ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের এক স্যার (অধ্যাপক) ক্লাসের সব শিক্ষার্থীকে জিজ্ঞেস করছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে তোমার প্রিয় স্থান কোনটি? জবাবে কেউ বলছে টিএসসি, কেউ ডাকসু, কারও কাছে হাকিম চত্বর, আবার কারও কাছে প্রিয় স্থানটি অপরাজেয় বাংলা। শুনতে শুনতে স্যার রেগে গেলেন, আসলে তিনি অত্যন্ত কষ্ট পেয়েছেন, কারণ তার কাঙ্ক্ষিত জায়গার নামটি কেউ বলছে না। বিস্ময় প্রকাশ করলেন_ ক্লাসটা তোমাদের কারও কাছেই প্রিয় স্থান নয়!

৭ আগস্ট ২০১১ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিলের সভায় ক্লাসে উপস্থিতির বিষয়ে বলা চলে এক কঠিন সিদ্ধান্ত হয়। কোনো শিক্ষার্থী ৬০ ভাগ উপস্থিত না থাকলে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারবে না। উপস্থিতি ৬৫-৭৪ শতাংশ থাকলে ৫ হাজার টাকা জরিমানা দিয়ে পরীক্ষা দিতে পারবে। ৭৫ ভাগ পর্যন্ত উপস্থিতরাই কেবল নিয়মিত শিক্ষার্থী হিসেবে পরীক্ষা দেবে। আর বিজ্ঞান অনুষদের শিক্ষার্থীদের ৩০ ভাগের কম উপস্থিতি থাকলে ছাত্রত্ব বাতিল হবে।

উপস্থিতি সংক্রান্ত বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এ সিদ্ধান্তের কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, কেন্দ্রীয়ভাবে সমন্বয় সাধন। যেহেতু সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের কয়েকটি বিভাগ সেমিস্টার পদ্ধতি গ্রহণ করছে, এর আগে ২০০৬-০৭ সেশন থেকে কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদে এ পদ্ধতি চালু আছে, আর ব্যবসায় অনুষদে আগে থেকেই সেমিস্টার পদ্ধতি ছিল। সেমিস্টার পদ্ধতি চালু হওয়ার পর উপস্থিতির বিষয়ে একেক অনুষদ একেক রকম নিয়ম করে, ফলে সবার সমন্বয়ের জন্য নতুন এ নিয়ম।

সিদ্ধান্তের ন্যায্যতার জন্য এ যুক্তি ঠিক আছে, কিন্তু এর পেছনেরও যে কারণ রয়েছে তা খুব সহজেই অনুমান করা যায়। একটা বিষয় তো স্পষ্ট, ক্লাসে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমছে। এটার জন্য বিস্তর গবেষণার প্রয়োজন নেই। ফেসবুকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার নামে একটা গ্রুপ আছে (বর্তমান সদস্যসংখ্যা ৪,৬৫৯)। গ্রুপে ক্লাসে উপস্থিতির বিষয়ে আলোচনা হচ্ছিল, কেউ বলছে আমার উপস্থিতি ৪০ ভাগ, কেউ বলছে বিশ্ববিদ্যালয়ে লাইফে মাত্র অল্প ক’দিন ক্লাস করেছি, কারও ভাষায়_ হায়! আমার তো ৬০ ভাগ উপস্থিতি নেই, আমার কী হবে?

মজার বিষয় হলো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে এর আগেও ৬০ ভাগ উপস্থিতি না থাকলে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করা যেত না। গ্রুপের আলোচনার মাধ্যমে বোঝা যাচ্ছে, আগে নিয়ম থাকলেও তা কার্যকর ছিল না। শিক্ষার্থীরা ইচ্ছামতো ক্লাসে আসত, পরীক্ষা দিত। কিছুদিন আগেও ৭৫ ভাগ পর্যন্ত উপস্থিতির জন্য এক হাজার টাকা জরিমানা ছিল, এখন সেটাকে পাঁচ হাজার করা হলো।

উপস্থিতির এ নতুন সিদ্ধান্তের দ্বারা এটা স্পষ্ট যে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জোর করে, অন্তত পরীক্ষা দেওয়ার ভয় দেখিয়েও শিক্ষার্থীদের ক্লাসে উপস্থিত করতে চায়। আবার একই সঙ্গে এ উপস্থিতির বিষয়টা হয়ে গেছে টাকার খেলা। যার পাঁচ হাজার টাকা আছে সে ৬৫ ভাগ ক্লাস না করে টাকা দিয়ে পার পেয়ে যাবে। টাকার ওপর যখন জোর দেওয়া হচ্ছে, তখন একই সঙ্গে এটাও সাব্যস্ত হয়, সে ক্লাস না করেও হিসাবমতো ১৫-২০ হাজার টাকা দিলে সমস্যা নেই।

আলোচনার জন্য অবশ্য টাকাটা মুখ্য নয়, মুখ্য বিষয় হলো প্রশাসন ক্লাসে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নিশ্চিতকরণে সমস্যার গোড়ায় হাত না দিয়ে আগা নিয়ে টানাটানি করছে। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না, যে শিক্ষার্থী তীব্র প্রতিযোগিতার যুদ্ধে উত্তীর্ণ হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে, যার স্বপ্ন পড়াশোনা করা, উচ্চ ডিগ্রি নেওয়া; তার তো ক্লাস না করার প্রশ্নই আসে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য তো তা কল্পনাই করা যায় না। সুতরাং তাকে কেন টাকা বা পরীক্ষার ভয় দেখিয়ে ক্লাসে হাজির করাতে হবে? সে তো এমনিতেই ক্লাসে আসবে।

আসলে মূল সমস্যাটা এখানেই। এখানেই ওই অধ্যাপকের কাছে বিনীত প্রশ্ন_ স্যার, আপনারা কি ক্লাসটা সেভাবে নেন বা আপনাদের ক্লাসের মানটা কি সে পর্যায়ে গেছে যে, শিক্ষার্থীরা বলবে বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার প্রিয় স্থান ক্লাসরুম? প্রিয় স্থান হওয়ার জন্য যে প্রাণ ক্লাসরুমে দরকার, তা কি আছে? অনেকে তো পরীক্ষার ভয়ে বা জরিমানার ভয়েও ক্লাস করছে। হয়তো এই স্যার চেষ্টা করছেন বা তার মতো অনেক শিক্ষকই আছেন যাদের সবার কাজের প্রধান কাজ ক্লাস নেওয়া, ক্লাসে আসার আগে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়ে আসেন, প্রাণবন্ত ক্লাস করেন।

এর বাইরের চিত্রও তো আছে, শিক্ষকদের মানসিকতা কিংবা প্রস্তুতির কথা না হয় বাদই দিলাম, যোগ্যতা নিয়েও তো প্রশ্ন আছে। কোনো কোনো শিক্ষকের ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জায়গায় ক্লাস নেওয়ার মতো আদৌ যোগ্য কি-না এ প্রশ্নও আছে। উড়ো বুলির বাইরে খোদ গবেষণাই আছে। কয়েক মাস আগে ইউজিসির গবেষণায় সেটা বের হয়েছে (প্রথম আলো, ২৩.০৬.২০১১)। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অন্তত ২৮ শতাংশের শিক্ষা দেওয়ার মান নিচু। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী তো বলেই ফেলেছে_ ২৮-এর ৮টা আগে হবে, ২ পরে হবে; অর্থাৎ তার ভাষায় এ হারটা ৮২ শতাংশ।

শতকরায় হার যতই আসুক অযোগ্য শিক্ষক আছেন, এটাই বাস্তবতা। কারণটা রাজনীতি। দলীয় লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি। শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয়টাই যখন মুখ্য, যোগ্যতার আর সেখানে প্রয়োজন পড়ে না। এদের প্রভাবটাই পড়ে ক্লাসরুমে। বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব শিক্ষক রাজনীতির খুঁটিতে বলীয়ান তাদের বিষয়ে ভুক্তভোগী মাত্রই জানেন। ক্লাস নেওয়া তো ব্যাপারই না, অন্য অনিয়মের কথা আজ থাক।
শিক্ষার্থীদের ক্লাসে উপস্থিতির ক্ষেত্রে প্রভাবক শক্তি কেবল শিক্ষকই নন। আরও অনেক বিষয়ই আছে। আবার ক্লাস করে না এ রকম শিক্ষার্থীর সংখ্যাও খুব বেশি নয়। তবে একজন শিক্ষার্থীও যদি শিক্ষকের যোগ্যতার প্রশ্নে ক্লাস না করে, তার দায় কি বিশ্ববিদ্যালয় এড়িয়ে যেতে পারবে?

—– দোহাই —–