ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

 

এখন সময় সার্কের সফলতার হিসাব করার। কিন্তু আমাদের এখন হিসাব করতে হচ্ছে এর অতীত নিয়ে। আমি স্বাপ্নিক মানুষ। স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসি। স্বপ্ন দেখেই মজা পাই। স্বপ্নে বিভোর হয়ে নির্ঘুম রাত পার করতে পারি। কিন্তু সেই আমি এখন সার্ককে নিয়ে দুঃস্বপ্নে আছি। ১৯৮৫-র ডিসেম্বরে ঢাকার সামিটের মাধ্যমে এক লম্বা পথ পাড়ি দিয়ে আজ যেন এই সহযোগী প্রতিষ্ঠানটি দিশেহারা অবস্থায় হাবুডুবু খাচ্ছে। সার্কের সাথে ঢাকার এক গভীর সম্পর্ক্য বিদ্যমান। সেই সম্পর্ক্য যদি কখনো ভেঙ্গে যায় আমি ঢাকার বাসিন্দা হয়ে কষ্ট পাবো। খুব কষ্ট। সেই কষ্ট থেকেই আজকে…

কাগজ কলমে ১৯৮৫ তে যাত্রা করলেও এই প্রক্রিয়ার পিছনে আরো প্রক্রিয়া আছে এবং থাকবে এটাই স্বাভাবিক। কোন কাজ করতে হলে বছরের পর বছর ঐ কাজের পরিবেশ তৈরি করতে হয়। এ নিয়ে আমি খুব বেশি কলবো না, শুধু গুরুত্ব পূর্ন দুই একটা কথা না বললেই নয়। ১৯৭৯-এ ঢাকার পক্ষ্য থেকে দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের একটি সহযোগিতা মূলক সংগঠন করার ইচ্ছা প্রকাশ করে। ১৯৮০ সালে দক্ষিণ এশিয়ার ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ ও শ্রীলংকার রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছে প্রস্তাব করা হয়। ১৯৮১ সালে কলম্বোতে প্রথম পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের সম্মেলনে সার্ক গঠনের ব্যাপারে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এর পর দিল্লীতে এই সাত দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রীরা উপস্থিত হয় ১৯৮৩ সালের আগষ্টে। এই মিলন মেলায় বিভিন্ন কাজ সম্পাদনের ক্ষেত্র তৈরী করেন সাত দেশের মন্ত্রীরা।

সার্ক সম্মেলনের এবারের আয়োজক দেশ ছিল পাকিস্তান। অনুষ্ঠান না করতে পেরে আয়োজক দেশ হিসেবে পাকিস্তানের মন- মেজাজ এখন চরম খারাপ পর্যায় আছে। সেই দিক থেকে ভারত এখন ফুরফুরে মেজাজে আছে। ভারত বরাবরই ফুরফুরে মেজাজে থাকে। তার চারপাশে যারা আছে তাদের মধ্যে তিনি সবার বড় সেই হিসেবে তাকে মান্য করে সাবাই চলে বা চলতে হয়। সুধু মাত্র পাকিস্তানের কথা আলাদা।

ভারতের গোয়ায় কিছু দিন আগে ব্রিকস-বিমসটেকের সম্মেলন শেষ হলো। দুইটা প্রোগ্রাম এক সাথে সফলতার সাথে শেষ করলো ভারত। একটা প্রোগ্রাম গরিবদের অন্যটা ধনীদের নিয়ে। ধনী-গরিব যাহাই হউক না কেন অনুষ্ঠান সমাপ্ত করতে পেরেছে এটাই সফলতার মাপকাঠি। আজকের লেখায় ‘ব্রিকস’ নিয়ে কথা বলতে চাই না।

প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের কাছে সাধারন মানুষের অনেক চাহিদা থাকে। সার্ক তার ব্যাতিক্রম নয়। তাই সার্কের কাছেও অনেক চাহিদা আছে, অনেক প্রত্যাশা আছে। হয়তো সার্ক চাহিদার মাপকাঠিকে স্পর্শ্য করতে পারেনি। হয়তো আঞ্চলিক সৌহাদ্য পূর্ণ্য অবস্থান তৈরি হয়নি কিন্তু কিছু অগ্রগতি যে হয়নি তা কিন্তু নয়। ১৯৮৫-র ডিসেম্বরে ঢাকায় আতাউর রহমান খানের সভাপতিত্বে যে প্রথম সম্মেলন হয়েছিল তার ধারাবাহিকতায় কাঠমুন্ডর বাবুরাম ভট্টরায় এর সভাপতিত্বে ২০১৩ সালে শেষ সামিট হয়েছে। মাঝে যে কয়টি সামিট হয়েছে তাতে আঞ্চলিক উন্নয়ন কিছু হলেও হয়েছে। প্রতিটি সামিটে সকল নেতারা যে এক স্থানে মিলিত হয়েছে এটা বা কম কিসে। অনেকে হয়তো বলতে পারেন ‘এটা তাদের পিকনিক পার্টি’। হোক না পিকনিক পার্টি তারপরেও’ত একে অন্যের মুখো-মুখি হয়েছেন। হাতে হাত মিলিয়েছেন। চোখে চোখ রেখে কুশল বিনিময় করেছেন। যেমন- ধরা যাক ১৮তম সমাপনী অধিবেশনে মোদি-নওয়াজ এই দুই নেতা হাত মেলান। মেলানোর সময় তারা প্রায় ৩০ সেকেন্ড পরস্পরের হাত ধরে রাখেন। এ বিষয়টিকে সুধু ভারত পাকিস্তান নয় সার্ক সদস্য দক্ষিন এশিয়ার ১৬১ কোটি জনতা নয় সু-সম্পর্ক্য কামনা কারী সমগ্র বিশ^ ইতিবাচক হিসেবে দেখেছে।

দক্ষিন এশিয়ার জন্য এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে বানিজ্য, অংশিদারিত্ব, যোগাযোগ, বিনিয়োগ এবং সহযোগিতা। কাঠমুন্ডুর সম্মেলনে মোদী অঙ্গীকার করেন যোগাযোগ ব্যাবস্থার উন্নতির জন্য ভিসা সহজীকরন করার জন্য তিনি চেষ্ঠা করবেন বা তার পক্ষ থেকে যা প্রয়োজন তাই করা হবে। আঞ্চলিক রেল যোগাযোগ পণ্য ও যাত্রীবাহী মোটরযান এবং জ¦ালানি সহযোগিতার জন্য কিছুটা কাজ হয়েছে। আজকের সমস্যা যে চিরস্থায়ী সমস্যা নয় তা সময়ের কথা।

২০০৭, ২০০৮ ও ২০১১ সালে সার্ক ফুড ব্যাংক, সার্ক উন্নয়ন তহবিল ও সার্ক বীজ ব্যাংক হলেও এখনো আলোতে আসতে পারছে না এই সকল প্রতিষ্ঠান। আজ জ¦ালানি নিয়ে কাজ হচ্ছে। বানিজ্য সুবিধার জন্য আগেই কাজ হয়েছে। উদার মুক্ত বানিজ্য অঞ্চল গঠনের লক্ষ্যে ১৯৯৫ সালে সাপ্টা ও ২০০৪ সালে সাফটা স্বাক্ষরিত হয়েছে যদিও এখনো কাজে আসেনি। কিন্তু আসবে না তা কিন্ত নয়। গত তিন দশকে আন্তর্জাতিক বানিজ্য বেড়েছে ৫.৮ শতাংশ। যদিও এটা চাহিদার তুলনায় কিছুই না। ২০০ পণ্যের ১০% থেকে ৫০% শুল্ক কমানো হয়। কিছু পণ্যের শুল্কর সমস্যার জন্য ভারত এটি কার্যকর করতে পারছে না অথবা করছে না। সার্ক রাষ্ট্র সমূহের বসতি ও অর্থনীতির সমতার জন্য সার্ক পাসপোর্ট ও সার্ক মুদ্রা চালুর চেষ্ঠা চালানো হচ্ছে। ঢাকায় সার্ক ভুক্ত দেশে উৎপাদিত পন্যর মান নির্নয় ও নিয়ন্ত্রনের জন্য অভিন্ন মান নির্নয় সংস্থা স্থাপন করা হয়েছে।

আমরা এক অঞ্চলের মানুষ। আমাদের সমস্যা এক। আমাদের দরকার অভিন্ন চুক্তি। আমরা সার্কের মূলনীতি দেখলে আশ্চয্য হই ১৯৭৯ সালের নেতাদের চিন্তা শক্তির কাছে আমরা হার মানছি। তাদের দূরদর্ষী ভাবনা, আন্তঃ সম্পর্ক্য এবং ছাড় দেওয়ার মানষিকতা আমরা গ্রহন করতে পারিনি। সদস্য রাষ্ট্রের অখন্ডতা এবং সার্বভৌমত্বের প্রতি আমরা সম্মান দেখাতে পারিনি। আঞ্চলিক আশা-আখাঙ্খার প্রতি লক্ষ্য রাখতে পারিনি। সার্ক গঠনের সময় তারা ভাবলেন যেহেতু আমাদের সমস্যা এক তাই সকলে মিলে সমাধানের দিকে আসতে হবে। আজ এত বছর পরেও আমরা আমাদের সমস্যার সমাধানের স্থানে এক হতে পারিনি। এই অঞ্চলের ১৬১ কোটি মানুষ স্বপ্ন দেখেছিলেন সার্ক হবে এশিয়ার ইউরোপীয় ইউনিয়ন। সার্ক সেই অবস্থায় আসতে পারেনি। আবার ইইউর সাথে তুলনা করলে দেখা যাবে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় অর্ধশতাব্দীর বেশি পুরানো। সেখানে তাদের সফলতার গল্প মাত্র এক থেকে দেড় দশকের। সেখানে আমাদের তিন দশক তেমন কিছু নয়। তবে আমাদের এই তিন দশক অতিক্রম করার অভিজ্ঞতা আয়ত্ব করতে পেরেছি। এটা বা কম কিসে।

যদিও কেউ কেউ বলতে চেষ্ঠা করেন বিগ ব্রাদার ভারত বিভিন্ন প্যাচে ফেলে কিছু সমস্যা তৈরি করছেন। তাদের কথার কিছু যুক্তিও আমি খুজেঁ পাই। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ওআরএফের ফেলো পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী বলেন, ‘এখন সার্কের কথা ভুলে যান। বিমসটেকের দিকে নজর দিন।’ আবার ড. বিবেক দেব রয় বলেন ‘বাংলাদেশ-ভারত সুসম্পর্ক চাইলে সার্কের কথা ভুলে যান’। যখন মন্ত্রী পদমর্যাদর বিবেক দেব রয় এই কথা বলেন তখন আমি চিন্তিত হতেই পারি ভারত মনে হয় সার্ক ভাঙ্গার চিন্তা করছে। ভারত হয়তো এই অঞ্চলে আঞ্চলিক সংগঠন হিসেবে একমাত্র বিমসটেককে প্রতিষ্ঠা করতে চান। যে সংগঠনে পাকিস্থানের মত প্রতিদ্বন্ধী থাকবে না। ‘সার্কের মূলনীতির প্রথম নাম্বার যে কোন সিদ্ধান্তে সর্বসম্মতি লাগবে।’ এই বলয়ের বাইরে যেতে চায় দেশটি। ‘সর্ব সম্মতিক্রমের’ গ্যাড়াকলে তারা আটকে থাকতে চায় না। যদি সেটি হয় তবে হয়তো সার্ক শেষ হতে পারে বিমসটেক সংস্থা হিসেবে দাড়িয়ে যাবে। দক্ষিণ এশিয়া প্রতিদ্বন্ধী হীন একটা সংস্থা পাবে যেখানে তর্ক হবে না বা তর্কের প্রয়োজন হবে না। আজীবন তার নেতৃত্বে থাকবে ভারত।

সার্ক এর শেষ সম্মেলন ব্যার্থ্য হবার পরে অনেকের স্বপ্ন ভঙ্গ হয়েছে। প্রস্তাবক দেশের মানুষ হয়ে আমিও স্বপ্ন ভাঙ্গায় আক্রান্ত। পাকিস্তানের আয়োজনে শেষ সম্মেলনে যে দেশ সমূহ অংশগ্রহনে আপত্ত্বি জানিয়েছে তাদের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বাংলাদেশ প্রথম নিজেদের ব্যাস্ততার কথা বললেও পরে বলেছে, আমাদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করার জন্য অংশ গ্রহন করবে না। ঢাকা অত্যান্ত যৌক্তিক কথা বলেছে। সার্কের মূলনীতির তিন নাম্বার নীতি হচ্ছে, ‘কেউ কারুর অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করবে না।’ তারপরও আমি স্বপ্ন ভঙ্গের রোগে আক্রান্ত হই যখন ভাবি সার্ক ব্যার্থ্য হচ্ছে।

slide