ক্যাটেগরিঃ স্বাস্থ্য

b

যে বিষয়ে দুচারটে কথা বলার জন্য এই রাত গভীরে লিখতে বসেছি তা তেমন কোন অজনা বিষয় নয়। সবাই জানে। এবং সবাই যখন জানে তখন আমাদের মাননীয়া প্রধানমন্ত্রীও জানবেন এটাই স্বাভাবিক বিশ্বাস। তাই যখন উনার কণ্ঠে শুনি চিকিৎসকদের উদ্দেশ্যে গত ২৫-১১-২০১১ তারিখ রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে কার্ডিওলজি ও কার্ডিয়াক সার্জারি বিষয়ক চতুর্থ আন্তর্জাতিক সম্মেলন ও দ্বিতীয় ঢাকা লাইভের উদ্বোধনী বক্তৃতায় বলছেনঃ

…একটা দিন ঠিক করেন, যেদিন আপনারা শুধুমাত্র আপনার নিজের গ্রামের মানুষকে সেবা দেবেন…

, তখন জনাতে ইচ্ছে হয় এ অনুরোধের বাস্তব ভিত্তি কি?
এ অনুরোধ অরণ্যে রোদন, কিংবা এই অনুরোধে ঢেকি কে গিলবে এমন অনেক প্রবাদ টেনে এনে আরো সহস্র সমস্যার অবাস্তবায়িত মৌখিক সমাধানের মত প্রধানমন্ত্রীর এই অনুরোধ নিয়ে আলোচনা এখানেই থামিয়ে দেয়া যায়। না দিলেও এর কোন দৃষ্টান্ত আমরা দেখব বলে মনে হয় না।

আমি ডাক্তার ভাইবোনদের হেয় করবো না। কারন অনুরোধটা আসলে বাস্তবিক না। এর সাথে আরও অনেক সমস্যা গভীরভাবে জড়িত।

ঐ একই অনুষ্ঠানে একই বিষয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চিকিৎসকদের উদ্দেশে আরো বলেন,

‘ক্ষুদ্র স্বার্থবাদিতার বশবর্তী থেকে স্বাস্থ্যসেবাকে কখনোই বাণিজ্যিকীকরণ করবেন না। সাধারণ মানুষও যাতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ পায়, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। আমি বিশ্বাস করি, চিকিৎসকেরা তাঁদের সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন।’

একজন প্রধানমন্ত্রী কেবল বিশ্বাস করলেই সেটা হয়ে যায়না। তাঁকে সেটা বাস্তবায়ন করার দক্ষ এবং কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করেতও হয়। প্রধানমন্ত্রী চিকিৎসকদের কাছে যে অনুরোধগুলো করেছেন বাস্তবে তাদের ঠিক উল্টো কাজটাই করেত দেখা যায়। প্রাকটিসটা দিনে দিনে বদলাতে বদলাতে বৈপরীত্যেই এসেছে ঠেকেছে।

জীবনে চিকিৎসকদের প্রয়োজন যেহেতু অনস্বীকার্য সেহেতু তাদের কাছে যেতেই হয়। কিন্তু অদ্যবধী এই ৩০/৩২ বছরের জীবেন কোন চিকিৎসককে তার প্রাইভেট প্রাকটিসে কোন বিল ভাইচার দিতে দেখিনি। তার মানে পুরো ফি যা আমরা দেই সেটার কোন হিসাব থাকে না। আর থাকেনা বলেই সরকারের ট্যাক্স আদায় কারী বিভাগ সেখানে হস্তক্ষেপ করেত পারে না। (ঠিক এই একই কাজ করতে দেখেছী উকিলদেকে। তারাও অধিকাংশ তার ফি এর কোন বিল ভাউচার প্রদান করেন না)। এই যে ট্যাক্স বিহীণ বানিজ্য করণ সে কি প্রধানমন্ত্রীর এক লাইন অনুরোধেই বন্ধ হওয়ার মত বিষয়?

২৭-০৫-২০১১ তারিখে দৈনিক প্রথম আলোর সরকারি চাকরি ছাড়ছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা শিরোণামের এক খবরে দেখা যায়-

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা সরকারি চাকরি ছেড়ে মোটা বেতনে বেসরকারি হাসপাতালে চলে যাচ্ছেন। বেতন ছাড়াও বদলি, পদায়ন ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনা বেশি গুরুত্ব পাওয়ায় তাঁরা চাকরি ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন।
শুধু ২০১০ সালেই বিভিন্ন মেডিকেল কলেজের ৪৪ জন শিক্ষক চাকরি ছেড়েছেন। গত পাঁচ বছরে এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৪৮। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলছে, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের চাকরি ছাড়ার এই প্রবণতা ‘সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা’ নিশ্চিত করার পথে বড় বাধা।
সূত্র জানায়, দেশের ১৭টি মেডিকেল কলেজে সাড়ে চার হাজার শিক্ষকের (বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক) পদ রয়েছে। এর প্রায় অর্ধেক শূন্য। ঢাকা মেডিকেল কলেজে ১৮৩টি পদের বিপরীতে আছেন ৫৪ জন। অন্যান্য মেডিকেল কলেজের পরিস্থিতিও নাজুক। খুলনা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ কাজী হামিদ আসগর জানান, তাঁর কলেজে ৫০ শতাংশ পদই শূন্য।
ঢাকার বাইরে অন্তত ১০টি জেলায় কথা বলে জানা গেছে, সদর হাসপাতালগুলোতে বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শকের (কনসালট্যান্ট) পদ থাকলেও পর্যাপ্ত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নেই।

একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ঢাকা বা যেকোন বিভাগীয় শহরে একদিনে প্রাইভেট প্রাকটিসে, নিজস্ব ক্লিনিকে, অপারেশন করে যে পরিমাণ টাকা আয় করেন তার সরকারী বেতন অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাবে তার চেয়ে কম। এটাই কিন্তু বাস্তব।

ঐ একই রিপোর্টে আরও উল্লেখ করা হয়েছে-

সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের বেতনকাঠামো পর্যালোচনা করে দেখা যায়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকদের চেয়ে বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকেরা ১০ গুণ পর্যন্ত বেশি বেতন পাচ্ছেন।
সরকারি হাসপাতালগুলোয় সহকারী অধ্যাপকের বেতন ২৯ হাজার ৭০০, সহযোগী অধ্যাপকের বেতন ৩১ হাজার ২৫০ থেকে ৩৩ হাজার ৭৫০ এবং অধ্যাপকের বেতন ৩৫ হাজার ৬০০ থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০০৫ সালের জাতীয় বেতনকাঠামোয় একজন চিকিৎসা কর্মকর্তা পেতেন ১৩ হাজার ৯০ টাকা, সেখান থেকে ২০০৯ সালে এই বেতন বেড়ে দাঁড়ায় ২০ হাজার ৩৭০ টাকা। একইভাবে অধ্যাপকের বেতন ২৩ হাজার থেকে বেড়ে ৪০ হাজার টাকা হয়। কিন্তু রাজধানীর ল্যাবএইড, স্কয়ার, অ্যাপোলো ও ইউনাইটেড হাসপাতালে কাজ করছেন, এমন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা পাস করেই ৫০ হাজার থেকে দেড় বা দুই লাখ টাকা পর্যন্ত উপার্জন করছেন। অধ্যাপকদের কেউ কেউ পাচ্ছেন পাঁচ লাখ টাকারও বেশি বেতন।
তবে চাকরি ছেড়েছেন, এমন নবীন চিকিৎসকদের প্রত্যেকেই বদলি, পদায়ন ও পদোন্নতিতে মেধার চেয়ে রাজনৈতিক বিবেচনা বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন।

সুতরাং বেতন বৈষম্য, সুযোগ সুবিধা, রাজনৈতিক প্রভাব এসবের কারেন ডাক্তাররা সরকারী চাকুরিকে গুরুত্বপুর্ণ মনে করেন না। তবে যেহেতু এখনো সরকারী চাকরি করলে টাইটেলে একটা ভারিক্বী ভাব আসে সেটার গুরুত্ব দেয়ার জন্য বিসিএসে নতুন ডাক্তারদের হুমরি খেয়ে পড়তে দেখা যায়। কিন্তু বিশেষজ্ঞ হয়ে গেলে সেই প্রয়োজনও ফুরায়।

তাছাড়া আমাদের দেশে ডাক্তার সংখ্যা এতই স্বল্প যে কাপড় কম পড়ার মত। কম কাপড় যেদিক দিয়ে টানা হোক শরীর কি আর ঢাকে। এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে ব্র্যাক দেশে চিকিৎসকদের সংকট ও অসম বণ্টন নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে দেখা গেছে, ঢাকায় প্রতি ১০ হাজার মানুষের জন্য ১০ দশমিক ৮ জন চিকিৎসক থাকলেও বরিশালে এই হার ১ দশমিক ১, খুলনায় ১ দশমিক ৩, রাজশাহীতে ২ দশমিক ১ ও সিলেটে ২ দশমিক ২ জন।

সুতরাং এই সংকটের শিকার হবে আর সকল সমস্যার মত সেই দূর্বল এবং অসংখ্য সুবিধা বঞ্চিক গ্রামের জনগণই।

এই লেখার প্রথমদিকে উল্লেখ করা প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধটি কথার খাতিরে ধরে নিলাম চিকিৎসকরা মেন প্রাণে পালন করবে। এটা ভাবার কারন আমি সত্যি বিশ্বাস করি একজন ডাক্তার যতই টাকার প্রয়োজনকে উপেক্ষা না করতে পারুক সেবার ব্রতকেও মন থেক এড়াতে পারেন না। চিকিৎসক মাত্রই সেবার ব্রত মনে ধারন করেন। দুএকটা ব্যতিক্রম সবজায়গাতেই থাকে। সে যাক।
সেই সেবার ব্রত থেকে এবং দেশের সরকার প্রধানের অনুরোধে ধরলাম প্রতি জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ঢাকা বার বড় শহরে তার চাকরি , প্রাইভেট উপর্যুপরী প্রাকটিস, অপারেশণ এসব ছেড়ে অন্তত একদিনের জন্য নিজ গ্রামে ফ্রি চিকিৎসা সেবা দেয়ার জন্য যবার সিদ্ধান্ত নিলেন। তাহলে কি হবে?

দেশের টেকনাফ হেত তেতুলিয়ার দৈর্ঘ্য ১০০০ কিলোমিটার। এই হলো আমাদের দেশের দীর্ঘ দূরত্ব। দেশে যদি সুন্দর আধুনিক উচ্চ গতির ট্রেন ব্যবস্থা থাকত। প্রতিটি জেলা শহরে বিমানবন্দর থাকত এবং বিমানের সেবা যথার্থ হত, রাস্তার যানজট সহ্য সীমারমধ্যে থাকত তাহলে ১০০০ কিমি পাড়ি দিতে খুব বেশী সময লাগতোনা। সেটা উন্নত বিশ্বে যাদের পদাপর্ণ আছে তারা মাত্রই বোঝেন। হংকংয়ে আমি এই উচ্চগিতর ট্রেনের কারনে মাত্র একদিনের ভ্রমনে এমাথা থেকে ও মাথা ঘুরে ফেলতে সক্ষম হই।

কিন্তু বাস্তব চিত্র বড় করুন। ডাক্তার ছুটির একদিন তার গ্রামে যেতে যেতেই তার অধিকাংশ সময় হারাবেন। মাঝে মাঝে যানজটে হয়তো পৌঁছানোর আগেই আবা ঢাকয় ফিরতে হবে। ফলে মনটাও বিগড়ে থাকবে। সেবা আর দেয়া কতটা সম্ভব হবে সেটা অনুমেয। মানুষ তো ফেরাস্তাতো কেউ নয়।

অথচ এই জার্নির সময় চিকিৎসকটি ঢাকায় বা বড় শহরে থাকলে অনেকগুলো মানুষের চিকিৎসা করতে পারতেন। একজন শল্য চিকিৎসক বা একজন গাইনীর চিকিৎসক ছুটির দিন এক একটা ক্লিনিকে কি পরিমাণ সিজার করেন তা ঢাকার কোন হাসপাতালে একটা ছুটির দিন কাটালেই বোঝা যায়। এমন একজন ব্যস্ত ডাক্তার গ্রামে প্রতি সপ্তাহে যাবেন এটা অনুরোধ করার মত বাস্তবতা বিরাজমান নয়।

এ কারনে পারিপার্শ্বিক ব্যবস্থা ঠিক করে না কেবল অনুরোধ আর বিশ্বাসে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কতদূর দেশকে এগিয়ে নিতে পারবেন সে বিষয় বড় প্রশ্নবোধক।