ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

কোচিং সেন্টার নিয়ে আমাদের দেশে একটা ‘তোড়জোড়’ লক্ষণীয়। এর ব্যাখ্যাটা দুই রকম হতে পারে— কোচিংয়ের পক্ষে এবং বিপক্ষে। দিন দিন নতুন কোচিং সেন্টার হচ্ছে। শিক্ষার্থী আকৃষ্ট করতে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের ফাঁদ, বিজ্ঞাপন। রমরমা বাণিজ্য হচ্ছে এগুলোয়। অনেকেই হচ্ছেন আঙুল ফুলে কলাগাছ। এসব পক্ষের তোড়জোড়। আর বিপক্ষের কথা সবার জানা। প্রশ্নপত্র ফাঁস, কোচিংয়ে শিক্ষক কর্তৃক ছাত্রী ধর্ষণ প্রভৃতি। মূল কথাটা এখনো আসেনি, খোদ কোচিং বন্ধের তোড়জোড়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, শিক্ষামন্ত্রী, শিক্ষক থেকে শুরু করে অনেক অভিভাবকও এ ব্যাপারে একাট্টা হয়েছেন। শেষ পর্যন্ত আদালতে গড়ায়। ১৭ অক্টোবরে হাইকোর্টের রুল গণমাধ্যমের কল্যাণে অনেকের জানা।

কোচিং সেন্টারকে প্রমোট করা এ লেখার উদ্দেশ্য নয়। এ বিষয়ে বিস্তর আলোচনার পরিবর্তে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ দেখা যাক। ১৮ অক্টোবর জাতীয় দৈনিকগুলোর গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ ছিল ‘স্কুলশিক্ষকদের কোচিং বন্ধে কেন নির্দেশ নয়: হাইকোর্ট’। ‘অভিভাবক ঐক্য ফোরাম’ নামে একটি সংগঠনের সভাপতির করা রিটের ভিত্তিতে এ রুল, যাতে বলা হয় সরকারি ও এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষকদের কোচিং বন্ধে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ কেন দেয়া হবে না। অবশ্য এ সংক্রান্ত রুল এটাই প্রথম নয়, ২০০৮ সালেও হাইকোর্ট এ রকম নির্দেশনা দেন। সেটা যে কার্যকর হয়নি তা বোঝাই যাচ্ছে। তবে কোচিং বন্ধের আলোচনা থেমে থাকেনি। ১৭ অক্টোবরে রুলের আগেও ২১ জুলাই শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান-প্রধানরা কোচিং বন্ধের দাবিতে একমত হয়েছেন।

হাইকোর্টের এবারের রুল একটু অন্য রকম। যেখানে গোটা কোচিং বন্ধের চেয়েও শিক্ষকদের কোচিং বন্ধের বিষয়কে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘আমরা দেশ থেকে কোচিং ব্যবস্থা উঠিয়ে দিতে চাই।’ আলোচনায় ফেরা যাক। একটা প্রশ্ন— বাংলাদেশে কি কোচিং সেন্টার বন্ধ করা সম্ভব? এক কথায় উত্তর দেয়াটা কঠিন। উত্তরটা যেমন কঠিন, কোচিং সেন্টার বন্ধ করাও তেমন কঠিন। কঠিন মানে কিন্তু অসম্ভব নয়। সম্ভব।

তার আগে কোচিং সেন্টার থাকার যে পূর্বশর্ত আমরা তৈরি করে রেখেছি, তার একটা দফারফা করতে হবে। এখানে অনেক বিষয় আছে যেমন— শিক্ষাব্যবস্থার ত্রুটি, শিক্ষাদান প্রক্রিয়ায় সমস্যা, মূল্যায়ন পদ্ধতির ত্রুটি প্রভৃতি। তার চেয়ে আবার শিক্ষক গুরুত্বপূর্ণ। আজকের আলোচনা শিক্ষকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। শিক্ষকরা কেন একটা কোচিং সেন্টার দেবেন বা কেন তা করাবেন। বাস্তবতা হলো, টাকার জন্য। শিক্ষকতা করে তিনি যে টাকা পান তা যথেষ্ট নয়। অন্যভাবে বললে একজন শিক্ষকের জীবন ধারণের জন্য যত টাকা প্রয়োজন, তা সরকার তাকে দিচ্ছে না। বাধ্য হয়ে তিনি আয়ের অন্য পথ ধরছেন। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে সহজ মাধ্যম হলো কোচিং করানো। কোচিং করিয়ে তিনি বেতনের কয়েক গুণ বেশি টাকা আয় করতে পারেন, এভাবে কোচিং করানোর পক্ষে হাজারো যুক্তি দেয়া সম্ভব। তবে কোচিং করান না, এ রকম শিক্ষক যে নেই তা নয়। তাদের কথা বাদ দিয়ে যারা এর সঙ্গে জড়িত, তাদের কথা বলছি। চাহিদার অনুসারে বেতন না দেয়ার ফলে, জীবন বাঁচানোর জন্য বাধ্য হয়ে তারা যেটা করছেন, তা কীভাবে বন্ধ করার কথা বলতে পারি। অর্থাত্ শিক্ষকের অর্থনৈতিক অবস্থাই কোচিং করানোর পূর্বশর্ত।

বাংলাদেশে শিক্ষকদের মাসিক বেতন দেখি। জাতীয় বেতন স্কেল ২০০৯ অনুযায়ী একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকের বেসিক স্কেল হলো ৪ হাজার ৭০০ টাকা। মাধ্যমিক ৮ হাজার এবং কলেজ শিক্ষকের ১১ হাজার টাকা। এর বাইরে বাড়ি ভাড়া, মেডিকেল বাবদ তারা যা পান তা সামান্য। এ বেতনে একজন শিক্ষক কীভাবে নিত্যকার ব্যয়ভার বহন করবেন? প্রাথমিক এবং মাধ্যমিকের শিক্ষকদের কথা বলাই বাহুল্য। শিক্ষকদের অন্য কোনো সুবিধা নেই। এ অবস্থায় তারা কোথায় যাবেন। কোচিং ছাড়া ভালো কী পথ খোলা আছে?

অন্য দেশগুলোয় শিক্ষকদের সম্মানীটা দেখা যাক। ভারতে শিক্ষকদের বেতন বাংলাদেশের দ্বিগুণেরও বেশি। দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী প্রত্যেকটি দেশেই শিক্ষকদের বেতন বেশি। উন্নত বিশ্বের দিকে তাকাই। worldsalaries.org দেখাচ্ছে, আমেরিকার একজন শিক্ষক মাসে গড়ে পান বাংলাদেশী টাকায় প্রায় ৪ লাখ টাকা, ইংল্যান্ডের শিক্ষক পান সাড়ে ৩ লাখের মতো, জার্মানির শিক্ষকের বেতন সাড়ে ৪ লাখ প্রায় আর জাপানের শিক্ষকদের বেতনও সাড়ে ৩ লাখের বেশি। এসব দেশের শিক্ষকদের বেতনের একটা অংশ (২৫ থেকে ৩৫ শতাংশ) কেটে রাখা হয় এবং শিক্ষকদের কাজের সময় নির্ধারণ করা হয় সপ্তাহে ৩২ থেকে ৪০ ঘণ্টা। এগুলো অবশ্য ২০০৫ সালের তথ্য। তবে বাংলাদেশে প্রাথমিকের তুলনায় মাধ্যমিক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতনের যে আকাশ-পাতাল তফাত, তা কোনো দেশেই নেই। শিক্ষকরা এখানে ক্লাস নিতে নিতে ক্লান্ত।

শিক্ষকরা কম বেতন পান বা তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচনায় রেখে কোচিং সেন্টার চালু রাখার ন্যায্যতা তৈরির জন্য এ লেখা নয়। বলার বিষয় হলো, একজন শিক্ষক সম্ভাব্য সব দিক বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষকতা পেশায় আসেন। তাদের জীবন ধারণের জন্য অতিরিক্ত টাকার প্রয়োজন হতেই পারে। সে জন্য শিক্ষক অন্য কোনো কাজ করতে পারেন। শিক্ষকতা মহান পেশা। সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষকরাই এ পেশার কলঙ্ক। বিশেষ করে, ঢাকার ভিকারুননিসা নূন স্কুলের শিক্ষক পরিমল কর্তৃক ছাত্রী ধর্ষণের ঘটনাসহ এ রকম আরও ঘটনা ঘটেছে। পরিমলের এ ঘটনা কিন্তু কোচিং থেকেই ঘটেছে। কোচিংয়ে যেসব শিক্ষক ক্লাস নেন, তাদের বিষয়ে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। ঠিকমতো ক্লাস নেন না, যেসব শিক্ষার্থী কোচিং করে না, তাদের নম্বর দেন না প্রভৃতি। এতে গরিব শিক্ষার্থীরা অসহায়ই থাকছে।

কোচিং সেন্টারের প্রসারটা আমাদের দেশ আর ভারতেই বিদ্যমান। পৃথিবীর আর কোথাও এ রকম কোচিং নেই। অন্য কোচিং আছে যেমন— লাইফ কোচিং, স্পোর্টস কোচিং, বিজনেস কোচিং। তবে অন্যান্য দেশে একাডেমিক ক্লাসের পাশাপাশি গৃহশিক্ষকতা আছে, যেটা তাদের ভাষায় Shadow Education, তাও বাংলাদেশ আর ভারতের প্রাইভেট ও কোচিংয়ের মতো এত বেশি নয়।

কোচিং সেন্টারের ব্যাপকতা আমাদের দেশে কত বেড়েছে, তা খুঁজে বের করা সম্ভব নয়। সরকারের কাছেও হয়তো ঠিক কতসংখ্যক কোচিং সেন্টার রয়েছে তার হিসাব নেই। শহরের অলিগলিতে ব্যাঙের ছাতার মতো অসংখ্য কোচিং সেন্টার রয়েছে। একাডেমিক, বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি, স্কুল ভর্তি, বিসিএস, ইংরেজি কোচিং প্রভৃতি ধরনের কোচিংয়ের ফাঁদে পড়ে আছে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, যার সঙ্গে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে আছেন শিক্ষকরা। ফলে কোচিং বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা শিক্ষকদের দ্বারাই সম্ভব। মজার বিষয় হলো, আমরা পাবলিক পরীক্ষাগুলোয় ভালো রেজাল্টধারী হিসেবে যাদেরই দেখছি, বলা চলে সবাই কোচিংয়ের প্রোডাক্ট। যারা পড়াশোনা মানে ভালো রেজাল্টই বোঝে। ফলে দিন দিন ‘এ প্লাস’ বাড়ছে ঠিকই; কিন্তু শিক্ষার মান বাড়ছে না।

প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে শিক্ষাসংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিরা প্রায়ই বলে আসছেন, শিক্ষকদের জন্য আলাদা বেতন কাঠামো হবে। গত ২ আগস্ট শিক্ষকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালেও প্রধানমন্ত্রী এ আশ্বাস দিয়েছেন। এটা খুবই যৌক্তিক এবং প্রয়োজন। আমাদের শিক্ষকদের সত্যিকারার্থে স্বাবলম্বী না করে কেবল হাইকোর্টে রুল জারি করে কাজের কাজ কিছু হওয়ার কথা নয়। কোচিং সেন্টার বন্ধ করাসহ শিক্ষার সার্বিক মান উন্নয়নে শিক্ষকদের ভূমিকাই প্রধান। তাই শিক্ষার মেরুদণ্ড শিক্ষকদের জন্য বিনিয়োগে সরকারের দৃষ্টি দেয়া আবশ্যক।

দেখুন