ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

গত ১৯ ফেব্রুয়ারি জাপান টাইমস পত্রিকার একটি সম্পাদকীয় শিরোনাম ছিল— Costly price of expensive education (দামি শিক্ষার ব্যয়বহুল মূল্য)। এতে বলা হয়, জাপানের শিক্ষার মান উন্নত হলেও সেখানে শিক্ষা ব্যয় আগের মতোই চড়া; যদিও দেশটির বাজেটের একটা বড় অংশ শিক্ষার্থীদের বিশেষ অর্থনৈতিক সহায়তা দিয়ে থাকে। জাপান উন্নত দেশ হিসেবে সেখানকার শিক্ষা ব্যয়বহুল হবে, এ রকমটা হয়তো আমরা ভাবতেই পারি। যদিও তার সমালোচনা করেছে সম্পাদকীয়টি এবং জাপান টাইমস এ শিক্ষা ব্যয় কমানোর সুপারিশও করেছে। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যয় আমরা কীভাবে দেখব? আমাদের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার বাইরে প্রাথমিক শিক্ষা হলো অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক; আবার উচ্চশিক্ষায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে কম মূল্যে যে কেউ পড়াশোনা করতে পারে। পড়াশোনার জন্য এর বাইরে অন্য বিষয়ও রয়েছে। বিশেষ করে শিক্ষা উপকরণের কথা বলতেই হবে। ঢাল-তলোয়ার বিহীন নিধিরাম সর্দার হয়ে যেমন যুদ্ধ করা যায় না, তেমনি শিক্ষা উপকরণ ছাড়াও শিক্ষাগ্রহণ অসম্ভব। ফলে শিক্ষা উপকরণ গুরুত্বপূর্ণ। স্বস্তির বিষয় হলো, শিক্ষার অন্যতম উপকরণ ‘বই’ প্রথম থেকে নবম শ্রেণী পর্যন্ত প্রত্যেক শিক্ষার্থী বিনা মূল্যে পাচ্ছে এখন। তবে শিক্ষার অন্যান্য উপকরণের ব্যবস্থা শিক্ষার্থীকে তথা তার অভিভাবককেই করতে হয়। বাংলাদেশে দ্রব্যমূল্যসহ সবকিছুর দামই পাগলা ঘোড়ার মতো ছুটছে আর শিক্ষা উপকরণও এর বাইরে নয়।

গত ১৮ ফেব্রুয়ারি ‘শিক্ষা উপকরণের দাম বাড়ছে’ বলে সংবাদ দিয়েছে বণিক বার্তা। এক মাস পর ২৫ মার্চ আরেকটি পত্রিকা (আমার দেশ) বলছে, ‘বাড়ছে সবরকম শিক্ষা উপকরণের দাম স্কুল ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে অভিভাবক’। প্রতিবেদনগুলো দেখাচ্ছে, গত এক বছরে শিক্ষা উপকরণের দাম বেড়েছে ৪০ শতাংশ। ফেব্রুয়ারি থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত এর দাম বেড়েছে ১০-১৫ শতাংশ। প্রতিবেদনে বিশেষভাবে কাগজ, খাতা, কলম, পেনসিল, রঙ পেনসিল, ইরেজার, জ্যামিতি বক্স প্রভৃতি উপকরণের কথা উঠে এসেছে, যেগুলোর প্রত্যেকটির দামই সাম্প্রতিক সময়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে। এ ছাড়া বেড়েছে আমদানি করা বইয়ের দামও। এর মধ্যে কাগজের দাম বাড়ায় বেড়েছে ফটোকপির খরচ; এভাবে প্রিন্ট, বাইন্ডিংসহ অন্যান্য শিক্ষাসংশ্লিষ্ট উপকরণের দাম বাড়ায় মোটের ওপর বেড়েছে শিক্ষা ব্যয়।
শিক্ষা উপকরণের দাম হঠাৎ এভাবে বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে ব্যবসায়ীরা ডলারের দামের অস্বাভাবিক বৃদ্ধিকে দেখিয়েছেন। বাংলাদেশের শিক্ষা উপকরণের ৮০ শতাংশই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। বিশ্ববাজারে কোনো দ্রব্যের দাম স্থিতিশীল থাকলেও আমদানির ক্ষেত্রে মুদ্রার মান একটা বড় প্রভাবক। দেখা গেল, বিশ্ববাজারে এসব শিক্ষা উপকরণের দাম বাড়েনি অথচ সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের দেশে তা বেড়ে গেছে কারণ ডলারের দাম বেড়েছে; আরও সহজভাবে বললে আমাদের টাকার মান ডলারের তুলনায় কমে গেছে। এ বিষয়ে পরে আসছি।

প্রকৃত অর্থে ডলারের দামের বিষয়টি না ধরলেও বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রীর দাম বৃদ্ধির ধারাবাহিকতায় বলা চলে শিক্ষা উপকরণের দাম বেড়েছে। ভোজ্যতেল, ডিম, আটা, কসমেটিকস, শিশুখাদ্য এবং সবজিসহ সব দ্রব্যের দাম যেমন সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে; একই সঙ্গে বেড়েছে শিক্ষা উপকরণের দাম। এভাবে দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবকিছুর দাম যখন বাড়ছে তখন শুধু শিক্ষা উপকরণই নয়, শিক্ষার অন্যান্য খরচও অনেক বেড়েছে। বিশেষ করে যেসব অভিভাবক সন্তানদের সরকারি বিদ্যালয়ে পড়ান না, তাদের ক্ষেত্রে ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে বেড়েছে ফি-বেতন। বলা চলে ঢাকাসহ সারা দেশেই এখন মধ্যবিত্ত শ্রেণী তাদের সন্তানদের সরকারি বিদ্যালয়ের চেয়ে ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান যেমন— কিন্ডারগার্টেন, ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল প্রভৃতিতে টাকা দিয়ে পড়াতে পছন্দ করেন। ফলে সংকটটা এখন যেমন মধ্যবিত্ত শ্রেণীর একই সঙ্গে নিম্নবিত্তদেরও। নিম্নবিত্ত, যাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির ব্যবস্থাই বড় বিষয়, তাদের সন্তানদের উচ্চমূল্যে শিক্ষা উপকরণ কেনাটা তো স্বপ্নের ব্যাপার। আবার যারা মধ্যবিত্ত, তাদের জন্য নিত্যদিনের বাজার, একই সঙ্গে সন্তানের বিদ্যালয়ের ফি-বেতন বহন আর চড়ামূল্যে শিক্ষা উপকরণ সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়ছে।

শিক্ষা উপকরণে আসি। পত্রিকার প্রতিবেদন থেকে জানা গেল, দেশের মোট চাহিদার ৮০ শতাংশ শিক্ষা উপকরণই দেশের বাইরে থেকে আমদানি করা হচ্ছে। এর মানে আমরা দেশীয়ভাবে মাত্র ২০ শতাংশ শিক্ষা উপকরণের জোগান দিতে পারছি। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে, চাইলেই ৮০ শতাংশ শিক্ষা উপকরণ দেশেই উত্পাদন করতে পারি।

শিক্ষার প্রধান উপকরণ কাগজের কথাই ধরা যাক। বাংলাদেশ পেপার মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএমএ) সূত্র ধরে পত্রিকাগুলো বলছে, দেশে সব ধরনের কাগজের মোট চাহিদা ৭ লাখ টনের বেশি নয়। আবার বিপিএমএ বলছে, দেশে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে মোট কাগজকল রয়েছে ৬১টি, যেগুলো বছরে ৯ লাখ ১৮ হাজার টন কাগজ উত্পাদন করে। স্বাভাবিকভাবেই এ কাগজ দিয়ে দেশের চাহিদা মিটিয়েও রফতানি করতে সক্ষম বাংলাদেশ। অনেক কল প্রতি বছর রফতানি করেও থাকে। সমস্যা হলো, এখনো আমাদের দেশে কাগজ আমদানি করা হয়। এ আমদানিতে একদিকে স্থানীয় শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে চলে যাচ্ছে। এমন অভিযোগও রয়েছে, একটি চক্র শুল্ক ফাঁকি দিয়ে বিদেশ থেকে নিম্নমানের কাগজ আমদানি করছে। ফলে বিদেশ থেকে কাগজ আমদানি বন্ধে সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেছে বিপিএমএ।

শিক্ষার আরেক উপকরণ কলমের সম্পূর্ণ চাহিদা পূরনের সক্ষমতাও রয়েছে আমাদের। এখনো চাহিদার ৭০ শতাংশ কলম দেশী আর বাকি ৩০ শতাংশ বলা চলে ভারতীয়। দেশীয় মেটাডোর কোম্পানিই ৫০ শতাংশ কলম উত্পাদনে সক্ষম এবং আমাদের পুরো বলপেনের চাহিদা দেশে উত্পাদিত কলমই মেটাতে পারে। এখন পর্যন্ত ওয়াটার বেইজড জেলপেনটা বাইরে থেকে আনতে হয়। দেশীয় কোম্পানিগুলো এ ধরনের জেলপেন উত্পাদনের দিকে যাচ্ছে। সরকারের যথাযথ সহায়তা পেলে কলমেও স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জিত হবে আশা করা যায়।

এ ছাড়া অন্যান্য শিক্ষা উপকরণ যেমন— পেনসিল, ইরেজার প্রভৃতি দেশে অল্প পরিমাণে হলেও উত্পাদন হচ্ছে। এ অবস্থায় ৮০ শতাংশ শিক্ষা উপকরণ বিদেশ থেকে আমদানির বিষয়টা মেনে নেয়া যায় না। আবার একই সঙ্গে ডলারের দাম বেড়ে গেলেই এগুলোর অস্বাভাবিকভাবে দাম বাড়বে, তাও হওয়ার কথা নয়। সবচেয়ে বড় কথা, শিক্ষা উপকরণের দামের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি নিশ্চিতভাবে শিক্ষাব্যবস্থায় প্রভাব ফেলবে। ফলে এগুলোর দাম স্বাভাবিক রাখা সরকারের দায়িত্ব। এ ক্ষেত্রে যেহেতু আমাদের স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের সুযোগ রয়েছে, সেহেতু শিক্ষা উপকরণ উত্পাদনসংক্রান্ত শিল্পকে প্রমোট করাও সরকারের অন্যতম দায়িত্ব হওয়া উচিত।