ক্যাটেগরিঃ প্রবাস কথন

বাংলাদেশি কিভাবে নেপালি হয়? তা আমার ধারনা ছিল জন্মগত সূত্রে অথবা বৈবাহিক ভাবে বা দীর্ঘকালীন বসবাসের সুত্রে কোন কোন দেশের নাগরিকত্ব পাওয়া যায়।কিন্তু আরো এক সূত্রে নাগরিকত্ব পাওয়া যায় সেই ধারনা আমাদের অনেকের জানা নেই তাই জানানোর জন্য আমার এই প্রয়াস। কর্মস্থলে বদলির কারনে কিছু দিনের জন্য আমার থাকতে হয়েছে কাতারের রাজধানি দোহাতে। প্রথম যখন কোম্পানির রেষ্ট হাউজে উঠি তখন দেখলাম আমাদের যিনি কুক রযেছেন উনি বাংলাদেশের। অনেক আনন্দ লাগছিল। দেশের একজনকে পেলাম তা ও আবার খাবারদাবার এর ডিপারমেন্ট এ।

যাই হোক, একদিন উনার সাথে কথা প্রসঙ্গে আমাকে বললেন, আমাকে একটা উপায় বলেন কিভাবে বাড়ি যাব? আমি বললাম, কেন ছুটি নাও। তারপর চলে যাও। সে বলল, সেটা সমস্যা না। সমস্যা অন্য জায়গায়। আমি বললাম, কেমন? আমার কাছে তো নেপালি পাসপোর্ট। আমি বললাম, তুমি এই পাসপোর্ট পেলে কিভাবে? সে বলল, কী বলব ভাই! দালালরা দিছে। আমি বললাম, তুমি নিলে কেন? তখন সে পুরা ঘটনাটি আমাকে খুলে বলল। কিভাবে সে কাতারে এসেছে।

বরাবরই উনি এসেছেন দালালের মাধ্যমে। দালালরা উনাদের প্রথমে কাতার আনবে বলে দেশের পাসপোর্ট নেয়। তারপর নিয়ে আসে নেপালে এবং সেখান থেকে তাদের নেপালি পাসপোর্ট বানিয়ে দেশের পাসপোর্ট ছিনিয়ে নিয়ে পাচার করে দেয় কাতারে। আর এই ব্যপারটা থাকে সম্পূর্ণ গোপন। নেপাল যাওয়ার পর টের পাবেন। নেপাল থেকে যদি চলে আসতে চান, তখন এই বলে ভয় দেখায়, তোমাকে পুলিশে দিয়ে দেওয়া হবে; তোমার দুইটা পাসপোর্ট। ইত্যাদি ইত্যাদি। তখন সে ভাবে এখানে জেলে থাকার চেয়ে কী আর করা, এত টাকা খরচা যখন করে ফেলেছি সামনের দিকে আগিয়ে যাই। পিছনে যাওয়া মানে তো আত্মহত্যা করা। এই ভাবে আমাদের মহৎ আদম ব্যবসায়ীদের কল্যাণে বাংলাদেশি হয়ে গেল নেপালি। চলে গেল কাতার।

এইবার ধরেন কোন কারনে আপনার যদি দেশে আসতে হয়, তাহলে আপনার দেশ হল নেপাল। ঐ অবস্থায় কারো মৃত্যু হয় তাহলে তার লাশ পাঠাবে নেপালে। দেশে যেতে হলে বাংলাদেশের ভিজিট ভিসা নিয়ে দেশে আসতে হবে। তা ছাড়া আর একটা উপায় হচ্ছে ভারতে যাওয়া, সেখান থেকে অবৈধ ভাবে বর্ডার পার হয়ে দেশে যাওয়া। কারন ভারতে নেপালিদের সেই সুযোগ দেওয়া হয়। তাদের ভারত থেকে নেপালে যেতে তেমন কাগজপত্রের দরকার হয় না।

ঐ দেশের প্রশাসন যখন এটা জানতে পারবে তখন বন্ধ করে দিবে সকল বাংলাদেশিদের ভিসা। আমাদের দেশ তালিকাবদ্ধ হয়ে যাবে এক অপরাধি রাষ্ট্র আর আমরা হব সেই দেশের নাগরিক। এই বিষয়ে আমার এক বন্ধুর সাথে কথা বললে জানতে পারলাম, এই রকম অনেকে আছেন কাতারে। আরো আনেক দেশি নেপালি ভাইদের সাথে দেখা হয়েছে। সবার মুখে একই কথা। চলে যখন এসে গিয়েছি কী করব? এখন বলতে পারছি না আমি বংলাদেশি। কারণ, চোখের প্রিন্ট নেওয়া আছে। তাই যাবার কোথাও জায়গা নাই। এইভাবে নেপালির পরিচয়ে চলছে জীবন।

আমার বন্ধুটিকে জিজ্ঞেস করলাম দালালরা এমন করার কারন কী? সে বিস্তারিত আমাকে বলল। বর্তমানে একজন বাংলাদেশের লোকের ভিসার মূল্য ৪/৫ লক্ষ টাকা। আর সেখানে নেপালিদের ভিসার দাম বড়জোর ৪০/৫০ হাজার টাকা। তাই ৫০ হাজার টাকার জিনিষ বিক্রি করা হল ৫ লক্ষ্য টাকায়। সুতরাং লাভের পরিমাণটা তুমি হিসেব করে দেখ। আমি তাকে বললাম, তাই বলে একজন লোকের নাগরিকত্বই বদলি করে ফেলবে, এইটা কেমন কথা। সে আমাকে বলল এরা টাকার জন্য নিজের……কে ও বিক্রি করে দিতে পারে। তাই এদের নাম আদম দালাল।

জানি না আমার সেই কুক বন্ধু টি কেমন আছে। বা সে আজও দেশে যেতে পেরেছে কিনা। সময়ের সাথে চলতে গিয়ে আমিও চলে গেলাম অন্য দেশে। তার সাথে আর যোগাযোগ করতে পারিনি। এই রকম হাজার হাজার বাংলাদেশি ভাইয়ের জন্য দোয়া করবেন। সবাই তাদের যেন ভাল কোন সমাধান হয়। কাতারের সব চাকচিক্য ভাল লাগলেও এই একটি বিষয় খুব খারাপ লেগেছে। আমার জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা। ধিক্কার দিচ্ছি সেই আদম দালালদের।

ধন্যবাদ সবাইকে।
মান্নান। আলজেরিয়া থেকে।