ক্যাটেগরিঃ খেলাধূলা

‘আমার প্রেমিক এসেছে আজ…’

—এইরকম বা এর কাছাকাছি একটা বাক্য প্রোফাইল স্ট্যাটাসে দেখলাম ৫ই আগষ্ট কোন এক নারীর ফেসবুকে। প্রেমিক পুরুষটি ভোলাভালা বদনের অধিকারী আর্জেন্টিনার তুখোড় ফুটবল খেলোয়াড় মেসি ছাড়া যে আর কেউ না তাও সেখানে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছিল। অগণিত নারীর এমনই প্রেমের তীর মেসি নামের নক্ষত্র জনের দিকে অনুভূতিহীন আঘাতের লক্ষ্যে এভাবেই আমাদের দেশে ছুটে চলে। পুরুষরাও কম কিসে। এক যুবকের কণ্ঠে শুনলাম, ‘ মেসিকে এক নজর দেখতে পারাটাই তার জীবনের লাইফটাইম এচিভমেন্ট।’ যাক সে দেখেছে। লাইফ ধন্য হয়েছে। পোড়া দেশের পোড়া কপালের এক নিরীহ যুবক শত সহস্র সমস্যা জর্জরিত থেকেও লাইফ টাইম অ্যাচিভমেন্ট অর্জন করেছে তো কেবল এক মেসির আগমনেই। ধন্য তুমি মেসি।

সে কারনেই হাজার হাজার টাকার বিনিময়ে একটি টিকিট জোগাড় করে খেলার ময়দানে হাজির হওয়া তো খুবই নগন্য বিষয়ই বটে, নাকি? ক’জন মানুষ এ দেশে মাসে ৭৫০০ টাকা বেতন পায়? মেজোরিটিই পায় না আজও এই সভ্যতার চরম উৎকর্ষকালেও। তারপরও মাঠে উপচে পরা ভীড় । আমারই এক ক্লোজ রিলেটিভ ২০০০ টাকা ব্যয় করে প্রাকটিস সেশন দেখতে ঢুকেছিল বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে। বিষয়টা উল্লেখ করা কারণ হলো খেলার জন্য ২০০০ টাকা খরচ করার মত উদার হবার প্রচেষ্টা তার মাঝে কখনও দেখার কথা ছিলনা। কিন্তু সে আর্জেন্টিনার অন্ধ ভক্ত, মেসির জন্য অন্ত:প্রাণ, বার্সেলোনার প্রতিটা খেলার টিভি দর্শক। মন মানে না বাংগালীর।

দোকানে , পথে ঘাটে অনেকে অনেক বিরূপ মন্তব্য করছিল, কানে এল। এত টাকা দিয়ে এই গরীব হতভাগা দেশে খেলা দেখা নাকি মানায় না। হঠাৎ মনে হয় আরে তাইতো। কেনো বাবা। গরীব মানুষ আমরা, এ কি বিলাসিতা নয়। আমিও সেই বিরূপ মন্তব্যের ঢেউয়ে ক্ষণিক মনটা ভাসিয়ে দেই।

কিন্তু এ যে চিরকালের ঐতিহ্যময় ইতিহাস বাংগালীর । বাংগালীর প্রাণে সুখের আবাস অত বেশী কই। তাই তো যা পায় আঁকড়ে ধরে। সুখ খোঁজে । চুক্তি , সমঝোতা এসব নিয়ে ভারতের সাথে সরকারের কি দাবার চাল চলছে অত কি আম জনতা বোঝে। এর মাঝে তাই মেসেরি বদন দর্শন বাংগালীর সেই চিরায়ত উন্মাতাল হবারই পুনঃ স্বাভাবিকতা।

আর্জেন্টিনা না হয়ে যদি ব্রাজিল দল যদি খেলতে আসত, তখন ? ৭০০০ কেনো আরও বেশী হলেও আমি কষ্টে সিষ্টে একটা টিকিটে জোগারেড়র চেষ্টা সত্যিই করতাম। মন বলছে তাই। আর তাইতো বুঝি আরে বাবা আমিও তো সেই চিরচেনা এক বাংগালী। আমার মাঝেও উন্মাতাল জোয়ারের নিয়তি। যে ব্রাজিলের ফুটবলের এত ভক্ত , এত কাছে তারা আসবে , কেনো মিস করব। জীবন তো একটাই। সুযোগ কি আর বারবার আসে। তাহলে আর্জেন্টিনার ভক্তদের দোষ কেনো হবে?

পথ ঘাটের বিরূপ মন্তব্য এবার বাংগালীর আরেক চিরায়ত আস্ফালনের পরিচয় হয়ে ধরা দেয় মনে। আমরা তো এমনই। নিজে করলে দোষ নেই। অন্য করলেই দোষ খুঁজি। মেসি অসাধারন খেলে। আমি নিজেও তার খেলা পছন্দ করি। কিন্তু আমি যে তার পাড় ভক্ত নই। ভক্ত হলেই বুঝতাম কোথায় টাকা আর কোথায় সাধ।

দোষ খোঁজার এই লক্ষণ, এই ছিদ্রান্বেষী মনোভাব আমাদের নেতিবাচকতার আরেকটি স্পষ্ট পরিচয় ।

তাইতো ইন্টারনেটে ভিনদেশি কোন ভাষায় ঐ খেলার এক ধারা বিবরণে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামকে ভুল উচ্চারণে বলতে শুনি -‘বাঙ্গাবাধু ষ্টেডাম’ তখনও আমরা সে খুঁত ধরে ফেলি। কিন্তু চিন্তা করি না ভিনদেশিদেরবঙ্গবন্ধু ’র মত প্রাণের প্রিয় একটি শব্দের সঠিক উচ্চারণ করা শিখিয়ে দেয়াটাও আমাদের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে।