ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

কোন দিক দিয়ে শুরু করবো ভেবে পাচ্ছি না। মাথায় দুই বিখ্যাত ব্যাক্তির কথা ঘুরঘুর করছে। প্রথমত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং লাওসের প্রফেসর ওস্তাদ আনিসুজ্জামান স্যারের দুটি বিখ্যাত লাইন। বঙ্গবন্ধু প্রথম হংকং ভ্রমন করে বলেছিলেন, “হংকং এত পাপ সহ্য করে কিভাবে।” ওস্তাদ আনিসুজ্জামান স্যার বেশ কিছু বছর আগে ঢাকার অবস্থা দেখে বলেছিলেন, “ব্যাভিচারের গন্ধে নিশ্বাস নেয়া যায় না।” ওস্তাদ আনিসুজ্জামান স্যারের কথা দিয়ে যদি শুরু করি তাহলে আমাকে ভ্যাবিচার নিয়েই কথা বলতে হয়। আমি হয়তো ভ্যাবিচারের গন্ধ পাই না। ভ্যাবিচারের যে গন্ধ আছে সেটাই জানি না বা জানতাম না। আবার আজ কালকের আধুনিক সভ্যতার ধারক বাহকরা ভ্যাবিচারকে খারাপ ভাবতে পারে না। এটাকে জীবনে একটি প্রয়োজনীয় অংশ করে নিয়েছে। তাহারা মনে করে একটি সভ্য সমাজে দুটি পূর্ন বয়স্ক পুরুষ এবং মহিলার শারিরিক চাহিদা থাকবে এটা স্বাভাবিক। পূর্ন বয়স্ক পুরুষ এবং মহিলা দু’জনের ইচ্ছায় তাদের চাহিদা পূর্ন করবে এটাও স্বাভাবিক। সভ্য সমাজে এটা সময়ের অধিকার। সেই সভ্য সমাজের ধারক বাহকরা যদি তাদের অধিকারের কথা বলে তাহলে আমার কিছু বলার নেই। যদিও সভ্যতার ধারক বাহকেরা তাদের সভ্যতার জন্য সকল সময় পরিবেশ তৈরী করতে চেষ্টা করে। কিন্তু তাহারা ভুলে যায় যে, তাহাদের জন্য পৃথিবীতে ডেথ সী’র জন্ম হয়েছে। তাহাদের জন্যই আজ এইডস নিয়ে বিজ্ঞানকে অজস্র সময় দিতে হচ্ছে। মানুষকে ধুকে ধুকে মরতে হচ্ছে। যাই হোক তাহারা যখন পূর্ন বয়স্ক বা প্রাপ্ত অপ্রাপ্ত বয়সকে আলাদা করে দেখে, তখন আমার মত সাধারণ বা অসামাজিক ব্যাক্তির জন্য কিছু বলার সুযোগ থাকে। একটি সময় আমাকে প্রতিনিয়ত নতুন বিমান বন্দর রোড ব্যবহার করতে হত। সময় অসময় এই পথের বালু আমায় স্পর্শ করতে হত। সেই সময়ের রেফারেন্স দিয়ে আমি দেখাতে পারি শুধু মহাখালীর আমতলী থেকে বনানীর চেয়ারম্যান বাড়ি পর্যন্ত অগনিত আবাসিক হোটেল আছে। সেই আবাসিক হোটেল সমূহের মধ্যে কোন হোটেলে অসামাজিক কর্ম হয়না? এমন হোটেল হয়তো পাওয়া যাবে না। অন্যান্য এলাকার চিত্র আমি দিতে চাচ্ছি না। আপনারা যাহারা ঢাকার বাসিন্দা তাহারা নিজেরাই জানেন আপনার মহল্লার কোন হোটেলে কতটা অসামাজিকতা হয়।
এখন আমার প্রশ্ন এই হোটেল সমূহের গ্রাহক কারা? বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তি এক উচ্চ গতিতে অগ্রসর হচ্ছে। তথ্যর জন্য এবং উন্নয়ন অগ্রযাত্রার জন্য প্রযুক্তি অগ্রগন্য। বিশ্ব এখন ফাইভ জিতে অবস্থান করলেও বাংলাদেশ এখনও ফোর জিতে পৌছাতে পারেনি। তবুও তৃতীয় বিশ্ব বা মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে আমাদের তথ্য প্রযুক্তির উন্নয়ন চোখে পড়ার মত। কিছু দিন আগে বিএসএমআরসিসিতে অনুষ্ঠিত আইসিটি মন্ত্রানালয়ের আয়োজনের এক অনুষ্ঠানের এবারের শ্লোগান দেওয়া হয় ‘নন ষ্টপ বাংলাদেশ’। ইন্টারনেট কেন্দ্রিক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং উদ্যোক্তা বেড়েছে। দেশে ইন্টারনেট কেন্দ্রিক ব্যবসায়ের পরিধি বেড়েছে। দেশী বিদেশী কোম্পানির কম্পিউটার ডাটাবেজ এখন অনেকটাই ঢাকায় বসে নিয়ন্ত্রিত হয়। এবারের বাজেটে ইন্টারনেট থেকে এক বৃহৎ আয়ের উৎস নির্ধারন করা হয়েছে। ফ্রিল্যান্সিং এবং অন্যান্য তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর ব্যবসা কেন্দ্রিক এবারের অনুষ্ঠানে মোটা অংঙ্কের রপ্তানী আয় ধরা হয়েছে । এতসব খুশির মাঝেও দুঃখের কথা হলো ইন্টারনেটে পর্নগ্রাফির দর্শকও বেড়েছে।
অন্য দিকে আমরা যদি যাই তাহলে কি দেখবো। মোড়ের পত্রিকা স্টলে সাঁজিয়ে রাখা আকর্ষনীয় মোড়কের ভিতর পর্ণর রমরমা ম্যাগাজিনের পাশেই গড়ে উঠেছে পর্নগ্রাফির ভিডিও ব্যবসা। দেশি-বিদেশি তারকা, শহর-গ্রামের কিশোর কিশোরীর একান্ত ভিডিওর সরব উপস্থিতি। এই সকল ব্যবসা রাঘব বোয়ালেরা নিয়ন্ত্রণ করলেও এর দৃশ্যমান বিক্রেতা কিশোর শ্রেনীর কেউ। যিনি এখনো কৈশোর শেষ করেনি। প্রাইমারী পাশ করা সকল ষ্টুডেন্ট এর কাছে এখন মোবাইল আছে। কোন কোন প্রাইমারীতে অবস্থানকারী স্টুডেন্টের কাছেও মোবাইল পাওয়া যায়। অভিভাবকরা সন্তানের নিরাপত্বার জন্য এই যোগাযোগকারী যন্ত্র দিয়ে থাকেন। কোন কোন বাবা-মা সন্তানের বিনোদনের জন্যও দিয়ে থাকেন। হাই স্কুলের এমন কোন ষ্টুডেন্ট পাওয়া যাবে না যাহার কাছে মোবাইল ফোন নামের বস্তুটি নেই। কারো কারো কাছে আইফোন বা গ্যালাক্সি সিরিজের সর্ব শেষ মডেলের পন্যটি আছে। হয়তো এই স্টুডেন্টের মধ্যে দুই পার্সেন্ট ব্যবহারকারী পাওয়া যাবে না যাহারা এনড্রয়েড ব্যবহার করেন না। মোট কথা প্রায় ৯৮ ভাগ স্টুডেন্ট এনড্রয়েড ব্যবহার করে।
দেশের এক টেলিভিশন জরিপে দেখা গেছে শত করা ৮২ ভাগ শিক্ষার্থী ক্লাশে বসে পর্নোগ্রাফি দেখে। ১ লা অক্টোবর ২০১৬ এ জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক এনজিওর রিপোর্টে দেখানো হয়েছে, দেশে তৈরী এই পর্নোগুলোয় যাদের ভিডিও দেখানো হয় তাদের বয়স ১৮ বছরের নিচে। আমরা আরো আর্চায্য হই যখন দেখি দিনের ৮ ঘন্টার বেশি সময় নষ্ট হয় পর্নোগ্রাফি দেখার জন্য। আমাদের সন্তানেরা কোন সাইট ব্যবহার করছে অভিভাবক হিসেবে আমরা কতটুকু নজর দিতে পারছি! আমাদের ব্যাস্ততা অথবা পরকিয়ার জন্য সমাজকে বেহায়া তৈরী করছি। নর্থ সাউথ বিশ্ব বিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র যখন অশ্লীল কাজের জন্য কোন নারীকে ব্ল্যাক মেইল করে তখন ভাবতে বাধ্য হই স্টুডেন্টরা পর্নের সাগরে কতটা হাবুডুবু খাচ্ছে। এক গবেষনায় দেখা গেছে পর্ন ব্যবহারকারী তার কার্য্য ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন। দিনের কর্ম ঘন্টার কতটা পর্নের পিছনে ব্যয় করে সেটা হিসাব করলে চোখ উপরে উঠে যাবে। পর্নর খাতিরে আজ সমাজ কোন অবস্থানে উপস্তিত হয়েছে ভাবলে বিস্ময়ের সীমা থাকবে না। বনশ্রীর দুই সন্তান হত্যা, পুরান ঢাকার স্বামী হত্যা। এই সকল হিসেব শেষ হবার নয়। মায়েরা বা বাবারা তাদের বাচ্চাদের পর্ন দেখা থেকে বিরত রাখতে পারছেন না। বন্ধু বা বান্ধবী নিয়ে ঘর বন্ধ করা থেকে বিরত রাখতে পারছেন না। কারন তাহারা নিজেরাও পর্নে আসক্ত। নিজের পরোকীয়া যায়েজ করতে সন্তান বা পরিবারের অন্য সদস্যকে অশ্লিলতায় নিমন্ত্রণ করা বা অশ্লিলতার সুযোগ তৈরী করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন।
আজ সমাজে নেমে এসেছে চরম অবিশ্বাস। স্বামী স্ত্রী উভয়ে উভয়ের পিছনে গোয়েন্দা লাগিলে রাখে। বাবা মা তার সন্তানের বন্ধুদের সন্দেহের চোখে দেখে। বিশ্ববিদ্যালয় পডুয়া সন্তানের সাথে মাকেও প্রতি নিয়ত বিশ্ববিদ্যালয়ে আসতে হচ্ছে এবং ক্লাস করতে হচ্ছে। পর্নগ্রাফি সাইট সমূহ নিজেদের শক্তি বৃদ্ধি করছে। আধুনিকতার সাথে সাথে তারাও তাদের সাইট এসইও’র দিক থেকে আধুনিক করেছে। তাদের প্রকাশ ভঙ্গি প্রাপ্ত এবং অপ্রাপ্ত সকল দর্শককে তাদের সাইটে প্রবেশের জন্য নিমন্ত্রন করে। আমরা সামাজিক ভাবে কতটা এই সাইট সমূহকে বয়কট করতে পারছি। ভারতের মত দেশে যখন পর্ন সাইটের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় সেখানে আমাদের আয়োজন কতটা চোখে পড়ে। আধুনিক সমাজে পর্নকে অনেকেই দোষী’র চোখে দেখতে চায় না বা পারে না। বিভিন্ন যুক্তি, গবেষনা বা উপস্থিত বুদ্ধি দিয়ে তারা পর্নর ভালো দিক তুলে ধরার চেষ্ঠা করে। কিন্তু সেই ৬০-৬১ বছর আগে পর্নোগ্রাফিকে সভ্যতার জন্য কালো দাগ বলেছেন যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী চার্চিল। পর্নোগ্রাফির দর্শকদের মস্তিস্কের একটি অংশ সংকুচিত করে। সেই সংকুচিত মস্তিস্ক নিয়ে আমরা সমাজ বা দেশের কাজে নিজেকে কতটা বিলিয়ে দিতে পারবো।
বর্তমানে বিশ্বে প্রায় প্রতি সেকেন্ডে ৩ কোটি মানুষ পর্নো সাইট দেখছে। আরো গুরুত্বপূর্ন বিষয় হলো প্রতি মুহুর্তে এর ভিজিটর ২০০০ করে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ১৩ বছর আগে পৃথিবীতে পর্নো সাইটের সংখ্যা ছিল ৭০ হাজার কিন্তু আজ সেই সাইটের হিসেব দাঁড়িয়েছে ২০ কোটির উপরে। পর্নো ইন্ডাষ্ট্রির উন্নয়নের জন্য বা এই ইন্ডাষ্ট্রির অভিনেতা অভিনেত্রীদের উন্নয়নের জন্য বেশ কিছু সংগঠন কাজ করে যাচ্ছে। ইতালিতে পর্নকে হাতে কলতে শিক্ষা দেওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় তৈরী হয়েছে। এই অভিনেতা-অভিনেত্রীদের জন্য এভিএন নামের পুরস্কার দেওয়া হয়। এই এভিএনকে পর্নের অস্কার বলা হয়। পর্ন স্টারদের বেতন হলিউড বলিউদের অভিনেতাদের থেকেও কম নয়। তাদের এত সব আয়োজনের মাঝে আমাদের সন্তান বা ভবিষ্যতের নিরাপত্তার জন্য নিজের আয়োজন চোখে পড়ছে না।
ভারতে পর্নোগ্রাফির কিছু সাইট বন্ধ করার পর ভিআইপি সমাজের কেউকেউ সরকারের কাজের সীমা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাহারা বলার চেষ্ঠা করেছেন, সরকার মাত্রার বাইরে কাজ করছে। এখন বলা দরকার ‘মাত্রা’ কে ঠিক করবে? যেখানে আমরা স্পষ্ট দেখতে পাই পর্নোগ্রাফির সাথে ধর্ষকের এক যোগসূত্র আছে। যেমন ধরা যাক, ২০-০৭-১৪তে বেঙ্গালুরুর এক ধর্ষকের ল্যাপটপ থেকে শিশুদের ভিডিও করা অগনিত পর্ন পাওয়া গেছে। অন্য দিক থেকে দেখলে দেখা যায়, পর্নোগ্রাফি ভিজিটরের কাতারে নাম্বার ওয়ানে আছে আমেরিকা আর নাম্বার তিনএ আছে আমাদের পাশের দেশ ভারত। ধর্ষনের খবরের দিকে তাকালে কি আমরা এই দুই দেশের অবস্থান কোথায় দেখতে পাচ্ছি।
পর্ন ব্যবসা হলিউড, আমাজন বা গুগলের থেকেও বেশি লাভজনক ব্যবসা। পর্ন ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসার উন্নতি করার জন্য চেষ্ঠা করবে এটা স্বাভাবিক। আমরা আমাদের জন্য কি করতে পারি সেটা দেখার বিষয়। ভারতে যখন পর্নোগ্রাফির সাইট বন্ধ করার ঘোষনা আসলো তখন বিটিআরসির নাম না জানা এক কর্মকর্তা বললেন, সরকার চাইলেই এই সকল সাইট বন্ধ করতে পারে। অপর দিকে আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক বললেন, বিদ্যমান আইনে বিটিআরসি চাইলেই (পর্ন) সাইট বন্ধ করতে পারেন। তবে প্রশ্ন হচ্ছে সবাই যদি বন্ধের পক্ষে থাকে তাহলে বন্ধ হচ্ছে না কেন?) পর্ন বা এই সেক্টরের ব্যবসায়ে ঢাকা খুব পিছিয়ে নেই। পাঁচ তারকা হোটেল থেকে গুলিস্তানের চিলে কোঠা। বন্ধুর বদ্ধ ঘর থেকে পীরের নিরালা নিবাস, শিক্ষকের টেবিল, বাবার অশ্লীল স্নেহ। তাই বলতেই হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যদি বেঁচে থাকতেন তাহলে তাকে বলতে হতো, “ঢাকা এ পাপ সহ্য করে কিভাবে।”