ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক

 

সপ্তাহজুড়ে যে খবরটি আলোচনার ঝড় তুলেছে সেটি একটি ভ্যান ও ভ্যানের উপর কিছু মানুষ। দেশের অধিকাংশ জাতীয় ও আঞ্চলিক পত্রিকার প্রথম পাতায় স্থান করে নিয়েছে খবরটি। গত শুক্রবার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পৈতৃক নিবাস গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার গ্রামে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে রিকশাভ্যানে চড়ে বেড়ান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ঘুরে দেখেন নিজের গ্রামের প্রকৃতি। কথা বলেন গ্রামের মানুষের সঙ্গে, খোঁজখবর নিলেন তাঁদের। পত্রিকা, টিভি চ্যানেল ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তুমুলভাবে আলোচিত হয়েছে ছবিটি। গণমাধ্যম ও তথ্য প্রযুক্তির কল্যাণে যে ছবিটি মুহূর্তের মধ্যে ভাইরাল হয়ে গেছে।

সেই ছবি সংক্রান্ত আরেকটি সংবাদের জন্ম হওয়ায় দুই দিন যেতে না যেতেই শুরু হলো নতুন করে আলোচনার ঝড়।খবরটি এ রকম, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় গিয়ে যে ভ্যানে করে গ্রাম ঘুরেছেন,সেই ভ্যানের চালক ইমাম শেখকে বিমানবাহিনীতে চাকরি দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা। ইমাম পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। বাবা বর্গাচাষি ছিলেন। পরে মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েন। পরিবারের ভরণপোষণের জন্য তিন বছর ধরে ভ্যান চালাচ্ছেন ইমাম।

একজন গ্রামের সাধারণ ছেলে প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগে বিমানবাহিনীতে চাকরি পাচ্ছেন এটাতো সবার জন্য খুশির খবর। একটি দরিদ্র পরিবারের প্রতি সহানুভূতিও বটে।এ নিয়ে আমাদের সবার খুশি হওয়ার কথা।কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এত আলোচনার ঝড় কেন? তাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্নজনের স্ট্যাটাস ও সেটার মন্তব্যে চোখ দিলাম। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলছে তুমুল আলোচনা,তর্ক-বিতর্ক,ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া।অনেকে আক্ষেপ করছেন ভ্যান চালক হতে না পারার বেদনায়।আবার অনেকে লিখছেন মাস্টার্স পাশ না করে আজ গোপালগঞ্জে গিয়ে ভ্যান চালালেই তো ভাগ্যের দুয়ারটা খুলে যেত।তাদের মন্তব্য দেখে ব্যাপরটা কিছুটা হলেও পরিস্কার হলো।

আলোচনা-সমালোচনা যাই হোক ইমাম শেখের পাশে দাঁড়ানোয় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে অসংখ্য ধন্যবাদ। ইমাম শেখের বয়সের অনেক তরুণ যেখানে মা-বাবার টাকায় নিজের খরচ চালাচ্ছেন সে বয়সে এই তরুণ পরিবারের সাত সদস্যের মুখে হাসি ফোটানোর কাজে নেমে গেলেন। জীবন সংগ্রামে টিকে থাকার জন্য বৃদ্ধ মা-বাবা ও ভাইবোনদের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য যে ত্যাগ স্বীকার করেছেন, সেই ত্যাগ বৃথা যায়নি। শুধু ইমাম শেখের বেলায় নয় প্রধানমন্ত্রী এর আগেও ব্যক্তিগতভাবে খোঁজ নিয়ে অনেকের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। তাদের মধ্যে আছেন গত বছরের অক্টোবরে বাংলাদেশ-ইংল্যান্ড দুই টেস্ট সিরিজে ১৯ উইকেট নিয়ে টেস্ট ক্রিকেটের ১২৯ বছরের রেকর্ড ভাঙ্গানো মিরাজ। তার পরিবারের জন্য একটি পাকা বাড়ি তৈরি করে দিতে স্থানীয় জেলা প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী।

একইভাবে গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে ভারতের গুয়াহাটিতে অনুষ্ঠিত এসএ গেমসে বাংলাদেশের প্রথম নারী হিসেবে স্বর্ণপদক পাওয়া মাহফুজা খাতুন শিলা ও মাবিয়া আক্তারও রয়েছেন এই তালিকায়। বাংলাদেশের হয়ে ব্রেস্টস্ট্রোক সাঁতারে দুটি স্বর্ণপদক মাহফুজা খাতুন শিলা ও ভারোত্তোলনে ৬৩ কেজি ওজন শ্রেণীতে স্বর্ণপদক পান মাবিয়া আক্তার।তাদের আর্থিক অস্বচ্ছলতার কথা গণমাধ্যমে উঠে আসায় প্রধানমন্ত্রী তাদের খোঁজ-খবর নিয়ে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন।এর মাধ্যমে বুঝা যায় দেশের সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারনী ব্যক্তি যদি চাই অনেক কিছুই করতে পারেন।

দেশের একজন সাধারন নাগরিক হিসেবে মনে প্রশ্ন জাগে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ালেখা করা ইমাম শেখ তাঁর যোগ্যতা অনুযায়ী বিমানবাহিনীতে চাকরি পায়। তাহলে দেশের কোটি কোটি উচ্চশিক্ষিত বেকার তরুণের জন্য সরকারি এতগুলো দফতরের মধ্যে কি কোন চাকরি নেই? ইমাম শেখকে কেনো চাকরি দেয়া হলো সেটার কৈফিয়ত নিচ্ছিনা।প্রধানমন্ত্রী তাঁকে চাকরি দেয়ায় আমি নিজেও অন্তর থেকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।কিন্তু মিডিয়ায় আলোচনায় এসছে বলে একজন ইমাম শেখকে চাকরি দিলে কি হবে? দেশের আনাচে কানাচে কোটি কোটি ইমাম শেখ উচ্চ শিক্ষা নিয়ে বসে আছে তাদের কথা কে চিন্তা করবে?

সপ্তাহ কয়েক আগে দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি দৈনিকের এসেছে ‘সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড এমপ্লয়মেন্ট রিসার্চের(সিডার) ‘কর্মসংস্থান ও শ্রমবাজার পর্যালোচনা, ২০১৭’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে বর্তমানে দেশে শিক্ষিত তরুণ বেকারের সংখ্যা প্রায় দুই কোটি।এতে আরও দুটি চিত্র উঠে এসেছে, যাকে খুবই অস্বস্তিকর বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।এ দুটি হলো দেশের ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী প্রায় ২৫ শতাংশ তরুণ নিষ্ক্রিয়।তাঁরা কর্মবাজারে নেই, শিক্ষায় নেই, প্রশিক্ষণও নিচ্ছেন না।এঁদের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ। আরেকটি চিত্র হলো দেশের উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার সবচেয়ে বেশি।তাদের মধ্যে কেউ বাবার উপর নির্ভরশীল,আবার কেউ ভাইয়ের উপর নির্ভরশীল। তাঁরা অবশ্যই হতাশাগ্রস্থ, দিনে দিনে তাঁদের হতাশা বাড়ছে। ভাবুন, দেশে দুই কোটি হতাশ তরুণ রয়েছেন।

আমার পরিচিতজনদের মধ্যে অনেকের অবস্থা সম্পর্কে জানি। এক বন্ধুর বাবা ছেলের চাকরি হবে এ আশায় প্রতীক্ষার প্রহর গুণছিলেন।ছেলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর পাশ করে বের হয়েছে।এবার চাকরি পেয়ে অভাবের সংসারের হাল ধরবে।ছেলে প্রায় দুইবছর আবেদন করতে করতে একটি চাকরিও জোটাতে পারেনি।যে মা-বাবা কোলে পিঠে মানুষ করেছেন,নিজে না খেয়ে ছেলের মুখে আহার দিয়েছেন,ধার দেনা করে যে ছেলেকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলেছেন অবশেষে সেই ছেলের চাকরির খবর পেয়ে মনটা খুশিতে ভরে উঠার আগেই দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে হলো। এর চাইতে বড় আক্ষেপের বিষয় আর কি হতে পারে?

এ ঘটনা শুধু একজনের নয়,দেশে এমন হাজারো তরুণ আছে যারা পড়ালেখা শেষ করে পরিবারে কোন সহযোগিতা করতে না পারার কারণে দুঃশ্চিন্তায় ভোগেন।
বলা হয়ে থাকে-‘বেকারের মস্তিস্ক শয়তানের কারখানা’। অনেকে হতাশাগ্রস্থ হয়ে অপরাধ জগতে পা বাড়ান। এদের মধ্যে কেউ মাদকাসক্ত হন, আবার কেউ স্কুল-কলেজের ছাত্রীদের ইভ টিজিং করেন।

অনেকে আর্থিক দৈন্যতার জন্য নিয়মিত সরকারি চাকরিতে আবেদনও করতে পারছেন না।এক্ষেত্রে রয়েছে পে-অর্ডারের নামে টাকা হাতিয়ে নেয়ার বিড়ম্বনা আর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঢাকায় গিয়ে পরীক্ষা দেয়ার ঝামেলা।সরকারি চাকরির জন্য পে-অর্ডারের নামে তোলা টাকা একজন সদ্য পাশ করা ছেলের পক্ষে কি আদৌ সম্ভব?

যে তরুণ ১৫ থেকে ২০ বছর পরিবারের টাকায় পড়ালেখা করেছে।সেই সদ্য পাশ হওয়া তরুণ কি চাকরির আবেদনের নামে পরিবার থেকে আরো কাড়ি কাড়ি টাকা নিতে পারবে? বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের ভেবে দেখার অনুরোধ রইল। ইমাম শেখের জন্য শুভ কামনা জানিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ শুধুমাত্র গণমাধ্যমসৃষ্ট নায়কদের খবর না নিয়ে এই কোটি তরুণের একটু খোঁজ নেবেন কি?