিত থাকবে। লার্নশিফট কলমের উদ্ভাবক জার্মানির মিউনিখের ডেনিয়েল কামাচার ও ফাক ওলস্কি। এ উদ্ভাবকেরা কলমটিকে উৎপাদন পর্যায়ে নিয়ে যেতে বর্তমানে নিজস্ব ওয়েবসাইটের মাধ্যমে বিনিয়োগ আহ্বান করেছেন।

অন্যদিকে, পিছিয়ে নেই যুক্তরাষ্ট্র। পড়ালেখার সময় ভাষান্তর করার প্রয়োজনের বন্ধু হিসেবে কলম ব্যবহারের পরিকল্পনা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের গবেষকেরা। নকশাবিদেরা এমন এক ধরনের কলমের নকশা তৈরি করেছেন, যা অনুবাদের পাশাপাশি অভিধান হিসেবেও ব্যবহার করা যাবে।

নকশাবিদেরা ‘আইভি গাইড’ নামে কলমের সঙ্গে ব্যবহার করা যাবে এমন একটি বিশেষ যন্ত্রও তৈরি করেছেন। যন্ত্রটি কলম বা পেনসিলের সঙ্গে যুক্ত করা যায়। এটি শব্দ স্ক্যান করে এবং ওই শব্দের অর্থ অনুবাদ করে দেখাতে পারে।

যন্ত্রটি ব্যবহার করে শব্দের নিচে দাগও দেওয়া যায়। যে শব্দটিতে দাগ দেওয়া হবে, ওই শব্দের ভাষান্তর করার জন্য প্রয়োজনীয় ভাষা নির্বাচন করে দিতে হবে। এতে শব্দের অনুবাদটি প্রজেকশনের মাধ্যমে ডকুমেন্টের ওপর দেখা যাবে। বাটনে চাপ দিলে আবার প্রজেকশন বন্ধ হয়ে যাবে। যন্ত্রটির নকশায় চার্জ দেওয়ার জন্য ইউএসবি যুক্ত করা হয়েছে। কলমের নকশাবিদ শি জিয়ান, শান ঝাও ও লি কের ভাষ্য, কলম অনুবাদ যন্ত্রের সাহায্যে পড়ার অভ্যাস তৈরি হবে এবং শব্দের অর্থ বোধগম্য হবে। কলম ব্যবহার করে অভিধান ঘেঁটে দেখার সময় বেঁচে যাবে। [(আইটি ওয়ার্ল্ড বেটা)  ২০১৪ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারিতে এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে ] 

মাসখানেক আগে, এই কলম দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। আমার বড় খালার নাতিনের কাছ থেকে শিখলাম এর ব্যবহার। ভালো লাগলো এটা ভেবে যে, প্রযুক্তি কত এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু খারাপ লাগছিল এটা দেখে যে, আমাদের আদরের জোহামনির বল পয়েন্টের কলমের উপর অমনোযোগ দেখে। বললাম কেন এটা ভাল লাগেনা তোমার? তার একটাই কথা, এই কলম কথা বলেনাআর কথা বলা কলম কথা বলে। আমাকে বলে বলে শেখায়। বুঝলাম, বেশিদিন নেই শিশুদের কাছে এখন জনপ্রিয় হবে এই কথা বলা কলম।  

একসময় আমরা পড়তে পারতাম না। স্রষ্টা আয়াত দিলেন, সূরা আলাকের ৩ নম্বর আয়াত। এই আয়াতের মাধ্যমেই আল্লাহ্‌ বলে দিলেন পড়তে হবে। এরপর তা সংরক্ষণের জন্যে লেখার জ্ঞান দিলেন। সেই লিখা যুগের সাথে সাথে কাগজে এল। এরপর ঢুকলো কম্পিউটারে। আর এখন অ্যাপের মাধ্যমে মোবাইলে। চিন্তার বিষয়, এরপর কোথায় যাবে?? অর্থাৎ মানুষ তার মেধাকে কতটা কাজে লাগাচ্ছে যার ফলাফল আজকের এই প্রযুক্তি। আস্তে আস্তে জ্ঞান উঠে যাবে। অজ্ঞতায় চারপাশ ঢেকে যাবে। লিখা উঠে যাবে। কারণ মানুষ লিখতে ভুলে যাবে এই ল্যাপটপ আর স্মার্টফোনের কিবোর্ডের জন্যে। এতটাই প্রযুক্তি নির্ভর হচ্ছে মানুষ। এই যে আমার কথাই ধরি, আমিও পরীক্ষা আর প্রিপারেশন নেয়া ছাড়া, কোনো প্রোগ্রামে নিজের নাম লিখা ছাড়া এমনি এমনি কখনো কিছু লিখিনা। মাঝেমাঝে কিছু বিষয় নোট করি ডায়েরিতে নিজের প্রয়োজনে। বাকি সব ল্যাপটপ আর মোবাইলের নোট অপশনে। আমার আগের লেখা আর এখনের লেখার ধরনে অনেক পার্থক্য। অক্ষর গুলো বলে দেয়, আমাকে এত কম সুন্দর করে কেন লিখছো তুমি? আমি তো দেখতে এমন না (!!)

তাই আবার লিখা শুরু করেছি কলম হাতে। যাতে করে কাগজ আর অক্ষরগুলো হয় আমার লিখনির সাক্ষী। আমি তো থাকবোনা কিন্তু প্রতিটা অক্ষর থেকে যাবে, কাগজ থেকে যাবে। তাই বলে বলছিনা যে, আমরা কিবোর্ডে লিখা বন্ধ করে দেবো। যুগোপযুগি হবার জন্যে কিবোর্ডে লেখার যেমন দরকার ঠিক তেমনি কলমের কালির লেখনিও প্রয়োজন আছে।