ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

 

সেই বুঝিল, স্বীকার করিল, তবে দেরীতে কেনো…?

সহজেই অনুমেয় যে শেয়ার মার্কেটের কথা বলছি। শুরুতে একটু বলে নেই সরকারের উচ্চপদের লোকজন হঠাৎ হঠাৎ করে শেয়ার বাজারের বর্তমান কেলেংকারির বিষয়ে মুখ খুলেই এমন কথা বলে ফেলেন , যা আগুনে ঘি দেয়ার মত অবস্থার সৃষ্টি করে। এই যেমন শেষ উদাহরণ হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টার একদিনের আগের কথাই ধরি। ওনার বক্তব্য অনুযায়ী দেশের মূল অর্থনীতির সাথে নাকি শেয়ার বাজারের খুব একটা সম্পর্ক নেই।

যদি তাই -ই হবে, তবে এত মিটিং-সিটিং, তোলপাড় কিসের ভয়ে? তাও বাদ দিলাম, লক্ষ লক্ষ বিনিয়োগকারীর লক্ষ পরিবারের কোটি মুখের আহার যে ঐ শেয়ার ব্যবসার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে সেটাও কি মিথ্যে? আর সেই নির্ভরশীলতাও জনগনের দোষ নয়, সেখানেও সরকারগুলোরই প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ প্রভাব।

ভূমিকা শেষ। একটু অন্য বিষয়ে জীবনের কিঞ্চিৎ পেছনে ফিরে দেখব।

বছর ২০/২১ আগে স্কুলে পড়ি তখন। প্রথম খুব না বুঝেও জানার সুযোগ হলো এমএলএম ধাঁচের ব্যবসা নামক জিনিসটা কে। সেটা কোন কোম্পানীর ছিল ঠিক মনে থাকারও কথা না। মনে নেই। জিনিসটা ছিল এ সম্ভবত ১০০/১৫০ টাকার একটা খেলা। একটা ফর্ম পূরণ করতে হবে । যে আমাকে ফর্ম পূরণ করালো সেই ফার্স্ট হ্যান্ড পাবে টাকার একটা অংশ। আরেকটা অংশ তার আগের জন আর বাকীটা ঐ কোম্পানী। এভাবে একটা হিসেব দেখানো হয়েছিল টাকা আসতেই থাকবে …হিসেবটা এখন আর মনে নেই। সম্ভবত তখনও অতটা মাথা খাটিয়ে হিসেব বোঝার চেষ্টা করিনি। এক বড় ভাই ( কাজিন) আমাদের কে দিয়ে ফর্ম পূরণ করিয়ে টাকা নিয়েছিল। ছোট বেলা থেকে হায় হায় কোম্পানী কথাটা কেউ মাথায় ঢুকিয়েই দিয়েছিল। সেটা ঐ ফর্ম পূলণ করার সময় মনে এসেছিল। এবং টাকা উপার্জন কিন্তু আমার হয় নি। কারন দুটো স্পষ্ট- এক আমি আর সদস্য বাড়াইনি। আমার হাত বাড়েনি। আর দ্বিতীয় কারন কোম্পানী নিশ্চয় এক সময় হায় হায় হয়েই উঠেছিল।

তার অনেক বছর পর। পরিপূর্ণ তরুন বয়সে নিমন্ত্রন পেলাম জিজিএন নামক এমএলএম কোম্পানীর। এক বন্ধুর বদৌলতে তাকে উপহাস করার জোড়দার উপাত্ত পাবার আশায় তার সাথে জিজিএন এর বনানী অফিসে গেলাম। সেমিনার এ অংশ গ্রহণ করলাম। বন্ধুটি জিজিএন এ টাকা খাটিয়েছে। আরও অনেক বন্ধুকে রাজী করিয়েছে সদস্য হবার। আর আমি সেমিনারে খুঁত ধরার প্রচেষ্টা অব্যহত রেখে মজা উপভোগ করলাম। তবে একটা সত্য স্পষ্ট দেখলাম মানুষের সহজভাবে টাকা কামানো সহজাত প্রলভন আর সদিচ্ছা। পরে জানা গিয়েছিল ঐ কোম্পানী নাকি তামিল টাইগারদের সহযোগী প্রতিষ্ঠান। ইত্যাদি ইত্যাদি। সে সত্য হোক কিংবা মিথ্যে , আলটিমেটলি হায় হায় কোম্পানীতে পরিণত হয়েছিল। পলায়ন করেছিল সব গুটিয়ে। সর্বসান্ত হয়েছিল অনেক অনেক , অজস্র বাঙালী। আমার বন্ধূটিও হারিয়েছিল তার নব চাকুরীর কষ্টার্জিত আয়।

ভাবছেন আমি একাই চালাক। আর ওরা সব বোকা। মোটেও তা না। আমিই বোকা। টাকার দরকার সবারই আছে। যে বলে তার নেই , সে ডাহা মিথ্যেবাদী। এটাই আমার বোকামীর পয়েন্ট। শিক্ষিত, মহা শিক্ষিত, জ্ঞানীগুণী, মূর্খ , ব্যবসায়ী, চাকুরীজীবি সব ধরনের লোককে আমি দেখেছি লাখে লাখে টাকা খাটাচ্ছে ঐ জিজিএন এ । ভীড় আর ভীড়। বোকা নাকি সবাই ! হতেই পারে না। অনেকে ঐ টাকা খাটিয়ে লাভ নিয়ে বাড়ী গাড়ী ও করে ফেলেছিল। এটাও বাস্তব। পাশাপাশি সর্বসান্ত হয়েছিল বিশাল এক অংশ। সেটাও বাস্তব। টাকা ইনকাম দিয়ে যদি বোকামী আর চালাকী পরিমাপ করা হয় কে বোকা আর কে চালাক তবে?

হায় হায় কোম্পানী বা এমএলএম ব্যবসার আড়ালে কোন স্বার্থান্বেষী দূরভিসন্ধি দল এর র দৌড়াত্ব ওখানেই শেষ না। এরপরও এসেছে গেছে। কেউ সর্ট টার্ম, কেউ লং টার্ম। কোম্পানীর লোকজন বিস্তর উপার্জন পেলেই সটকে পড়েছে। তাদের সেই সরে পড়ার আগেই একদল নিরীহ সাধারণ আম জনতাও বেশ লাভ করে ফেলেছে। সেই লোক গুলো ঐ ধরনের ব্যবসার প্রেমেও পড়ে গেছে। আর যারা আবার লস করলো, তারা নিজের কাছে নিজে বোকা হয়ে গেলো। আর আমরা চির বোকারা হায় হায় করেই গেলাম।

এর মধ্যে ২০০০ সালের আগে এলো ডেস্টিনি ২০০০ নামে এক এমএল এম কোম্পানী। একটু ভিন্ন আঙ্গিকে , একটু গোছানো বড় সড় আকারে। অনেককে দেখলাম লাভ করছে তো করছেই। চাকুরী-বাকুরী বাদ দিয়ে এক বন্ধু দেখলাম সেখানে কি সব সিলভার-গোল্ড হয়ে আজ ভাল অবস্তায়। আবার অনেক বন্ধূকে দেখলাম হাত বাড়াতে না পেরে পুঁজির টাকার মায়া ছেড়ে মুক্ত হয়েছে। শেষতক ডেসটিনি হায় হায় কোম্পানী হয়ে পালায়নি। তাই হয়তো তারা মেইন স্ট্রিমের নানান ব্যবসায় সেই আমজনতার হাত হতে হাতে বৃদ্ধি পাওয়া টাকা খাটিয়ে চলেছে। এখনও দাওয়াত পাই নিয়মিত ডেসটিনি কোওপারিটিভসোসাইটির শেয়ার কেনার, কিংবা সেই গাছের শেয়র কেনার। আমি কিনিনা। মনে আমার হায় হায় হাহাকার। অথচ আমি কি চালাক? মোটেও না । টাকা উপার্জন যদি মুখ্য চালাকি হয়, তবে ডেসটিনি করে অনেকেই চালাক। আবার অনেকে বোকা, যারা ঝরে গেছে।

শেষবার এ ধরনের যে ব্যবসায় পুঁজি খাটানোর আমন্ত্র ন পেলাম সেটার নাম উইনিপে টু ইউ। মনে আবার সেই হায় হায় হাহাকার। আমি তো টাকা খাটাবো না। তবে মানুষ যে খাটাচ্ছে লক্ষ লক্ষ টাকা! ওরা কেনো খাটায়? ওরা নিশ্চয় আমার আপনার চেয়ে কম বোঝে না। টাকার মায়া সবারই কম বেশি থাকে। কেউ লুসার হতে চায় না। ইউনিপেটু ইউ -এ টাকা খাটিয়ে অনেকে প্রচুর উপার্জনও করে ফেলেছে। এটাও বাস্তব। কিন্তু তারপর যদি হায় হায় হয়ে যায়। কিংবা সরকার যেমন উঠে পড়ে লেগেছে, যদি বন্ধ করে দেয় ইউনিপেটু উই কিংবা এদের মত অন্যদের এই আজব ( আমার কাছে) ব্যবসা? তখন শেষ ইনভেস্টটর দের কি হবে? নিশ্চিত লুসার!

হায় হায় কোম্পানী, কিংবা এমএলএম ব্যবসার কথা এখানেই শেষ। এবার আবার ফিরি শেয়ার মার্কেটে। শেয়ার বাজার কোন ভাবেই এমএলএম কিংবা হায়হায় ব্যবসার সাথে তুল্য নয়। তুলনা অসম্ভব। শেয়ার মার্কেটের একটা রাষ্ট্রীয় ভিত্তি আছে। মূল অর্থনীতির সাথে সম্পৃক্ততা আছে। এটা স্বীকৃত ব্যবসা। সরকার এখানে বিনিয়োগের জন্য উৎসাহিত করে । এর হিসাব নিকাশ স্বচ্ছ। ব্রোকারহাউসগুলোতে চাকুরী করেন অনেক অনেক মানুষ। কোটি মানুষ শেয়ার ব্যবসার সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জীবিকার জন্য নির্ভরশীল। মোদ্দা কথা দুটো সম্পূর্ণ বিপরীত ।

কিন্তু সেই একদল যারা অধিক মুনাফার লোভে সিন্ডিকেট বানিয়ে বাজারকে ম্যানিপুলেট করে অতিমূল্যায়িত করে আবার শেয়ার বেঁচে পুঁজি উঠিয়ে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের পুঁজি আত্মসাত করে তখন কোথায় যেন ঐ এমএলএম এবং হায় হায় কোম্পানীর ব্যবসার ধরনের সাথে একটা কাঁচা মনের মিল খুঁজে পাওয়া যায়। কি হাস্যকর, তাই না? এমএলএম এ কোন সরকারী নিয়ন্ত্রন দেখা যায় না, কোন রেগুলেটরি বডি নেই। শেয়ার মার্কেটে এসব খুব ভালো ভাবেই আছে। তারপরও সেই তাই। একদল অধিক লাভ করা জন্য ম্যানুপুলেট করেছে মার্কেটেকে। তাদের লাভের ষড়যন্ত্র চলাকালীন একদল আম জনতা বিনিয়োগকারীও হয়তো কিছু লাভ করেছে। কিন্তু যারা সত্যিকার অর্থে নিরীহ, সেই সহজাত আম জনতা এবং বিনিয়োগকারী তারা তো পুঁজির নিচে নেমে হাহাকার করা ছাড়া আর কিছুই করতে পারছে না। তারা বড় অসহয়। দু’চারবার চিৎকার, আর প্রতিবাদই তাদের সম্বল।

তবুও শেষ আশা সরকার বলে কিছু একটা তো আছে। এবং সেটা নিরঙ্কুশ ক্ষমতা প্রাপ্ত সরকার। সদিচ্ছা যদি থাকে সেই সরকারের তবে কি আশা করাও অন্যায়।

দেখা যাক এমএলএম আর শেয়ার মার্কেটের মিল কবে বিদূরীত হয়!