ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

অনেকদিন ধরেই ভাবছিলাম বিয়ে নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা, বন্ধুদের মন্তব্য এবং জ্ঞানি জনের অভিমত নিয়ে লিখব। কিন্তু কেন যেন এত গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু অগোছালো একটা বিষয় নিয়ে গুছিয়ে লিখার মতো শব্দ যোজন করাটাকে একটা কঠিন কাজ বলেই মনে হয়েছে! এর একটা কারণ হচ্ছে পদার্থ বিজ্ঞানে গবেষণা আর বিবাহিত জীবন নিয়ে গবেষণা এক কথা না! দীর্ঘদিন গবেষণা করার ফলে এখন হয়তো বিজ্ঞানের কোন একটা বিষয়ে খুব সহজেই একটা কলাম লিখার মতো কিছুটা যোগ্যতা অর্জন করতে পেড়েছি, কিন্তু বিবাহিত জীবনটা এতই জটিল বিষয় যেটা নিয়ে লিখাটা অনেক সহজ কোন কাজ নয়! কারণ এখানে বিজ্ঞানের কোন সুত্র, দার্শনিকের তত্ত্ব সব ব্যর্থ। আমার কাছে বিয়ের ব্যাপারে একটা সাধারন সংজ্ঞা হল, বিয়েটা হল ছয় কানার হাতি দেখার মতো infact আমাদের জীবনটাই এমন! আমরা যে জীবনটার যে অংশের ছোঁয়া পাই তার কাছে জীবনটা তেমন! মানে যে হাতির লেজ ধরল তার কাছে হাতি দড়ির মতো, যে কান ধরল তার কাছে পাখার মতো…! তার মানে এখানে সবাই ভিন্ন ভিন্ন জায়গার ছোঁয়া পেয়ে নিজস্ব যুক্তিতে সঠিক, কিন্তু সার্বিক বিবেচনায় কেউই সঠিক না! কারণ হাতি দড়ির মতোও না আবার পাখার মতোও না! হাতি দেখতে হাতির মতই! তার মানে হচ্ছে জীবনকে দেখতে হলে আমাদেরকে চোখ (মানে মনের চোখ যেটা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বন্ধ থাকে!) খুলে রেখেই দেখতে হবে। ইংরেজিতে একটা প্রবাদ আছে ‘Don’t miss the wood for the trees’! আমার মতে একথাটার একটা মানে হচ্ছে বাইরেরটা দেখে বিশাল বনভূমি নিয়ে মন্তব্য না করে, বনের ভেতর ঢুকেই বনের সৌন্দর্যটা উপভোগের চেষ্টা করা উচিত! বাঘের যেমন হিংস্রতা আছে তেমনি বাঘের সৌন্দর্যও কিন্তু মুগ্ধ করার মতো! এত ভূমিকা করার মানে হচ্ছে বিয়ে বিদ্বেষীদেরকে একটু আশস্থ করা, কারণ বিবাহিত জীবনের কষ্টটাই অনেকসময় এর সুখ ভোগের রসদ যোগায়! কবির ভাষায় বলতে গেলে, দুঃখ বিনা সুখ লাভ হোয় কী মহীতে! আর কষ্ট আছে বলেই সুখ নামক বস্তুটার সন্ধান মানুষ পেয়েছে, যেটাকে আমরা এত গুরুত্ব দিয়ে থাকি!

আমি পড়াশোনার সুবাদে দেশের বাইরে থাকার কারণে অনেক দেশের মানুষের সাথে মিশার সুযোগ পেয়েছি! বিয়ের ব্যাপারে সব দেশের মানুষের মনোভাবের এক অদ্ভুত মিল আমি খুঁজে পেয়েছি! বিবাহিত জীবনের সেরা সময়টা কাটে প্রথম ছয় মাস থেকে এক বছর! মনে হবে আপনি স্বপ্নের ভুবনে বিচরণ করছেন এবং যারা বিবাহিত জীবন নিয়ে অভিযোগ করে তাদেরকে তখন আপনার গাল মন্দ করতে ইচ্ছা করবে, হয়তোবা আপনি তাদেরকে হতভাগ্যর কাতারে ফেলে তাদেরকে কিছুটা সহানুভুতিও দেখাতে পারেন! কিন্তু সময়ের সাথে সাথে ভালবাসাটা বেস্তানুপাতিক হারে কমতে থাকবে! এ নিয়ে একটা মজার গ্রাফ বানালাম চাইলে দেখতে পারেন কার কার সাথে মিলেছে!

এখন প্রশ্ন হল এই ভালবাসা গুলোতো এক প্রকার শক্তি, যার বিনাশ বিজ্ঞানের ভাষায় সম্ভব নয়, তাহলে এগুলো যায় কথায়? উত্তরটা খুবই সোজা ভালবাসাটা অন্য শক্তিতে রূপান্তরিত হয়ে যাবে, যেমন ক্রোধ, হিংসা, ঘৃণা…! এখানে দেখা যাচ্ছে জীবনের তিক্ততা বাড়তে বাড়তে পঞ্চম বছরে গিয়ে সেটা চরম অবস্থায় পৌছাতে পারে, তার ফলেই অধিকাংশ বিচ্ছেদ ওই সময়ই ঘটে! আমি ওই পাঁচ বছরকে বলব adjustment period! এই সময়টা সবার জন্যই কঠিন, কারণ তখন প্রকৃত পক্ষেই দুটা ভিন্ন চরিত্র মিশে একটা সাধারন চরিত্র দান করার সংগ্রামে বেস্ত থাকে! তবে যারা এই কঠিন সময় গুলোকে পারি দিতে পারেন তাদের ভেতর হয়তো আবার সম্পর্কটা সুন্দর করার প্রবনতা দেখা দেয়! তখন অনেক যুগল তাদের সংসারে নতুন অতিথির আগমন ঘটানোর চেষ্টা করেন। ফলে বাহ্যিক বিষয়ের গুরুত্ব তাদের কাছে কমে, দুজনের মিলনের ফলে যে সৃষ্টি তাকে পাওয়ার আনন্দে ডুবে যান অনেকেই। তাই অনেক ক্ষেত্রেই সংসারে নতুন অতিথি এলে স্বামী স্ত্রীর বন্ধন অনেকটা শক্ত হয়। তখন হয়তো দুজনের ভেতরই দায়িত্ব বোধটা বেশি কাজ করে। সংসারের দায়বদ্ধতা বেড়ে যায়। তাহলে দেখা যাচ্ছে, দায়িত্ব আর দায়বদ্ধতা কাজ করলে পারস্পরিক সম্পর্ক দৃঢ় হতে পারে। আধুনিক যুগের মানুষ এত সচেতন হয়েও এখন বিচ্ছেদের কারণ হয়তো এখানে থাকতে পারে! তবে যেকোনো বন্ধনে পারস্পরিক রাসায়নিক ক্রিয়াটা খুবই জরুরী। কিন্তু সত্যিটা হল নারী আর পুরুষের ভেতর যে রসায়নটা দুটি ভিন্ন মানুষের ভেতর একটা শক্তিশালী বন্ধন গড়ে তুলতে পারে সেটা নিয়ে অধিকাংশ মানুষই সচেতন থাকেনা! আমার কথা হচ্ছে দুটি জড় পদার্থের বন্ধনেও একটা লেনদেন ব্যাপার থাকে, তেমনি দুটা মানুষের বন্ধনেও এই ব্যাপারটার গুরুত্ব থাকতে হবে! জীবন সঙ্গী সংজ্ঞাটার সঠিক মানে আমাদেরকে অনুধাবন করতে হবে! ছাড় দেয়া জানতে হবে! তবে এখানে আমার মনে হয় নারী পুরুষের গঠন ও চারিত্রিক ভিন্নতাটা অনেকাংশে বড় ভূমিকা পালন করে! অনেকেই উদারপন্থী চিন্তাভাবনা থেকে বলে থাকেন আমরা নারী/পুরুষ সবাই যেহেতু মানুষ সুতরাং সবাই সমান! এখানে আমার খানিকটা দ্বিমত আছে! এ প্রসঙ্গে এরিস্টটল বলেছেন ‘A male is male in virtue of a particular ability, and a female in virtue of a particular inability’; Stephen Hawking’s বলেছেন “They are a complete mystery to me”; বারাক ওবামা বলেছেন দাম্পত্য সুখের জন্য স্ত্রী যা বলে, তা-ই কর।’ আমার মনে হয় স্ত্রী চরিত্র নিয়ে আজ পর্যন্ত যা লেখা হয়েছে তেমনি করে আর কোন কিছুই লেখার উপকরণ হিসাবে এতটা গুরুত্ব পায়নি! যারা যুক্তি বুঝেন, যারা নারী পুরুষের শারীরিক গঠন সম্পর্কে জানেন, যারা জানেন কোনটা কার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য তারা হয়তো আমার কথার আর বিজ্ঞজনের মন্তব্যর সাথে একমত হবেন! এখানে আমি কাউকে আক্রমণ করার জন্য বলছি না, শুধু বলব প্রতিটা বস্তুরই নিজস্বতা আছে, সব কিছুকেই একটা নির্দিষ্ট সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত করা যায়! আর প্রতিটা বস্তুরই নিজস্বতা আছে বলেই সেগুলোর আলাদা আলাদা গুরুত্ব আছে! তাই ছেলেদের সম্পর্কে মেয়েরা যা বলেন বা মেয়েদের সম্পর্কে ছেলেরা যা বলেন তার সবটা সত্যি না হলেও অনেকাংশেই কথা গুলো সত্যি! কারণ এখানেইতো বেক্তির নিজস্বতা! সাধারণত কেউই তার নিজস্বতার গণ্ডির বাইরে আসতে পারেনা, অথবা আসতে চায়না! তবে আমার মতে শক্ত বন্ধনের জন্য ছাড় দেয়াটা খুবই জরুরী। এ ব্যাপারে আমার বেক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে একটা মন্তব্য করছি, এটাকে কেউই অন্য ভাবে নিবেন না, সেটা হল মেয়েরা ছাড় দেয়াটাকে মনে করে নিজের সাথে compromise করা! আর তাদের জন্য নিজের সাথে compromise করা অসম্ভব! আমি ছাড় দেয়া বলতে স্বামীর উল্টা পাল্টা কার্যকলাপ দেখেও চোখ বুজে বসে থাকা বুঝাইনি, আমি বুঝিয়েছি খুঁটিনাটি সমস্যা গুলোকে এড়িয়ে চলা! তবে আমার মনে হয় আমাদেরকে কোনটা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ সেটা বুঝতে হবে। অবশ্য বেক্তি ভেদে বস্তুগত গুরুত্ব পরিবর্তনশীল! আমার অভিমত হল এই পৃথিবীতে আমার সুযোগ একবারই, আর সুখ যদি নিজের সঙ্গীর সাথে ভাগাভাগি করে না নেয়া যায় তাহলে যত জায়গায়ই সুখ খুঁজে বেড়াই না কেন সে আশায় গুরেবালি! প্রতিটা মানুষ যেহেতু ভিন্ন তাই অন্যরা কিভাবে সুখে আছে সেটা নিয়ে না ভেবে নিজের যা আছে তার ভেতরই সুখ খুঁজে বেড়ানোটা বুদ্ধিমানের কাজ। নিজের অবস্থান নিয়ে সুখে থাকার মানে হচ্ছে সব অবস্থায় একজনকে আরেকজনের সহায়তা করা, শক্তভাবে হাত ধরে রাখা! এখানেইতো জীবন সঙ্গী থাকার সার্থকতা!

মেয়েদের আরেকটা দিক আমার চোখে লেগেছে যেটা আমার ফ্রান্স, ইরান, জার্মান, সুইডেনের বন্ধুরাও সহমত প্রদান করেছে তা হল, তারা কোন কিছুর শুরুটা শুনেই সেটার উপসংহারে পৌঁছে যান! আর তারা যখন যেটা নিয়ে উপসংহারে পৌঁছান তারা ধরেই নেন যে তাদের ধারনাটা ১০০% সত্যি! আর খুঁটিনাটি কোন বিষয়ই তাদের নজর এড়ায় না। আর প্রতিটা জিনিসের সমাধান তারা সাথে সাথেই খুঁজে বেড়ান মানে অস্থিরতা মেয়েদের ভেতর সব সময়ই বেশি কাজ করে! তাদের ভালবাসাটা যত প্রখর তাদের ঘৃণাটাও ততই তিব্র! সুতরাং তাদের পক্ষে কোন কিছু ভুলে যাওয়া অনেক কষ্টের! তাই একই সমস্যা বার বার ঘুরে ফিরে আসে! আর ছেলেরা নিজেদের enjoyment টাকে অনেক গুরুত্ব দেয়! তারা সব সময়ই চায় তাদের সাথে তার জীবন সঙ্গী সব সময় সুন্দর করে কথা বলুক, সময় তাকে আনন্দে ভরিয়ে রাখুক! তাই তারা কোন সমস্যার কথা খুব একটা শুনতে চায়না যেটাকে মেয়েরা ধরে নেয় অবহেলা হিসাবে, পাত্তা অথবা গুরুত্ব কমে যাওয়া হিসাবে! প্রাকৃতিক নিয়মেই মেয়েরা প্রতি মাসের ভেতর দশ দিন কিছুটা অস্বস্তিতে ভোগেন, ওই সময়টাতে তাই তার পক্ষে স্বাভাবিক আচরণ করাটা কঠিন, তেমনি ছেলেদেরও বাইরের ঝক্কি ঝামেলার শেষে ঘরে ফিরে স্বাভাবিক আচরণটা ধরে রাখাটা কঠিন! তবে এসবের ভেতরেও যারা নিজেরকে একটু মহান করতে পারেন হয়তো তাদের জীবন অন্য পাঁচ জনের চেয়ে একটু আলাদা হয়! বিবিসির একটা জরিপে স্বামী স্ত্রীর কার কি অভিমত সেগুলো নিচের লিংকে দেখতে পারেন। [লিংক]

এখানে এই যুক্তি গুলো তুলে ধরার ভেতর আমার কোন একটা শ্রেণীকে ছোট করা অথবা কোন এক শ্রেণির পক্ষে সাফাই গাওয়া নয়। আমার উদ্দেশ্য হল সব কিছুর পরেও বিয়ে বা জীবন সাথী বেছে নিয়ে একটা সুন্দর সুখের নীর গড়ে তোলাটা খুবই জরুরী কারণ আজকে আমার গায়ে শক্তি আছে বলে আমি যেভাবে ইচ্ছা চলতে পাড়ছি, কিন্তু জীবন সায়াহ্নে একমাত্র জীবনসঙ্গী ছাড়া বাকি সবাই আপনাকে ছেড়ে চলে যাবে। জীবন সঙ্গী থাকার গুরুত্ব হয়তো মানুষ তখনই কেবল অনুধাবন করতে পারে, কিন্তু যাদেরকে একাকিত্ত বরন করতে হয় তারা হয়তো বুঝেন জীবনের ছোট ছোট ভুল শুধরে নিলে সেটা আজকে তাদের জন্য কত বড় সুখ বয়ে আনতে পারতো! আমি বিয়ে বিদ্বেষীদেরকে বলব বিয়ে করুন, দুজনে দুজনের চাওয়া পাওয়াকে সম্মান করুন, সাদ্ধের সর্বোচ্চ চেষ্টা করুন দুজন দুজনার জন্য, তাতে হয়তো সচ্ছলতা না থাকলেও সুখ থাকতে পারে।