ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

 

ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস সাম্প্রদায়িক। এখানে বারবার বহিরাগতদের আক্রমনে ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে এবং সে অনুযায়ী নিজ ধর্মের লোকজনকে রাষ্ট্রক্ষমতার স্বাদ দিয়েছে। মোঘল ইতিহাসে মোঘলরা পৃষ্ঠপোষকতা করেছে ইসলামের, ভারত দখলের জন্য তারা ধর্মীয় কারণকে কুক্ষিগত করেছিল। সেখানে আবার সম্রাট আকবর যখন দ্বীন-ই-ইলাহী নামের অসাম্প্রদায়িক এক ধর্মের বাণী প্রচার করে ভারতীয়দের ঐক্যবদ্ধ করার এক মহান চেষ্টা করেছেন। রাষ্ট্রের সাথে ধর্ম কেন্দ্রিক সম্পর্ক না গড়ে বাণিজ্য ভিত্তিক সম্পর্ক থাকবে এ কথাকে অনুসরণ করে ইউরোপীয়রা সহজে ভারত ঢুকে পড়েছে। সেখানে ধর্মীয় বিভাজনকে সুন্দরভাবে চিহ্নিত করে এ ভূখণ্ডকে শেষ পর্যন্ত অবিশ্বাস আর তিক্ততার দিকে নিয়ে একটি ভূখণ্ডকে ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ করে তৈরি করা হয়েছে দুটি সতন্ত্র রাষ্ট্র। ধর্মকে কেন্দ্র করে দাড়িয়ে থাকা রাষ্ট্র যে আসল অস্তিত্বের জন্য খুবই দুর্বল একটি বিষয়। তার বড় প্রমাণ দুটি পাকিস্তান । মাত্র কয়েক যুগের মধ্য দিয়েই সোনার বাংলার উদ্ভব। বাঙ্গালীর ইতিহাসের সাম্প্রদায়িক কলঙ্ক দুটিই সেই ইংরেজ যুগের (কলকাতা দাঙ্গা ও নোয়াখালী দাঙ্গা)। সকল কিছুর পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষ করে একটি জায়গায় বাঙ্গালীর অনুভুতি এক সেটা হল ধর্মীয় অনুভুতি।

স্বাধীন বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে অসাম্প্রদায়িকতার চর্চা মূলত রাষ্ট্রীয় ভাবে শুরু হয় ১৯৬৯ এর গণ অভ্যুত্থান, ৭০ এর নির্বাচন এবং নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে। তবে বিভিন্ন সময়ে সাম্প্রদায়িকতার ছায়া বৃদ্ধি করার ভুয়সী চেষ্টা চালানো হয়েছে। যতবার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্টের পাঁয়তারা চালানো হয়েছে ততবারই আমাদের শিক্ষা হল রাষ্ট্র প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে জনগনের দৃষ্টিকে সেখানে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট থেকে সরিয়ে রাখতে চেয়েছে। বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ, এ কথাটি বাঙ্গালী যতই দাবি করুক না কেন কিন্তু আজ অস্বীকার করার কন উপায় নেই। তবে ধর্মীয় বিরোধী হামলার ঘটনা খুব বেশি নেই। গত এক বছরের পরিসংখ্যানে লক্ষ্য করা যায় চট্টগ্রাম, সাতক্ষীরাস্থ আর কিছু জায়গায় এক দল উগ্রপন্থীগন সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ঘটিয়ে চলেছে। যেটা খুবই উদ্বেগজনক ! এ ঘটনায় বর্তমান সরকার আন্তর্জাতিক সংস্থা ও দাতা দেশের চাপে খুবই ইমেজ সংকটে রয়েছে। পদ্মা সেতুর দুর্নীতি সহ বর্তমান মন্ত্রীপরিষদের সমালোচনা সকলের মুখে থাকতে থাকতেই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ধ্বংসের অভিযোগের আঙুল উঠেছে বাংলাদেশের প্রতি।

সাম্প্রদায়িক আক্রমণের ধারা বাংলাদেশে একটি শক্ত অবস্থানে পৌঁছে যাচ্ছে এতে কোন সন্দেহ নেই। কেননা সম্প্রতি রামু,উখিয়া, কক্সবাজারের ঘটনাটি সেটাই প্রমাণ করে। আমি ধ্বংসযজ্ঞ স্থান পরিদর্শন করে বুঝতে পেলাম স্থানীয় প্রশাসন সম্প্রীতি রক্ষার্থে সম্পূর্ণ নিরব। এই নীরবতা কি প্রমাণ করে না এটা সরকারের রাজনৈতিক চাল? ২৫০ বছর আগের মৈত্রী বিহার সহ ১২ টি বৌদ্ধবিহার ও ৩০টি বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয়া হয়। এসব ঘটনা যে পূর্ব পরিকল্পিত সেটা দিবালোকের মত সত্য । কেননা এতসব তাণ্ডবলীলা ঘটে গেল কিন্তু সরকারী গোয়েন্দা বাহিনী, স্থানীয় প্রশাসন কি করল আর তাদের ভূমিকাই কি ছিল? যাহোক পরিকল্পিত ঘটনার তীব্র নিন্দা জ্ঞাপনের সাথে সাথে বাংলার বুকে যারা সংখ্যালঘু ধর্মীয় বুদ্ধতাদের মনে যে নিরাপত্তাহীনতার জোয়ার সৃষ্টি হয়েছে। সেটা হয়তোবা সহজেই দূর করা সম্ভব নয় । তবে বাংলাদেশকে অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হতে হলে সংখ্যা লঘুদের মনে আস্থা ফিরিয়ে আনার বিকল্প নেই। মানব সভ্যতার এই পর্যায়ে এসে এক বিংশ শতাব্দীতে একটি দেশের জনগোষ্ঠীর মধ্যে ধর্মীয় কারণে উত্তেজনার সৃষ্টি হবে এমনটি কারো কাম্য নয়। সাম্প্রদায়িকতা ভুলে যেমন ৪১ বছর আগে স্বাধীনতা অর্জন করেছিলাম। সেখানে আজ সাম্প্রদায়িকতার ট্রাম্পকার্ড চলবে সেটি হতে দেয়া যায় না। দেশকে এগিয়ে নিতে হলে আমাদের কাধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে যেতে হবে। চাই সম্প্রীতি, আর ধ্বংস হোক সকল অপশক্তি।