ক্যাটেগরিঃ প্রতিবন্ধী বিষয়ক, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

 
13_jatiyosritishoudho_260316_0012

কবি মানুষ জাতের বর্ণনা দিয়ে বলেছেন ,
‘নানান বরন গাভীরে ভাই
একই রঙের দুধ
জগৎ জুড়িয়া দেখলাম
একই মায়ের পুত’

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার সনদ একটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তি বা সনদ। মানবাধিকার হলো মানব পরিবারে জন্ম নেয়া সকল মানুষের অধিকার , এই অধিকার সকল মানুষের জন্য সমান। ২০০৬ সালে ১৩ ডিসেম্বর বিশ্বব্যাপি মানবাধিকারের ৮ম সনদ হিসেবে সাধারণ পরিষদের ৬১ তম অধিবেশনে সর্বসম্মতভাবে জাতিসংঘ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবর্গের অধিকার সনদ পড়হাবহঃরড়হ ড়ভ ঃযব ৎরমযঃং ড়ভ ঢ়বৎংড়হং রিঃয ফরংধনরষরঃু(ঈজচউ) অনুমোদন করে । ৩ মে ২০০৮ তারিখে সনদটি বিশ্বব্যাপি একটি আন্তর্জাতিক আইনে বলবৎ হয়। বাংলাদেশ জাতিসংঘের ৮ম সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে সনদ এবং ১৬ তম সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে এর ঐচ্ছিক বিধান সাক্ষর ও অনুসমর্থন করে।

অনুসমর্থনকারী রাষ্ট্র হিসেবে এখন এই সনদ পরিপূর্ণভাবে পালন করা আমাদের রাষ্ট্রিয় দায়িত্ব।এই দায়িত্বের অংশ হিসেবে সরকারিভাবে প্রয়োজন হলো দেশের বিরাজমান সকল আইন ও নীতিমালাকে এই সনদের আলোকে ঢেলে সাজানো। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবর্গের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য দেশের নির্দিষ্ট কোন আইনের বাস্তবায়ন নেই। তৃতীয় বিশ্বের অন্যতম দেশ হওয়ার কারণে নতুন ধাঁচের একটি পূর্ণাঙ্গ মানবাধিকার ভিত্তিক আইনের প্রয়োজন পরে পুরনো দয়া দাক্ষিন্য ভিত্তিক ‘প্রতিবন্ধী কল্যাণ আইন’-২০০১ এর পরিবর্তে। এ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সনদের অনেক ঘোষণা , কর্মসূচি , আর বিধি তৈরি হয়েছে। অনক দেশে বলেছে যে তার এই সকল ঘোষনা বিধি বাস্তবায়ন করবে। কিন্তু সে সবের কোন নজরদারি , জবাবদিহিতা ও আইনের বাধ্যবাধকতা না থাকায় এই সনদের কেউই কোন তোয়াক্কা এমনকি শ্রদ্ধা পর্যন্ত করেনি। আলাদাভাবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য জাতিসংঘের বিধি (স্ট্যান্ডার্ড রুলস) হয়েছে। কোন দেশই সেটা খুব একটা মানেনি। জাতিসংঘের উদ্যেগে শিশু অধিকার সনদ হয়েছে যা থেকে শিশু প্রতিবন্ধীরা কোন উপকার পায়নি।

নারী সনদ সিডও থেকেও প্রতিবন্ধী নারীরা কোন উপকার পায়নি । অথচ মানব ঘরে জন্মের কারণে একই মর্যাদা পাবার কথা ছিল। ১৯৪৮ সালে মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষনা ছিল। কিন্তু সেটা বর্তমানে ভেঙ্গে দুটি ভাগ হয়েছে। প্রথমত , অর্থনৈতিক ,সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার। দ্বিতীয়ত, নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদ।

মানুষের মুক্তি, স্বাধীনতা অধিকার ,মর্যাদা , সমতা, বৈষম্যহীনতার নিশ্চয়তা। এর জন্য বয়স, লিঙ্গ , জন্মস্থান, পরিচয়, পেশা ,জাতপাত ,শ্রেণী ,বর্ণ ইত্যাদি ভিত্তিতে কোন ভেদাভেদ করা চলবে না। কিন্তু এইসবের কোন সফলতা আসেনি। গায়ের রং, লিঙ্গ , বয়স এমন নানা অজুহাতে মানুষের উপর জুলুম হচ্ছে। জুলুম নিপীড়নের আরেক অজুহাত হলো প্রতিবন্ধকতা। প্রতিবন্ধী মানুষের ভিন্ন শারিরীক, মানসিক ইন্দ্রিয়গত বাধার কারণে ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের অজুহাতে তাদের প্রতি বৈষম্য, অসম আচরণ ব্যবস্থা এমন এক পর্যায় পৌছেছে যে তাকে নির্যাতন আর নিপীড়নের এক ইতিহাস বলা হয়েছে।এজন্য প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য আরো একটি সনদ দরকার, সেটি হলো সিআরপিডি।

আমরা জানি প্রতিবন্ধী নারী, শিশু ঘরের বাহিরে সর্বত্র অন্য কারো চেয়ে বেশী নির্যাতিত , অযত্ন-অবহেলা, মারধর অন্যায় আচরণ ও বিভিন্ন ফায়দা উঠানোর শিকার হয় । আমরা বিশ্বাস করি পরিবার হেেলা সমাজের প্রধান ভিত্তি। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিগণ যেন সমান অধিকার উপভোগ এবং সমাজে অবদান রাখতে পারেন সেজন্য প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং তাদের পরিবারের প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ও সহায়তা পাওয়া উচিত। আন্তর্জাতিক সনদের সাথে আমি একমত পোষণ করে বলতে চাই যেহেতু প্রতিবন্ধীরাও মানুষ সেহেতু তাদের রয়েছে নিজস্ব পছন্দ- অপছন্দ, মর্যাদা, স্বাধীনতা। সুতরাং সকল ক্ষেত্রে তাদের সঠিক মর্যাদা প্রদানসহ তাদের সকল প্রকার সামাজিক আচার অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ ও অন্তর্ভুক্তিতে বৈষম্য বাদ দিয়ে তাদের স্থান পরিস্কার করা উচিত।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধীদের নামে ‘লুনাসি আইন’ নামক একটি ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্তৃক প্রদত্ত আইন রয়েছে। যে আইনের বলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের যেকোন সময় গ্রেফতার পরয়োনা জারি করা যায়। যা আমাদের মতো অ-প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য লজ্জাকর বিষয়। দেশে বিদ্যমান ‘প্রতিবন্ধী কল্যাণ আইন’ , যাদের প্রতিবন্ধীদের অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব ছিল। কিন্তু অধিকার দূরের কথা তাদের বিষয়ে কথা পর্যন্ত বলেনা। বাংলাদেশে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় রয়েছে কিন্তু সেখানে প্রতিবন্ধী নারী ও শিশুদের নিয়ে কোন কাজ করে না। অথচ আজ প্রতিবন্ধী নারী ও মেয়েরা শত শত অবিচার অবহেলার শিকার। তাদের জন্য সমাজসেবা অধিদপ্তরের ভাতা ছাড়া আর কোন উন্নয়ন প্রকল্প নেই। তাদেরকে উন্নয়নের সকল ক্ষেত্রে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দিয়ে সমাজের মুল ¯্রােতধারায় নিয়ে আসতে নারী উন্নয়নের সকল প্রচেষ্টায় তাদেরকে অন্তর্ভূক্ত করা উচিত।

তবে শুধু বাংলাদেশে নয় পৃথিবীর অনেক দেশেই প্রতিবন্ধীদের সমাজের অন্য দশজনার মত সমান মনে করে না । উদাহরন হিসেবে দেখা যায় , আশির দশকে আমেরিকায় প্রতিবন্ধীদের বিয়ে করা নিষিদ্ধ ছিল। কেননা বিয়ে করলে আবারো প্রতিবন্ধী সন্তান জন্ম নিয়ে মার্কিন জাতিকে কলুষিত করে তুলবে। ১৯৯০ সালে আমাদের দেশের নারায়ণগঞ্জ জেলার লস্করদিয়া গ্রামের জনাব শহিদুল নামক এক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ফরিদপুর থেকে আটক হয়। একর পর এক পাগলা গারদ সহ একাধিক আশ্রমে থেকে শেষে ফরিদপুর কারাগারে স্থান হয়।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রতি এইসব প্রতিবন্ধকতা শব্দটির ধারণা ক্রমেই স্বচ্ছ হচ্ছে। প্রতিবন্ধকতা জন্ম নেয় প্রতিবন্ধী মানুষের প্রতি সমাজ আর পরিবেশের মনোভাব থেকে। হ্যাঁ তবে সকল প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের যদি সকল ক্ষেত্রে অংশগ্রহন করতে দেয়া হয়। তারা যদি তাদেও অধিকার চর্চা করতে পাওে তবে তারা সমাজকে সুন্দর করতে ভূমিকা রাখবে। সমাজ থেকে বিদ্বেষ , বৈষম্য এবং বঞ্চনা কমে যাবে। সমাজটা আরো সুন্দর ও সমৃদ্ধি অর্জন করবে।

লেখক পরিচিতি
শিক্ষক,
আনন্দশালা স্কুল
(বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের বিকাশকেন্দ্র)
মোবাইল নং ০১৭৩৭৩২৫০২৩