ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

মাহমুদ (ছদ্মনাম) সবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। টানাটানির সংসারে বড় হয়েছে। মেধায় কমতি নেই; এসএসসি-এইচএসসি দুটোতেই গোল্ডেন এ প্লাস। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর তার এক বন্ধু খাণ্ডকালীন চাকরি দেয়ার নাম করে এক অফিসে নিয়ে যায় তাকে। কোট-টাই পরা অফিসারের বক্তব্যে কুপোকাত মাহমুদ। চাকরির চেয়ে কোটিপতি হওয়াটাই এখন তার স্বপ্ন। লাখ টাকা জীবনে কোনো দিন দেখেনি যে, এত সহজে কোটিপতি হওয়ার রাস্তা পেয়ে সে আনন্দিত। মেধাবী মাহমুদ যে স্বপ্ন নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে, তার চেয়ে কোটি টাকা এখন অনেক বড় তার কাছে। এর পেছনেই ছুটছে সে; টাকার কাছে পড়ালেখা বড়ই অসহায়!

মাহমুদকে আসলে টাকার নেশা ধরিয়ে দিয়েছে এমএলএম কোম্পানি। এমএলএম মানে মাল্টি লেভেল মার্কেটিং। সবার কাছে এমএলএম যতটা না পরিচিত, তার চেয়ে বেশি পরিচিত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নাম। এমএলএম কোম্পানির খপ্পরে পড়েনি এমন মানুষ পাওয়া ভার। তবে তাদের আগ্রহ শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক। কারণ এরা তাদের টোপ খুব সহজেই গ্রহণ করে— এটা বিভিন্ন কারণে হতে পারে। এ বিষয়ে যাওয়ার আগে কয়েকটি এমএলএম কোম্পানির নাম জানি— ডেসটিনি, নিউওয়ে, লাইফলাইন, গ্যানেক্স, গেটওয়ে, ব্রাভো আইটি, ডোরওয়ে, ইউনিপেটুইউ, ই-লিংকস। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে এমন মোট ৬৯টি কোম্পানির নিবন্ধন রয়েছে বলে জানান বাণিজ্যমন্ত্রী জিএম কাদের।

বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজে ভর্তি হলে স্বাভাবিকভাবেই তার চলাফেরায় প্রয়োজন টাকার। যদি বলা হয়, ‘তুই পড়ালেখার পাশাপাশি হাজার হাজার টাকা কামাতে পারবি সহজেই’, তার মাথা ঠিক থাকার কথা নয়। অসচ্ছল মেধাবী শিক্ষার্থীকে পড়ালেখা ভালোভাবে চালিয়ে নেয়ার দোহাই দিয়ে এমএলএম কোম্পানি মানুষকে প্রলুব্ধ করছে। একসময় দেখা যায় শিক্ষার্থীটি পড়াশোনার আগ্রহ তো হারিয়েছেই, তার ওপর নিঃস্ব হয়ে এমএলএম কোম্পানিও ছেড়েছে।

বাংলাদেশে শিক্ষার্থীদের, বিশেষত কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের ওপর এমএলএম কোম্পানির প্রভাব নিয়ে গবেষণা করলেই বের হয়ে আসবে কত শিক্ষার্থীর জীবন এরা নষ্ট করেছে। পড়ালেখার পাশাপাশি এমএলএম কোম্পানি করা সম্ভব বা পড়ালেখা চালিয়ে নিতে এমএলএম কোম্পানি সাহায্যকারী— এমন ধোঁকা দিয়ে শিক্ষার্থীদের এরা বশ করে। মজার বিষয় হলো, ঠিক এ শিক্ষার্থীটির ভেতরে যখন এমএলএমের বীজ ঢুকে যায়, যখন সে প্রত্যেক দিন ঘুম থেকে উঠে একটা টাই গলায় ঝুলিয়ে অফিসে যায়, যখন তার সহপাঠী বন্ধু জিজ্ঞেস করে ‘কি রে ক্লাস করবি না?’ তখন তার উত্তর হয়, ‘আরে ক্লাস করে কী হবে’ কিংবা ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখাশেষে চাকরি করে কত টাকা পাবি— বিশ, ত্রিশ কিংবা পঞ্চাশ হাজার? আর আমি এখন এটি করলে দুই বছর পর ঘরে বসে থাকলেও দেড় লাখ টাকা আসবে।’ আরও মজার বিষয় হলো, এরাই আবার হতাশ হয়ে অনেকে কাজ না পেয়ে বিদেশে যেতে বাধ্য হন।

বাংলাদেশে এমএলএম কোম্পানির শিকার শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, বরং এর দ্বারা নিঃস্ব হয়েছেন অনেক সাধারণ মানুষও। এটা অবশ্য আমাদের এমপি-মন্ত্রীরাই স্বীকার করছেন। ৬ ফেব্রুয়ারি বাণিজ্যমন্ত্রী যেমন সংসদে বলেছেন, ‘এমএলএম কোম্পানিগুলো মানুষের কাছে স্বপ্ন বিক্রি করছে। প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে স্বপ্ন দেখিয়ে অনেক ক্ষেত্রে অনেককে নিঃস্ব করছে’ কিংবা ২০১১ সালের ২৪ অক্টোবর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একটি কোম্পানির নাম উল্লেখ করে বলেছেন, ‘তাদের অপকর্ম খতিয়ে দেখা হবে। এর কিছু কর্মকর্তা এরই মধ্যে সরকারের নজরে এসেছে। তাদের মিথ্যা আশ্বাসে অনেকে প্রতারিত হচ্ছেন। সরকার তাদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছে।’ এমএলএম কোম্পানি বন্ধের সুপারিশও করা হয়েছে। এখনো কর্তৃপক্ষ বলেই যাচ্ছে, ‘এমএলএম ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে আইন হচ্ছে।’ তবে এ ক্ষেত্রে অগ্রগতি ধীর।

এমএলএম কোম্পানির বিরুদ্ধে কমিউনিটি ব্লগগুলোয় ব্যাপক জনমত তৈরি হয়েছে। এমএলএম কোম্পানিগুলো আর যা-ই করুক; অন্তত শিক্ষার্থীদের জীবন নষ্ট করার অধিকার তাদের নেই। শিক্ষার্থীদের নানা কৌশলে টাকার পেছনে যেভাবে ছোটাচ্ছে, তা করতে পারে না কোম্পানিগুলো। কোম্পানিগুলো যেভাবে ব্রেন ওয়াশ করছে, শিক্ষার্থীদের পাগল বানাচ্ছে কিংবা মেধাবী শিক্ষার্থীদের পড়ালেখা বিমুখ করছে, তা চলতে দেয়া যায় না। এটা একদিকে শিক্ষার্থীর নিজের জন্য ঝুঁকিস্বরূপ, অন্যদিকে দেশের সম্পদ হারিয়ে যাচ্ছে।

এ বিষয়ে আইনের যেমন দরকার আছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেরও রয়েছে দায়িত্ব। প্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষার্থীদের কাউন্সিলিং করতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ভর্তি হওয়ার পর পরই শিক্ষার্থীকে তার শিক্ষাজীবনের সম্ভাব্য প্রলোভন, ঝুঁকি, সাফল্যের পথ প্রভৃতি বিষয়ে কাউন্সিলিং করালে এর একটা সমাধান হতে পারে।

গোড়ায় গলদ। গলদটা শিক্ষাব্যবস্থায়। দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ বিশ্ববিদ্যালগুলোয় পড়েও চাকরির কোনো নিশ্চয়তা নেই। হতাশা থেকেও এমএলএম কোম্পানির খপ্পরে পড়াটা আশ্চর্যের কিছু নয়; এটাই বরং তার ভবিষ্যতের জন্য ভালো। আরেকটা বিষয় হলো, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় খণ্ডকালীন কাজের কোনো ব্যবস্থা নেই। বিশ্ববিদ্যালয় যদি পার্ট-টাইম কাজের নিশ্চয়তা দিতে পারত, তাহলে শিক্ষার্থীরা এমএলএমসহ পড়ালেখার জন্য হুমকিস্বরূপ, এমন অন্যান্য কাজে হয়তো জড়াত না। সর্বোপরি শিক্ষার্থীদের সচেতনতা, বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব আর প্রশাসনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে এমএলএম কোম্পানির খপ্পর থেকে বাঁচা সম্ভব।

প্রকাশিত