ক্যাটেগরিঃ প্রযুক্তি কথা

তথ্য প্রযুক্তির নানা অপব্যবহার মানুষের জীবনকে মাঝে মাঝে বিষিয়ে তোলে! যদিও এর সঠিক ব্যবহার জীবনকে সহজ এবং সুন্দর করতে রাখতে পারে অসামান্য অবদান! শুরুটা এমন দুটা লাইন দিয়ে করেছি তাতে মনে হতে পারে আমি তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ে অনেক বিষদ আলোচনায় যাচ্ছি, আসলে বেপারটা তা না, শুধু নিজের একটা খুশির খবরকে সবার সাথে শেয়ার করতেই এই ভুমিকা করা! আসল প্রসঙ্গে যাওয়া যাক!

এই ডিসেম্বরে আমার চার বন্ধু মিউনিখ থেকে বেড়াতে তারাগোনায় এলো। ক্রিসমাসের টিকেটের উচ্চমূল্য এড়াতে ওরা নিজেদের গাড়ি নিয়েই এলো আমার বাসায়! প্রায় ১৪৭০ কিমি পথ, তাই পথিমধ্যে ফ্রান্সএ থামতে হলো ওদেরকে। প্রায় ১০ বছর পর বন্ধুকে দেখলাম! ওদের ভেতর একজন এই জানুয়ারিতে দেশে যাবে, তাই বউকে জিজ্ঞাসা করলাম সে কিছু চায় কিনা, তাহলে আমি বন্ধুর কাছে দিয়ে দিতে পারব। বউ চাইল একটা আইফোন ফাইভ! যদিও সেটা আমার বর্তমান অবস্থার সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ তবুও বউ বলে কথা, অনেক খোজা খুজি করে একটা ফ্রি আইফোন ফাইভ কিনে ফেললাম! ফ্রি ফোন কিনলাম যাতে কোনো কম্পানির চুক্তির ঝামেলা নেই আর বাংলাদেশে যাতে সে ব্যবহার করতে পারে। তবে ফোনটা কিনে মনের ভেতর একটা শান্তি ছিল যে অনেকদিন পর বউযের একটা ইচ্ছা পূরণ করতে পেরেছি! বন্ধু যাওয়ার পথে তাকে ফোনটা দিলাম। ওরা যাওয়ার পথে রাস্তায় বার্সেলোনা অলিম্পিক স্টেডিয়াম থামবে বলে ঠিক করলো! কারণ ওই জায়গা থেকে পুরো বার্সেলোনা শহর দেখা যায়! ওরা রওনা দিল সন্ধা ৭ টা ৩০ মিনিটে, রাত আনুমানিক ১১ টার দিকে ফোন বেজে উঠলো! দেখলাম বন্ধু কল দিয়েছে! সে তখন যে খবরটা দিল তাতে হৃদয়টা ভাঙ্গার মতই একটা খবর! ওদের গাড়ি ভেঙ্গে গাড়িতে যা কিছু ছিল তা ডাকাতরা নিয়ে গেছে! তারা বার্সেলোনা পুলিশকে বিষয়টা অবহিত করলো। তাদের হারানোর তালিকাটা অনেক লম্বা ছিল! এর ভেতর আমার বউযের সখের আইফোন ফাইভ! কষ্ট লাগলো একটা সখ পূরণ করার খুব কাছাকাছি পৌছেও সেটাকে পরিপূর্ণতা দিতে পারলাম না বলে। তবে মনের ভেতর একটা জেদ চেপে গেল, আমি এর শেষ দেখে ছাড়ব ! যে কথা সেই কাজ, পরেরদিন পুলিশ অফিসে গেলাম আমার মোবইলের কাগজ পত্র নিয়ে, কিন্তু ওরা বললো ওরা মোবইলের imei নম্বর দিয়ে কিছুই করতে পারবেনা, কারণ তাদের কাছে সেই প্রযুক্তি নেই! imei নম্বর হলো International Mobile Station EquipmeIdentit।

যেটা প্রতিটা মোবইলেরি একটা করে থাকে, যা দিয়ে চুরি যাওয়া মোবাইলকে GSM (Global System for Mobile Communications) থেকে বন্ধ করে দেয়া যায়, যার ফলে যেই ওই মোবাইলটা নিয়ে থাকুকনা কেন, সেটা তার কোনো কাজে আসবেনা! কিন্তু আমি আমার মোবাইল হারিয়েছি সেটা আর ফেরত পাবোনা! তাই ভিন্ন কোনো রাস্তা খুজতে থাকলাম।একবার মিলেও গেল সেই সুযোগ! আমার যে বন্ধুটি বাংলাদেশ গেল সে হুটকরে একদিন আমাকে বলল ওই মোবাইলের imei নম্বরটা তাকে দিতে, ওর এক ছাত্রের কাছে imei নম্বর দিয়ে মোবাইল খুঁজে বের করার প্রযুক্তি আছে! শুনে একটু আশাবাদী হয়ে উঠলাম। imei নম্বরটা তাকে দেয়ার ১ ঘন্টা পর সে আমাকে ওই মোবাইলের বিস্তারিত জানালো! জানতে পারলাম এখন কে ওই মোবাইলটা ব্যবহার করছে! খবরটা পেয়েই আগে ঠিক করলাম করণীয় কি। পুলিশকে জানানোটাই যৌক্তিক মনে করলাম। পরেরদিন সকাল বেলা গেলাম পুলিশের কাছে! দিলাম বিস্তারিত তথ্য। যদিও পুলিশ বললো এই ধরনের তথ্য যোগাড় করার এখতিয়ার সাধারণ মানুষের নেই এমনকি বেআইনি, কিন্তু ওরা আমাকে সাহায্য করতে রাজি হলো! ওরা ওই নম্বর কার নামে নেয়া সেটা দেখে তাকে বের করলো! সে ছিল এক চাইনিজ মেয়ে যে কিনা রাস্তা থেকে মোবাইলটা কিনেছে! পরে সে গিয়ে পুলিশ অফিসে জমা দিয়ে এলো! আমিও ফিরে পেলাম আমার সাধের মোবাইল! তথ্যপ্রযুক্তির এই সুফলটা পেয়ে নিজের ভেতর একটু কৃতজ্ঞতা এসে গেল, মূলত এইসব প্রযুক্তিবিদদের ধন্যবাদ জানাতেই এই লিখাটা লিখলাম! তবে আমার বেক্তিগত কিছু অনুভুতি এখান থেকে তৈরী হয়েছে, যা হয়ত পাঠকদের কারো কারো ক্ষেত্রে কাজে লাগলেও লাগতে পারে!

১) কখনো রাস্তা থেকে এমনকি ebay থেকেও কোনো কিছু কেনার বিষয়ে সাবধান থাকা জরুরি, কারণ ওই চাইনিজ মেয়েটার মত আপনিও নির্দোষ হয়ে খোয়াতে পারেন অনেক গুলো টাকা অথবা পোহাতে পারেন অনর্থক পুলিশি ঝামেলা!
২) কম দামে ভালো জিনিস পেলাম বলে কিনে ফেললাম, এটা হয়তো অনেকেই চাই, কিন্তু আপনি কতটা নিশ্চিত আপনার কেনা বস্তুটা চুরির কিনা?
৩) চুরি করা কোনো বস্তু আমরা কেউ না কিনলে চোরদের হয়তো চুরিটা লাভজনক হবে না বা তারা চুরি করার প্রেরণাও পাবেনা!
৪) প্রযুক্তিকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারলে এটা শুধু আমাদের কল্যানই করে যাবে, যদিও সব মানুষ এতোটা মহৎ হয়ে উঠেনি!

জানিনা এই লিখাটা কারো কাজে লাগবে কিনা, কিন্তু আমি খুব আনন্দিত যে আমি আমার হারানো মোবাইল ফিরে পেয়েছি এই তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণেই!

বি: দ্র: ছবিটা এই লিংক থেকে নেয়া!