ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

 

রোহিঙ্গা শরনার্থী সমস্যা একটি সাম্প্রদায়িক সমস্যা। এ সমস্যা দীর্ঘকাল ধরে চলে আসছে। রোহিঙ্গা হলো মায়ানমারের আরাকান রাজ্যের সংখ্যালঘু মুসলমান জাতিগোষ্ঠী। রোহিঙ্গা নামটি শুনতেই একটি উদ্বেগজনক স্মৃতি মনে পড়ে। রাখাইন অঞ্চলের এ মুসলমান জনগোষ্ঠীর সাথে মায়ানমার কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে বিভিন্ন বিরোধ জড়িয়ে আছে। সংখ্যালঘু মুসলিম জাতি রাখাইন বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের ভয়ে বাংলাদেশ, থাইল্যান্ডসহ আরো অনেক দেশে বিতাড়িত রোহিঙ্গারা মানবেতরভাবে আশ্রয় নিয়েছে। রোহিঙ্গারা রাখাইন অঞ্চলের মোট জনসংখ্যার বিশ ভাগের বেশী। জাতিসংঘের একটি জরিপ মতে(২০০৯), রোহিঙ্গা জনসংখ্যা ৭ লাখ ২৩ হাজার বলে উল্লেখ রয়েছে।

গত তিন দশকে বাংলাদেশকে একাধিকবার রোহিঙ্গা নামক উদ্বাস্তু সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে। সত্তর দশকের শেষে এবং নব্বইয়ের দশকের শুরুতে রাখাইন বৌদ্ধদের ও সে দেশের সেনাবাহিনীর নির্যাতনে যে সমস্ত রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে এসেছে তাদের প্রত্যাবাসন করাটা একটু কষ্ঠ সাধ্য হয়েছে। তথাপি দুই লক্ষাধিকের বেশী শরনার্থী এখনো বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে রয়েছে। বাংলাদেশেও তারা মানবেতর জীবন যাপন করছে। দারিদ্রের কষাঘাতে তারা বিভিন্ন সময়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হচ্ছে। যা বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক, পরিবেশজনিত ও নিরাপত্তাগত সমস্যার সম্মুখীন করছে।

‘কপাল বাড়িয়ে সিঁদুর নেয়ার’ অবকাশ নেই। যদিও মায়ানমার বাংলাদেশের বন্ধুপ্রতিম ও প্রতিবেশী রাষ্ট্র। তারপরও রোহিঙ্গা সমস্যা বাংলাদেশের করে নেয়ার কোনো অবকাশ নেই। রোহিঙ্গা সমস্যা পুনরায় শুরু হবার পর জাতিসংঘ রোহিঙ্গাদের আশ্রয়ের জন্য বাংলাদেশের প্রতি আহবান জানিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অনুরোধ নাকচ করে দিয়েছেন। রোহিঙ্গাদের নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের বর্তমান দৃষ্টিভঙ্গি মানবিক দিক থেকে দৃষ্টিকটু হলেও বাস্তবিক দিক থেকে সিদ্ধান্তটি অযৌক্তিক নয়। রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে শুধু বাংলাদেশ নয় সমগ্র বিশ্ববাসীকেই সচেতন হতে হবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র , ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থাগুলো শুধু বাংলাদেশকেই রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ার জন্য অনুরোধ করছে। অথচ যাদের কারণে রোহিঙ্গারা আজ নির্যাতিত তাদের বিরুদ্ধে কোন কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করছেনা। রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে মুসলিম বিশ্বকে আরো কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।

যাহোক প্রসঙ্গে ফিরে আসি। মায়ানমারে ১৩২ টি নৃতাত্ত্বিক জাতিগোষ্ঠী সরকারি ভাবে স্বীকৃত, এর মধ্যে শুধু রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী সরকার স্বীকৃত থেকে বঞ্চিত। কেননা এ জনগোষ্ঠী জাতিতে মুসলমান। যদিও পঞ্চাশের দশকে উনু সরকার রোহিঙ্গাদের স্বীকৃতি দিয়েছিল। তারপর থেকে রাখাইন বৌদ্ধ ও রোহিঙ্গা মুসলমানরা শতাব্দীর পর শতাব্দী একত্রে বসবাস করে আসছিল।

১৯৭৭ সালে যখন মায়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকার দেশে বহিরাগতদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করে তখনই এ জাতিগোষ্ঠির কপালে আর সুখ টিকে থাকেনি। কেননা এ ঘোষণার পর রাখাইন বৌদ্ধ এবং বার্মা সরকার সেনাবাহিনী একত্রে রোহিঙ্গাদের ওপর অন্যায়ভাবে নির্যাতন নিপীড়ন শুরু করে। এবং সামরিক সরকার রোহিঙ্গাদের ‘সন্ত্রাসবাদী জনগোষ্ঠী’ বলে আখ্যায়িত করে।

বর্ণবাদী হিংসার ভাষায় বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ মায়ানমার অনেক বাস্তব বিষয় সংবাদ প্রতিবেদনে প্রকাশ করেনা এবং মায়ানমারের বৌদ্ধ জনগোষ্ঠী এতে কিছু মনেও করে না। ফলে রোহিঙ্গা সমস্যার প্রকৃত চিত্র বিশ্ববাসীর নিকট এখনো অস্পষ্ট। রোহিঙ্গাদের প্রতি এই হিংসাত্মক মনোভাব প্রকাশে মায়ানমারের গণতন্ত্রীপন্থী নেতৃত্বে যারা নিজেদের পরিবর্তনের শক্তি হিসেবে দাবী করেন তারা মোটেও পিছিয়ে নেই। প্রখ্যাত গণতন্ত্রীপন্থী নেতা কো কো গাইয়ী বলেন, রোহিঙ্গাদের উপস্থিতি মায়ানমারের জন্য হুমকি। সংখ্যালঘু হওয়ায় তারা এ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার শিকার হচ্ছে। এ সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী বারবার জাতিগত শুদ্ধি অভিযানের শিকার। একবার ৬০’র দশকে, একবার ৮০’র দশকে, এবং ৯০’র দশকের শুরুতে আর সাম্প্রতিক দাঙ্গাটাও শুদ্ধি অভিযান দিয়ে। যে অভিযানে সেনাবাহিনীর হাতে অজ¯্র রোহিঙ্গা নিহত হয়েছে এবং বিতাড়িত হয়েছে।

রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী সরকার কর্তৃক স্বীকৃত না হওয়ায় বারবার এ হিংস্র দাঙ্গার শিকার হতে হচ্ছে। যে ব্যাপারে জাতিসংঘসহ অন্যান্য মানবাধিকার সংস্থাগুলোর বক্তব্য খুবই উদ্বেগজনক। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রোহিঙ্গাদের মানবেতর বসবাস সত্যই দুঃখজনক। রোহিঙ্গারাই পৃথিবীর একমাত্র জনগোষ্ঠী যাদেও নির্দিষ্ট কোনো আবাসস্থল নেই। তবে ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে তারা অবশ্যই মায়ানমারের নাগরিক। এবং আন্তর্জাতিক আইন মোতাবেক বাংলাদেশ ও থাইল্যান্ডে বসবাসকৃত রোহিঙ্গাদের মায়ানমার ফেরত নিতে বাধ্য।

মায়ানমারে বর্তমানে গণতন্ত্রের সুবাতাস বইতে শুরু করেছে। তার মাঝেই আবার এই দাঙ্গার সূত্রপাত সেদেশের গণতন্ত্রকামীদের জন্য একটি অশুভ সংবাদ। রোহিঙ্গাদের সম্পর্কে গণতন্ত্রকামী নেত্রী অং সান সুচির আরো বেশী আন্তরিক হতে হবে। কিন্তু বর্তমান সমস্যা নিয়ে তার বক্তব্য নিরব ও খুবই উদ্বেগজনক। তিনি বলেন, এরকম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা থামাতে আইনের সুশাসন খুবই জরুরী, একই সাথে রোহিঙ্গাদের এ সমস্যা থামাতে জনগণের সহযোগিতা দরকার। কিন্তু যেখানে সরকার ও জনগণের অনুভূতি একই সেখানে জনগনের সহযোগিতা কতটুকু পাবেন এই গণতন্ত্রকামী নেত্রী সেটাই অপেক্ষার বিষয়। তবে একথা সত্য যে, রোহিঙ্গা সমস্যা মায়ানমারের গনতন্ত্রায়নের পথে বিরাট বাধা। এ সমস্যার সমাধান মায়ানমার সরকারকেই করতে হবে।