ক্যাটেগরিঃ গণমাধ্যম

 

আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির এ যুগে সামাজিক মাধ্যম থেকে শুরু করে গণমাধ্যম খুব দ্রুততার সাথে আমাদেরকে তথ্যায়িত করছে। নিজেকে প্রচার করতে কেউ পিছিয়ে নেই এখানে। যে যেদিকে পারছে নিজেকে প্রচারে ব্যস্ত। নিজের প্রতিভা, উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড ইত্যাদি ব্যক্তিগত ওয়ালে হোক কিংবা পেজে হোক প্রচার করে যাচ্ছি আমরা। নিজেকে প্রচারের জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ভিডিও চ্যানেল ইত্যাদি ব্যবহার করে যাচ্ছি আমরা।

বর্তমানে কোন স্বাভাবিক কিংবা অস্বাভাবিক যে কোন লেখা, ছবি, ভিডিও খুব দ্রুতই প্রচার করা কষ্টসাধ্য ব্যাপার না। কিছুদিন আগের কথা- ইউটিউব চ্যানেলের বদৌলতে ‘হিরো আলম’ নামক এক যুবক রীতিমত একজন হিরো বনে গেছেন। ইউটিউব চ্যানেলের মাধ্যমে তার মিউজিক ভিডিও ছড়িয়ে দিয়ে হিরো আলম অধিকাংশ মানুষের কাছে এখন একটি পরিচিত নাম।

শুধুই কি হিরো আলম? আমাদের নেতারাও কম যাননা। বিভিন্ন সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখি বিভিন্ন নেতার মাটি কাটার দৃশ্য, শ্রমিক সেজে স্বেচ্ছাশ্রমের দৃশ্য। এ দৃশ্যগুলো শুধু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সীমবদ্ধ থাকেনা। তা লুফে নেন আমাদের গণমাধ্যম। সাম্প্রতিককালে আমরা বেশ কয়েক রাজনীতিবিদের জনগণের সাথে মিলে মিশে কাজ করতে দেখেছি বিভিন্ন গণমাধ্যমে। যেগুলো খুব গুরুত্ব সহকারে আমাদের গণমাধ্যম ছেপেছে।

আমাদের চারপাশে প্রতিদিন যা ঘটে তার সবটি সংবাদ নয়। একটি ঘটনা সংবাদ হওয়ার জন্য কিছু মানদণ্ড আছে। সংবাদের অসংখ্য উপাদানের মধ্যে অন্যতম একটি উপাদান হচ্ছে ‘Novelty’ বা অভিনবত্ব। যা স্বভাবত ঘটেনা তা সংবাদ হওয়ার যোগ্যতা রাখে। যেমন ভোরবেলা সূর্য ওঠা একটা দৈনন্দিন ঘটনা। তাই তা সংবাদ হয় না। কেননা ঐ ঘটনার মধ্যে কোনো নতুনত্ব নেই। ঠিক যেমন মানুষকে কুকুর কামড়ালে তাতে কোনো নতুনত্ব নেই; তেমনি মানুষ যদি কোনো কুকুরকে কামড়ায় তা মাত্রাছাড়া বিষয়, তাই এটা একটা সংবাদ হতে পারে। অর্থাৎ যা কিছু স্বাভাবিক তা সংবাদ হওয়ার যোগ্যতা রাখেনা। যেমন- বিমান ঠিক সময়ে ছাড়লে সেটা সংবাদ হয়না। বিমানের শিডিউল বিপর্যয় হলেই সংবাদ হয়। কেননা বিমানের কাজই হচ্ছে সময়সূচি মেনে ছেড়ে যাওয়া।

কয়েকদিন আগের ঘটনা-চট্টগ্রাম শহর থেকে প্রায় ৩৩ কিলোমিটার দূরে স্বেচ্ছাশ্রমে যোগ দিলেন এক নেতা। সেখানে দেখলাম বেশ কয়েকটি টিভি ক্যামেরা হাজির। এরপর থেকে দেখলাম অধিকাংশ সংবাদপত্রে ঘটনাটিকে সংবাদ হিসেবে চালিয়ে দেয়া হলো। প্রশ্ন হচ্ছে- ৩৩ কিলোটার দূরে মাটি কাটতে নামবেন নেতা তা শহরে বসে গণমাধ্যমকর্মীরা এত দ্রুত সময়ে জেনে ঐ এলাকায় উপস্থিত হলো কিভাবে? জানলেও গণমাধ্যমের জন্য ঘটনাটিকে সংবাদ হিসেবে পরিবেশন করা কি খুব জরুরি ছিল?

জনপ্রতিনিধিরা জনগণের সুখে-দুঃখে জনগণের পাশে থাকবেন, তাদের সুবিধা-অসুবিধার খোঁজ খবর নিবেন সেটাই স্বাভাবিক। কেননা আজকে যিনি জনপ্রতিনিধি হয়ে সংসদে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন, বাড়ি-গাড়িসহ বিভিন্ন সরকারি সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন তা সম্ভব হয়েছে ঐ এলাকার জনগণের মাধ্যমে। জনগণ সংসদে যেতে পারেনা, তাই তারা ভোটের মাধ্যমে প্রতিনিধি নির্বাচন করে সংসদে পাঠান।

বিভিন্ন পত্রিকায় পড়েছি এটা নাকি স্বেচ্ছাশ্রম। স্বেচ্ছাশ্রম যদি হয়ে থাকে তাহলে ঘটা করে মিডিয়াকে ডেকে এনে এ আয়োজন কেন? প্রকৃত জনসেবকরা মানুষকে দেখিয়ে দেখিয়ে সেবা করেন না, তারা মানুষের অবস্থা দেখতে বের হন রাতের অন্ধকারে লুকিয়ে লুকিয়ে। বর্তমানে আরো একটি বিষয় লক্ষনীয়, বিভিন্ন দুর্গত এলাকায় ত্রাণ দেবার সময় নেতারা ক্যমেরার ক্লিকের অপেক্ষায় থাকেন। প্রকৃত দাতার বৈশিষ্ট্য হলো- ডান হাতে দান করবে তা বাম হাতও জানবেন না। নিজেকে জনগণের সেবক প্রমাণ করার জন্য মিডিয়াকে ডেকে এনে হঠাৎ একদিন এসে কোদাল আর মাটির ঝুড়ি নিয়ে নামতে হয়না। মেকি জনসেবার সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে আমাদের গণমাধ্যমও কি আজ মেকি হয়ে যাচ্ছে?