ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

গুলশান এর হলি আর্টিসান বেকারিতে যে এক হৃদয়-বিদারক ঘটনা ঘটে গেছে সেটা বুঝতে পারলাম ২রা জুলাই সকাল বেলা টেলিভিশনের সামনে বসে।ঠিক কতজনে নিহত হয়েছে সেই খবরটা তখন পর্যন্ত জানতে পারিনি তবে এর ভিতর বেশ কয়েকজন জাপানিজ আছে এটা বুঝতে পেরেছিলাম। এতগুলো জা্পানিজকে একসাথে শুধুমাত্র বিদেশী হবার কারণে হত্যার কথা শুনে কেন জানি বিশ্বাস হচ্ছিল না। জাপানিজদের মত নিরীহ ও বিনয়ী মানুষদের কিভাবে হত্যা করতে পারে জঙ্গিরা! পুরো ঘটনায় বিস্মিত, ক্ষুব্ধ, হতবাক আমার মুখ থেকে এই কথাটাই প্রথম বের হয়ে এসেছ।

যারা জাপানিজদের সাথে কখনো মেশেনি তারা হয়তো কখনো এই বিষয়টা ঠিকভাবে বুঝতে পারবেনা কারণ তাদের মনে দাগ কেটে আছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং তার পূর্ববর্তী সময়ের যুদ্ধবাজ জাপানিজদের কথা। প্রায় সাড়ে পাঁচ বছর জাপানে থেকে তাদেরকে খুব কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা না থাকলে আমিও হয়তো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পূর্ববর্তী জাপানিজদের সাথে তাদের বর্তমান রূপের পার্থক্য বুঝতে পারতাম না। আগুনে পুঁড়ে যেমন সোনা খাঁটি হয়, যুদ্ধের ভয়াবহতা হয়তো তাদেরকে সেভাবেই পরিবর্তিত করেছে। আর এজন্য-ই হয়তো তাদেরকে কেও গলা কেটে হত্যা করতে পারে এটা ভাবতে আমার খুব কষ্ট হয়েছে।

তাদেরকে কেন আলাদা বলছি তা একটু পরিষ্কার করছি। অনেক সময় অনেক সামান্য ঘটনা নিয়েই আমরা ভারত, পাকিস্তান, মায়ানমার বা অন্য দেশকে নিয়ে আড্ডায় বা ফেসবুকের পাতায় কত জঘন্য মন্তব্য-ই না করে ফেলি। ঐ দেশগুলো থেকেও ঠিক একই রকম উত্তর ফিরে আসে। জাতি হিসেবে আমরা কতটা সভ্য হয়তো এটা তারই প্রতিফলন। কিন্তু ১লা জুলাই এর সেই ঘটনার পর আমি আমার কোন পরিচিত জাপানিজ এর ফেসবুকে বাংলাদেশ বা ইসলাম ধর্ম বিদ্বেষী কোন মন্তব্য দেখিনি।

ঘটনা ঘটে যাবার বেশকিছুদিন পার হবার পরও জাপানিজ কাওকে সহমর্মিতা জানানোর সাহস সঞ্চয় করতে পারছিলাম না। অথচ তারাই আমাকে বার্তা পাঠিয়ে আমার এবং আমার পরিবারের খবর নিতে শুরু করলো, কিন্তু সেই মেসেজ এ একবারও এতগুলো জাপানিজের নৃশংস পরিণতির ব্যাপারে কোন কথা নেই।

এবার বিব্রত, লজ্জিত আমি কিছুটা সাহস সঞ্চয় করে বললাম, “ঐ দিনের সেই মর্মান্তিক ঘটনার জন্য আমি খুবই দুঃখিত এবং লজ্জিত”।

বন্ধুর উওর, “ঘটনাটি খুব দুঃখজনক, কিন্তু আমি জানি, আমরা বন্ধু”। এর উত্তরে কিছু বলার মতো সাহস আমার ছিল না, শুধু বলতে পারলাম, “ধন্যবাদ”।

আরেক বন্ধুর উত্তর যেন আমাকে স্তম্ভিত করল, “তোমার লজ্জিত হবার কোন কারণ নেই, তোমারা নিরাপদে আছ এটি জানতে পেরেই আমাদের ভাল লাগছে।”

আমার একজন সিনিয়র বন্ধু তার ফেসবুক নোট (view this link)-এ দিয়েছেন তার জাপানিজ বন্ধুর কাছ থেকে পাওয়া এমন অনেক মেসেজ যা হয়তো জাপানিজদের মানবিকতা এবং মনুষত্ব্যের উচ্চতা নিয়ে আমাদের অনেককে নতুন করে ভাবতে শিখাবে। এই রকম কাওকে কি গলা কেটে হত্যা করা যায়!

আমার আজ বারবার মনে পড়ছে আমার ঢাকার বাড়িতে আমন্ত্রিত জাপানিজদের নিয়ে আমার পুরো পরিবারের কাটানো চমৎকার কিছু সময়ের কথা। জাপান থেকে পিএইচডি শেষে দেশে ফিরে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম আমার জাপানিজ ল্যাব-মেটদের। পুরো সপ্তাহ-জুড়ে আমাদের বাসায় ছিল তারা। ঢাকার বিভিন্ন স্থানে ঘুরাতে নিয়ে যেতে আমাদের নিজেদের যেমন এতটুকু ভয় লাগেনি তেমনি ওদের ভিতরেও কোন জড়তা দেখতে পাইনি। সেই সময়টাতে তাদের ভিতরে যেমন কোন নিরাপত্তা-হীনতা ছিলনা আমিও ভাবিনি তাদের কোন বিপদ হতে পারে। অনেক বাংলাদেশী-ই তখন সেই জাপানিজদের সাথে ছবি তুলেছে তার ফেসবুক-কে সমৃদ্ধ করার জন্য। তখন কি আমি ভেবেছি এই ছেলে বা মেয়েটিও হতে পারে সুইসাইড স্কোয়াডের কোন সদস্য! আমার এই ঢাকার বাসাতেই রাত্রিযাপন করেছেন আমার জাপানিজ পিএইচডি সুপারভাইজার তার পরিবার নিয়ে! আজ ভাবতেই তাদের নিরাপত্তার কথা ভেবে কেমন যেন গা শিওরে উঠছে!

 

 

আমার পিএইচডি সুপারভাইজার আর মাত্র দুই/তিন বছর পরেই রিটায়ারম্যান্ট এ যাচ্ছেন। রিটায়ারম্যান্ট এর পর তার ইচ্ছে বিভিন্ন দেশে ঘুরবেন আর এই সব দেশে থাকা তার ছাত্রদের সাথে সময় কাটাবেন। পোষ্ট-ডক শেষে আমিও বড়মুখ করে বলে এসেছিলাম, “আমার দেশে আবার আসবে কিন্তু সেন্সেই(জাপানিজ ভাষায় শিক্ষক কে সেন্সেই বলা হয়) ”।আমার দেশে পাওয়া আতিথেওতার কথা জানতে পেরে ল্যাব এর অনেকেই আমার দেশে আসতে চেয়েছে। এখনো কি তাদের সেই ইচ্ছে অবশিষ্ট থাকবে? না আমি সাহস করব তাদেরকে আমন্ত্রণ জানাতে? এত অল্প সময়ের ভিতর কেন এত বড় পরিবর্তন ঘটে যাবে!

জাপানিজ দের হত্যার মোটিভ আমার কাছে পরিষ্কার না। তারা মুসলমান না এটিই যদি একমাত্র কারণ হয়ে থাকে তবে আমি বলবো এখানে অনেক বড় ভুল হচ্ছে। জাপানে থাকাকালীন সময়ে ধর্মের ব্যাপারে আমাকে কখনো কোন বিরূপ পরিস্থিতিতে পড়তে হয়নি শুক্রবারের নামাজের জন্য লাঞ্চ এর সময় দীর্ঘ সময় ল্যাব এর বাইরে থাকা বা ঈদের দিন ল্যাব খোলা থাকলেও পুরোদিন ছুটি নিতে কোন দিন-ই কোন সমস্যা হয়নি। রোযার সময় ল্যাব এর কাজ তাড়াতাড়ি শেষ করে বাড়ি ফিরতেও মাঝে মাঝে তাড়া দিতেন আমার প্রফেসর। ল্যাব পার্টিতে আমাদের জন্য ব্যবস্থা করা হতো আলাদা খাবার, কখনো এ নিয়ে তাদেরকে বিরক্ত মনে হয়নি বরং ছিল অনেক আন্তরিক।

ফেসবুক থেকে জানতে পেরেছি যে, জাপানে তৈরি হয়েছে প্রায় ৬০ টি মসজিদ। প্রায় প্রতিটি বড় শহরেই আছে মসজিদ এবং এইসব মসজিদ স্থাপনে জাপানিজ সরকারের ছিল না কোন প্রকার অসহযোগিতা। ইসলাম ধর্ম সেখানে ক্রমেই প্রসার পাচ্ছে, view this link

সুপার মলে পাওয়া যাচ্ছে হালাল খাবার, অনেক ফুড কোম্পানি হালাল খাবার তৈরিতে এগিয়ে আসছে। যারা জাপানকে ইসলামের শত্রু ভাবছে তারা কি আসলেই এসব খবর জানে? আমি যেন কোনভাবেই হিসাব মিলাতে পারছিনা। গুলশানের ঘটনা যে শেষ নয় বরং শুরু এটা এখন সবার মুখে মুখে। সবার মনে এখন আতঙ্ক। ইসলাম যেই দেশের রাষ্ট্রধর্ম, মুসলমান যেই দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ, সেই দেশে ইসলাম ধর্ম প্রতিষ্ঠা করতে মুসলমানদের সাথে সাথে হত্যা করা হচ্ছে মুসলমানদের বন্ধুদের!!! এভাবে কি ধর্ম-প্রতিষ্ঠা হয়!!! এইসব হত্যাকাণ্ড ইসলাম ধর্মের সাথে সাথে মুসলমান প্রধান এই দেশটির উন্নয়নকেও যে অবনমিত করছে।

ফেসবুক পেজ