ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 

মেইন গেইটের বাইরে স্কুটার এসে থামার শব্দ পাওয়া গেল। মামা এসে তাড়া দিলেন, “স্কুটার চলে এসেছে, সবাই বেড়িয়ে পড়”। গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার এই সময়টাতে আম্মাকে সবচেয়ে খুশি দেখা যায়, চোখমুখ কেমন জ্বলজ্বল করে। করবেই বা না কেন, স্কুল এর গণ্ডি পেরোনোর আগেই বাড়ি ছাড়তে হয়েছিল। সেই ঘর-বাড়ি, বাড়ির সামনের উঠোন, উঠোন পেরিয়ে সড়ক, সড়কের পাশ ঘেঁসে খাল, খালের টলটলে পানি –এ সব কিছু কিভাবে যে টানে। তবে বছরের বাকী সময়টা সংসার সামলাতে সামলাতে যেন সেসব দিনের কথা ভুলেই যান। রোজা এলে যখন ছেলেমেয়েদের স্কুল ছুটি হয়ে যায় কেবল তখনই নিজের বাড়ির কথা, বাবা-মার কথা, শ্বশুর বাড়ির কথা ভাবার অবসর পান। তাই সেই প্রিয় চেনা যায়গায় গিয়ে প্রিয় মানুষগুলোকে পাশে রেখে শৈশবের সেই দুরন্ত দিনগুলোকে স্মরণ করার এই সুযোগটা যেন কিছুতেই হাতছাড়া করতে চান না তিনি।

আমরা চার-ভাই বোন, মা, বাবা আর মামা-প্রতিবার এই কয়জনই যাই গ্রামের বাড়িতে।শুনতে পাচ্ছি এবার নাকি বাবা যাবেন না আমাদের সাথে। এটা শোনার পর থেকেই আমার মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেছে। বাবাকে বারবারই তাই জিজ্ঞেস করছি তিনি যাবেন কিনা। বাবা হেসে উত্তর দিচ্ছেন যে উনি যাবেন। কিন্তু হাসিটা কেমন জানি একটু মলিন। বাবার না যাবার কারণটাও আমি ঠিক বুঝতে পারছিলাম না। একবার শুনলাম ছুটি পাননি আবার কেও একজন বলল যে বাবা মনে হয় বোনাস এখনও পায়নি, তাই আমাদের সাথে যেতে পারছেন না। আমি মনে প্রাণে চাচ্ছি বাবা যেন আমাদের সাথে যায়।

তখনো আন্তঃনগর ট্রেন চালু হয়নি। সকাল বেলা রওনা দিলে জামালপুর কালীবাড়ি স্টেশনে পৌঁছাতে পৌঁছাতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে যায়। সেখান থেকে কিছুদূর যেতে হবে রিকশায়, তারপর সেলোবোট।সেলোবোটগুলো বানান হয় বড় নৌকার সাথে ক্ষেতে পানি দেয়ার ইঞ্জিন লাগিয়ে। বর্ষাকালে তাও এই বাহন আছে, শুকনো মৌসুমের একমাত্র বাহন গরুর গাড়ি।

আমরা সবাই একে একে সেলোবোটে উঠলাম, কিন্তু বাবা এখনো আসছেন না।তবু আমার মনে ক্ষীণ সন্দেহ, বাবা মনে হয় শেষ পর্যন্ত আমাদের সাথেই যাবেন, তা-নাহলে সারাদিন আমাদের সাথে ট্রেনে করে এসে এই নদীর ঘাট থেকে ফিরে যাবেনই বা কেন? আমি বার বার পিছন ফিরে দেখছি, এই বুঝি বাবা উঠে এ্লেন। কিন্তু বাবা আর উঠে এলেন না, নদীর ঘাটেই দাঁড়িয়ে আছেন। আমাদের সেলোবোটটি আস্তে আস্তে চলতে শুরু করল।সেলোবোট বাবাকে পিছনে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে, আমার বুকের ভিতর কেমন যেন খারাপ লাগছে। বাবা তার পকেটে হাত দিয়ে সিগারেট বের করলেন, সিগারেট ধরিয়ে একটা টান দিলেন, এরপর তার ঘনকাল ব্যাকব্রাশ করা চুলে হাত বুলালেল।যখন বুঝে গেলাম বাবা আর আসবেন না তখন খুব ইচ্ছে করছিল বাবাকে হাত নেড়ে বিদায় জানানোর, কিন্তু ঠিক অভিমান না জড়তা কোন কারণে যেন হাত আর উঠছিল না। চারদিক আস্তে আস্তে অন্ধকার হয়ে এল।বাবা চোখের আড়াল হয়ে গেলেন। আমার বাবাকে আর বিদায় জানানো হল না।

এর থেকে প্রায় ২৫ বছর পর।
তৃতীয় রোজা চলছে। আমার মেজ ভাই, মামুন, এর ফোন পেয়ে হন্তদন্ত হয়ে চলে এলাম হসপিটালে। মামুনের গলা এমনিতেই শীতল, ফোনে কেন জানি আরও শীতল মনে হচ্ছিল। আমাকে আইসিইউ এর ভিতরে যেতে বলা হল। বাবার শরীরে বিভিন্ন যন্ত্রপাতি লাগান। আর্টিফিশিয়াল ভেন্টিলেশন এর সাহায্যে শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা চলছে। মাথার কাছের মনিটরে হার্ট-বীট এর রিডিং দেখা যাচ্ছে, রিডিং অল্প অল্প করে কমতে শুরু করেছে।আমাদের বাবা কোথায় যেন চলে যাচ্ছেন। এবার তো আমরা বাবাকে ফেলে যাচ্ছি না, বাবাই কেন আমাদেরকে রেখে চলে যাচ্ছেন?

ক্রমাগত দোয়া পড়ে চলেছি। বড় ভাইও চল এসেছেন। আইসিইউ এর ভিতরে একবার ঢুকে ভাইয়া বের হয়ে এলেন। হাসপাতালে থাকা অবস্থায় বাবার কষ্টগুলো ভাইয়া বরাবরই সহ্য করতে পারেন না। আমাদের বাবা কি হারিয়ে যাচ্ছেন? এইতো আমাদের সামনে পরিপূর্ণ শরীর নিয়ে শুয়ে আছেন বাবা। তাহলে উনি কিভাবে অজানার দেশে চলে যাবেন? এইভাবেই কি মানুষ চলে যায়? মৃত্যু কি এত সহজ একটা ব্যাপার? জীবনে প্রথম চোখের সামনে একটি মৃত্যু ঘটতে চলেছে, আর যার মৃত্যু ঘটছে সে কিনা আমাদেরই প্রাণপ্রিয় বাবা! আমরা কেউ কিছু করতে পারছি না! কোন শক্তি কি নেই এই প্রক্রিয়াকে বন্ধ করার? আমার এখন কি করা উচিত…। আমরা তিন ভাই কেবল আইসিইউ তে যাচ্ছি আর আসছি। এখানে আর কোন রোগী নেই বলে আমাদের কেউ বাঁধা দিচ্ছে না। এর মাঝে আপার ফোন এলো। কি বলব আপাকে? ওপাশ থেকে বাবার সবচেয়ে আদরের সন্তানের কান্না শুনতে পাচ্ছি। পাশ থেকে মার কোরাআন শরীফ পড়ার শব্দ শোনা যাচ্ছে।

বাবার পাশে থাকা উচিত, তাড়াতাড়ি ফোনে কথা সেরে আবার আইসিইউ এর ভিতরে ফিরে এলাম। হার্ট-রেট এখন দ্রুত কমছে…৪০……………৩৮……………৩৫………………আমার বাবা আমাদের ছেড়ে চলে যাচ্ছেন! বাবাকে বিদায় জানানোর কোন ভাষা, কোন পন্থা আমার জানা নেই। হার্ট-রেট আরও নেমে এল… ৫…৪…৩…২…১…০। সব কিছু শেষ……………………………। বাবা আর নেই। চারিদিকে কেমন এক অসহ্য নিস্তব্ধতা, শুধু মনিটর থেকে অদ্ভুত একটা শব্দ হচ্ছে। ডাক্তার কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষা করলেন, ইলেক্ট্রিক শক দিয়ে হার্ট আবার কার্যকর করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু বাবা আর ফিরে এলেন না। ডাক্তার বাবার মৃত্যু ঘোষণা করলেন।

আমরা ভাইরা বাবার বিছানার পাশে ঠায় দাঁড়িয়ে আছি। কারো মুখে কোন কথা নেই, যেন ঘটনাটা ঠিক বুঝতে পারছিনা। হঠাৎ খেয়াল করলাম বাবার বুক ওঠানামা করছে। আমি চিৎকার দিলাম, বাবা তো শ্বাস নিচ্ছেন। ডাক্তার এগিয়ে এসে বললেন, “আর্টিফিশিয়াল ভেন্টিলেশন এর মেশিন এখনো চলছে, তাই এমন হচ্ছে, আপনারা অনুমতি দিলে আমরা ওটা খুলে ফেলতে পারি”।আর্টিফিশিয়াল ভেন্টিলেশন এর নল খুলে ফেলা হলো। বাবার শরীরের সর্বশেষ নড়াচড়াও বন্ধ হয়ে গেল। মনে মনে পড়লাম, “ইন্না লিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজেউন”। মামুন দোয়া পড়ে বাবার বাবার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। আমি বাবার গা ছুঁয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলাম আর ভাইয়া একটু দূরে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বাবা আমাদের ছেড়ে, এই পৃথিবী ছেড়ে বিদায় নিয়ে চলে গেলেন, অথচ বাবাকে এই শেষ বারও আমি বিদায় জানাতে পারলাম না। বাবাগো আমার এত জড়তা কেন……………?