ক্যাটেগরিঃ প্রকৃতি-পরিবেশ

হাল দুনিয়ায় ব্যাপক প্রচলিত একটি বিষয় ‘জলবায়ু পরিবর্তন’। উন্নত, উন্নয়নশীল ও অনুন্নত বিশ্ব তথা সবার কাছে পরিভাষাটি বেশ পরিচিত। আমরা তো এটি অহরহই শুনছি। শুধু শুনছিই না, প্রত্যক্ষও করছি। এর প্রভাবে ২০০৭ সালে সিডর দেখেছি, ২০০৮-এ দেখেছি নার্গিস, আইলা দেখলাম ২০০৯-এ। আমরা যখন এগুলোর শিকার হচ্ছি অন্যরা গবেষণা করছে— আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান জার্মান ওয়াচ ২০১০-এ প্রকাশিত তাদের ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেস্কে বাংলাদেশকে এক নম্বর ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে দেখিয়েছে।

এ রকম হাজারো গবেষণা হয়েছে। সব গবেষণায়ই ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে চ্যাম্পিয়নশিপটি বাংলাদেশের। এসব গবেষণায় কেবল ক্ষতিগ্রস্তদেরই চিহ্নিত করা হয়নি, বরং দায়ীদেরও শনাক্ত করা হয়েছে। বলা হচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণ হলো বৈশ্বিক উষ্ণায়ন। সহজ ভাষায় বললে কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমন। বিশ্বব্যাংক ক্লাইমেট ডাটাবেজ-২০০৪ থেকে জানা যায়, ২০০২ সালে একজন আমেরিকান গড়ে ২০ টন কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণ করেছেন। অস্ট্রেলিয়ায় এর পরিমাণ ১৬ টন, যুক্তরাজ্যে ৯ টন এবং দক্ষিণ আফ্রিকায় ৮ টন আর একজন বাংলাদেশী নিঃসরণ করেন শূন্য দশমিক ৩ টন। শিল্পায়নও এর জন্য দায়ী। চীন এবং ভারতেরও এখানে দায় রয়েছে। অবশ্য এর অন্য কারণও রয়েছে।

উন্নত বিশ্বের এ দায় বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত বলে তারা তা মেটাতে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোতে তহবিল দিয়ে থাকে। এ লেখার মূল বিষয় হলো জলবায়ু তহবিল। সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার পার্থে অনুষ্ঠিত কমনওয়েলথ সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী উন্নত বিশ্বকে তাদের আর্থিক সহযোগিতা আরও বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী তার দাবির ন্যায্যতার জন্য ঠিক এ কথাটিই বলেছেন— বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির জন্য সবচেয়ে কম দায়ী হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে সবচেয়ে ক্ষতিকর দেশগুলোর একটি।

জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক কনভেনশনের (ইউএনএফসিসি) চার নম্বর ধারা অনুযায়ী উন্নত বিশ্ব তহবিল দিতে বাধ্য। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দেশে তারা এ তহবিল দিয়ে আসছে। বাংলাদেশও যে ওই তহবিল পায়নি, তা নয়। বাংলাদেশ সে তহবিল ও নিজস্ব ফান্ড মিলে গঠন করেছে জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড। এ ফান্ড দিয়ে কাজও শুরু হওয়ার কথা। গত ২৩ মার্চ একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে— এ ফান্ড থেকে ৫০০ কোটি টাকার বেশি কাজে লাগানোর জন্য বিভিন্ন উন্নয়ন সংগঠন (এনজিও) ও সরকারি সংস্থাগুলোকে দেয়া হচ্ছে।

জলবায়ু তহবিল আমাদের প্রয়োজন কেন? এর উত্তর— অভিযোজনের জন্য। অভিযোজন হলো জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশের যে ক্ষতি হয়ে গেছে তার ক্ষতিপূরণ। যেমন— উপকূলীয় যেসব এলাকায় বাঁধ ভেঙে গেছে তা নির্মাণ, যারা উদ্বাস্তু হয়েছে তাদের আবাসনের ব্যবস্থা এবং ভবিষ্যৎ ক্ষতি হতে বাঁচার উপায় বের করা, পানি সহনীয় ধান বা ফসল উদ্ভাবন, গ্রিন টেকনোলজি উদ্ভাবন। পরিবেশ বিপর্যয়ে খাপ খাওয়ানোর মতো প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি উদ্ভাবনও রয়েছে এর মধ্যে। এর জন্য গবেষণায়ও তহবিল দরকার, অবশ্য গবেষণায় আমরা বরাবরই কম জোর দিয়ে থাকি। এ ছাড়া ভবিষ্যৎ ঝুঁকি মোকাবেলায় প্রস্তুতিসহ এ রকম নানা অভিযোজনের কাজে জলবায়ু তহবিল আবশ্যক।

প্রতি বছর ইউএনএফসিসির সদস্য দেশগুলোর শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ডিসেম্বরে। ১৯৯৫ সাল থেকে চালু হওয়া কোপ (কনফারেন্স অব কান্ট্রিজ)-১৭ সম্মেলন হচ্ছে আগামী মাসে দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে। একে কেন্দ্র করে ১৩ ও ১৪ নভেম্বর ঢাকায় হচ্ছে ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরামের সভা। এ নিয়ে ১ নভেম্বর পররাষ্ট্র এবং পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় যৌথ উদ্যোগে সংবাদ সম্মেলন করে। যেখানে বন ও পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতি মোকাবেলায় জলবায়ু তহবিল পাওয়া বাংলাদেশের অধিকার’। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আশা করছেন এ সভায় অন্তত ১০টি দেশের মন্ত্রীরা অংশগ্রহণ করবে এবং এর মাধ্যমে ক্লাইমেট গ্রিন ফান্ড কার্যকর করতে ভুক্তভোগী দেশগুলোকে নিয়ে একটি প্লাটফর্ম গড়ে তোলা হবে।

জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড বিষয়ে আসা যাক। ২০১০ সালে গঠিত হয় এ ফান্ড। শুরু থেকেই এ ফান্ড নিয়ে রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। এ লেখার শুরুর দিকে একটি জাতীয় দৈনিকের কথা বলা হয়েছে, যার শিরোনাম ছিল— জলবায়ু তহবিল নয়-ছয়! এতে বলা হয়েছে, জলবায়ু তহবিল থেকে ৫৩টি এনজিও ২১ কোটি ৩৪ লাখ টাকা পাচ্ছে, যেগুলোর বেশির ভাগই অদক্ষ এবং ১১টির কর্ণধার ক্ষমতাসীন দলের লোক। আর এর বাইরে ৪৮৮ কোটি টাকা বরাদ্দ হচ্ছে সরকারি সংস্থার জন্য। এখানেও রয়েছে এলাকাপ্রীতির অভিযোগ। সাম্প্রতিক সময়েও এ ফান্ডের বিষয়ে বিভিন্ন পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশের পর টিআইবি এর স্বচ্ছতা খতিয়ে দেখতে ‘ফলো দ্য মানি’ নামে একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে।

অভিযোগের অন্ত নেই। সম্প্রতি দুর্নীতির অভিযোগে পদ্মা সেতু প্রকল্প বন্ধ রয়েছে, বিশ্বব্যাংক প্রতিশ্রুত অর্থ ছাড় করতে চাইছে না। তদন্ত চলছে। জলবায়ু পরিবর্তনের তহবিল যেখানে আমরা দাতা গোষ্ঠীকে রাজি করিয়ে আদায় করছি, সেখানে বাস্তবায়নের এ অসঙ্গতি দুঃখজনক। বলা চলে, বাংলাদেশ তেমন একটা তহবিল পায়নি। এখনো ১১ কোটি ২ লাখ ডলার সাহায্যের প্রতিশ্রুতি রয়েছে ( ডেনমার্ক ১৬ লাখ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ১ কোটি ৪ লাখ, সুইডেন ১ কোটি ১৫ লাখ ও যুক্তরাজ্য ৮ কোটি ৬৭ লাখ ডলার দেবে)। এ দেশগুলো প্রতিশ্রুত তহবিল দেয়ার আগেই যদি এখানে নয়-ছয় দেখে, তারা তা দিতে আগ্রহী হওয়ার কথা নয়।

বাংলাদেশের এখনো অনেক তহবিল প্রয়োজন। সিডর ও আইলার কয়েক বছর পার হলেও সে ক্ষত রয়েই গেছে, সেখানকার মানুষের জীবন-জীবিকার সমস্যাও তীব্র। এসব বিষয়ে অভিযুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে দেন-দরবারের প্রয়োজন রয়েছে। এর জন্য বাংলাদেশের যথেষ্ট প্রস্তুতি ও গবেষণার প্রয়োজন। যুক্তি ও বাস্তবতা ভালোভাবে উপস্থাপন করতে পারলে তহবিল পাওয়াটা খুব কষ্টের হবে না বলেই মনে হয়। তবে তার আগে প্রয়োজন স্বচ্ছতার।

প্রকাশিত